গাজা উপত্যকায় নারী ও কিশোরীদের বিরুদ্ধে সহিংসতা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। এর মধ্যে বাল্যবিয়ে, জোরপূর্বক বিয়ে এবং যৌন সহিংসতার ঘটনাও রয়েছে। সাম্প্রতিক একাধিক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানিয়েছে জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিল (ইউএনএফপিএ)।
১০টি সংস্থার কাছ থেকে সংগৃহীত তথ্য বিশ্লেষণ করে ইউএনএফপিএ জানিয়েছে, চলতি বছরের দ্বিতীয় প্রান্তিকে গাজায় বাল্যবিয়ে ও জোরপূর্বক বিয়ের নথিভুক্ত ঘটনা আগের প্রান্তিকের তুলনায় ১২৩ শতাংশ বেড়েছে।
গাজা সিটি ও খান ইউনিসের বাস্তুচ্যুত শিবিরে ২৩০ নারীর সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে তৈরি আরেক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে আরও ভয়াবহ চিত্র। এক নারী জানান, ধর্ষণের শিকার মেয়েদের সামাজিক লজ্জা এড়াতে অনেক সময় ধর্ষণকারীর সঙ্গেই বিয়ে দেয়া হচ্ছে।
আরেক নারী জানান, গত বছর দুর্ভিক্ষের সময় এক ব্যক্তি তার ১৪ বছর বয়সী মেয়েকে দুই বস্তা আটার বিনিময়ে বিয়ে দিয়েছিলেন, যাতে তিনি ও তার অন্য সন্তানরা খাবার পেতে পারেন। বিভিন্ন শিবিরের ছয় নারী একই ধরনের ঘটনার কথা জানিয়েছেন।
ইউএনএফপিএর ফিলিস্তিন প্রতিনিধি নেস্টর ওমুহাঙ্গি বলেন, যুদ্ধ, ব্যাপক প্রাণহানি, ধ্বংসযজ্ঞ ও বারবার বাস্তুচ্যুতির কারণে গাজার সামাজিক কাঠামো ভেঙে পড়েছে।
তার ভাষায়, “সবকিছু ক্ষয়ে গেছে... কোনো ব্যবস্থা নেই।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দুই কোটির বেশি গাজাবাসীর প্রায় সবাই যুদ্ধের কোনো না কোনো পর্যায়ে বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। অধিকাংশ মানুষ এখন তাবু কিংবা ক্ষতিগ্রস্ত ভবনে বসবাস করছেন। খাদ্যের বাজার চালু হলেও বহু মানুষ প্রয়োজনীয় পণ্য কেনার সামর্থ্য হারিয়েছেন। দারিদ্র্য ও ক্ষুধার পাশাপাশি সরকারি সেবাব্যবস্থাও অনেকাংশে ভেঙে পড়েছে।
যুদ্ধের আগে গাজার মেয়েরা প্রাথমিকের পর প্রায় সব স্তরের শিক্ষায় ছেলেদের তুলনায় এগিয়ে ছিল। দীর্ঘদিন স্কুল বন্ধ থাকায় এখন বহু শিশু পড়াশোনা ছেড়ে দিয়েছে। মেয়েদের ক্ষেত্রে নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগও বেড়েছে।
বাস্তুচ্যুত শিবিরে ব্যক্তিগত গোপনীয়তার অভাব এবং অপরিচিত মানুষের সঙ্গে বসবাসের কারণে যৌন হয়রানি ও নির্যাতনের ঝুঁকি বেড়েছে। অনেক পরিবার মেয়েদের নিরাপত্তা ও সামাজিক মর্যাদা রক্ষার উপায় হিসেবে বিয়েকে বেছে নিচ্ছে।
যুদ্ধে বাবা-মাকে হারানো মেয়েরা বিশেষভাবে ঝুঁকিতে রয়েছে। গাজা সিটির একটি শিবিরে এক নারী জানান, তার পরিবারের ১৪ ও ১৫ বছর বয়সী দুই মেয়েকে চাচারা বিয়ে দিয়েছেন। মেয়েদের বাবা-মা নিহত হওয়ার পর তাদের দায়িত্ব ও খরচ থেকে মুক্তি পেতেই এ সিদ্ধান্ত নেয়া হয় বলে জানান তিনি।
গাজার বিভিন্ন সহায়তা সংস্থা জানিয়েছে, বাল্যবিয়ের পর অনেক কিশোরী নির্যাতনের শিকার হচ্ছে এবং অল্প বয়সেই গর্ভবতী হয়ে পড়ছে। কিশোরী মায়েদের গর্ভপাত ও কম ওজনের সন্তান জন্ম দেয়ার ঝুঁকি বেশি বলে জানিয়েছে তারা।
গাজায় যৌন সহিংসতার প্রকৃত চিত্র এখনো পুরোপুরি জানা যায়নি। সামাজিক লজ্জা ও প্রতিশোধের ভয়ে অনেক ঘটনা প্রকাশ্যে আসে না। তবে ইউএনএফপিএর সর্বশেষ বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ধর্ষণ ও যৌন নিপীড়নসহ যৌন সহিংসতা এখন “সংকটজনক” পর্যায়ে রয়েছে।
এপ্রিল থেকে জুন ২০২৬ পর্যন্ত নথিভুক্ত লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতার ২ দশমিক ৭ শতাংশ ছিল যৌন সহিংসতা। আগের প্রান্তিকে এই হার ছিল ২ দশমিক ১ শতাংশ। মোট নথিভুক্ত ঘটনার হিসাবে বৃদ্ধি ছিল ৬১ শতাংশ।
