রাজধানীর বারিধারায় বেপরোয়াগতিতে গাড়ি চালিয়ে ফুটপাথে বসে থাকা নির্মাণ শ্রমিককে চাপা দিয়ে হত্যার ঘটনায় গাড়িচালক আজান আলী শরীফ (১৭)কে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। ঘটনার পর আটক হলেও পুলিশ তাকে ছেড়ে দিয়েছিল। মেহেদী নামের ওই শ্রমিককে চাপা দিয়ে হত্যার ঘটনায় দায়ের হওয়া মামলায়ও এই কিশোরের নাম ছিল
না। মামলা দেয়া হয় অন্য একজনের নামে। ঘটনার ভিডিও ভাইরাল ও কিশোর চালককে ছেড়ে দেয়ায় ব্যাপক সমালোচনা শুরু হয় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। গতকাল বিকালে তাকে গ্রেপ্তারের কথা জানিয়েছে পুলিশ।
অভিযোগ উঠেছে, ঘটনার সময়ে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের ক্যাপ্টেন আব্বাস আলী শরীফের কিশোর ছেলে আজান আলী শরীফ গাড়ি চালালেও মামলায় আসামি করা হয় অন্য আরেকজনকে। পুরো ঘটনাটিই ধামাচাপা দেয়ার চেষ্টার অভিযোগ ওঠে।
প্রত্যক্ষদর্শীরা বলেন, মঙ্গলবার বিকালে বারিধারার ডিপ্লোম্যাটিক জোনের ১ নম্বর সড়কের ফুটপাথে বসে বিশ্রাম নিচ্ছিলেন নির্মাণ শ্রমিক মেহেদী হাসান। হঠাৎ দ্রুতগতির একটি প্রাইভেটকার ফুটপাথে উঠিয়ে দেয় চালক। গাড়ির চাকায় পিষ্ট হয়ে ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয়। পরে আশপাশের লোকজন ছুটে এসে গাড়ির নিচ থেকে মেহেদীর রক্তাক্ত দেহ বের করে আনেন। তার মাথা, বুক ও পিঠে গুরুতর জখম হয়। পরে কয়েকজন মিলে মেহেদীকে কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসকরা জানান ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয়েছে।
ওই সময়ে মেহেদীকে চাপা দেয়া ওই গাড়ির চালকের আসনে থাকা আজান আলী শরীফ নামে ওই কিশোরকে আটক করে পুলিশ সদস্যদের কাছে সোপর্দ করেন পথচারীরা। তবে অবাক করার বিষয়, ওই কিশোরকে হেফাজতে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ শেষে ছেড়ে দেয় পুলিশ। পুলিশের ভাষ্য, ক্ষুব্ধ জনতার হাতে যাতে ওই কিশোর মবের শিকার না হয়, সেজন্য তাকে হেফাজতে নেয়া হয়েছিল। পরে জিজ্ঞাসাবাদ শেষে রাতে তার চাচার জিম্মায় ছেড়ে দেয়া হয়েছে। গুলশান থানা পুলিশ বলে, আজান আলী শরীফ নামের ওই কিশোর ঢাকার গুলশান এলাকার একটি ইংরেজি মাধ্যম স্কুলের ‘ও’ লেভেলের শিক্ষার্থী। তার বাবা আব্বাস আলী শরীফ বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের ক্যাপ্টেন। গাড়িটিও ওই কিশোর শরীফের মা সিগমা বেগমের নামে নিবন্ধিত। সব তথ্য আমাদের কাছে আছে। তবে ওই ঘটনায় সরাসরি সম্পৃক্তার পরও পুলিশ তাকে আটক না করে ছেড়ে দেয়ায় বিভিন্ন মাধ্যমে তোলপাড় শুরু হয়।
এদিকে ওই ঘটনায় নিহত মেহেদীর বড় ভাই মোক্তাদির ইসলাম বাদী হয়ে গুলশান থানায় মামলা করেন। তবে সড়ক পরিবহন আইনে করা ওই মামলাতেও মেহেদীকে চাপা দেয়া ওই গাড়ির চালক আজান আলী শরীফের নাম উল্লেখ করা হয় না। মামলায় গাড়িটির চালক হিসেবে আকাশ মারক নামের ৪৪ বছরের এক ব্যক্তিকে আসামি করা হয়। উল্লেখ করা হয়, ঘটনার পর থেকেই এই চালক পলাতক রয়েছে।
ওই ঘটনার সিসিটিভি ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, ফুটপাথে বসে বিশ্রাম নিচ্ছেন মেহেদী হাসান। তার পাশ দিয়ে রাস্তা দিয়ে ফোনে কথা বলতে বলতে যাচ্ছেন একজন পথচারী। তার পেছনে আরও তিনজন পথচারী গল্প করতে করতে সামনের দিকে হেঁটে আসছেন।
এরই মধ্যে কালো রংয়ের একটি প্রাইভেটকার ফুটপাথের উপর উঠিয়ে দিয়ে সামনের গাছ ভেঙে মেহেদীকে চাপা দিয়ে ল্যাম্পপোস্ট ভেঙে নিয়ে সামনের দিকে চলে যায়। আর রাস্তায় থাকা পথচারীরা দৌড়ে পালানোর চেষ্টা করে। এরপর গাড়ি থেকে দুই ব্যক্তি নেমে আসেন। গাড়ির ডান পাশ অর্থাৎ চালকের আসন থেকে কালো টি-শার্ট পরা কিশোরকে নামতে দেখা যায়। গাড়ির অপর পাশ থেকে নামেন শার্ট পরা মধ্যবয়সী এক ব্যক্তি। আশপাশের লোকজন ছুটে এলে দু’জনই গাড়ির পাশে অবস্থান নেন। পরে কিশোরটিকে সেখান থেকে একদিকে সরে যেতে দেখা যায়। পরে ওই কিশোরকে ঘিরে ধরে ক্ষুব্ধ লোকজন। আরেক ভিডিওতে দেখা যায়- মেহেদীকে চাপা দেয়া প্রাইভেটকারটি ফুটপাথের উপরে দাঁড়িয়ে রয়েছে। গাড়িটির পেছনে চালকের আসনে বসে থাকা কালো টি-শার্ট ও সাদা রংয়ের ট্রাউজার পরা ওই কিশোর হাতে হাত রেখে দাঁড়িয়ে আছে। তার দুই পাশে দুইজন পুলিশের এসআই ও দুই কনস্টেবল দাঁড়িয়ে কথা বলছেন। তাদেরকে ঘিরে রেখেছেন অর্ধশত পথচারী। এতসব কাণ্ডের পরও গাড়ির চালকের আসনে বসে থাকা কিশোর আজানের নাম মামলাতে আসে না। তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনা-সমালোচনার পর অবশেষে বুধবার বিকালে ওই কিশোর আজানকে আটক দেখায় গুলশান থানা পুলিশ।
এ বিষয় নিয়ে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ- ডিএমপি’র গুলশান থানার পরিদর্শক (তদন্ত) ইসমাইল হোসেন মানবজমিনকে বলেন, নিহত মেহেদীর বড় ভাই নিজে গাড়িটির চালক হিসেবে আকাশ মারকের নাম উল্লেখ করে মামলা করেছেন। ওই কিশোরের নাম মামলায় উল্লেখ করা হয়নি। এ কারণে প্রথমে তাকে জিজ্ঞাসাবাদ শেষে ছেড়ে দেয়া হয়। তবে গাড়িটি জব্দ করা হয়। পরে ঘটনার ফুটেজ বিশ্লেষণ করে ওই কিশোরের সম্পৃক্ততা পাওয়া গেলে বুধবার তাকে আটক করা হয়েছে।
এদিকে ভাইয়ের মৃত্যুর পরও মামলায় প্রকৃত চালক ওই কিশোর আজানকে আসামি না করার বিষয়ে নিহত মেহেদীর বড় ভাই মোক্তাদীর ইসলামের বক্তব্য জানতে মামলার নথিতে উল্লেখ করা মোবাইল নম্বরে একাধিকবার যোগাযোগ করলেও বন্ধ পাওয়া যায়। নিহত মেহেদী হাসানের বাড়ি নীলফামারীর ডোমার উপজেলার সোনারায় গ্রামে।
