বহুল প্রতীক্ষিত শীর্ষ বৈঠকে মুখোমুখি হচ্ছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প ও চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং। তীব্র প্রযুক্তিগত প্রতিযোগিতা, বাণিজ্য সংঘাত এবং মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতির জটিল সমীকরণের মধ্যেই তারা বৈঠকে বসবেন। বুধবার যুক্তরাষ্ট্রে শুরু হতে যাওয়া শি’র এই ঐতিহাসিক সফরে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) নিরাপত্তা এবং বিদ্যমান ভঙ্গুর বাণিজ্য যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বাড়ানোই দুই নেতার মূল আলোচ্য বিষয় হিসেবে উঠে আসছে। ২০১৫ সালের পর মার্কিন মাটিতে চীনা প্রেসিডেন্টের এটিই প্রথম আনুষ্ঠানিক রাষ্ট্রীয় সফর। এ খবর প্রকাশ করেছে গার্ডিয়ান।
প্রযুক্তির নতুন ময়দান: এআই প্রতিযোগিতা
দুই পরাশক্তির দ্বন্দ্বের কেন্দ্রবিন্দুতে এখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা খাতের নিয়ন্ত্রণ। একদিকে যুক্তরাষ্ট্র উন্নত সেমিকন্ডাক্টর ও চিপ রপ্তানিতে বিধিনিষেধ দিয়ে বেইজিংকে আটকানোর চেষ্টা করছে, অন্যদিকে চীন অভ্যন্তরীণ প্রযুক্তি ও নিজস্ব মডেল বিকাশে নজিরবিহীন গতিতে এগোচ্ছে। এমনকি চীনের অভ্যন্তরীণ মঙ্গোলিয়ার প্রত্যন্ত উলানকাব অঞ্চলের বিশাল সমতলভূমিতে আলুর ক্ষেত ঘেঁষে গড়ে উঠছে একের পর এক সুবিশাল ডেটা সেন্টার। ২০৩০ সালের মধ্যে দেশটির ৯০ শতাংশ শিল্প ও সমাজে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার নিশ্চিত করতে হুয়াওয়ে, বাইটড্যান্স ও ডিপসিকের মতো চীনা প্রযুক্তি জায়ান্টরা এসব অঞ্চলে শত শত ডেটা সেন্টার বানাচ্ছে। কম খরচের উন্মুক্ত বা ওপেন সোর্স প্রযুক্তির ওপর জোর দিয়ে বেইজিং দ্রুত ওয়াশিংটনের সমকক্ষ হওয়ার চেষ্টা করছে।
এআই নিরাপত্তা নিয়ে মুখোমুখি অবস্থান
যুক্তরাষ্ট্রের টেক জগতের শীর্ষ নির্বাহীরা দ্রুত অগ্রসরমান এআই প্রযুক্তির সম্ভাব্য বিপর্যয়কর ঝুঁকি নিয়ে নিয়ন্ত্রণ আরোপের দাবি তুললেও, ট্রাম্পের বার্তা অত্যন্ত আগ্রাসী। সম্প্রতি তিনি স্পষ্ট করে বলেছেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার লড়াইয়ে যে জিতবে, সে-ই দুনিয়া শাসন করবে। তাই চীনকে পেছনে ফেলতে মার্কিন অগ্রগতিতে কোনো বিরতি টানতে নারাজ তিনি। তবে বৈশ্বিক ঝুঁকির কথা মাথায় রেখে জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস স্নায়ুযুদ্ধের সময়ের মতো ওয়াশিংটন ও বেইজিংকে নিয়মিত সংলাপ শুরুর আহ্বান জানিয়েছেন। প্রাথমিক পদক্ষেপ হিসেবে যেকোনো বড় ধরনের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সংক্রান্ত দুর্ঘটনা ঘটলে দ্রুত তথ্য আদান-প্রদানের একটি সুরক্ষামূলক দ্বিপাক্ষিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব দিয়েছে মার্কিন অর্থ দপ্তর।
ভঙ্গুর বাণিজ্য যুদ্ধবিরতি ও দরকষাকষি
গত বছর দক্ষিণ কোরিয়ার বুসানে ট্রাম্প ও শি-এর মধ্যকার বৈঠকে হওয়া এক বছর মেয়াদী সাময়িক বাণিজ্য যুদ্ধবিরতির মেয়াদ আগামী ১০ই নভেম্বর শেষ হতে চলেছে। ওই চুক্তির আওতায় পাল্টাপাল্টি শুল্কের হার কিছুটা কমানোর পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রকে বিরল খনিজ সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে রাজি হয়েছিল বেইজিং। শীর্ষ এ বৈঠকে যুদ্ধবিরতির মেয়াদ আরও এক বছর বাড়ানো নিয়ে আলোচনা হবে। এছাড়া উভয় পক্ষ থেকে ৩০ বিলিয়ন ডলার মূল্যের অপ্রয়োজনীয় পণ্যের ওপর পারস্পরিক শুল্ক কমানোর একটি রূপরেখা তৈরি করা হয়েছে। তবে তাইওয়ানের কাছে ১৪ বিলিয়ন ডলারের মার্কিন অস্ত্র বিক্রির প্রক্রিয়া স্থগিত রাখা নিয়ে ট্রাম্পের অবস্থানকে ডেমোক্রেটরা শি’কে অযাচিত ছাড় দেয়া হচ্ছে বলে কড়া সমালোচনা করেন।
ইরান যুদ্ধ ও ভূরাজনৈতিক সমীকরণ
ইরানের বিরুদ্ধে ট্রাম্পের সামরিক অভিযান শুরুর পর থেকে তেহরানের ওপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞা আরও কঠোর করা হয়েছে। ইরানের বৃহত্তম তেল ক্রেতা ও বাণিজ্যিক অংশীদার চীনকে এই নিষেধাজ্ঞার আওতায় টানতে ওয়াশিংটন চাপ সৃষ্টি করছে। যদিও প্রকাশ্য সংঘাত এড়াতে বেইজিং পর্দার আড়ালে গোপনে দরকষাকষি চালিয়ে যাচ্ছে এবং বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে নিজেদের তেল আমদানি কিছুটা কমিয়ে এনেছে।
হোয়াইট হাউসে জাঁকজমকপূর্ণ আয়োজন
চীনা প্রেসিডেন্টের আগমন ঘিরে ম্যারিল্যান্ডের সামরিক ঘাঁটিতে ট্রাম্প নিজে উপস্থিত থেকে তাকে স্বাগত জানানোর পরিকল্পনা করেছেন। এরপর হোয়াইট হাউসের সাউথ লনে মার্কিন মেরিন সেনাদের আনুষ্ঠানিক স্যালুট এবং মিলিটারি ফ্লাইওভারের মাধ্যমে আড়ম্বরপূর্ণ সংবর্ধনা দেয়া হবে। বৃহস্পতিবার রাতে আয়োজিত বিশেষ নৈশভোজে আমন্ত্রিত হয়েছেন ইলন মাস্ক, জেফ বেজোস, টিম কুক, সুন্দর পিচাই, স্যাম অল্টম্যান এবং জেনসেন হুয়াংসহ সিলিকন ভ্যালির শীর্ষ প্রযুক্তি কর্মকর্তারা। পর্যবেক্ষকদের মতে, জাঁকজমক ও উষ্ণ অভ্যর্থনা থাকলেও মৌলিক ভূরাজনৈতিক ও প্রযুক্তিগত বিরোধের কারণে বৈঠক থেকে বড় ধরনের চূড়ান্ত সমঝোতা আসার সম্ভাবনা বেশ ক্ষীণ।
