প্রথম আলো
‘বাস–ট্রাক–লঞ্চভাড়া বাড়ল: মানুষের ওপর আবার চাপ’—এটি দৈনিক প্রথম আলোর প্রধান শিরোনাম। খবরে বলা হয়, জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর পর সরকার গতকাল মঙ্গলবার বাসভাড়া কিলোমিটারে ১৭ পয়সা বাড়িয়েছে। লঞ্চমালিকেরা কিলোমিটারে ১৭-২০ শতাংশ বাড়তি ভাড়া আদায়ের ঘোষণা দিয়েছেন। ট্রাকচালকেরাও বাড়তি ভাড়া নিচ্ছেন।
সব মিলিয়ে পাঁচ মাস পর আবারও ভাড়া ও নিত্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধির চাপে পড়ছে মানুষ। যাত্রীবাহী যানবাহনের বাড়তি ভাড়া সরাসরি জনগণের পকেট থেকে যাচ্ছে। অন্যদিকে পণ্য পরিবহনের বাড়তি ব্যয়ের চাপ প্রথমে বহন করছেন ব্যবসায়ী-আড়তদারেরা। শেষ পর্যন্ত এই চাপ পড়ছে নিত্যপণ্যের বাজারে। মানুষকে বাড়তি দাম দিয়ে পণ্য কিনতে হচ্ছে।
সরকার গত রোববার রাতে জ্বালানি তেলের দাম লিটারে ২০ টাকা বাড়িয়েছে। পাঁচ মাস আগে গত এপ্রিলে বাড়ানো হয়েছিল ১৫ থেকে ২০ টাকা। তখন বাসভাড়া বেড়েছিল কিলোমিটারে ১১ পয়সা। বেড়েছিল ট্রাকভাড়াও।
পাঁচ মাসে দুই দফায় ডিজেলের মূল্য বেড়েছে লিটারে ৩৫ টাকা। ডিজেলের দাম বাড়লে এর প্রভাব সব শ্রেণির মানুষের ওপর পড়ে। কারণ, যাত্রীবাহী বাস, ট্রেন, লঞ্চ, পণ্যবাহী ট্রাক-কাভার্ড ভ্যান, জাহাজসহ প্রায় সব যানবাহনই ডিজেলে চলে। কৃষিযন্ত্রের বড় অংশ চালানো হয় ডিজেল দিয়ে।
সচিবালয়ে ভাড়া বৃদ্ধি–সংক্রান্ত বৈঠক শেষে গতকাল সড়ক পরিবহন, রেল ও নৌমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম সাংবাদিকদের বলেন, ‘যেকোনো ভাড়া বৃদ্ধিই জনগণের জন্য চাপ। কিন্তু পরিস্থিতি বিবেচনা করে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির ফলে ভাড়া যা বেড়েছে, তা যৌক্তিকের চেয়েও কম রাখতে আমরা সক্ষম হয়েছি।’
দূরপাল্লা আর নগরে বাড়তি ভাড়ার চাপ
বাসের ভাড়া বৃদ্ধির প্রজ্ঞাপন জারি হয় গতকাল রাতে। সরকারের নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ঢাকা ও চট্টগ্রাম মহানগরে বাসের ভাড়া কিলোমিটারে ২ টাকা ৫৩ পয়সা থেকে বেড়ে ২ টাকা ৭০ পয়সা হয়েছে। মিনিবাসের ভাড়া ২ টাকা ৪৩ পয়সা থেকে বেড়ে হয়েছে ২ টাকা ৬০ পয়সা। দূরপাল্লার ৫২ আসনের বাসে কিলোমিটারে ভাড়া ২ টাকা ২৩ পয়সা থেকে বেড়ে ২ টাকা ৪০ পয়সা হয়েছে।
সরকার শীতাতপনিয়ন্ত্রিত (এসি) বাসের ভাড়া নির্ধারণ করে না। ট্রাক-কাভার্ড ভ্যানসহ পণ্যবাহী অন্য যানবাহনের ভাড়াও সরকার ঠিক করে দেয় না।
নতুন সরকারি ভাড়ার তালিকা কার্যকর হওয়ার আগেই বিভিন্ন পথে বেশি টাকা নেওয়া চিত্র দেখা গেছে। গতকাল ঢাকার সায়েদাবাদ ও ফুলবাড়িয়া বাস টার্মিনাল থেকে বিভিন্ন দূরপাল্লার বাসে ৫০ থেকে ২০০ টাকা পর্যন্ত বেশি নিতে দেখা যায়।
ফুলবাড়িয়া বাস টার্মিনালে গতকাল সকালে টুঙ্গিপাড়া এক্সপ্রেসের টিকিট কেনেন হোসনে আরা বেগম নামের এক যাত্রী। মেয়েকে নিয়ে তিনি গোপালগঞ্জে যাচ্ছিলেন। সাধারণ বাসের দুটি টিকিট হোসনে আরা কেটেছিলেন ১ হাজার ১০০ টাকায়। তিনি বলেন, কোনো বাসে কম নেই। সবাই টিকিটে ৫০ টাকা করে বাড়তি নিচ্ছে।
রাজধানী ভেতরে চলাচলের ক্ষেত্রে বাসে কোথাও ১০ টাকার ভাড়া নেওয়া হচ্ছে ১৫ টাকা। কোথাও ১৫ টাকার ভাড়া ২০ টাকা নেওয়া হচ্ছে। কিছু বাসে গতকাল দুপুর পর্যন্ত আগের ভাড়াই নেওয়া হয়েছে।
বেলা ১১টার দিকে শনির আখড়ায় আসে মৌমিতা পরিবহনের একটি বাস। এটি নারায়ণগঞ্জের চাষাঢ়া থেকে গাজীপুরের চন্দ্রা রুটে চলাচল করে। যাত্রী তোলার সময়ই বাসটির চালকের সহকারী সাদ্দাম হোসেন বলে দিচ্ছিলেন, ‘আজকে কিন্তু ভাড়া বেশি।’
বাসটিতে উঠে দেখা যায়, বাড়তি ভাড়া নিয়ে বাগ্বিতণ্ডা হচ্ছে। ভাড়ার নতুন তালিকা প্রকাশ না হলেও কেন বাড়তি টাকা নেওয়া হচ্ছে, সেই প্রশ্নও তোলেন যাত্রীরা। চালকের সহকারী সাদ্দাম হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, প্রতি স্টপেজে পাঁচ টাকা বেশি নিচ্ছেন তাঁরা। তবে সব যাত্রীর কাছ থেকে বাড়তি টাকা আদায় করতে পারছেন না।
জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির কারণে রাইড শেয়ারিং বা ভাড়ায় চালিত মোটরসাইকেলের চালকেরা দূরত্বভেদে ২০ থেকে ৫০ টাকা বাড়তি নিচ্ছেন।
মোটরসাইকেলে রাইড শেয়ারিং করে সংসার চালান সাব্বির হোসেন। রাজধানীর শাহবাগ মোড়ে তিনি গতকাল প্রথম আলোকে বলেন, তেলের দাম বাড়লেও যাত্রীরা বাড়তি টাকা দিতে চান না। কিন্তু তেলের দাম বাড়লে ভাড়া বেশি নেওয়া ছাড়া উপায়ও নেই।
ইচ্ছেমতো ভাড়া বেড়েছে ট্রাক-কাভার্ড ভ্যানে
পাবনা থেকে পেঁয়াজ নিয়ে গতকাল দেশের অন্যতম বড় ভোগ্যপণ্যের পাইকারি বাজার চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জে এসেছিলেন ট্রাকচালক মোহাম্মদ মাসুদ। তাঁর হিসাবে, যাওয়া-আসায় ট্রাকে প্রায় ২২০ লিটার ডিজেল লাগে। লিটারে ২০ টাকা দাম বাড়ায় একই যাত্রায় শুধু ডিজেলের পেছনে তাঁর খরচ বাড়বে ৪ হাজার ৪০০ টাকা।
শুধু মোহাম্মদ মাসুদের ট্রাক নয়। ডিজেলের মূল্যবৃদ্ধির পর দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জে পণ্য আনা-নেওয়ার খরচ বাড়তে শুরু করেছে। ব্যবসায়ীরা বলছেন, কোনো কোনো পথে ট্রাকমালিকেরা ইতিমধ্যে ৪ থেকে ৬ হাজার টাকা পর্যন্ত বেশি ভাড়া চাইছেন।
বাংলাদেশ কাভার্ড ভ্যান-ট্রাক-প্রাইম মুভার পণ্য পরিবহন মালিক অ্যাসোসিয়েশনের মহাসচিব চৌধুরী জাফর আহমদ বলেন, চট্টগ্রাম থেকে ঢাকা ও সাভার পর্যন্ত ট্রাকে এখন পাঁচ হাজার টাকা পর্যন্ত বাড়তি ভাড়া নেওয়া হচ্ছে। পণ্য নেওয়ার ক্ষেত্রে এই ব্যয় বেড়েছে।
বেনাপোল থেকে সাড়ে ১০ টনের কাভার্ড ভ্যানে গার্মেন্টস পণ্য ঢাকার কাঁচপুরে নিতে আগে ১৮ থেকে ১৯ হাজার টাকা ভাড়া নেওয়া হতো। এখন নেওয়া হচ্ছে ২২ হাজার টাকা। কুষ্টিয়া থেকে ঢাকায় এক ট্রাক চাল পাঠানোর ভাড়াও ২০ হাজার থেকে বেড়ে ২২ হাজার টাকা হয়েছে।
পণ্য পরিবহন মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ কাভার্ড ভ্যান-ট্রাক-প্রাইম মুভার পণ্য পরিবহন মালিক অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ হোসাইন প্রথম আলোকে বলেন, পরিবহন ভাড়া বৃদ্ধির বিষয়ে গ্রাহকদের (ক্লায়েন্ট) চিঠি দেওয়া হয়েছে। ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম পর্যন্ত কনটেইনার পরিবহনে ৫০ হাজার টাকার ভাড়া ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত বাড়বে।
জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব পড়েছে আমদানি-রপ্তানির কনটেইনার ব্যবস্থাপনাতেও। চট্টগ্রামের ২১টি বেসরকারি কনটেইনার ডিপোর বিভিন্ন সেবার ওপর ৯ দশমিক ৮৫ শতাংশ ‘জ্বালানি সারচার্জ’ আরোপ করা হয়েছে। সোমবার থেকে এই নতুন মাশুল কার্যকর হয়েছে। বাংলাদেশ ইনল্যান্ড কনটেইনার ডিপোস অ্যাসোসিয়েশন (বিকডা) জানিয়েছে, ডিপোগুলোর পরিচালন কার্যক্রমে ডিজেলচালিত যন্ত্রপাতি ও যানবাহন ব্যবহৃত হয়। ডিজেলের দাম বাড়ায় পরিচালন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় এই সারচার্জ আরোপ করা হয়েছে।
লঞ্চের ভাড়াও বেড়েছে
সরকার লঞ্চের ভাড়া আনুষ্ঠানিকভাবে বৃদ্ধি করেনি। তবে ঢাকা-বরিশাল নৌপথে সরাসরি চলাচলকারী যাত্রীবাহী লঞ্চে ডেকের ভাড়া প্রায় ১৭ শতাংশ ও কেবিনের ভাড়া ২০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে। লঞ্চ মালিক সমিতির নির্ধারিত নতুন ভাড়া গতকাল মঙ্গলবার থেকে কার্যকর হয়েছে।
লঞ্চ মালিক সমিতির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ঢাকা-বরিশাল রুটে ডেকের ভাড়া ৩০০ থেকে বাড়িয়ে ৩৫০ টাকা করা হয়েছে। সিঙ্গেল কেবিনের ভাড়া ১ হাজার থেকে বাড়িয়ে ১ হাজার ২০০ টাকা এবং ডাবল কেবিনের ভাড়া ২ হাজার থেকে বাড়িয়ে ২ হাজার ৪০০ টাকা করা হয়েছে।
মূল্যস্ফীতি বাড়বে
দেশে গত আগস্টে মূল্যস্ফীতি দাঁড়িয়েছে ৮ দশমিক ২৬ শতাংশ। ২০২২ সাল থেকেই মূল্যস্ফীতির হার চড়া। এ সময়ে মানুষের মজুরি বেড়েছে কম হারে। অর্থাৎ প্রকৃত আয় কমেছে।
২০২৫ সালের আগস্টে বেসরকারি গবেষণাপ্রতিষ্ঠান পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টারের (পিপিআরসি) এক গবেষণার বরাত দিয়ে জানায়, দারিদ্র্যের হার দাঁড়িয়েছে ২৭ দশমিক ৯৩ বা প্রায় ২৮ শতাংশ। সরকারি হিসাবে, ২০২২ সালে এই হার ছিল ১৮ দশমিক ৭ শতাংশ।
বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির ফলে মূল্যস্ফীতি আরও বেড়ে যেতে পারে। তখন দারিদ্র্য আরও বাড়বে।
বেসরকারি চাকরিজীবী সালাউদ্দিন সরদারের চিন্তা নিজের সংসার চালানো নিয়ে। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, সরকার বলছে, উপায় না পেয়ে তারা দাম বাড়িয়েছে। উপায় যদি না-ই থাকে, তাহলে বেতন বাড়ানো, বড় বড় কেনাকাটা কোথা থেকে করে? তিনি আরও বলেন, সাধারণ মানুষের পিঠ তো অনেক আগেই দেয়ালে ঠেকে আছে। তারা কী উপায়ে সংসার চালাবে?
যুগান্তর
দৈনিক যুগান্তরের প্রধান শিরোনাম ‘পথে পথে ভাড়া নৈরাজ্য’। প্রতিবেদনে বলা হয়, সরকার বাস ভাড়া বাড়ানোর সিদ্ধান্ত ঘোষণার আগেই রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন রুটে অতিরিক্ত ভাড়া আদায় শুরু হয়ে যায়। সোমবার সকাল থেকে শুরু হওয়া এই নৈরাজ্য মঙ্গলবারও চলে। ঢাকার বিভিন্ন বাসে যাত্রীদের কাছ থেকে ৫ থেকে ২০ টাকা বেশি নেওয়া হয়। দূরপাল্লার বাসে নেওয়া হয় ৫০ থেকে ১০০ টাকা বেশি। চট্টগ্রামের বিভিন্ন রুটেও ইচ্ছামতো ভাড়া আদায়ের অভিযোগ পাওয়া গেছে। এ নিয়ে যাত্রী ও পরিবহণকর্মীদের মধ্যে কথা কাটাকাটি হয়। কোথাও কোথাও হাতাহাতির ঘটনাও ঘটেছে বলে খবর মিলেছে।
রোববার রাতে সরকার ডিজেল, পেট্রোল, অকটেন ও কেরোসিনের দাম লিটারে ২০ টাকা বাড়ায়। নতুন দাম সোমবার থেকে কার্যকর হয়। তখনো বাসের নতুন ভাড়া নির্ধারণ করা হয়নি। এরপরও সোমবার সকাল থেকে ঢাকাসহ বিভিন্ন এলাকার বাস, মিনিবাস ও লেগুনায় বাড়তি ভাড়া আদায় শুরু হয়। মঙ্গলবার সকালেও রাজধানীর রায়সাহেব বাজার, গুলিস্তান, পল্টন ও শাহবাগ এলাকার বিভিন্ন বাসে ৫ থেকে ১০ টাকা বেশি নেওয়ার অভিযোগ পাওয়া যায়। মঙ্গলবার বিকালে কিলোমিটারপ্রতি ১৭ পয়সা ভাড়া বাড়ানোর সিদ্ধান্ত জানায় সরকার।
সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে নানা অব্যবস্থাপনা এবং মানুষের কষ্টের দৃশ্য। মঙ্গলবার দুপুরে সায়েন্সল্যাব থেকে সাভার পরিবহণের একটি বাসে রায়সাহেব বাজারে পৌঁছান বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা মিজানুর রহমান। তিনি বলেন, আগে ২০ টাকা ভাড়া দিলেও মঙ্গলবার ২৫ টাকা চাওয়া হয়েছে। এ নিয়ে বাসের স্টাফদের সঙ্গে কিছুক্ষণ কথা-কাটাকাটিও হয়। তিনি বলেন, ভাড়া বাড়ানোর সিদ্ধান্তই এখনো হয়নি। তার আগেই বাড়তি ভাড়া চাওয়া হচ্ছে। আমাদের মতো সাধারণ যাত্রীদের ওপরই এর চাপ পড়ছে। নতুনবাজার থেকে ভিক্টর পরিবহণের একটি বাসে গুলিস্তানে আসেন আফতাব আহমেদ। তার কাছ থেকে ৩০ টাকার পরিবর্তে ৪০ টাকা নেওয়া হয়। তিনি বলেন, কিছু দিন পরপর জ্বালানি তেলের দাম বাড়ে। আর এর চাপ এসে পড়ে আমাদের ওপর। ভাড়া বাড়ানোর সিদ্ধান্ত হলে নিয়ম মেনে বাড়ানো হোক। কিন্তু সিদ্ধান্তের আগেই বেশি টাকা নেওয়া ঠিক নয়।
সোমবার দুপুরে মতিঝিলে মেট্রোরেল স্টেশন থেকে ৮ নম্বর বাসে ওঠেন বেসরকারি চাকরিজীবী মহিউদ্দিন। তিনি দৈনিক বাংলা মোড়ে নামেন। এই পথে এতদিন ১০ টাকা ভাড়া দিতেন। কিন্তু ২০ টাকার নোট দেওয়ার পর কন্ডাক্টর তাকে ফেরত দেন ৫ টাকা। কন্ডাক্টর দাবি করেন, সর্বনিম্ন ভাড়া ১৫ টাকা করা হয়েছে। এর প্রতিবাদ করেন মহিউদ্দিন। তিনি জানতে চান, সরকার কখন বাসভাড়া বাড়িয়েছে। এক কিলোমিটারের কম পথের জন্য কেন ৫ টাকা বেশি নেওয়া হবে, সেই প্রশ্নও তোলেন। এ নিয়ে দুজনের মধ্যে তীব্র বাকবিতণ্ডা হয়। একপর্যায়ে হাতাহাতির পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়।
রাজধানীর সাইনবোর্ড থেকে নতুনবাজারগামী ইকবাল পরিবহণের একটি এসি বাসে ১০০ টাকার পরিবর্তে ১২০ টাকা নেওয়া হয়। ওই বাসের যাত্রী ইব্রাহিম খলিল বলেন, তিনি প্রতিদিন ১০০ টাকা দিয়ে যাতায়াত করেন। কিন্তু এবার তার কাছ থেকে ১২০ টাকা রাখা হয়েছে। তেলের দাম বাড়লেও তখন পর্যন্ত সরকার বাসভাড়া বাড়ানোর ঘোষণা দেয়নি বলে উল্লেখ করেন তিনি। মহাখালী থেকে বিজয় সরণি পর্যন্ত বৈশাখী ও ভূঁইয়া পরিবহণে ১০ টাকার পরিবর্তে ১৫ টাকা নেওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে। গুলিস্তান থেকে বিমানবন্দরগামী পরিবহণেও ১০ টাকা বেশি নেওয়া হয়। এসব রুটেও যাত্রী ও পরিবহণকর্মীদের মধ্যে বচসা হয়েছে।
চিটাগাং রোড থেকে গুলিস্তানগামী বাসে ৫ টাকা বেশি নেওয়া হয়। নারায়ণগঞ্জ ও সাইনবোর্ড থেকে চলাচলকারী মৌমিতা, ঠিকানা, অনাবিল ও লাভলী পরিবহণেও গন্তব্য অনুযায়ী ৫ থেকে ১০ টাকা বাড়তি নেওয়া হয়েছে। চিটাগাং রোড থেকে যাত্রাবাড়ী পর্যন্ত লেগুনায় ২০ টাকার ভাড়া ২৫ টাকা এবং ২৫ টাকার ভাড়া ৩০ টাকা করা হয়। মঙ্গলবার সকাল থেকে ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ রুটের বন্ধন ও উৎসব পরিবহণেও ভাড়া বাড়ানো হয়। এই রুটে ৫৫ টাকার পরিবর্তে যাত্রীদের কাছ থেকে ৬০ টাকা নেওয়া হয়েছে। তখনো সরকার নতুন ভাড়া কার্যকর করেনি।
চট্টগ্রাম নগরীতেও ভাড়ানৈরাজ্য: ঢাকার বাইরে সবচেয়ে বেশি ভাড়ানৈরাজ্যের তথ্য পাওয়া গেছে চট্টগ্রাম মহানগরে। সোমবার সকাল থেকে নগরীর আগ্রাবাদ, বহদ্দারহাট, চকবাজার, নিউমার্কেটসহ বিভিন্ন এলাকায় বাস, টেম্পো ও হিউম্যান হলারে অতিরিক্ত ভাড়া নেওয়া হয়। এ নিয়ে যাত্রী ও পরিবহণকর্মীদের মধ্যে বাগবিতণ্ডা হয়। হাতাহাতির ঘটনাও ঘটে। কাজীর দেউড়ি থেকে নিউমার্কেট পর্যন্ত এক কিলোমিটার পথে মিনিবাসের ভাড়া ছিল ৭ টাকা। সেখানে ১৫ টাকা আদায় করা হয়। কোতোয়ালি মোড় থেকে জামালখান পর্যন্ত ৮ থেকে ১০ টাকার ভাড়া বাড়িয়ে ১৫ টাকা নেওয়া হয়। বহদ্দারহাট থেকে নতুন সেতু পর্যন্ত বাসের ভাড়া ছিল ১০ থেকে ১২ টাকা। সেখানে ১২ থেকে ১৫ টাকা নেওয়া হয়। একই পথে মাহিন্দ্রার ১৪ টাকার ভাড়া বাড়িয়ে ১৫ থেকে ২০ টাকা করা হয়।
কাপ্তাই রাস্তার মাথা থেকে পতেঙ্গা পর্যন্ত ৩৫ টাকার ভাড়া ৪৫ থেকে ৫০ টাকা নেওয়া হয়। বহদ্দারহাট থেকে শিকলবাহা ক্রসিং পর্যন্ত সরকার নির্ধারিত ভাড়া ২২ টাকা হলেও আদায় করা হয় ৩০ থেকে ৩৫ টাকা। পটিয়া রুটে ৫৯ টাকার ভাড়া ৭০ থেকে ৭৫ টাকা এবং কেরানীহাট পর্যন্ত ১১২ টাকার ভাড়া ১৫০ টাকা নেওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে। চট্টগ্রামের বাসযাত্রী নাসির উদ্দিন বলেন, জ্বালানি তেলের দাম কমলে গণপরিবহণের ভাড়া কমানো হয় না। কিন্তু দাম বাড়লে রাতারাতি ভাড়া বেড়ে যায়। গ্যাসচালিত গাড়িতেও ডিজেলচালিত বাসের মতো বাড়তি ভাড়া নেওয়া হচ্ছে বলে উল্লেখ করেন তিনি।
দূরপাল্লার বাস: দূরপাল্লার বাসেও একই চিত্র দেখা গেছে। গাবতলী বাস টার্মিনাল থেকে ছেড়ে যাওয়া বিভিন্ন এসি ও নন-এসি বাসে ৫০ থেকে ১০০ টাকা বেশি নেওয়া হয়। মাগুরাগামী যাত্রী মো. রমজান বলেন, আগের দিন ৫০০ টাকা দিয়ে তিনি ঢাকায় এসেছিলেন। ফিরতি পথে একই দূরত্বের টিকিট কিনতে ৬০০ টাকা দিতে হয়েছে। রংপুরগামী যাত্রী মো. রিয়াদুর রহমান বলেন, কয়েক দিন আগেও তিনি ৮০০ টাকায় যাতায়াত করেছেন। এবার তাকে ৯০০ টাকায় টিকিট কিনতে হয়েছে। অনেক বাসে এর চেয়েও বেশি ভাড়া চাওয়া হচ্ছিল বলে উল্লেখ করেন তিনি।
সায়েদাবাদ থেকে খুলনা, বরিশাল, শরীয়তপুর ও মাদারীপুরগামী বাসে ৫০ টাকা পর্যন্ত বাড়তি নেওয়া হয়। চট্টগ্রামগামী কোনো কোনো বাসে ১০০ টাকা পর্যন্ত বেশি নেওয়ার অভিযোগ মিলেছে।
কালের কণ্ঠ
‘রাজপথে ছাড় দেবে না বিএনপি’—এটি দৈনিক কালের কণ্ঠের প্রধান শিরোনাম। খবরে বলা হয়, দেশকে অস্থিতিশীল করার অপচেষ্টা ও ‘পরিকল্পিত সন্ত্রাস’ মোকাবেলায় মাঠের কর্মসূচিতে সক্রিয় হচ্ছে বিএনপি। ষড়যন্ত্র করে দেশের স্থিতিশীল পরিবেশ ঘোলাটে করতে বিরোধী দলগুলো মাঠে নামলে ছাড় দেবে না ক্ষমতাসীন দল বিএনপি।
উদ্ভূত পরিস্থিতি মোকাবেলায় এরই মধ্যে রাজধানীসহ সারা দেশে দলটির নেতাকর্মীরা মিছিল-মিটিংয়ের মতো কর্মসূচি পালন করা শুরু করেছেন। ধারাবাহিকভাবে এই মিছিল-মিটিং, সমাবেশসহ অন্যান্য কর্মসূচি আরো জোরদার করা হবে বলে জানিয়েছেন দলটির দায়িত্বশীল নেতারা। দলের অঙ্গদলগুলোসহ সমমনা সংগঠনগুলোকে এরই মধ্যে কেন্দ্র থেকে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। কেন্দ্রীয়ভাবে আনুষ্ঠানিক কর্মসূচি দেওয়া না হলেও অঙ্গসংগঠনগুলোকে নিজেদের মতো করে কর্মসূচি নিয়ে সাধারণ মানুষের কাছে গিয়ে সরকারবিরোধী ‘ষড়যন্ত্র’ প্রতিহত করার বার্তা পৌঁছে দিতে বলা হয়েছে।
একই সঙ্গে গণতান্ত্রিক কোনো কর্মসূচিতে বাধা না দেওয়ার নির্দেশনাও দেওয়া হয়েছে। বর্তমানে জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে যোগ দিতে নিউইয়র্কে অবস্থান করছেন প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান। আগামী ২৭ সেপ্টেম্বর তিনি দেশে ফিরবেন। এ সময়ে সারা দেশের নেতাকর্মীদের রাজপথের কর্মসূচিতে সরব থাকার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
বিএনপির একাধিক নেতা কালের কণ্ঠকে জানান, আগামী ডিসেম্বর পর্যন্ত কেন্দ্র থেকে তৃণমূল পর্যন্ত মাঠের কর্মসূচি চলমান থাকবে। এই সময়ে সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড আরো জোরদার করা হবে।
জামায়াত ও এনসিপির লং মার্চকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক অপতৎপরতা এবং কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের বিচ্ছিন্ন ‘সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড’র অভিযোগে বিএনপির হাইকমান্ড মাঠের রাজনীতি জোরদার করার নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে গত রবি ও সোমবার রাজধানীর নয়াপল্টনে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে যৌথ সভা অনুষ্ঠিত হয়। দলের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবীর রিজভীর সভাপতিত্বে যৌথ সভায় দলের যুগ্ম মহাসচিব, সাংগঠনিক ও সহসাংগঠনিক সম্পাদকদের পাশাপাশি ঢাকা মহানগর উত্তর ও দক্ষিণ বিএনপির আহ্বায়ক ও সদস্যসচিব, যুবদল, স্বেচ্ছাসেবক দল ও ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় নেতারা অংশ নেন।
সভায় দলের সাংগঠনিক কার্যক্রম আরো গতিশীল করার সিদ্ধান্তের পাশাপাশি ‘পরিকল্পিত সন্ত্রাসের মাধ্যমে দেশকে অস্থিতিশীল করার’ অপচেষ্টার বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ থাকার আহবান জানানো হয়।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক কার্যক্রম দলের চলমান কর্মসূচি। এ জন্য মিছিল-মিটিং, সভা-সমাবেশসহ বিভিন্ন কর্মসূচি পালনের প্রয়োজন আছে।’
তিনি বলেন, ‘এসব কর্মসূচির মাধ্যমে সাংগঠনিক কার্যক্রম আরো জোরদার করা হবে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এসব কর্মসূচির পরিধিও বাড়ানো হবে।’
বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবীর রিজভী কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘জনগণের ভোটে নির্বাচিত হয়ে বিএনপি সরকার গঠন করেছে। ওই জনগণকে সঙ্গে নিয়েই আমরা সকল ষড়যন্ত্র রুখে দেব। এক দফা কর্মসূচির মাধ্যমে নৈরাজ্য সৃষ্টির চেষ্টা করা হলে বিএনপি হাত গুটিয়ে বসে থাকবে না। তবে আওয়ামী লীগের মতো করে প্রতিহত করার কোনো কর্মসূচি দেওয়া হবে না।’
তিনি বলেন, ‘পরিকল্পিত সন্ত্রাস ও দেশকে অস্থিতিশীল করার যেকোনো অপচেষ্টার বিরুদ্ধে বিএনপির অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনগুলো রাজপথে সক্রিয় থাকবে। মিছিল, সমাবেশসহ বিভিন্ন কর্মসূচি নিজ নিজ সংগঠনের উদ্যোগে পালন করবে। এর জন্য কেন্দ্র থেকে কোনো কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে না।’
বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব সৈয়দ এমরান সালেহ প্রিন্স কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমরা যৌথ সভা করে সারা দেশের নেতাকর্মীদের সতর্ক থাকতে বলেছি। কেন্দ্র থেকে তৃণমূল পর্যন্ত বিএনপির কেউ যদি মানববন্ধন, মিছিল, কর্মশালা করে, করতে পারে। যার যার মতো করে তারা গণসংযোগ করতে পারে।’
তিনি বলেন, ‘আগামী ডিসেম্বরকে কেন্দ্র করে পতিত স্বৈরাচার এবং রাজাকারদের মেলবন্ধন অথবা তাদের পুরনো রাখিবন্ধনের পুনরাবৃত্তি ঘটছে কি না, সেটি আমাদের নজরে রাখতে হবে। সতর্ক দৃষ্টি রাখতে হবে। বিএনপির এই কর্মসূচি নির্দিষ্ট সময়ের কোনো কর্মসূচি না, এটি অব্যাহত থাকবে।’
সমকাল
দৈনিক সমকালের প্রধান শিরোনাম ‘মবের শিকার হাজার শিক্ষক কর্মস্থলে ফিরতে পারছেন না’। প্রতিবেদনে বলা হয়, শ্রেণিকক্ষে জীববিজ্ঞানের ক্লাস নিচ্ছিলেন বরিশালের গৌরনদীর শরিকল মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক কণিকা মুখার্জী। হুড়মুড় করে কয়েকজন শিক্ষার্থীসহ একটি মব শ্রেণিকক্ষে ঢোকে। শিক্ষার্থীদের বের করে দেয়। কণিকাকে লক্ষ্য করে শুরু হয় অশ্রাব্য ভাষায় গালাগাল। নানাভাবে হেনস্তা করা হয় তাঁকে। পদত্যাগের জন্য চাপ দেওয়া হয়। স্থানীয় এক ব্যক্তির সহযোগিতায় সেদিন নিজ প্রতিষ্ঠান থেকে প্রাণ নিয়ে কোনোমতে বের হতে সক্ষম হন তিনি।
কণিকা মুখার্জীর ভাষ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ৩ সেপ্টেম্বর দুপুরে তিনি ওই মবের শিকার হন। কয়েক দিন পর বিদ্যালয়ে গিয়ে একই ধরনের পরিস্থিতির মুখে পড়েন। কণিকা জানান, পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে গিয়েছিল যে তাঁর প্রাণ হারানোর আশঙ্কা করছিলেন।
চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর কণিকার মতোই সারাদেশের বিভিন্ন বেসরকারি স্কুল-কলেজে বহু শিক্ষক মবের শিকার হন। তাদের মধ্যে সহস্রাধিক শিক্ষক এখনও নিজ কর্মস্থলে ফিরতে পারেননি। ভুক্তভোগী শিক্ষকদের একটি সংগঠন এ দাবি করেছে।
দুই বছর পার হলেও শিক্ষা মন্ত্রণালয়, মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি) কিংবা জেলা শিক্ষা অফিসের কাছে মব বা জোরজবরদস্তির মুখে পদত্যাগে বাধ্য হওয়া কিংবা হেনস্তার শিকার শিক্ষকদের পূর্ণাঙ্গ তালিকা নেই।
সরকারি কর্মকর্তাদের বিভিন্ন সময়ের বক্তব্যে দুই হাজারের বেশি প্রতিষ্ঠানপ্রধান ও শিক্ষককে সরিয়ে দেওয়া বা পদত্যাগে বাধ্য করার তথ্য উঠে এসেছে। পুনর্বহালের দাবিতে আট শতাধিক শিক্ষক আদালতের আশ্রয় নিয়েছেন।
তবে পদত্যাগে বাধ্য হওয়া শিক্ষকদের সংগঠন 'পদবঞ্চিত প্রতিষ্ঠানপ্রধান ও শিক্ষক জোট'-এর দাবি, সারাদেশে প্রায় দুই হাজার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সাড়ে তিন হাজারের বেশি প্রতিষ্ঠানপ্রধান ও শিক্ষক হয়রানি, অপমান, পদত্যাগে বাধ্য হওয়া কিংবা কর্মস্থল থেকে বিতাড়নের শিকার হয়েছেন। তাদের মধ্যে পাঁচ শতাধিক আহত বা অসুস্থ হয়েছেন। জোটের দাবি, শারীরিক ও মানসিক আঘাতের জেরে চারজনের মৃত্যু হয়েছে। সারাদেশে বেসরকারি স্কুল-কলেজ-মাদ্রাসাসহ এমপিওভুক্ত প্রতিষ্ঠান রয়েছে ২৮ হাজার। শিক্ষক-কর্মচারী রয়েছেন প্রায় পাঁচ লাখ।
পদত্যাগপত্রে সই, তারপর বেতনও বন্ধ
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগের (বর্তমানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ) পতনের পর সৃষ্ট অস্থিতিশীল পরিস্থিতি কাজে লাগিয়ে কিছু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে স্থানীয় স্বার্থান্বেষী ব্যক্তি, রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী মহল এবং প্রতিষ্ঠানেরই কিছু শিক্ষক শিক্ষার্থীদের উস্কে দিয়ে প্রতিষ্ঠানপ্রধানদের বিরুদ্ধে মব সৃষ্টি করেন। কোথাও তোলা হয় অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ। কোথাও ব্যক্তিগত বিরোধ বা পদ-পদবি নিয়ে দ্বন্দ্বের জেরে এ পরিস্থিতির সৃষ্টি করা হয়।
অভিযোগের সত্যতা যাচাই কিংবা নিয়মতান্ত্রিক তদন্তের বদলে অনেক ক্ষেত্রে নেওয়া হয় তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা। শিক্ষার্থীদের সামনে এনে পদত্যাগের জন্য চাপ দেওয়া হয়।
ধামরাইয়ের সুয়াপুর নান্নার স্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ আনোয়ারুল ইসলাম তালুকদারের ঘটনাটি এর একটি উদাহরণ। ২০২৩ সালে ধামরাই উপজেলার শ্রেষ্ঠ প্রতিষ্ঠান এবং একই বছর শ্রেষ্ঠ প্রতিষ্ঠানপ্রধান নির্বাচিত হন। আনোয়ারুলের ভাষ্য, চব্বিশের ৫ আগস্টের পর পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে কয়েকজন শিক্ষক তাঁর বিরুদ্ধে শিক্ষার্থীদের উস্কে দেন। এরপর ১১ আগষ্ট কয়েকজন শিক্ষক ও শিক্ষার্থী তাঁর পদত্যাগ দাবি করেন। পরদিন প্রায় ১৫ জনের একটি দল মিরপুরে তাঁর বাসায় গিয়ে জোর করে পদত্যাগপত্রে স্বাক্ষর নেয়।
আনোয়ারুলের দাবি, প্রতিষ্ঠানে শৃঙ্খলা ফেরাতে তিনি ক্লাসে কড়াকড়ি আরোপ করেছিলেন। প্রাইভেট-কোচিংনির্ভরতা কমানোর উদ্যোগ নিয়েছিলেন। অপ্রয়োজনীয় খরচ বন্ধ করেছিলেন। এসব কারণে কয়েক শিক্ষকের বিরাগভাজন হন তিনি
ইত্তেফাক
‘বাড়ছে ব্যয়, কমছে আয় সংসার চালাতে হিমশিম’—এটি দৈনিক ইত্তেফাকের প্রধান শিরোনাম। খবরে বলা হয়, একদিকে মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়ছে, অন্যদিকে কমছে আয়। জ্বালানি তেলের দাম লিটারে ২০ টাকা বৃদ্ধির জেরে বেড়েছে নিত্যপণ্যের দাম ও পরিবহন ভাড়া। অতিরিক্ত বা ভূতুড়ে বিদ্যুত্ বিল আসার কারণে সাধারণ গ্রাহকদের ‘মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘা’ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। পাইপলাইনে গ্যাস সংকটের কারণে দেশের বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে অনেক কারখানা সচল রাখতে সিএনজি সিলিন্ডারে করে গ্যাস নেওয়ার প্রবণতা ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। এতে খরচ বৃদ্ধির পাশাপাশি নিরাপত্তা ঝুঁকিও বেড়েছে। অন্যদিকে গ্যাসসহ নানা সংকটে একে একে বন্ধ হচ্ছে ছোট ছোট উত্পাদনমুখী শিল্পপ্রতিষ্ঠান। এতে বাড়ছে বেকারত্ব। কাজের বাজারও মন্দা। নেই নতুন কর্মসংস্থান। পাল্লা দিয়ে বেড়েছে চিকিত্সা ও শিক্ষা ব্যয়। সব মিলিয়ে অনেক সাধারণ মানুষ সংসার চালাতে হিমশিম খাচ্ছেন।
রবিবার রাতে জ্বালানি তেলের দাম লিটারে ২০ টাকা করে বাড়ায় সমাজের সব শ্রেণি-পেশার মানুষের ওপর বাড়তি খরচের বোঝা চেপে বসেছে। বিশেষ করে সীমিত আয়ের মানুষসহ যাদের হাতে আয় বাড়ানোর ক্ষমতা নেই, তাদের যাপিত জীবন একরকম বিষিয়ে উঠছে। একসময় আর্থিক সংকট কাটাতে মানুষ গ্রাম থেকে শহরে আসতেন। সময়ের পরিক্রমায় পালটে যাচ্ছে সেই চিরচেনা দৃশ্যপট। সরকারি পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, আয়ের তুলনায় ব্যয় বেশি হওয়ায় গত পাঁচ বছর ধরে গ্রামে ফিরে আসা মানুষের সংখ্যা প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। জানা গেছে, সরবরাহ লাইনে গ্যাসের চাপ কম থাকায় উত্পাদন সচল রাখতে সিএনজি ফিলিং স্টেশন থেকে সিলিন্ডারে ভরে গ্যাস নেন তৈরি পোশাক ও বস্ত্র, সিরামিকসহ বিভিন্ন খাতের অনেক শিল্পকারখানার মালিকরা। এভাবে অনিরাপদ সিলিন্ডারে গ্যাস পরিবহন গ্যাস আইন-২০১০ ও গ্যাস বিতরণ বিধিমালা-২০১৬ অনুযায়ী নিষিদ্ধ। তবে বিষয়টি অনেক দিন ধরে প্রকাশ্যেই চলছে। সাম্প্রতিক গ্যাস-সংকটে এ প্রবণতা বৃদ্ধি পায়।
এদিকে জ্বালানি তেলের দাম বাড়লেই বাসভাড়া বাড়ানোর দাবি ওঠে, কখনো কখনো ভাড়া বাড়েও। এটিই দেশের গণপরিবহনে বিশেষ করে বাসের ক্ষেত্রে যেন নিয়মিত চিত্র। এবারও এর ব্যতিক্রম হয়নি। ২০ সেপ্টেম্বর রাতে ডিজেল, কেরোসিন, পেট্রোল ও অকটেনের দাম লিটারপ্রতি ২০ টাকা বাড়িয়েছে সরকার। দাম বাড়ানোর সঙ্গে সঙ্গেই দাবি উঠেছে গণপরিবহনে ভাড়া বাড়ানোর। আবার সরকার বাসভাড়া বাড়ানোর ঘোষণা না দিলেও এরই মধ্যে কোথাও কোথাও বাড়তি ভাড়া আদায় করা হচ্ছে। ডেমরার স্টাফ কোয়ার্টার থেকে মিরপুর-১০ এ চলাচল করে আলিফ পরিবহন। সোমবার সন্ধ্যায় এই রুটের যাত্রীদের কাছ থেকে ১০ টাকা করে বেশি ভাড়া নিতে দেখা গেছে। নারায়ণগঞ্জের সাইনবোর্ড থেকে ঢাকার উত্তরা (আব্দুল্লাহপুর) রুটে চলাচল করে ইকবাল এন্টারপ্রাইজের এসি বাস। এ বাসে সোমবার থেকে ভাড়া ১০ থেকে ২০ টাকা বেড়েছে। অর্থাত্, বাড্ডা লিংক রোড কাউন্টার থেকে উত্তরা পর্যন্ত আগে ৯০ টাকা ভাড়া ছিল, কিন্তু সোমবার থেকে ১১০ টাকা করে নিতে দেখা গেছে। যদিও বিআরটিএ এসি বাসের ভাড়া নির্ধারণ করে দেয় না।
এসি বাসের মালিকরাই নিজেদের মতো ভাড়া বাড়িয়ে নিচ্ছেন। উত্তরা হাউজ বিল্ডিংয়ে ইকবাল পরিবহনের টিকিট বিক্রি করেন শাকিব। তিনি জানান, তার কোম্পানি সোমবার সব গন্তব্যে ২০ টাকা করে ভাড়া বাড়ানোর নির্দেশনা দিয়েছে। শুধু নতুন বাজার থেকে উত্তরা বা সাইনবোর্ড পর্যন্ত ১০ টাকা করে ভাড়া বাড়ানো হয়েছে। সে অনুযায়ী আমরা যাত্রীদের থেকে ভাড়া বেশি নিচ্ছি।
অর্থনীতিবিদরা বলেন, জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির বিরূপ প্রভাব শুধু সাধারণ মানুষের ওপর পড়ছে না, শিল্পপতির শিল্প পরিচালনার উত্পাদন খরচও বাড়বে বহুগুণ। বাড়ছে গণপরিবহনসহ সব ধরনের পরিবহন ভাড়া। নিত্যপণের বাজার তো এ অজুহাতে সোমবার থেকেই গরম। কৃষকের সেচ খরচও নির্ঘাত বাড়ছে। এই যখন অবস্থা, বাড়িভাড়া বাড়াতেও বাড়িওয়ালারা বেশি সময় নেবেন না। এককথায় বলা যায়, ধনী থেকে দরিদ্র-সবার জীবনে কমবেশি এর বিরূপ প্রভাব পড়বে। অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ীরা বলছেন, এটি মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়ে বড় ধাক্কা। এর ফলে একদিকে মূল্যস্ফীতি বাড়বে, অপরদিকে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা আরো কমে যাবে। এককথায়, সামগ্রিকভাবে অর্থনীতি নানামুখী চাপে পড়বে। সরকারের এই সিদ্ধান্ত অর্থনীতিকে আরো বাধাগ্রস্ত করবে। তবে তাদের মতে, মূল্য না বাড়িয়ে তেমন কোনো বিকল্পও ছিল না।
নয়া দিগন্ত
দৈনিক নয়া দিগন্তের প্রথম পাতার খবর ‘সারের ডিলারশিপ নিয়ে চাপে মাঠ প্রশাসন’। প্রতিবেদনে বলা হয়, নতুন ডিলার (পরিবেশক) নিয়োগকে কেন্দ্র করে চাপে রয়েছেন দেশের বিভিন্ন জেলার প্রশাসনের কর্মকর্তারা। সরকারদলীয় নেতা ও প্রভাবশালী ব্যক্তিরা ডিলারশিপ পেতে নানাভাবে তদবির করছেন।
কিছুদিন আগে ফ্যামিলি কার্ড ইস্যুতে অর্ধশত উপজেলা নির্বাহী অফিসারের (ইউএনও) হামলা, ভাঙচুর, হুমকির ঘটনা ঘটে। ফলে রাজনীতিবিদদের এসব তদবির উপেক্ষা করে যোগ্য ব্যবসায়ীদের সুপারিশের সাহস পাচ্ছেন না মাঠ প্রশাসনের কর্মকর্তারা। স্থানীয় সংসদ সদস্যদের মতামত নিয়ে সে অনুযায়ী জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে প্রতিবেদন দেয়ার নির্দেশনা দেয়া হচ্ছে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের। এসব ডিলারশিপের জন্য ৩০ থেকে ৫০ লাখ টাকার মৌখিক চুক্তি হচ্ছে বলেও একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেছে।
২০২৬ সালের সার ডিলার নিয়োগ নীতিমালার আলোকে প্রথমে আবেদনপত্রগুলো জেলা সার ও বীজ মনিটরিং কমিটি যাচাই-বাছাই করবে। যাচাই শেষে দুই কার্যদিবসের মধ্যে আবেদনপত্র উপজেলা সার ও বীজ মনিটরিং কমিটির কাছে পাঠানো হবে। উপজেলা কমিটি তথ্য যাচাই করে বিধিমালা অনুযায়ী প্রতি ইউনিয়নের জন্য তিনজন যোগ্য প্রার্থীর নাম প্রস্তাব করবে। এরপর উপজেলা কমিটির প্রস্তাবিত প্রত্যেক প্রার্থীর তথ্য জেলা কমিটি পুনরায় যাচাই করবে। যাচাই শেষে প্রতি ইউনিয়নের জন্য তিনজন প্রার্থীর প্রস্তাব সার ডিলার সংক্রান্ত কেন্দ্রীয় ব্যবস্থাপনা কমিটির কাছে পাঠানো হবে। কেন্দ্রীয় কমিটি প্রস্তাবিত প্রার্থীদের আবেদনপত্র ও তথ্য পরীক্ষা করে ইউনিয়ন প্রতি একজন প্রার্থীকে মনোনয়ন দেবে। পরবর্তী সাত কার্যদিবসের মধ্যে চূড়ান্ত ডিলার নিয়োগ অনুমোদন করা হবে। অনুমোদন পাওয়ার পর জেলা সার ও বীজ মনিটরিং কমিটি বিধিমালা অনুযায়ী প্রয়োজনীয় পরবর্তী কার্যক্রম সম্পন্ন করবে।
উপজেলা সার ও বীজ মনিটরিং কমিটির সভাপতির দায়িত্ব পালন করছেন স্থানীয় উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) এবং জেলা সার ও বীজ মনিটরিং কমিটির সভাপতির দায়িত্ব পালন করছেন জেলা প্রশাসক (ডিসি)। মাঠ প্রশাসনের এই দুই কর্মকর্তাই নতুন ডিলার (পরিবেশক) নিয়োগ প্রক্রিয়ার প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। দেশের কয়েকটি জেলার স্থানীয়দের সাথে কথা বলে জানা গেছে, এই ডিলার নিয়োগ কেন্দ্র করে ব্যাপক তদবির চলছে। স্থানীয় সংসদ সদস্যদের আধাসরকারি পত্র (ডিও) লেটার এবং ইউএনও-ডিসির কাছে তদবিরের জন্য ৩০ থেকে ৫০ লাখ টাকার চুক্তি করছেন ডিলার প্রত্যশীরা।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে মেহেরপুরের একজন ডিলার প্রত্যাশী জানান, ডিলারশিপ নেয়ার জন্য আবেদন করেছি। এটি নিশ্চিত করার জন্য নানাভাবে চেষ্টা করছি। সংশ্লিষ্ট একটি দফতরে যোগাযোগ করা হলে একটি রাজনৈতিক দলের জেলার শীর্ষ নেতার কাছে যাওয়ার পরামর্শ দেয়া হয়। পরামর্শ অনুযায়ী সেই নেতার ঘনিষ্ঠজনদের কাছে গেলে বলা হয় আরেকজন ৩৫ লাথ দিতে রাজি হয়েছে। তুমি যদি এর চেয়ে বাড়াতে পারো তাহলে কথা বলতে পারি। সেই ব্যবসায়ী এতটাকা দেয়ার সামর্থ্য না থাকায় সেখান থেকে চলে আসেন।
মাঠ প্রশাসনের একজন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এবং উপজেলা সার ও বীজ মনিটরিং কমিটির সভাপতি নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ডিলার নিয়োগের জন্য নানামুখী তদবির আমার কাছে আসছে। এ বিষয়ে জেলা প্রশাসকের নির্দেশনা চাইলে তিনি স্থানীয় সংসদ সদস্যের কথা অনুযায়ী সুপারিশ পাঠাতে বলেছেন। আমিও সেভাবেই কাজ করছি। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, রাজনৈতিক প্রভাব, অনিয়ম কিংবা শুধু কাগুজে যোগ্যতার পরিবর্তে পর্যাপ্ত গুদাম, আর্থিক সক্ষমতা, সারের বাজারজাতকরণে অভিজ্ঞতা, সততা ও কৃষকবান্ধব মনোভাবকে গুরুত্ব দেয়া হবে। যোগ্যতার ভিত্তিতে ডিলার নিয়োগ হলে কৃষকরা সঠিক সময়ে নির্ধারিত দামে সার পাবেন এবং কৃষি উৎপাদন অব্যাহত রাখা সহজ হবে।
সম্প্রতি সরকারের শীর্ষ পর্যায়ে জমা দেয়া সরকারি সংস্থার প্রতিবেদনে বলা হয়, স্থানীয় প্রভাবশালী ও রাজনৈতিক নেতাদের সুপারিশে যোগ্যতার পরিবর্তে অনুগত ব্যক্তিদের ডিলার নিয়োগ দেয়ার উচ্চ ঝুঁকি রয়েছে। নতুন ডিলার নিয়োগে নিজেদের পছন্দের লোকদের সুযোগ দিতে প্রভাবশালী মহলের চাপ রয়েছে। এটা হলে প্রকৃত ব্যবসায়ীরা বাদ পড়তে পারেন।
প্রতিবেদনে আরো বলা হয়, রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের মাধ্যমে প্রভাবশালী বিভিন্ন গোষ্ঠী সার পরিবহনে প্রভাব বিস্তার করতে পারেন। এতে সার পরিবহন ও বিতরণব্যবস্থা ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এর সুযোগে কৃষকদের কাছ থেকে সারের অতিরিক্ত দাম আদায় করা হতে পারে। সারে নতুন ডিলার নিয়োগ দিতে গত ২৭ আগস্ট একটি নীতিমালা প্রকাশ করেছে কৃষি মন্ত্রণালয়। এতে বলা হয়, একই পরিবারে একাধিক ডিলার নিয়োগের সুবিধা থাকবে না। ডিলারের কার্যক্রম মূল্যায়নের মাধ্যমে বাতিল বা নবায়ন করা হবে। প্রতিটি ইউনিয়নে তিনজন সার ডিলার (এখন দু’জন) নিয়োগ করা যাবে। প্রতিটি পৌরসভায় তিনজন করে ডিলার নিয়োগ দেয়া যাবে। নতুন ডিলার নিয়োগে এরই মধ্যে বিভিন্ন জেলা প্রশাসক পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করেছেন। অনেকে পরিবেশক পদে আবেদন করছেন।
বণিক বার্তা
‘আমলাতান্ত্রিক কর্তৃত্ব টিকিয়ে রাখতেই ক্ষমতা দেয়া হয়নি বিইআরসিকে’—এটি দৈনিক বণিক বার্তার প্রধান শিরোনাম। খবরে বলা হয়, দেশে গ্যাস-বিদ্যুৎ, তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি), ফার্নেস অয়েল ও জেট ফুয়েলের দাম নির্ধারণ করে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)। কিন্তু সংস্থাটি এখনো ডিজেল, পেট্রল, অকটেন ও কেরোসিনের দাম নির্ধারণের ক্ষমতা পায়নি। জানা গেছে, এসব পণ্যের দাম নির্ধারণে বিইআরসি প্রবিধানমালা প্রয়োজন। সে জন্য ২০১২ সালে প্রবিধানমালার ওপর বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের মতামত জানতে চেয়েছিল কমিশন। তবে ১৪ বছরেও প্রবিধানমালা নিয়ে মন্ত্রণালয়ের মতামত কিংবা সিদ্ধান্ত পায়নি বিইআরসি। সংশ্লিষ্ট বেশ কয়েকটি সূত্র বলছে, এসব তরল জ্বালানি পণ্যের দাম নির্ধারণের ক্ষমতা বিইআরসির হাতে ছেড়ে দিলে মন্ত্রণালয়ের কর্তৃত্ব খর্ব হতে পারে—এমন ধারণা থেকে বিষয়টি বাস্তবায়ন হয়নি।
নির্বাহী আদেশের ক্ষমতাবলে এবং স্বয়ংক্রিয় মূল্য সমন্বয় নির্দেশিকার আওতায় ডিজেল, কেরোসিন, পেট্রল ও অকটেনের দাম নির্ধারণ করছে সরকার। আইন অনুযায়ী, বিদ্যুৎ ও জ্বালানির দাম গণশুনানির মাধ্যমে নির্ধারণ করার মূল এখতিয়ার বিইআরসির। কিন্তু ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে আইনটি সংশোধন করে পতিত আওয়ামী লীগ সরকার। এর ফলে ডিজেল, কেরোসিন, পেট্রল ও অকটেনের দাম নির্ধারণে সরাসরি ক্ষমতা পায় সরকার। সংশোধিত আইনি ক্ষমতাবলে সরকার যখন প্রয়োজন মনে করবে, তখন সরাসরি নির্বাহী আদেশে গেজেট বা প্রজ্ঞাপন জারি করে নতুন দাম নির্ধারণ করতে পারবে। এরপর ২০২৪ সালের মার্চ থেকে আন্তর্জাতিক বাজারের (ব্রেন্ট ক্রুড অয়েল) দামের ওঠানামার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে প্রতি মাসে আলোচ্য চারটি জ্বালানি পণ্যের দাম নির্ধারণ করছে সরকার।
জ্বালানি বিভাগের আগে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) পণ্যগুলোর দাম নির্ধারণ করত। সব ধরনের জ্বালানি পণ্যের দাম নির্ধারণের ক্ষমতা বিইআরসির কাছে দিতে বর্তমানে উচ্চ আদালতে রিট রয়েছে কনজিউমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব)।
অভিযোগ রয়েছে, জ্বালানি বিভাগ ও বিপিসির সাবেক কর্মকর্তাদের পরামর্শে কৌশলগত এসব জ্বালানি পণ্যের দাম নির্ধারণের ক্ষমতা বিষয়ে আওয়ামী সরকার আইন সংশোধন করে। এর মাধ্যমে মূলত সরকারের রাজস্ব আয়ের বড় পথ তৈরি করা হয়, যেখানে জ্বালানি পণ্য কেনাকাটায় রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা বিপিসির কোনো ধরনের জবাবদিহিতা থাকবে না। বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দামের ওঠানামা, বিপিসির লোকসান মজুদসংক্রান্ত বিষয়ে রাষ্ট্রের আর্থিক ক্ষতির ঝুঁকির অজুহাত তুলে সে সময় আইন সংশোধন করে আওয়ামী লীগ সরকার। এসব তৎপরতায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল সে সরকারের বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদের। তার সঙ্গে ছিলেন বেশ কয়েকজন আমলাও।
ভোক্তা অধিকার সংগঠনগুলো বলছে, ডিজেল, কেরোসিন, পেট্রল ও অকটেনের দাম নির্ধারণ বিইআরসির হাতে দিলে গণশুনানি ও জবাবদিহির প্রশ্ন আসে। যে কারণে আওয়ামী লীগ সরকার সে ক্ষমতা বিইআরসির কাছে ছেড়ে দেয়নি। কমিশন দাম নির্ধারণের ক্ষমতা পেলে জ্বালানি তেল কেনাকাটায় কমিশনসহ বিপিসির নানা অনিয়ম সামনে চলে আসার সুযোগ রয়েছে। সেই সঙ্গে আকস্মিকভাবে এসব পণ্যের মূল্যবৃদ্ধির সুযোগও সরকারের হাতছাড়া হবে। এসব কারণেই মূলত বিইআরসির কাছে এ চারটি জ্বালানি তেলের দাম নির্ধারণের ক্ষমতা ছাড়া হচ্ছে না।
বর্তমানে বিইআরসি প্রতি মাসে এলপিজির দাম নির্ধারণ করছে, তবে সেটিও উচ্চ আদালতের নির্দেশে। পতিত আওয়ামী লীগ সরকারও নিজে থেকে বিইআরসির কাছে এলপিজির দাম নির্ধারণের ক্ষমতা ছেড়ে দেয়নি। যে কারণে আদালতের সিদ্ধান্ত নিয়ে ২০২১ সাল থেকে এলপিজির দাম নির্ধারণ করছে কমিশন।
বিইআরসি সূত্রে জানা গেছে, পেট্রোলিয়ামজাত পণ্যের খুচরা মূল্য নির্ধারণে একটি প্রবিধানমালার খসড়া তৈরি হয় ২০১২ সালে। কমিশন এ প্রবিধানমালা মন্ত্রণালয়ের মতামত নিয়ে চূড়ান্ত করবে—এমনটা বলা হয় বিইআরসি আইনে। কিন্তু এ প্রবিধানমালায় মতামত দেয়নি তৎকালীন সরকার। এরপর ২০২১ সালে পেট্রোলিয়াম পণ্যের দাম নির্ধারণে উচ্চ আদালতে রিট করে ক্যাব। ওই রিটে ‘বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন পেট্রোলিয়াম পদার্থ মজুদকরণ, বিপণন ও বিতরণ ট্যারিফ প্রবিধানমালা ২০১২’, ‘বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (পেট্রোলিয়াম পদার্থ পরিবহন ট্যারিফ) প্রবিধানমালা ২০১২’ এবং ‘বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন পেট্রোলিয়ামজাত পদার্থের খুচরা ট্যারিফ প্রবিধানমালা, ২০১২’—সমন্বিত তিনটি প্রবিধানমালার বিষয়ে উচ্চ আদালতের নির্দেশনা চায় ক্যাব, যা এখনো আদালতের আদেশের অপেক্ষায় রয়েছে।
বিইআরসি কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ২০১২ সালে প্রবিধানমালা মন্ত্রণালয়ের মতামতের জন্য পাঠানো হলেও তা আটকে থাকে দীর্ঘদিন। এরপর ২০২৩ সালে আবারো পাঠানো হয়। ২০২৪ সালের শেষের দিকে এবং ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে আবারো তা মতামত গ্রহণের জন্য পাঠানো হয়, কিন্তু মন্ত্রণালয় থেকে কোনো মতামত দেয়া হয়নি।
আজকের পত্রিকা
দৈনিক আজকের পত্রিকার প্রধান শিরোনাম ‘ভর্তির বাইরে সোয়া দুই লাখ’। প্রতিবেদনে বলা হয়, চলতি বছর মাধ্যমিক স্কুল সার্টিফিকেট (এসএসসি) ও সমমানের পরীক্ষায় পাস করা সোয়া দুই লাখের বেশি শিক্ষার্থী একাদশ শ্রেণিতে (কলেজ ও মাদ্রাসা) ভর্তির প্রক্রিয়ায় নেই; যা গত চার বছরের মধ্যে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ। এবার ভর্তিপ্রক্রিয়ার বাইরে থাকা পৌনে ২ লাখের বেশি শিক্ষার্থী আবেদনই করেনি। তাদের মধ্যে জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থী রয়েছে সাড়ে ১১ হাজার।
এবার ভর্তির প্রক্রিয়ায় না থাকা শিক্ষার্থীদের সংখ্যা মোট পাস করা শিক্ষার্থীদের প্রায় ২১ শতাংশ। অর্থাৎ পাস করা প্রতি পাঁচজনের মধ্যে একজন ভর্তির প্রক্রিয়ায় নেই। এসব শিক্ষার্থীকে আবার সুযোগ দিতে দ্বিতীয় দফায় অনলাইনে আবেদন নেওয়ার ব্যবস্থা করেছে ঢাকা মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ড।
শিক্ষাবিদেরা বলছেন, একাদশ শ্রেণিতে ভর্তির প্রক্রিয়ার বাইরে থাকা শিক্ষার্থীদের একটি অংশের শিক্ষাজীবন থেকে ঝরে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। আগের তিন বছরেও এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় পাসের পর বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী একাদশ শ্রেণিতে ভর্তিপ্রক্রিয়ার বাইরে ছিল।
রাজধানীর নটর ডেম কলেজসহ হাতে গোনা কয়েকটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় একাদশ শ্রেণিতে শিক্ষার্থী ভর্তি করে। এগুলো ছাড়া দেশের অন্যান্য কলেজ ও মাদ্রাসায় একাদশে ভর্তি কার্যক্রম কেন্দ্রীয়ভাবে পরিচালিত হয়। ঢাকা বোর্ডের অধীনে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) কারিগরি সহায়তায় অনলাইনে এ ভর্তিপ্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়। কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের অধীন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর একাদশ পর্যায়ের ভর্তি কার্যক্রম এই কেন্দ্রীয় প্রক্রিয়ার বাইরে পৃথকভাবে পরিচালিত হয়।
চলতি বছর নয়টি সাধারণ এবং মাদ্রাসা ও কারিগরি বোর্ড থেকে এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছে ১১ লাখ ৪৪ হাজার ৬৯৫ জন শিক্ষার্থী। তাদের মধ্যে একাদশ শ্রেণিতে ভর্তির জন্য অনলাইন প্রক্রিয়ায় আবেদন করেছে ৮ লাখ ৩৪ হাজার ৭১৮ জন। পাস করা বাকি ৩ লাখ ৯ হাজার ৯৭৭ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে কারিগরি বোর্ডের রয়েছে ৭৪ হাজার ৪৭০ জন, তারা কারিগরি বোর্ডের অধীনে আলাদাভাবে ভর্তি হয়। তাদের বাদ দিয়ে এবার কলেজ ও মাদ্রাসায় একাদশ শ্রেণিতে ভর্তির প্রক্রিয়ার বাইরে রয়েছে ২ লাখ ৩৫ হাজার ৫৭০ জন। তাদের মধ্যে ১ লাখ ৮৮ হাজার ১১৬ জন আবেদনই করেনি। আর ৪৭ হাজার ৪৫৪ জন আবেদন করলেও ভর্তি আবেদন নিশ্চয়ন করেনি।
ঢাকা বোর্ড থেকে জানা যায়, চলতি বছর এসএসসি ও সমমান পরীক্ষায় মোট ১ লাখ ১৯ হাজার ৪৬৩ জন শিক্ষার্থী জিপিএ-৫ পেয়েছে। তাদের মধ্যে ১১ হাজার ৫৩৫ জন একাদশ শ্রেণিতে ভর্তির জন্য আবেদন করেনি। এ ছাড়া আবেদন করেও পছন্দের কলেজে সুযোগ পায়নি জিপিএ-৫ পাওয়া ২ হাজার ২০৫ জন।
পাস করা শিক্ষার্থীদের এক-পঞ্চমাংশ ভর্তির প্রক্রিয়ার বাইরে থাকা নিয়ে জানতে চাইলে গত রোববার ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক সৈয়দ আক্তারুজ্জামান আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘বিভিন্ন কারণে শিক্ষার্থীদের একটি অংশ ভর্তিতে আবেদন করেনি। ধারণা করছি, তাদের একটি বড় অংশ ডিপ্লোমা, নার্সিং ও পলিটেকনিকে ভর্তি হবে।’
দেশ রূপান্তর
‘হাত বাড়ালেই ককটেল, বিস্ফোরণে পাঁচ হাজার’—এটি দৈনিক বণিক বার্তার প্রধান শিরোনাম। খবরে বলা হয়, রাজধানীর বংশালের বাসিন্দা মো. রায়হান উদ্দিন (৩৫) সামাজিক মাধ্যমে একাধিক ভিডিও দেখে ককটেল তৈরির প্রক্রিয়া সম্পর্কে ধারণা নেন। এরপর প্রয়োজনীয় উপকরণ কিনে নিজ বাসায় তৈরি করেন। তৈরিকৃত ককটেল কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের এক নেতার নির্দেশে গত ১৭ তারিখ যাত্রাবাড়ী থানা কম্পাউন্ড ও প্রধান ফটকে বিস্ফোরণ ঘটান। রায়হান উদ্দিন বংশাল থানাধীন ৩২ নম্বর ওয়ার্ডের ৬ নম্বর ইউনিট আওয়ামী লীগের দপ্তর সম্পাদক। ঘটনার তদন্তে নেমে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ তাকেসহ আরও তিনজনকে চারটি ককটেলসহ গ্রেপ্তার করে। ডিবির জিজ্ঞাসাবাদে রায়হান ককটেল তৈরির প্রক্রিয়া এবং তৈরির কারণ সম্পর্কে জানান।
ডিবি ওয়ারী বিভাগের ডিসি মোল্লা মো. শাহীন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘রায়হান উদ্দিন প্রযুক্তির সহায়তা নিয়ে ককটেল তৈরির কৌশল রপ্ত করে একাধিক ককটেল তৈরি করেন। ভারতীয় একটি নাম্বার থেকে তার রাজনৈতিক গুরু ঢাকা মহানগর দক্ষিণ ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক মো. সাব্বির হোসেন ককটেল মারার নির্দেশ দেন। মূলত রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে হাসিলের জন্যই ককটেল তৈরি এবং নিক্ষেপ করেছিলেন তিনি। রায়হান সন্ত্রাসবিরোধী আইনের একটি মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে ৫ মাস কারাগারে ছিলেন।’
হরতাল-অবরোধের মতো কর্মসূচিতে সহিংসতা ঘটানোর অন্যতম বড় উপকরণ হয়ে দাঁড়িয়েছে এই বিস্ফোরক দ্রব্য, যা ককটেল নামে পরিচিত। গত কিছুদিন থেকে রাজধানীতে ধারাবাহিকভাবে ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটছে। এতে সাধারণ মানুষ আহত হচ্ছেন, জনমনে আতঙ্ক বিরাজ করছে। অতীতে এই ককটেল কত মানুষের জীবন কেড়ে নিয়েছে, কত সংসারের জীবিকার প্রধান ব্যক্তিকে পঙ্গু করে পরিবারটিকে পথে বসিয়েছে, এ পরিসংখ্যান কম বড় নয়। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সাম্প্রতিক সময়ে যেসব ককটেল বিস্ফোরণ ঘটানো হচ্ছে সেগুলোর ধ্বংস ক্ষমতা আগের চেয়ে বেশি। ককটেল কোথায় পাওয়া যায়, কারা কী কারণে এবং কীভাবে তৈরি করছে, তা খুঁজতে গিয়ে একাধিক চক্রের তথ্য সামনে এসেছে।
অনুসন্ধানে দেখা যায়, রাজনৈতিক উদ্দেশ্য, প্রতিপক্ষকে ঘায়েল ও জনমনে আতঙ্ক সৃষ্টিতে ককটেল তৈরি করছে একাধিক চক্র। মোহাম্মদপুরের জেনেভা ক্যাম্প, ডেমরার সাইনবোর্ড, কেরানীগঞ্জ, সাভার ও শরীয়তপুরের জাজিরায় গড়ে উঠেছে এসব আস্তানা। দক্ষ কারিগরের পাশাপাশি প্রযুক্তির সহায়তায় এখন বাসাবাড়িতেও তৈরি হচ্ছে ককটেল। পরে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় সরবরাহ করা হচ্ছে। সরকারবিরোধী রাজনৈতিক দলের নেতাদের নির্দেশে তৈরি এসব ককটেল কয়েক হাত ঘুরে পৌঁছায় নিক্ষেপকারীদের হাতে। টাকা ও দলীয় পদ-পদবির আশায় কর্মী এবং ভাড়াটে তরুণরা এসব ককটেল নিক্ষেপ করছে। আগে ১০০-২০০ টাকায় ককটেল বিস্ফোরণ ঘটানো হলেও এখন দিতে হচ্ছে প্রায় ৫ হাজার টাকা। জনসমাগমপূর্ণ গুরুত্বপূর্ণ স্থানে বা যেখানে বিস্ফোরণ ঘটালে বেশি আতঙ্ক সৃষ্টি হবে সেখানে নিক্ষেপের জন্য পারিশ্রমিক আরও বেশি।
ঢাকা মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার (ডিবি) মো. শফিকুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘যারা ককটেল নিক্ষেপ করছে, আমরা তাদের ইতিমধ্যে গ্রেপ্তার করেছি। তাদের দেওয়া তথ্যানুযায়ী, ককটেল যারা তৈরি করছে, তাদের সন্ধানেও অভিযান চলছে। তাছাড়া রাজধানীর যেসব এলাকায় বিভিন্ন সময় ককটেল তৈরি করা হতো, সেসব বাসা-আস্তানা নজরদারিতে রয়েছে। আমাদের একাধিক টিম মাঠে রয়েছে।’
ডিবির তথ্যমতে, এক বছরের ব্যবধানে শুধু রাজধানীতেই ককটেলের ব্যবহার বেড়েছে পাঁচগুণেরও বেশি। বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ককটেল তৈরি করাচ্ছে। যারা আর্থিক জোগানদাতা, তাদের ফরমায়েশ অনুযায়ী ককটেল বা বোমা তৈরি করে মাঠ পর্যায়ের কর্মিবাহিনীর হাতে এগুলো তুলে দেন মধ্যম সারির নেতারা।
নেতার ইচ্ছায় কর্ম: রাজনৈতিক দলের কর্মিবাহিনী এবং ক্ষেত্রবিশেষে ভাড়াটে লোক দিয়ে রাজপথে ককটেল বিস্ফোরণ ঘটানো হয়। বিগত কয়েক মাসের ঘটনা পর্যালোচনা করে দেখা যায়, বেশিরভাগ ক্ষেত্রে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরাই ঝটিকা মিছিল থেকে ককটেল বিস্ফোরণ ঘটিয়েছেন বলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তথ্য পেয়েছে। ককটেলসহ পুলিশ একাধিক কর্মীকে গ্রেপ্তার করেছে। গত ১১ তারিখে গুলশানে ঝটিকা মিছিল থেকে পাঁচটি ককটেলসহ আব্দুর রহিম ও আরাফাত নামে দলটির দুজন কর্মীকে আটক করে পুলিশ। তাদের ছত্রভঙ্গ করতে গেলে পুলিশের দিকেও ককটেল নিক্ষেপ করা হয়। হাতেনাতে ধরা আব্দুর রহিম পুলিশকে জানিয়েছে, ‘আমাদের নেতারা ককটেল দিছিল। তাদের নির্দেশে ককটেল ফাটাচ্ছি।’
গত ১৯ তারিখে কমলাপুর রেলস্টেশনের প্ল্যাটফর্মে ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনায় ছাত্রলীগের শাহজাহানপুর থানার সাংগঠনিক সম্পাদক ও রেলওয়ের ইলেকট্রিশিয়ান সাখাওয়াত হোসেন রায়হান এবং যুবলীগ কর্মী মোহাম্মদ সানমুনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। মতিঝিল বিভাগের উপকমিশনার হারুন অর রশিদের দাবি, আওয়ামী লীগের ডাকা ‘লকডাউন’ সফল করা, নিজেদের অবস্থান জানান দেওয়া ও জনমনে ভীতি সৃষ্টির উদ্দেশ্যে তারা ককটেল বিস্ফোরণ ঘটিয়েছিল। ২০ হাজার টাকার চুক্তিতে দুজনে ককটেল নিক্ষেপ করেছিল। একাধিক হাত ঘুরে ককটেলগুলো তাদের হাতে পৌঁছানো হয়।
সুপ্রিম কোর্টের সামনে ককটেল বিস্ফোরণে জড়িত মো. সালমান ইসলাম সাকিব ওরফে আসিফ (২৩) নামে ছাত্রলীগ নেতাকে সোমবার চারটি ককটেলসহ গ্রেপ্তার করেছে ডিবি রমনা বিভাগ। ডিবি রমনা বিভাগ জানিয়েছে, মতিঝিল থানা ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি মিরাজ ১০ হাজার টাকা ও দলীয় পদ দেওয়ার আশ্বাস দিয়ে সালমানকে ককটেল নিক্ষেপে প্ররোচিত করেন।
সম্প্রতি ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনায় জড়িত অনেককে গ্রেপ্তার করে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। জিজ্ঞাসাবাদে অধিকাংশই পুলিশকে জানিয়েছে, প্রতি ককটেল নিক্ষেপের জন্য ৫ হাজার টাকা দেওয়া হচ্ছে। বেশি গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় ককটেল বিস্ফোরণ ঘটাতে পারলে ১০ হাজার টাকাও দেওয়া হয়। আবার একনিষ্ঠ কর্মীদের নতুন কমিটি গঠন হলে প্রত্যাশিত পদ দেওয়ার প্রলোভনও দেখানো হচ্ছে। ককটেল নিক্ষেপকারীদের সমন্বয় করার জন্য দেশে অবস্থানকারী আলাদা গ্রুপ কাজ করছে। বিস্ফোরণের ভিডিও পাঠালেই মিলছে টাকা। বেশি টাকা পেতে একই স্পটে ৪-৫টি ককটেলও বিস্ফোরণ ঘটানো হয়। বাসে অগ্নিসংযোগে মাদকাসক্ত ও টোকাইদের টার্গেট করা হচ্ছে। ককটেল নিক্ষেপে জড়িতদের গ্রেপ্তারের পর এমন তথ্য পেয়েছে সংশ্লিষ্টরা। গ্রেপ্তারকৃতদের ফোনে বিভিন্ন ভারতীয় নাম্বার পাওয়া গেছে। ওই নাম্বারগুলোর তথ্যে নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীদের শীর্ষ নেতাদের নাম আসছে। যারা আওয়ামী লীগের পতনের পর থেকে ভারতে অবস্থান করছেন।
ককটেল-বোমার কারখানা এখন রাজধানীর বুকে: পুলিশি হয়রানি ও নজর এড়াতে এবং রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় ককটেল তৈরির কারখানা এখন খোদ রাজধানীতেই গড়ে উঠেছে। আবাসিক এলাকা কিন্তু সাধারণ মানুষের দৃষ্টি ও সন্দেহের বাইরে, এমন ফ্ল্যাট ও বাড়ি ককটেল তৈরির উপযুক্ত স্থান হিসেবে বেছে নেওয়া হয়ে থাকে।
বাংলাদেশ প্রতিদিন
দৈনিক বাংলাদেশ প্রতিদিনের প্রথম পাতার খবর ‘নজরদারি বাড়াবে আইএমএফ’। প্রতিবেদনে বলা হয়, নিম্ন আয়ের দেশগুলোর ঋণ বহনের সক্ষমতা মূল্যায়নে বড় পরিবর্তন এনেছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ও বিশ্বব্যাংক। নতুন এ কাঠামোর আওতায় শুধু বৈদেশিক ঋণ নয়; অভ্যন্তরীণ ঋণ, রাজস্ব আদায়, ব্যাংক খাতের দুর্বলতা এবং জলবায়ু পরিবর্তনজনিত দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকিও কড়াকড়িভাবে বিশ্লেষণ করা হবে। ২০২৭ সালের দ্বিতীয়ার্ধ থেকে কার্যকর হতে যাওয়া এ সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ দেশের মোট সরকারি ঋণের বড় অংশই অভ্যন্তরীণ উৎসনির্ভর। ওয়াশিংটনে আইএমএফের সদর দপ্তরে অনুষ্ঠিত সংস্থাটির নির্বাহী কমিটির সভায় এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। গতকাল রাতে তা প্রকাশ করে আইএমএফের সদর দপ্তর।
আইএমএফের নতুন কাঠামোর মূল দিক ও প্রভাব : অভ্যন্তরীণ ঋণে চাপ : ২০২৪-২৫ অর্থবছর শেষে বাংলাদেশের মোট সরকারি ঋণ জিডিপির ৪১ শতাংশে পৌঁছেছে, যার ৫৩.৬ শতাংশই অভ্যন্তরীণ ঋণ। একই সময়ে এই ঋণের সুদ ও আসল মেটাতে জিডিপির ৪.২ শতাংশ ব্যয় হওয়ায় পরিশোধ সক্ষমতার ওপর বড় চাপ তৈরি হয়েছে।
বেসরকারি খাতে ঋণের সংকট : বাজেট ঘাটতি পূরণে সরকার দেশীয় ব্যাংক থেকে অতিরিক্ত ঋণ নিলে বেসরকারি খাতের ঋণপ্রবাহ সংকুচিত হবে। এতে ব্যবসাবাণিজ্য ও বেসরকারি বিনিয়োগের ওপর সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।
ব্যাংক খাতের দুর্বলতা : খেলাপি ঋণ ও পুনর্গঠন ব্যয়ে জর্জরিত ব্যাংক খাতকে চাঙা করতে সরকারি অর্থের প্রয়োজন হতে পারে, যা সরকারের ঋণের বোঝা আরও বাড়াবে।
কম রাজস্ব আদায়ের ঝুঁকি : ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশের কর-জিডিপি অনুপাত ছিল মাত্র ৬.৯ শতাংশ। রাজস্ব আদায় বাড়াতে না পারলে ঋণনির্ভরতা বৃদ্ধি পাবে, যা দেশের ঋণ শোধের সক্ষমতাকে মারাত্মক ঝুঁকিতে ফেলবে।
জলবায়ু ও সরকারি দায়ের যুক্তকরণ : প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও জলবায়ু পরিবর্তনের সম্ভাব্য ক্ষয়ক্ষতি এবং রাষ্ট্রায়ত্ত বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের অপূরণীয় বকেয়া ও গ্যারান্টির প্রভাবও নতুন বিশ্লেষণে যুক্ত করা হবে। এ অবস্থায় আইএমএফের মূল মূল্যায়ন অনুযায়ী, বাংলাদেশের সামগ্রিক ঋণঝুঁকি এখনো ‘মাঝারি’ পর্যায়ে থাকলেও তা সামলানোর সক্ষমতা বেশ সীমিত। ২০২৭ সালে নতুন মূল্যায়ন ব্যবস্থা চালুর আগেই কর কাঠামো জোরদার করা, ব্যাংক খাতের প্রশাসনিক বিশৃঙ্খলা দূর করা এবং অভ্যন্তরীণ ঋণ ব্যবস্থাপনায় গতি আনা অপরিহার্য হয়ে দাঁড়িয়েছে।
