ইউরোপের কৌশলগত অংশীদার হতে এয়ারবাস কেনা গুরুত্বপূর্ণ: ফরাসি রাষ্ট্রদূত

ফন্ট সাইজ:

ইউরোপের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত অংশীদারিত্ব গড়ে তুলতে এয়ারবাস কেনা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশে নিযুক্ত ফরাসি রাষ্ট্রদূত জ্যঁ-মার্ক সেরে-শার্লে। তিনি বলেন, এয়ারবাস চুক্তির মাধ্যমে বাংলাদেশ ইউরোপের কৌশলগত মানচিত্রে জায়গা করে নিতে পারে। তবে এজন্য ইউরোপের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি অংশীদারিত্বে বাংলাদেশের আগ্রহ দেখাতে হবে। গতকাল জাতীয় প্রেস ক্লাবে কূটনৈতিক প্রতিবেদকদের সংগঠন ডিপ্লোম্যাটিক করেসপন্ডেন্টস এসোসিয়েশন, বাংলাদেশ (ডিক্যাব) কর্তৃক আয়োজিত ডিক্যাব টকে তিনি এসব কথা বলেন।

ফরাসি রাষ্ট্রদূত বলেন, আমাদের একে অন্যের মানচিত্রে একে অপরকে জায়গা করে দিতে হবে। এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তিনি বলেন, ইউরোপ অনেক দেশের সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি করেছে। বাংলাদেশ যদি ইউরোপের মানচিত্রে থাকতে চায় এবং ইউরোপের সম্পৃক্ততা চায়, তাহলে দীর্ঘমেয়াদি অংশীদারিত্বে যুক্ত হওয়ার আগ্রহ দেখাতে হবে। আর সেখানেই এয়ারবাস গুরুত্বপূর্ণ।

বাংলাদেশের উচিত অন্য বড় শক্তির বিকল্প হিসেবে নয়, বরং ইউরোপকে একটি অতিরিক্ত কৌশলগত অংশীদার হিসেবে দেখা। সেরে-শার্লে বলেন, আপনি যদি আমাদের দিকে এগিয়ে না আসার সিদ্ধান্ত নেন, আমরাও আপনার দিকে এগিয়ে না আসার সিদ্ধান্ত নেবো। এয়ারবাসের সঙ্গে চুক্তির বিষয়ে তিনি বলেন, কয়েক বছর আগে কারিগরি সমীক্ষা চালানোর পর বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স এয়ারবাসের উড়োজাহাজ কেনার আগ্রহ প্রকাশ করেছিল।
এয়ারবাসকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে বেছে নেয়নি উল্লেখ করে রাষ্ট্রদূত বলেন, আমেরিকানরা কয়েকটি উড়োজাহাজ বিক্রি করতে সক্ষম হয়েছে। তবে বিমান এয়ারবাসের প্রতি তাদের আগ্রহ বজায় রেখেছে এবং আলোচনা এখনো চলছে। তিনি বলেন, এ বিষয়ে কিছুটা সময় লাগতে পারে। কারণ ফ্রান্স চায় আলোচনা সঠিকভাবে সম্পন্ন হোক।

বাংলাদেশকে ওয়াশিংটন ও ব্রাসেলসের মধ্যে কোনো একটি পক্ষ বেছে নিতে হবে না বলে মন্তব্য করেন ফরাসি রাষ্ট্রদূত। তিনি বলেন, দক্ষিণ এশিয়ার অংশীদারদের কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন অর্জনে সহায়তা করতে চায় প্যারিস। তিনি বলেন, আপনাদের কখনোই ওয়াশিংটন ও ব্রাসেলসের মধ্যে বেছে নিতে হবে না। ইউরোপের অংশীদারিত্ব কোনো পক্ষকে বাদ দেয়ার জন্য নয়। সেরে-শার্লে বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ভালো বন্ধু। তাই শুধু এ কারণে বিভাজনের চেষ্টা করবেন না যে, এখন একজন প্রেসিডেন্ট আছেন, পরে আরেকজন আসবেন। ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি করা হবে কিনা, সেটি শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশের সিদ্ধান্ত বলেও জানান তিনি। তিনি বলেন, হয়তো ইউরোপের দেশগুলো সিদ্ধান্ত নেবে যে তারা মুক্ত বাণিজ্য চায় না। সেটি তাদের সিদ্ধান্ত। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ঢাকা ইউরোপের কাছে কী বার্তা পাঠায়। শুরুর বক্তব্যে রাষ্ট্রদূত বলেন, বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার অংশীদাররা যাতে দুই পক্ষের মধ্যে কোনো একটি বেছে নিতে বাধ্য না হয়, সে জন্য তাদের কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন অর্জনে সহায়তা করতে চায় ফ্রান্স।
বাংলাদেশের সংস্কার প্রক্রিয়া প্রসঙ্গে সেরে-শার্লে বলেন, জুলাই সনদে বর্ণিত বাংলাদেশের জনগণের আকাঙ্ক্ষা এবং প্রাতিষ্ঠানিক পরিবর্তনের বিষয়গুলো পর্যবেক্ষণ করছে ফ্রান্স। সমপ্রতি ফ্রান্সের একদল সিনেটর বাংলাদেশ সফর করেছেন জানিয়ে তিনি বলেন, তারা উচ্চকক্ষ গঠনের বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করেছেন। রাষ্ট্রদূত বলেন, আমি উল্লেখ করেছি যে, জুলাই সনদে উচ্চকক্ষ গঠনের আকাঙ্ক্ষা ও সিদ্ধান্ত রয়েছে। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে ফরাসি ব্যবস্থা কীভাবে কাজ করে, তা ব্যাখ্যা করতে বিশেষজ্ঞ পাঠানোর প্রস্তাব দেয়া হয়েছে।

সেরে-শার্লে বলেন, দেশ পরিবর্তন এবং প্রতিষ্ঠানগুলো পরিবর্তনের বিষয়ে বাংলাদেশের জনগণের আকাঙ্ক্ষা আমরা পর্যবেক্ষণ করছি। আমরা সহযোগিতা করতে এবং নিজেদের অভিজ্ঞতা বিনিময় ও ভাগ করে নিতে প্রস্তুত। তবে বাংলাদেশের কী করা উচিত, সে বিষয়ে ফ্রান্স কোনো নির্দেশনা দেবে না বলেও জানান তিনি। রাষ্ট্রদূত বলেন, আমরা আপনাদের কী করা উচিত, তা নিয়ে মন্তব্য করি না। আমরা আপনাদের বিব্রত করতে এখানে আসিনি।
ইউরোপীয় পণ্যের বাজারে প্রবেশাধিকার নিয়ে উদ্বেগের বিষয়ে ফরাসি রাষ্ট্রদূত বলেন, ৬১টি অশুল্ক বাধা চিহ্নিত করা হয়েছে। এসব বাধা দূর করার বিষয়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় আশ্বাস দিয়েছে। তিনি বলেন, আমরা চাই আমাদের কোম্পানিগুলো সর্বোত্তম আচরণ পাক। আমরা মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে আলোচনা শুরু করতে প্রস্তুত। ইউরোপে আমরা অবাধ ও ন্যায্য প্রতিযোগিতার সিদ্ধান্ত নিয়েছি এবং এ বিষয়ে আমরা আলোচনা করতে চাই।

সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার বিষয়ে রাষ্ট্রদূত বলেন, গত ডিসেম্বরে ডেইলি স্টার ও প্রথম আলো’র কার্যালয়ে আগুন দেয়ার ঘটনায় তিনি ‘ভীষণভাবে হতবাক’ হয়েছেন। তিনি বলেন, আমরা সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতায় বিশ্বাস করি। ফ্রান্সে আমরা সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার জন্য লড়াই করছি। এটি প্রতিদিনের সংগ্রাম। সেরে-শার্লে বলেন, আপনারা যাতে সততার সঙ্গে, কোনো প্রভাব ও সেন্সরশিপ ছাড়াই কাজ করতে পারেন, সেটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা ছাড়া কোনো গণতন্ত্র নেই। এ বিষয়ে ফ্রান্স বাংলাদেশ সরকারের কাছে তাদের উদ্বেগের কথা জানিয়েছে বলেও জানান তিনি। তবে দেশের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি নিয়ে বিস্তারিত মন্তব্য করতে রাজি হননি।

স্যাটেলাইট সহযোগিতার বিষয়ে ফরাসি রাষ্ট্রদূত বলেন, বাংলাদেশের সঙ্গে ফ্রান্সের অংশীদারিত্ব দুই দেশের মধ্যে আস্থা ও পারস্পরিক বোঝাপড়া তৈরি করেছে। তিনি বলেন, বাংলাদেশ যখন তার স্যাটেলাইট বহর উন্নয়নের কথা ভাবছে, স্বাভাবিকভাবেই তারা ইউরোপ, ফ্রান্স এবং ফরাসি কোম্পানিগুলোর দিকে তাকাচ্ছে। রোহিঙ্গা সংকটের বিষয়ে সেরে-শার্লে বলেন, ফ্রান্স আর্থিক ও রাজনৈতিক সহায়তা দিতে প্রস্তুত। তবে এ সংকট মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সম্মিলিত উদ্যোগ প্রয়োজন।

ডিকাব সভাপতি এ কে এম মঈনুদ্দিনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তৃতা দেন সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক আবু হেনা ইমরুল কায়েস। এ ছাড়া এই টকে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে কর্মরত কূটনৈতিক প্রতিবেদকরাও উপস্থিত ছিলেন।