পদকটা আসতে পারতো সকালেই। একটি ব্রোঞ্জের আশায় কারোগি স্পোর্টস পার্কে হাজির হয়েছিলেন জাপানে অবস্থান করা বাংলাদেশ অলিম্পিক এসোসিয়েশনের প্রায় সকল কর্মকর্তা। সাংবাদিকের বহরও হাজির করোগি স্পোর্টস পার্কে। কিন্তু সেখানে হতাশ করে নারী ক্রিকেট দল। সন্ধ্যায় নাগোয়ার টোকাই সিটিজেন জিমনেশিয়ামে হতাশা আরও বাড়িয়ে দেয় পুরুষ কাবাডি। জাপানের কাছে হেরে ২০০৬ সালের পর এশিয়ান গেমসে পদক পুনরুদ্ধারের সুযোগ হাতছাড়া করে তারা। সবাই যখন মন খারাপ করে হোটেলে ফেরার প্রস্তুতি নিচ্ছিলো, তখনই উশু থেকে এলো সুখবর। যে সুখবর অবসান ঘটালো চার দশকের অপেক্ষার। ৪০ বছর আগে, ১৯৮৬ সালের সিউল এশিয়ান গেমসে বক্সিংয়ে ব্যক্তিগত ইভেন্টে পদক জিতেছিলেন মোশারফ হোসেন। চার দশক পর আইচি নাগোয়ায় মোশারফের অর্জনে ভাগ বসালেন উশুকা জিন্নাত আক্তার। নাগোয়ার আইচি প্রিফেকচারাল মার্শাল আর্ট সেন্টারে গতকাল ৫২ কেজি ফাইট ইভেন্টের সেমিফাইনালে ওঠার মধ্য দিয়ে অন্তত ব্রোঞ্জ নিশ্চিত করেছেন জিন্নাত।
এদিন জিন্নাতের শুরুটা অবশ্য লড়াই ছাড়াই। রাউন্ড অব সিক্সটিনে বাই পেয়ে সরাসরি কোয়ার্টার ফাইনালে ওঠেন তিনি। শেষ আটে তার প্রতিপক্ষ ছিলেন ইন্দোনেশিয়ার থারিশা দিয়া ফ্লোরেন্তিনা। কিন্তু পুনরায় ওজন নেয়ার সময় নির্ধারিত ওজনের চেয়ে ১০০ গ্রাম বেশি হওয়ায় ডিসকোয়ালিফাই হন ইন্দোনেশিয়ার প্রতিযোগী। তাতেই সেমিফাইনাল নিশ্চিত হয়ে যায় জিন্নাতের। আজ সেমিফাইনালে চীনের ইউডি’র বিপক্ষে ম্যাটে নামবেন তিনি। লড়াইয়ে জিতলে নিশ্চিত হবে রুপা, হারলেও ব্রোঞ্জ নিয়ে ফিরবেন বাংলাদেশের এই উশুকা। উশুর কিছু ইভেন্টে প্রতিযোগীর সংখ্যা কম হলে সেমিফাইনালে উঠেও পদক নিশ্চিত হয় না; তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচ খেলতে হয়।
তবে জিন্নাতের ৫২ কেজি ফাইটে প্রতিযোগী ছিলেন ১৫ জন। তাই সেমিফাইনালে ওঠার সঙ্গে সঙ্গেই নিশ্চিত হয়েছে তার ব্রোঞ্জ। বিষয়টি নিশ্চিত করে উশু ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক দিলদার হাসান দিলু বলেন, ‘উশুতে অনেক সময় প্রতিযোগিতা কম থাকায় তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচ খেলতে হয়। ২০২৫ সালের ইসলামি সলিডারিটি গেমসেও এমন হয়েছিল। সেমিফাইনালে উঠেও প্রতিযোগী কম থাকায় বাংলাদেশ পদক পায়নি। এবার ১৫ জন প্রতিযোগী থাকায় সেমিফাইনালে উঠতেই পদক নিশ্চিত হয়েছে।’ পদক জয়ের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন বাংলাদেশের সেফ দ্য মিশন ইমরোজ আহমেদও। তিনি বলেন, ‘আমরা অফিসিয়ালদের সঙ্গে কথা বলে জানতে পেরেছি উশুর ইভেন্টগুলোতে সেমিফাইনালে উঠলে পদক নিশ্চিত হবে।’ ২০১৯ সাল থেকে জাতীয় চ্যাম্পিয়নশিপে খেলছেন জিন্নাত। এখন পর্যন্ত সাতটি সোনা জিতেছেন, কখনো হননি দ্বিতীয়।
অথচ এতদিন আন্তর্জাতিক কোনো বড় আসরে খেলার সুযোগই পাননি। প্রথম আন্তর্জাতিক আসরেই এশিয়ান গেমসের মতো মঞ্চে পদক- গল্পটা তাই অন্যরকম। তা-ও আবার এমন এক পদক, যার জন্য বাংলাদেশকে অপেক্ষা করতে হয়েছে ৪০ বছর। এ নিয়ে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে জিন্নাত বলেন, ‘আমি মানসিকভাবে প্রস্তুত ছিলাম ফাইট করার জন্য। খেলা হয়নি। তবে পদক নিশ্চিত হয়েছে। আমি যে কতটা খুশি, সেটা ভাষায় প্রকাশ করতে পারবো না।’ জিন্নাতের এই কথার মধ্যেই যেন লুকিয়ে আছে চার দশকের অপেক্ষার আনন্দ। একটি পদক শুধু একজন উশুকার নয়-এটি বাংলাদেশের ব্যক্তিগত পদকের দীর্ঘ খরা ভাঙার গল্প।
