দেশে সাশ্রয়ী ও নির্ভরযোগ্য ইন্টারনেট নিশ্চিত করার পথে প্রধান অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে বাংলাদেশ সাবমেরিন ক্যাবলস পিএলসি (বিএসসিপিএলসি)- এর মনোপলি বা একচেটিয়া আধিপত্য। আন্তর্জাতিক ব্যান্ডউইথ অবকাঠামোয় বিএসসিপিএলসির এই একাধিপত্যের কারণে বাজারে কোনো প্রতিযোগিতাপূর্ণ পরিবেশ তৈরি হচ্ছে না, যার সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে ব্যান্ডউইথের মূল্য, ইন্টারনেটের গুণগত মান এবং শেষ পর্যন্ত গ্রাহক পর্যায়ের দামের ওপর। খাতসংশ্লিষ্টরা এই মনোপলি ভাঙতে প্রতিযোগিতা বাড়ানো, বেসরকারি সাবমেরিন ক্যাবল বিনিয়োগ সহজ করা এবং ল্যান্ডিং স্টেশনে উন্মুক্ত ও বৈষম্যহীন প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে গুগল, মেটা, আকামাই ও ক্লাউডফ্লেয়ারের মতো প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের বিনিয়োগ আকর্ষণে স্থিতিশীল নীতিমালা ও উন্নত ডিজিটাল অবকাঠামো নিশ্চিত করতে হবে। মঙ্গলবার রাজধানীর মহাখালীর রাওয়া কনভেনশন হলে টেলিকম অ্যান্ড টেকনোলজি রিপোর্টার্স নেটওয়ার্ক বাংলাদেশ (টিআরএনবি) আয়োজিত ‘সবার জন্য সাশ্রয়ী ইন্টারনেট ও টেক জায়ান্টদের বাংলাদেশে বিনিয়োগ: বর্তমান চ্যালেঞ্জ ও উত্তরণের উপায়’ শীর্ষক এক সেমিনারে এমনটাই জানিয়েছেন বক্তারা।
বক্তারা বলেন, বিএসসিপিএলসি দুটি সাবমেরিন ক্যাবল- সি-মি-উই-৪ ও সি-মি-উই-৫-এ মোট ৮১৯ কোটি ৫০ লাখ টাকা বিনিয়োগ করেছে। ২০০৮ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানটির রাজস্ব ৩ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। এই দীর্ঘ সময়ে নিট মুনাফা হয়েছে ১ হাজার ৩৬২ কোটি টাকার বেশি। কিন্তু একচেটিয়া ব্যবসার সুযোগ থাকায় সাধারণ মানুষ ও ইন্টারনেট গ্রাহক এর সুফল থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। তারা বলেন, দেশে আন্তর্জাতিক ব্যান্ডউইথের ব্যবহার বাড়লেও বিএসসিপিএলসির মনোপলির কারণে একাধিক সাবমেরিন ক্যাবল ও বিকল্প আন্তর্জাতিক রুটের সুযোগ অত্যন্ত সীমিত। ২০০৬ সালে বিটিসিএল (বাংলাদেশ টেলিকমিউনিকেশন্স কোম্পানি লিমিটেড) এক এমবিপিএস ব্যান্ডউইথ বিক্রি করত ৭৫ হাজার টাকায়। পরে সাবমেরিন ক্যাবল কোম্পানি লিমিটেড (বিএসসিপিএলসি) ব্যান্ডউইথ বিক্রি শুরু করে। ব্যান্ডউইথ বিক্রি শুরুর ১০ বছর পর ২০১৬ সালে একই পরিমাণ ব্যান্ডউইথ বিক্রি হয় ৫০০ টাকায়। চলতি বছরে একই পরিমাণ ব্যান্ডউইথ বিক্রি করা হচ্ছে ১২০ টাকায়। অথচ বেসরকারি সাবমেরিন ক্যাবল চালু হলে উন্মুক্ত প্রতিযোগিতার ফলে ২০২৭ সালে একই পরিমাণ ব্যান্ডউইথের দাম নেমে আসবে মাত্র ৬০ থেকে ৭০ টাকায়। বিএসসিপিএলসির একচেটিয়া আধিপত্য বহাল থাকলে এবং নতুন সাবমেরিন ক্যাবল চালু না হলে এই সাশ্রয়ী মূল্যে ব্যান্ডউইথ বিক্রি করা কখনোই সম্ভব হবে না।
তারা বলেন, বর্তমানে বাংলাদেশ প্রায় ১৩ হাজার ৫০০ জিবিপিএস আন্তর্জাতিক ব্যান্ডউইথ ব্যবহার করছে। গুগল, মেটা, আকামাই ও ক্লাউডফ্লেয়ারের মতো বৈশ্বিক প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের সেবা ও অবকাঠামোর সঙ্গে এই আন্তর্জাতিক সংযোগের গভীর সম্পর্ক রয়েছে। তবে বিএসসিপিএলসির মনোপলি নির্ভর পরিবেশ, আন্তর্জাতিক সংযোগের সীমাবদ্ধতা, নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ এবং অনুকূল নীতিমালার অনুপস্থিতির কারণে বাংলাদেশে বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান ও হাইপারস্কেলাররা বিনিয়োগে মারাত্মক চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ছে। আইএসপিএবির পক্ষ থেকে এই মনোপলি ভেঙে বেসরকারি বিনিয়োগ ও উন্মুক্ত প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করা, বেসরকারি সাবমেরিন ক্যাবল স্থাপনের প্রক্রিয়া সহজ করা এবং ল্যান্ডিং স্টেশনে ক্যারিয়ার-নিরপেক্ষ ও বৈষম্যহীন প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করার প্রস্তাব দেয়া হয়। পাশাপাশি একাধিক সাবমেরিন ক্যাবল ও ল্যান্ডিং স্টেশনের সুযোগ তৈরি, দেশীয় ফাইবার শেয়ারিং, আইএক্সপি ও স্থানীয় পিয়ারিং সম্প্রসারণ এবং ব্রডব্যান্ড অবকাঠামো ও সরঞ্জামের ওপর কর যৌক্তিকীকরণের সুপারিশ করা হয়।
এসময় মেটাকোর সাবকম লিমিটেডের পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা আমিনুল হাকিম বলেন, বিএসসিপিএলসির একচেটিয়া ব্যবস্থা জিইয়ে রেখে দেশে সাশ্রয়ী ও মানসম্মত ইন্টারনেট নিশ্চিত করা অসম্ভব। আন্তর্জাতিক সংযোগ অবকাঠামোয় প্রতিযোগিতা বাড়াতে হবে এবং বেসরকারি বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি হলে ব্যান্ডউইথের বাজারে এই মনোপলি ভেঙে যাবে, যার সুফল সরাসরি গ্রাহক পর্যায়ে পৌঁছাবে।
টিআরএনবি’র সাবেক সভাপতি সমীর কুমার দে-এর সঞ্চালনায় টিআরএনবির সভাপতি মাসুদুজ্জামান রবিনের সভাপতিত্বে সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বেসরকারি সাবমেরিন ক্যাবল কোম্পানি মেটাকোর সাবকম লিমিটেডের প্রকল্প প্রধান মাহমুদ শাহেদ এবং ইন্টারনেট সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর সংগঠন আইএসপিএবির কোষাধ্যক্ষ মইন উদ্দিন আহমেদ। এসময় আরো বক্তব্য দেন সিডিনেট কমিউনিকেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মশিউর রহমান, বাংলাদেশ এনজিওস নেটওয়ার্ক ফর রেডিও অ্যান্ড কমিউনিকেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা এএইচএম বজলুর রহমান। তারা পাওয়ার পয়েন্ট উপস্থাপনায় দেশের আন্তর্জাতিক সংযোগ, সাবমেরিন ক্যাবল খাত ও ইন্টারনেট অবকাঠামোর বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন।
