পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের দল পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফ (পিটিআই) দেশটির সরকার ও সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে বিরোধী নেতাদের অপহরণ ও আটকের অভিযোগ তুলে ‘গৃহযুদ্ধের’ হুঁশিয়ারি দিয়েছে। আগামী ২৭ সেপ্টেম্বর দলটির ঘোষিত বড় বিক্ষোভের আগে দেশটিতে উত্তেজনা আরও বেড়েছে।
পিটিআইয়ের অভিযোগ, প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফের সরকার এবং ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনিরের নেতৃত্বাধীন সেনাবাহিনী প্রতিষ্ঠানগুলোকে ব্যবহার করে বিরোধীদের ওপর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছে।
দলটি দাবি করেছে, খাইবার পাখতুনখোয়ায় (কেপি) তাদের নেতাদের বন্দুকের মুখে অপহরণ করা হচ্ছে এবং আরও কয়েকজনকে অপহরণের চেষ্টা করা হয়েছে।
ইমরান খানের মুক্তির দাবিতে আগামী ২৭ সেপ্টেম্বর দেশব্যাপী বিক্ষোভের ডাক দিয়েছে পিটিআই। দলটি জানিয়েছে, ‘যেকোনো মূল্যে’ ইমরান খানকে মুক্ত করার দাবিতে এই কর্মসূচি পালন করা হবে। এর আগে লাহোরে ইমরানের তিন বোন আলিমা খান, নুরিন নিয়াজি ও ডা. উজমা খানকে আটক করা হয়েছে। তাদের ৩০ দিনের জন্য আটকাদেশ দেয়া হয়েছে বলে পাকিস্তানের সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে।
‘অপহরণের’ অভিযোগ
পিটিআইয়ের অভিযোগ, দলটির আরও দুই নেতা কেপি সরকারের মন্ত্রী ফজল শাকুর খান এবং সাবেক প্রাদেশিক মন্ত্রী শাকিল আহমেদ সাম্প্রতিক সময়ে একই ধরনের ঘটনার শিকার হয়েছেন।
কেপি প্রাদেশিক পরিষদের অধিবেশনে দেয়া বক্তব্যে স্পিকার বাবর সেলিম স্বাতি অভিযোগ করেন, জনস্বাস্থ্য প্রকৌশলমন্ত্রী ফজল শাকুর খানকে পেশোয়ারে সড়কের মাঝ থেকে মুখোশধারী ব্যক্তিরা তুলে নিয়ে গেছে। একই সময়ে মালাকান্দে মন্ত্রী শাকিল খানকে অপহরণের চেষ্টা ব্যর্থ করা হয়েছে বলেও তিনি দাবি করেন।
স্বাতি বলেন, মুখোশধারী ব্যক্তিরা গুলি করে মানুষকে অপহরণ করছে- এটি সংশ্লিষ্ট ‘প্রতিষ্ঠানগুলোর’ কার্যক্রম নিয়ে বড় প্রশ্ন তৈরি করে। কেপি পুলিশের বিরুদ্ধেও তিনি অভিযোগ করেন, তারা ‘এজেন্সিগুলোর’ ‘বি-টিম’ হিসেবে কাজ করছে।
ফজল শাকুর খানকে সোমবার পেশোয়ারের মোটরওয়ে টোল প্লাজা এলাকা থেকে অপহরণ করা হয়েছে বলে পিটিআই দাবি করেছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওতে মুখোশধারী কয়েকজন ব্যক্তিকে মহাসড়কে ব্যারিকেড তৈরি করতে দেখা গেছে। পিটিআইয়ের দাবি, তারা মন্ত্রীর গাড়ির টায়ার লক্ষ্য করে গুলি চালিয়ে গাড়িটি থামতে বাধ্য করে। এরপর মন্ত্রীকে গাড়ি থেকে বের করে অজ্ঞাত স্থানে নিয়ে যাওয়া হয়।
এদিকে কেপির আইনমন্ত্রী আফতাব আলম আফ্রিদি বলেন, মালাকান্দে মন্ত্রী শাকিল খানকেও অনুসরণ করে হামলা করা হয়েছে। তার নিরাপত্তারক্ষীরা পাল্টা গুলি চালালেও পরে মন্ত্রীর বিরুদ্ধেই এফআইআর করা হয়েছে।
এ ঘটনায় পুলিশের পক্ষ থেকেও শাকিল আহমেদের বিরুদ্ধে গুলি চালানোর অভিযোগ আনা হয়েছে। শাকিল আহমেদ অবশ্য ভিন্ন বর্ণনা দিয়ে অজ্ঞাতপরিচয় সশস্ত্র ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে মামলা করার আবেদন করেছেন।
আফতাব আলম অভিযোগ করেন, এসব ঘটনার মাধ্যমে কেপির প্রাদেশিক মন্ত্রিসভাকে বার্তা দেয়া হচ্ছে যে পিটিআইয়ের কোনো রাজনৈতিক অবস্থান নেই।
‘মানবিক সংকটের’ প্রস্তুতি
২৭ সেপ্টেম্বরের বিক্ষোভকে সামনে রেখে পাকিস্তানে পিটিআইয়ের নির্বাচিত নেতা-কর্মীদের গ্রেপ্তার এবং দলীয় কার্যালয়ে অভিযান চালানোর ঘটনাও ঘটছে বলে দলটি অভিযোগ করেছে।
একই সময়ে ইসলামাবাদের হাসপাতালগুলোকে জরুরি প্রস্তুতি নেয়ার নির্দেশ দেয়া হয়েছে বলে একটি প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। হাসপাতালগুলোকে সম্ভাব্য ‘মানবিক সংকট’ এবং ‘গণহতাহতের ঘটনা’র জন্য প্রস্তুত থাকতে বলা হয়েছে।
এরই মধ্যে ইসলামাবাদের কয়েকটি হাসপাতালে অস্ত্রোপচারের জন্য নির্ধারিত রোগীদের জানানো হয়েছে, তাদের চিকিৎসা কার্যক্রম পিছিয়ে দেয়া হতে পারে। এসব নির্দেশনার কারণে পিটিআই আশঙ্কা করছে, বিক্ষোভ দমনে ব্যাপক অভিযান চালানো হতে পারে।
তবে এতকিছুর পরেও ২৭ সেপ্টেম্বরের বিক্ষোভ কর্মসূচি থেকে সরে আসেনি পিটিআই। কেপির মুখ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ সোহেল আফ্রিদি জানিয়েছেন, আগামী ২৫ সেপ্টেম্বর বিক্ষোভের বিস্তারিত কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে এবং সারা দেশে দলীয় নেতা-কর্মীদের সংগঠিত করা হবে।
৭৩ বছর বয়সী ইমরান খান ২০২৩ সাল থেকে কারাগারে রয়েছেন। বর্তমানে তিনি রাওয়ালপিন্ডির উচ্চনিরাপত্তার আদিয়ালা কারাগারে বন্দি।
পেশোয়ারে এক সংবাদ সম্মেলনে আফ্রিদি বলেন, বিক্ষোভের আগেই পিটিআইয়ের প্রাদেশিক মন্ত্রী ও আইনপ্রণেতাদের গ্রেপ্তার শুরু হয়েছে। এ কারণে দলের সংসদীয় দলের জরুরি বৈঠকও ডাকা হয়েছে।
তিনি বলেন, ইমরানের সঙ্গে সাক্ষাতের জন্য পিটিআই ‘সব সাংবিধানিক ও গণতান্ত্রিক পথ’ অনুসরণ করেছে। আদালতের নির্দেশ থাকা সত্ত্বেও তাদের ইমরানের সঙ্গে দেখা করতে দেয়া হচ্ছে না।
আফ্রিদি বলেন, পিটিআই কোনো সংঘাত চায় না এবং শান্তিপূর্ণ ও গণতান্ত্রিক উপায়ে তাদের দাবি আদায়ের চেষ্টা করবে। বিক্ষোভে দলীয় কর্মীরা কোনো অস্ত্র বহন করবেন না বলেও তিনি জানান।
তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, বিক্ষোভ চলাকালে যদি গুলি চালানো হয়, তাহলে তার পাল্টা প্রতিক্রিয়া হতে পারে। তার অভিযোগ, বর্তমান পরিস্থিতি পাকিস্তানকে ‘গৃহযুদ্ধের’ দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
