স্ত্রীর মৃত্যুর তদন্ত বদলাতে বাংলাদেশে ৯০ হাজার ডলার পাঠানোর অভিযোগ, অস্ট্রেলিয়ায় স্বামী গ্রেপ্তার

স্ত্রীর মৃত্যুর তদন্ত বদলাতে বাংলাদেশে ৯০ হাজার ডলার পাঠানোর অভিযোগ, অস্ট্রেলিয়ায় স্বামী গ্রেপ্তার

ফন্ট সাইজ:

বাংলাদেশে রহস্যজনকভাবে মারা যাওয়া বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত অস্ট্রেলিয়ান নাগরিক রেহানা পারভীনের মৃত্যুর তদন্তে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করা হয়েছিল—এমন অভিযোগে তার স্বামী আওলাদ হোসেনকে গ্রেপ্তার করেছে অস্ট্রেলিয়ান ফেডারেল পুলিশ। মঙ্গলবার তাকে গ্রেপ্তার করা হয়।

তদন্তকারী কর্মকর্তাদের দাবি, অস্ট্রেলিয়ার কুইন্সল্যান্ডে বসবাসরত ৫১ বছর বয়সী আওলাদ হোসেন বাংলাদেশে থাকা কয়েকজন ব্যক্তির সঙ্গে যোগাযোগ রেখে ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত প্রায় ৯০ হাজার অস্ট্রেলিয়ান ডলার পাঠানোর ব্যবস্থা করেন। ওই অর্থের একটি অংশ বাংলাদেশি সরকারি কর্মকর্তাদের ঘুষ দেয়ার উদ্দেশ্যে পাঠানো হয়েছিল বলে অভিযোগ করেছে অস্ট্রেলিয়ান ফেডারেল পুলিশ(এএফপি)।
এএফপি বলছে, বাংলাদেশে পরিচিত কয়েকজনের কাছে দুই বছর ধরে ওই অর্থ পাঠানো হয়। এই ঘটনায় আওলাদ হোসেনের বিরুদ্ধে বিদেশি(বাংলাদেশ) সরকারি কর্মকর্তাকে ঘুষ দেয়ার অভিযোগ আনা হয়েছে। অভিযোগ প্রমাণিত হলে তার সর্বোচ্চ ১০ বছরের কারাদণ্ড হতে পারে। তবে এখনো আদালতে অভিযোগের বিচার শুরু হয়নি । আওলাদ তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।

আওলাদকে গ্রেপ্তারের পর গুডনা ও রেডব্যাংক প্লেইনস এলাকায় তার দুটি বাড়িতে অভিযান চালিয়ে একটি ইলেকট্রনিক ডিভাইস জব্দ করা হয়। পাশাপাশি সিডনি ও ব্রিসবেনের কয়েকটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানে তল্লাশি চালানো হয়। আন্তর্জাতিক অর্থ স্থানান্তর ও ব্যাংকিং সংক্রান্ত নথি জব্দ করেন তদন্তকারীরা।

বাংলাদেশে মিলেছিল স্ত্রীর মরদেহ

আওলাদ হোসেনের স্ত্রী রেহানা পারভিন পাঁচ সন্তানের মা এবং অস্ট্রেলিয়ার নাগরিক ছিলেন। ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর মাসে বাংলাদেশের প্রত্যন্ত গ্রামের একটি স্থানে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
বাংলাদেশে এর তদন্ত শুরু হয়। রেহানা পারভিনের মৃত্যুর ঘটনায় বাংলাদেশ পুলিশ আওলাদ হোসেনের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানাও জারি করে তখন। তবে এখন পর্যন্ত বাংলাদেশ কিংবা অস্ট্রেলিয়া—কোনো দেশেই তার বিরুদ্ধে স্ত্রীকে হত্যার অভিযোগে আনুষ্ঠানিক চার্জ গঠন করা হয়নি। ঘটনাটি নিয়ে দুটি পৃথক তদন্ত চলছে। একটি বাংলাদেশ পুলিশের এবং অন্যটি এএফপির।

‘পুলিশকে দেয়ার জন্য ছিল কিছু অর্থ’

এএফপি কমান্ডার স্টিফেন জে জানিয়েছেন, পুলিশের অভিযোগ অনুযায়ী, বাংলাদেশে চলমান তদন্তকে প্রভাবিত করতে আওলাদ হোসেন অর্থ পাঠিয়েছিলেন।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, পাঠানো অর্থের একটি অংশ বাংলাদেশি পুলিশের জন্য নির্ধারিত ছিল। তবে এখন পর্যন্ত কোনো বাংলাদেশি পুলিশ কর্মকর্তাকে ওই অর্থ দেয়া হয়েছে কিংবা অর্থের বিনিময়ে তদন্তের কোনো কার্যক্রম প্রভাবিত হয়েছে—এমন কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
কমান্ডার জে বলেন, বাংলাদেশি কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে আমরা যে চমৎকার সহযোগিতা পেয়েছি, আমরা সন্তুষ্ট।

ঘুষের অভিযোগ কীভাবে সামনে এলো?

এএফপি জানিয়েছে, রেহানা পারভিনের মৃত্যুর তদন্ত করতে গিয়ে কথিত অর্থ লেনদেনের বিষয়টি তদন্তকারীদের নজরে আসে। এরপর অর্থ স্থানান্তর ও সংশ্লিষ্ট নথিপত্র খতিয়ে দেখে ঘুষ দেয়ার অভিযোগ আনা হয়।
কমান্ডার স্টিফেন জে বলেন, রেহানা পারভিনের মৃত্যুর তদন্তের সঙ্গে এসব অভিযোগ প্রাসঙ্গিক’। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, হত্যাকাণ্ডের তদন্তও দ্রুত এগিয়ে চলছে। রেহানার পরিবার ও বন্ধুরা যখন ঘটনার কারণ ও উত্তর খুঁজছেন, তখন আমাদের সহানুভূতি ও চিন্তাজুড়ে তারাই রয়েছেন।

‘অভিযোগ অস্বীকার করেছেন আওলাদ’

এদিকে আওলাদ হোসেনের আইনজীবী তরিক দিব জানিয়েছেন, তার মক্কেল তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। আদালতে আইনি লড়াই চালিয়ে যেতে চান।
গণমাধ্যমকে তিনি বলেন, মামলাটি চলমান থাকা অবস্থায় আওলাদের পক্ষে জামিনের আবেদন করা হবে।
আইনজীবীর দাবি, রাষ্ট্রপক্ষের মামলায় প্রমাণের ঘাটতি রয়েছে। আদালতের যথাযথ যাচাই-বাছাই ও পর্যালোচনার মাধ্যমেই বিষয়টির নিষ্পত্তি হওয়া উচিত।
আওলাদ হোসেন বর্তমানে অস্ট্রেলিয়ায় ব্রিসবেনে পুলিশি হেফাজতে রয়েছেন। শুনানি মুলতবি হওয়ার পর তার জামিনের আবেদন করার কথা রয়েছে।

বিদেশি ঘুষের অভিযোগে এএফপির প্রথম মামলা

এএফপির দাবি, ব্যক্তিগত সুবিধা অর্জনের উদ্দেশ্যে কোনো বিদেশি সরকারি কর্মকর্তাকে ঘুষ দেয়ার অভিযোগে আদালতে মামলা করার ঘটনা সংস্থাটির জন্য এটিই প্রথম।
কমান্ডার স্টিফেন জে সতর্ক করে বলেন, বিদেশি সরকারি কর্মকর্তাকে ঘুষ দেয়ার চেষ্টার প্রমাণ পাওয়া গেলে অস্ট্রেলিয়ায় তদন্ত ও আইনি ব্যবস্থা নেয়া হতে পারে। অভিযোগ প্রমাণিত হলে দীর্ঘ মেয়াদি কারাদণ্ডের ঝুঁকি রয়েছে। তবে এই মামলায় এখন পর্যন্ত বাংলাদেশি কোনো সরকারি কর্মকর্তা ঘুষ গ্রহণ করেছেন—এমন প্রমাণ পাওয়ার কথা এএফপি জানায়নি।

হত্যা মামলায় অস্ট্রেলিয়ার ভূমিকা কতটা?

আওলাদ হোসেনকে তার স্ত্রীর মৃত্যুর ঘটনায় অস্ট্রেলিয়ায় হত্যা মামলায় অভিযুক্ত করা হবে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে কমান্ডার জে বলেন, বিষয়টি বিদেশে একজন অস্ট্রেলিয়ান নাগরিকের ক্ষতিসাধনের সঙ্গে সম্পর্কিত।
তিনি জানান, বাংলাদেশে রেহানা পারভিনের মৃত্যুর তদন্ত এখনো চলমান। অর্থাৎ, বিদেশি ঘুষের অভিযোগে অস্ট্রেলিয়ায় আওলাদ হোসেনের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ নেয়া হলেও রেহানা পারভিনের মৃত্যুর ঘটনায় তার বিরুদ্ধে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক হত্যার অভিযোগ আনা হয়নি।

উল্লেখ্য, বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত অস্ট্রেলীয় নাগরিক রেহানা স্বামী আওলাদ হোসেন ও সন্তানদের নিয়ে অস্ট্রেলিয়ায় বসবাস করছিলেন। ২০২৪ সালের ৬ জুন কিশোরী মেয়েকে নিয়ে বাংলাদেশে যান রেহানা। তিনি তার বাবার বাড়ি ও শ্বশুরবাড়িসহ স্বজনদের বাড়িতে ছিলেন। তার স্বামী আওলাদ হোসেন ২৯ জুন বাংলাদেশে যান। তথ্য অনুযায়ী, সেখানে থাকাকালীন ২০২৪ সালের ৪ জুলাই থেকে নিখোঁজ হন রেহানা। পরে রেহানার মা আইরিন আক্তার ৩১ আগস্ট ঢাকার নবাবগঞ্জ থানায় সাধারণ ডায়েরি করেন। একই সময়ে অস্ট্রেলিয়ান ফেডারেল পুলিশ ও ঢাকায় অস্ট্রেলিয়ান হাইকমিশনের পক্ষ থেকেও ইন্টারপোলের মাধ্যমে বাংলাদেশ পুলিশ সদর দপ্তরে রেহানার বিষয়ে তথ্য চাওয়া হয়। ৮ সেপ্টেম্বর রেহানার মা বাদী হয়ে নবাবগঞ্জ থানায় অপহরণ ও নারী-শিশু নির্যাতন দমন আইনে মামলা করেন। মামলায় চারজনের বিরুদ্ধে রেহানাকে অপহরণের অভিযোগ করা হয়। তাদের মধ্যে স্বামী আওলাদ হোসেনও ছিলেন। পরে তদন্তে আরো একজনের নাম আসে।

রেহানার ননদ পাপিয়া আক্তার ও আমজাদ হোসেনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। তাদের জিজ্ঞাসাবাদ এবং তথ্যের সূত্র ধরে ১২ সেপ্টেম্বর সাভারের আশুলিয়ার নয়াহাট মৌনদিয়া চৌরাপাড়া এলাকায় পাপিয়ার বাড়ির আঙিনা থেকে রেহানার মরদেহ উদ্ধার করা হয়। মাটির নিচে মরদেহটি পুঁতে রাখা হয়েছিল। বাংলাদেশে চলমান মামলার তদন্ত কর্মকর্তা তখন অস্ট্রেলিয়ার এবিসিকে জানান, পুলিশের তদন্ত অনুযায়ী ৫ জুলাই রাত আটটা থেকে দশটার মধ্যে পাপিয়ার বাড়িতে রেহানাকে হত্যা করা হয়। প্রাথমিক তদন্তে, বালিশ দিয়ে মুখ চেপে তাকে হত্যা করার বিষয়সহ ঘটনার সময় রেহানার স্বামী আওলাদ বাংলাদেশেই অবস্থান কছিলেন বলে জানা যায়। পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, ২৯ জুন বাংলাদেশে গিয়েছিলেন অাওলাদ। ১৩ জুলাই অস্ট্রেলিয়ায় ফিরে আসেন।