ফরাসি রাষ্ট্রদূত

দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে চাপ প্রয়োগের নীতি অনুসরণ করে না ফ্রান্স

ফন্ট সাইজ:

দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে চাপ প্রয়োগের নীতি অনুসরণ করে না ফ্রান্স। বাংলাদেশকে কোনো সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষেত্রে চাপ দেয়ার পরিবর্তে অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে কাজ করতে চায় দেশটি। ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে বাংলাদেশকে কোনো একটি পক্ষ বেছে নিতে হলেও চাপ দেবে না ফ্রান্স। বরং ঢাকা তার প্রয়োজন ও স্বার্থ অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নিতে পারবে বলে মন্তব্য করেছেন ঢাকায় নিযুক্ত ফ্রান্সের রাষ্ট্রদূত জ্যঁ-মার্ক সেরে-শার্লে।

তিনি বলেছেন, ফ্রান্স অংশীদারিত্বে বিশ্বাস করে, কাউকে বাদ দিয়ে নয়। ওয়াশিংটনের সঙ্গে ফ্রান্সের দীর্ঘদিনের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রয়েছে। ফলে বাংলাদেশকে কখনোই বলা হবে না–ইউরোপ বা যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে যেকোনো একজনকে বেছে নিতে হবে।

মঙ্গলবার জাতীয় প্রেস ক্লাবে ডিপ্লোম্যাটিক করেসপন্ডেন্টস অ্যাসোসিয়েশন, বাংলাদেশ (ডিক্যাব) আয়োজিত ডিক্যাব টকে এক প্রশ্নের জবাবে এসব কথা বলেন ফরাসি রাষ্ট্রদূত।
বাংলাদেশের কৌশলগত অর্থনৈতিক স্বায়ত্তশাসন নিয়ে এক প্রশ্নের জবাবে রাষ্ট্রদূত বলেন, ব্রাসেলস বনাম ওয়াশিংটন–এভাবে তিনি বিষয়টি কখনো বলেননি। কোনো কোনো দেশ নিজেদের সিদ্ধান্ত অন্যদের ওপর চাপিয়ে দেয়ার চেষ্টা করতে পারে। তবে বাংলাদেশের সিদ্ধান্ত বাংলাদেশেরই নেয়া উচিত।
তিনি বলেন, বাংলাদেশকে কখনোই ওয়াশিংটন ও ব্রাসেলসের মধ্যে কোনো একটিকে বেছে নিতে হবে না। ব্রাসেলস সবসময় আলোচনার জন্য উন্মুক্ত। এর অর্থ এই নয় যে ইউরোপ বাংলাদেশের সব সিদ্ধান্ত মেনে নেবে। তবে এমন কোনো শর্ত দেয়া হবে না, যেখানে ওয়াশিংটনের বিপরীতে ব্রাসেলসকে বেছে নিতে হয়।
রাষ্ট্রদূত বলেন, আমরা ওয়াশিংটনের সঙ্গে একসঙ্গে কাজ করি। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ফ্রান্সের সম্পর্কের প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, তিনি ফ্রান্সের ভার্সাই শহরের মানুষ। ১৭৮৩ সালের ভার্সাই চুক্তির মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র স্বাধীনতা লাভ করে। যুক্তরাষ্ট্র স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশের আগেই ফ্রান্স তাদের বন্ধু ছিল। ফলে আমেরিকার সঙ্গে ফ্রান্সের বন্ধুত্ব অনেক পুরোনো।
এয়ারবাস কেনার ক্ষেত্রে ইউরোপীয় ইউনিয়নের পক্ষ থেকে সমান সুযোগ বা লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড-এর দাবি নিয়েও কথা বলেন ফরাসি রাষ্ট্রদূত। তিনি বলেন, সমান সুযোগ একটি সহজ ও পরিষ্কার ধারণা। বাংলাদেশে এমন ৬১টি ক্ষেত্র চিহ্নিত করা হয়েছে, যেখানে স্বচ্ছতার ঘাটতি রয়েছে। এসব বিষয় নিয়ে কাজ করার প্রতিশ্রুতি রয়েছে।
তিনি বলেন, সিদ্ধান্ত সবসময় বাংলাদেশের নেয়া উচিত। ফ্রান্স চায় তাদের প্রতিষ্ঠানগুলো যেন ন্যায্য ও সমান প্রতিযোগিতার সুযোগ পায়। মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি বা এফটিএ নিয়েও ইউরোপ আলোচনা করতে প্রস্তুত।
এয়ারবাস কেনার বিষয়ে চাপ দেয়ার অভিযোগ প্রসঙ্গে রাষ্ট্রদূত বলেন, বাংলাদেশের কোনো মন্ত্রীকে তিনি কখনো বলেননি, আপনারা আগামীকালের মধ্যে এয়ারবাস না কিনলে আমরা পদক্ষেপ নেব। ফ্রান্স এভাবে কাজ করে না। তারা সত্যিকারের অংশীদারিত্বে বিশ্বাস করে।
বাংলাদেশের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি অংশীদারিত্বের ওপর গুরুত্ব দিয়ে তিনি বলেন, জোর করে কোনো কিছু একবারে চাপিয়ে দেয়া যায় না। ইউরোপের কাজের পদ্ধতিই হলো অংশীদারত্বের ভিত্তিতে এগিয়ে যাওয়া।
বাংলাদেশ-ইউরোপ সম্পর্ক আরও গভীর করার প্রয়োজনীয়তার কথাও বলেন জ্যঁ-মার্ক সেরে-শার্লে। তিনি বলেন, বাংলাদেশে মাত্র সাতটি ইউরোপীয় দেশের পূর্ণাঙ্গ দূতাবাস রয়েছে। বাকি ২০টি ইউরোপীয় দেশের ঢাকায় পূর্ণাঙ্গ দূতাবাস নেই। ফলে এসব দেশের অনেকেই বাংলাদেশে কী ঘটছে সে সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা রাখে না। এ কারণে তারা বাংলাদেশে নতুন করে যুক্ত হওয়ার বিষয়ে দ্বিধায় থাকতে পারে।
রাষ্ট্রদূত বলেন, এটি বাংলাদেশকে শাস্তি দেয়া বা ভয় দেখানোর বিষয় নয়। বরং এসব দেশের অনেকেই বাংলাদেশে নিজেদের স্বার্থ দেখতে পাচ্ছে না।
বাংলাদেশকে ইউরোপের কাছে আরও পরিচিত করার প্রয়োজনীয়তার কথাও বলেন তিনি। একই সঙ্গে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের আরও বেশি ফ্রান্সে যাওয়ার এবং ফরাসি শিক্ষার্থীদের বাংলাদেশে আসার ওপর গুরুত্ব দেন।
ফ্রান্সের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কের ভবিষ্যৎ নিয়ে রাষ্ট্রদূত বলেন, দুই দেশকে একে অপরকে আরও ভালোভাবে জানতে হবে। বাংলাদেশ যদি ইউরোপের সঙ্গে সম্পর্ক আরও গভীর করতে চায়, তাহলে দীর্ঘমেয়াদি অংশীদারত্বের আগ্রহ দেখাতে হবে।
মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, ইউরোপ এরই মধ্যে ভিয়েতনাম, ভারত, অস্ট্রেলিয়া ও কানাডার মতো বিভিন্ন দেশের সঙ্গে এ ধরনের চুক্তি করেছে। বাংলাদেশ ইউরোপের সঙ্গে সম্পর্ক আরও গভীর করতে চাইলে দীর্ঘমেয়াদি অংশীদারত্বের আগ্রহ দেখাতে হবে।
এয়ারবাসের বিষয়টিকেও এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ বলে উল্লেখ করেন তিনি। তার মতে, এয়ারবাস কেনা ইউরোপের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটি বড় সুযোগ এবং সদিচ্ছার ইঙ্গিত হতে পারে। বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের অর্ধেকের বেশি ইউরোপে রপ্তানি হয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, এই সম্পর্কের ক্ষেত্রে বাংলাদেশেরও বড় স্বার্থ রয়েছে।
সংস্কার ও গণতান্ত্রিক রূপান্তর নিয়েও কথা বলেন ফরাসি রাষ্ট্রদূত। তিনি বলেন, বাংলাদেশের জনগণ তাদের প্রতিষ্ঠান ও ব্যবস্থায় পরিবর্তন আনতে চায়– ফ্রান্স বিষয়টিকে ইতিবাচকভাবে দেখছে। এই প্রক্রিয়ায় সহযোগিতা এবং নিজেদের অভিজ্ঞতা ও জ্ঞান ভাগ করে নিতে প্রস্তুত তারা।
তবে সরকারের পদক্ষেপ নিয়ে প্রকাশ্যে সমালোচনা বা মন্তব্য না করার নীতির কথা জানান তিনি। বলেন, মন্ত্রীদের সঙ্গে ব্যক্তিগত বৈঠকে তারা নিজেদের অভিজ্ঞতা ও মতামত খোলাখুলিভাবে শেয়ার করেন। একে অপরকে সহযোগিতা করার মনোভাব নিয়েই কাজ করছে দুই দেশ।
বাংলাদেশের প্রস্তাবিত উচ্চকক্ষ নিয়েও ফরাসি সহযোগিতার আগ্রহের কথা জানান রাষ্ট্রদূত। সম্প্রতি বাংলাদেশ সফর করা ফরাসি সিনেটরদের সঙ্গে এ বিষয়ে আলোচনা হয়েছে বলে জানান তিনি। ফ্রান্সের দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদব্যবস্থা কীভাবে কাজ করে, তা বোঝাতে বিশেষজ্ঞ পাঠানোর প্রস্তাব দেয়া হয়েছে বলেও জানান।
রোহিঙ্গা সংকট প্রসঙ্গে রাষ্ট্রদূত বলেন, ফ্রান্স জাতিসংঘের মাধ্যমে রোহিঙ্গা তহবিলে নতুন অর্থ সহায়তার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। বাংলাদেশের পক্ষে একা এই সংকটের সমাধান সম্ভব নয় উল্লেখ করে তিনি রাজনৈতিক ও আর্থিকভাবে সহযোগিতা অব্যাহত রাখার কথা জানান।
তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নিউ ইয়র্কে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের ফাঁকে রোহিঙ্গা সংকটের বিষয়টি তুলবেন। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে এ বিষয়ে আরও সোচ্চার করার এই উদ্যোগকে যথাযথ বলেও মন্তব্য করেন ফরাসি রাষ্ট্রদূত।