বন্যায় নেপালে ‘এতিম’ ৫ শতাধিক শিশু, অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ

বন্যায় নেপালে ‘এতিম’ ৫ শতাধিক শিশু, অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ

ফন্ট সাইজ:

ভয়াবহ ভূমিধস, বন্যায় নেপালে কমপক্ষে ৫০০ শিশু এতিম হয়েছে। এসব শিশুর ভবিষ্যত এখন অনিশ্চিত। এ খবর দিয়েছে অনলাইন আল জাজিরা। ওই শিশুদের মধ্যে আছে নয় বছর বয়সী রাম ঠাকুর। সে তার পরিবারের সবাইকে হারিয়েছে। ২৬ আগস্টের ওই বন্যার পর প্রায় চার সপ্তাহ হতে চললেও রাম এখনো অপেক্ষা করছে। আশা ছাড়তে পারছে না। ভাবছে তার মা-বাবা ফিরে আসবেন।

বর্তমানে নেপালের নুওয়াকোট জেলার একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়কে অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্রে পরিণত করা হয়েছে। সেখানেই আরও ২৬ শিশুর সঙ্গে থাকে রাম। বন্যাকবলিত বিভিন্ন জেলার অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে থাকা ৫ শতাধিক শিশুর মধ্যে আছে তারাও। এসব শিশুর কারও বাবা-মা মারা গেছেন, আবার কারও নিখোঁজ।

নেপালের আইন অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তিকে মৃত ঘোষণা করার আগে তাকে ১২ বছর নিখোঁজ থাকতে হয়। তবে দুর্যোগের ক্ষেত্রে এই নিয়মে ছাড় রয়েছে। সেক্ষেত্রে স্বজনদের জেলা আদালতে আবেদন করে তথাকথিত বিচারিকভাবে মৃত্যুর ঘোষণা নিতে হয়। তাই আপাতত রাম ও অন্য শিশুরা এক ধরনের অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছে। আইনগতভাবে তারা এখনো এতিম নয়। কিন্তু বাস্তবে তারা বাবা-মাকে হারিয়েছে।

২৬ আগস্টের সকালটি রামের কাছে অন্য যেকোনো স্কুল দিনের মতোই শুরু হয়। সকাল প্রায় ৮টার দিকে সে মায়ের সঙ্গে স্কুলে যাচ্ছিল। তখনই বিপর্যয় আঘাত হানে। রামের বাবা একজন গাইড ও গাড়িচালক হিসেবে কাজ করতেন। তার কাজ শুরু হতো সকাল ১০টায়। তাই তিনি তখন বাড়িতেই ছিলেন। হঠাৎ তারা মানুষের চিৎকার শুনতে পান- দৌড়াও, বন্যা! রাম ও তার মা হাঁটলেন, পাহাড়ে উঠলেন এবং দৌড়ালেন। একপর্যায়ে মায়ের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় রাম। এরপর আরও ১৩ জনের সঙ্গে একটি পাহাড়ে এক দিন আটকে ছিল সে। পরে সেনাবাহিনীর একটি হেলিকপ্টার তাদের উদ্ধার করে।

রাম বলে, আমি খুব ভয় পেয়েছিলাম এবং ক্ষুধার্ত ছিলাম। মনে হয়েছিল আমিও মারা যাব। আমার স্কুলব্যাগটিও বন্যায় ভেসে গেছে। ব্যাগে বিস্কুট ও খাবারের বাক্স ছিল। আশ্রয়কেন্দ্রে থাকা আরও ২৬ শিশুর সঙ্গে বসে ডাল, ভাত ও শাক খাওয়ার সময় রাম জানায়, তার মা-বাবা এখনো তাকে খুঁজতে আসেননি কেন, তা সে বুঝতে পারছে না। সে বলে, মা আর বাবা সাঁতার জানতেন। তাই এত দিনে তো তাদের ফিরে আসার কথা।

সেখানে থাকা একজন পরামর্শদাতা জানান, কাছাকাছি কোনো হেলিকপ্টার উড়তে দেখলেই রাম এখনো বাইরে ছুটে যায়। তার আশা, হয়তো তার মা-বাবাকে উদ্ধার করা হয়েছে এবং তারা হেলিকপ্টারে করে ফিরে আসছেন। নেপালের ন্যাশনাল চাইল্ড রাইটস কাউন্সিল এবং বেসরকারি সংস্থা সেভ দ্য চিলড্রেনের এ মাসের বন্যাপরবর্তী মূল্যায়নে দেখা গেছে, অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে ১ হাজারের বেশি শিশু রয়েছে। এর মধ্যে শতাধিক শিশুর সঙ্গে কোনো স্বজন নেই। আরও ৪৩৯ শিশু বাবা-মাকে ছাড়া থাকলেও তাদের সঙ্গে অন্য স্বজন আছেন। নেপালে সেভ দ্য চিলড্রেনের কর্মসূচি পরিচালক আয়ুশ যোশি আল জাজিরাকে এ তথ্য জানিয়েছেন।

সব মিলিয়ে বন্যায় ৩২ হাজারের বেশি শিশু বাস্তুচ্যুত হয়েছে। তাদের পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ ও পুনর্মিলনের জন্য সরকারি কর্মকর্তা ও বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থা কাজ করছে বলে জানিয়েছেন ইউনিসেফ নেপালের শিশু সুরক্ষা বিভাগের দায়িত্বে থাকা লিওন মুওনি। এ পর্যন্ত ১৮ শিশুকে তাদের বাবা-মায়ের সঙ্গে পুনর্মিলন করা সম্ভব হয়েছে বলে আল জাজিরাকে জানিয়েছেন মুওনি।

রাম যে আশ্রয়কেন্দ্রে আছে, সেখানে আটটি কক্ষ। এর মধ্যে ছয়টি কক্ষ স্থানীয় বেসরকারি সংস্থাগুলো শিশুদের থাকার জন্য প্রস্তুত করেছে। সেখানে জলরোধী মাদুর, বিছানার সরঞ্জাম ও নরম খেলনা রাখা হয়েছে। শিশুদের জন্য কর্মীরা বাঙ্ক বেড তৈরি করছেন। সপ্তম কক্ষটি খাদ্যসামগ্রী রাখার গুদাম হিসেবে এবং অষ্টমটি রান্নাঘর হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। দায়িত্বে থাকা অধিকাংশ কর্মী নেপাল পুলিশের সদস্য। বাকিরা বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থার প্রতিনিধি। শিশুদের সঙ্গে একজন পরামর্শদাতাও রয়েছেন। তাদের সবাই নারী।