অভিবাসন কমলে বাড়বে চাপ, ২০৬০-এর দশকে জন্মের চেয়ে মৃত্যু বেশি হতে পারে

বদলে যাচ্ছে অস্ট্রেলিয়ার জনমিতিক চিত্র

অভিবাসন কমলে বাড়বে চাপ, ২০৬০-এর দশকে জন্মের চেয়ে মৃত্যু বেশি হতে পারে

ফন্ট সাইজ:

অস্ট্রেলিয়ার জনসংখ্যার চিত্র আগামী কয়েক দশকে বড় ধরনের পরিবর্তনের মুখোমুখি হতে পারে। ২০৬০-এর দশকে দেশটিতে প্রথমবারের মতো প্রতিবছর জন্ম নেয়া মানুষের চেয়ে মৃত্যুর সংখ্যা বেশি হওয়ার পূর্বাভাস দেয়া হয়েছে। ফলে অভিবাসন অব্যাহত না থাকলে ওই সময় থেকে অস্ট্রেলিয়ার মোট জনসংখ্যা কমতে শুরু করতে পারে।
সর্বশেষ ইন্টারজেনারেশনাল প্রতিবেদন-এ অস্ট্রেলিয়ার দীর্ঘমেয়াদি জনসংখ্যা, অর্থনীতি ও সরকারি ব্যয়ের ওপর সম্ভাব্য প্রভাব তুলে ধরা হয়েছে। গতকাল সোমবার প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, কমে যাওয়া জন্মহার এবং মানুষের গড় আয়ু বেড়ে যাওয়ার কারণে দেশটির জনসংখ্যা দ্রুত বয়স্ক হয়ে উঠছে। এই প্রবণতায় অস্ট্রেলিয়া ভবিষ্যতে জাপান, ইতালি ও দক্ষিণ কোরিয়ার মতো উন্নত অর্থনীতির জনমিতিক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে পারে। এসব দেশে জন্ম ও মৃত্যুর স্বাভাবিক ব্যবধান জনসংখ্যা বৃদ্ধিতে আর ইতিবাচক ভূমিকা রাখছে না।

বাড়বে প্রবীণ মানুষের সংখ্যা

জনসংখ্যার বয়স কাঠামোর পরিবর্তনের ফলে অস্ট্রেলিয়ায় কর্মক্ষম মানুষের তুলনায় প্রবীণ মানুষের সংখ্যা বাড়বে। এ ধরনের পরিবর্তন পরিমাপের একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক হলো ‘ওল্ড এজ ডিপেনডেন্সি রেশিও’—অর্থাৎ কর্মক্ষম বয়সের মানুষের তুলনায় ৬৫ বছর বা তার বেশি বয়সী মানুষের অনুপাত। প্রবীণ মানুষের সংখ্যা বাড়ার অর্থ হলো তুলনামূলক কমসংখ্যক কর্মজীবী মানুষের ওপর অবসরপ্রাপ্ত জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্যসেবা, পরিচর্যা ও অন্যান্য সরকারি ব্যয়ের চাপ বাড়বে। বিশেষ করে ৮৫ বছর বা তার বেশি বয়সী মানুষের সংখ্যা আগামী কয়েক দশকে উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে বলে পূর্বাভাস দেয়া হয়েছে। এর ফলে স্বাস্থ্যসেবা ও এজড কেয়ার খাতে সরকারি ব্যয় আরও বাড়তে পারে।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, জনসংখ্যার এই পরিবর্তন দীর্ঘমেয়াদে সরকারি বাজেটের ওপর চাপ সৃষ্টি করবে। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য রাজস্ব ও সরকারি ব্যয়ের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখা তাই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।

অভিবাসন হবে গুরুত্বপূর্ণ

কম জন্মহারের প্রভাব সামাল দিতে অস্ট্রেলিয়ার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে অভিবাসনকে দেখা হচ্ছে।
অন্যান্য অনেক উন্নত অর্থনীতির তুলনায় অস্ট্রেলিয়ার জনসংখ্যা এখনো তুলনামূলকভাবে তরুণ। দক্ষ অভিবাসন কর্মক্ষম মানুষের সংখ্যা বাড়াতে এবং জনসংখ্যার বার্ধক্যের গতি কিছুটা কমাতে সাহায্য করছে।
ইন্টারজেনারেশনাল রিপোর্টে অনুযায়ী, জন্মহার কমে যাওয়ার কারণে আগামী কয়েক দশকে কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর বৃদ্ধি আগের পূর্বাভাসের তুলনায় ধীর হতে পারে। তবে অভিবাসনের কারণে কর্মক্ষম মানুষের সংখ্যা বাড়তে থাকার সম্ভাবনা রয়েছে।

স্বরাষ্ট্র বিভাগের সাবেক সচিব মাইক পেজুলো দীর্ঘমেয়াদে অস্ট্রেলিয়ার জনসংখ্যা কাঠামোর ভারসাম্য বজায় রাখতে বছরে প্রায় ২ লাখ ৩৫ হাজার মানুষের নিট বৈদেশিক অভিবাসনের প্রয়োজন হতে পারে বলে মন্তব্য করেছেন।

তার মতে, কর্মক্ষম মানুষের তুলনায় প্রবীণ মানুষের অনুপাত খুব বেশি বেড়ে গেলে সরকারি বাজেটের ওপর ব্যাপক চাপ তৈরি হতে পারে। সেই চাপ সীমিত রাখতে দীর্ঘ সময় ধরে পর্যাপ্ত নিট অভিবাসন প্রয়োজন হবে।

অভিবাসন কমানোর রাজনৈতিক চাপ

অস্ট্রেলিয়ায় অভিবাসনের মাত্রা নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্কও তীব্র হয়েছে। রাজনৈতিক দল 'ওয়ান নেশন' অভিবাসন উল্লেখযোগ্যভাবে কমানোর প্রস্তাব দিয়েছে। দলটির পরিকল্পনা অনুযায়ী প্রথম কয়েক বছর নিট অভিবাসন ঋণাত্মক করার পর বছরে প্রায় ১ লাখ ৩০ হাজার নিট বৈদেশিক অভিবাসনের সীমা নির্ধারণের প্রস্তাব রয়েছে।

অন্যদিকে ফেডারেল সরকারও অভিবাসনের চাপ কমানোর উদ্যোগ নিয়েছে। ২০২৭–২৮ অর্থবছরের মধ্যে নিট বৈদেশিক অভিবাসন ২ লাখ ২৫ হাজারে নামিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। সরকারের যুক্তির মধ্যে রয়েছে দ্রুত জনসংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে আবাসন নির্মাণ, অবকাঠামো ও জনসেবার সক্ষমতার মধ্যে ভারসাম্য তৈরি করা।

অস্ট্রেলিয়ার কোষাগার বিষয়ক মন্ত্রী জিম চালমার্স অস্ট্রেলিয়ার কমে যাওয়া জন্মহার নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেন, কয়েক বছর আগের তুলনায় জন্মহারে পরিবর্তন একটি গুরুত্বপূর্ণ জনমিতিক প্রবণতা হয়ে উঠেছে। তবে সরকার “জন্মহার আরও দ্রুত ও ব্যাপকভাবে কমে যাওয়ার” আশঙ্কা করলেও জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার মতো দেশগুলোর তুলনায় অস্ট্রেলিয়ায় মৃত্যুর সংখ্যা জন্মের সংখ্যাকে ছাড়িয়ে যাওয়ার পরিস্থিতি তৈরি হতে আরও কয়েক দশক সময় লাগবে।

তিনি আরও যোগ করেন, ওই দেশগুলোর অর্থনীতি সত্যিই বেশ ভালো।
অস্ট্রেলিয়ার সামনে তাই ধীরে ধীরে একটি নতুন জনমিতিক বাস্তবতা তৈরি হচ্ছে—জন্মহার কমছে, মানুষের আয়ু বাড়ছে এবং প্রবীণ জনগোষ্ঠীর সংখ্যা বাড়ছে। এই পরিবর্তনের প্রভাব সামাল দিতে অভিবাসন, কর্মশক্তি, স্বাস্থ্যসেবা এবং সরকারি ব্যয়ের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখা আগামী কয়েক দশকের অন্যতম বড় নীতিগত চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে।