যুক্তরাষ্ট্রে টিকে থাকতেই হিমশিম খাচ্ছেন ব্যবসায়ীরা। কেউ কেউ বলছেন, কোভিডের সময়কার চেয়েও বড় সংকটে তারা। এমনই ভয়াবহতার কথা জানিয়েছেন তারা। তাদের একজন উত্তর ক্যারোলাইনার র্যালিতে অবস্থিত ডিলওয়ার্থ কফির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা জেফ ভজতা। তিনি ২০২৪ সালে ব্রাজিলের ভয়াবহ কফি উৎপাদন পরিস্থিতির ধাক্কা সামলেছেন। এতে কফির ফিউচারসের দাম রেকর্ড উচ্চতায় উঠে যায়। পরের বছর প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের আরোপ করা বৈশ্বিক শুল্ক কফির দাম আরও বাড়িয়ে দেয়। এরপর এ বছর শুরু হয়েছে ইরান যুদ্ধ। তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে একটি সুপার এল নিনো। জাহাজ চলাচলে বিঘ্ন, কনটেইনারের ঘাটতি, লোহিত সাগরে যা ঘটছে তার কারণে উচ্চ পরিবহন ব্যয় এবং সার উৎপাদনের খরচ বেড়ে গেছে। ভজতা বলেন, সব মিলিয়ে আমরা এমন এক ধরনের অস্থিরতার সময় পার করছি, যার মুখোমুখি আগে কখনো হইনি। তিন দশকেরও বেশি সময় আগে তিনি জাতীয় পর্যায়ের এই কফি পরিবেশক প্রতিষ্ঠানটি প্রতিষ্ঠা করেন। এ খবর দিয়েছে অনলাইন সিএনএন।
যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে বিভিন্ন খাতের ব্যবসায়ীরাও প্রায় একই পরিস্থিতির কথা বলছেন। ইনস্টিটিউট ফর সাপ্লাই ম্যানেজমেন্টের (আইএসএম) মাসিক জরিপে এ মাসের শুরুতে এমন কিছু মন্তব্য উঠে আসে, যা ব্যবসায়ীদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি করেছে। কয়েকজন ব্যবসায়ী বর্তমান ব্যবসায়িক পরিস্থিতির সঙ্গে মহামারির সময়ের তুলনা করেছেন। তাদের বক্তব্য, কোভিডের সময় পরিস্থিতি বরং এর চেয়ে ভালো ছিল। ব্যাপক সরবরাহ ব্যবস্থা বিপর্যয় এবং পণ্যের দামের অস্থিতিশীলতা ব্যবসাগুলোকে এমন সব কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করছে, যার কোনো সহজ সমাধান নেই। কীভাবে পরিকল্পনা করবেন, ব্যবসায়ীরা তা বুঝতে পারছেন না। একই সময়ে মূল্যস্ফীতি নিয়ে উদ্বিগ্ন ক্রেতারা আর কোনো মূল্যবৃদ্ধি মেনে নেয়ার অবস্থায়ও নেই।
ডেনভার বিশ্ববিদ্যালয়ের সাপ্লাই চেইন কর্মসূচির পরিচালক জ্যাক বাফিংটন বলেন, এটি নিশ্চিতভাবেই কোভিডের চেয়েও বড় সমস্যা। এটি সম্পূর্ণ ভিন্ন ধরনের সংকট। এটি মূলত জ্বালানির সমস্যা। ট্রাম্প প্রশাসন ইরান যুদ্ধকে সাময়িক অর্থনৈতিক ধাক্কা হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করেছে। তাদের বক্তব্য, যুদ্ধ শেষ হলে মূল্যস্ফীতি দ্রুত কমে যাবে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের ব্যবসায়ীরা যে ঐতিহাসিক সরবরাহব্যবস্থা সংকটের মুখোমুখি হয়েছেন, তা দেখিয়ে দিচ্ছে কেন মূল্যস্ফীতির এই পুনরুত্থান সহজে কাটিয়ে ওঠা যাবে না। এমনকি যুদ্ধ যদি অলৌকিকভাবে আগামীকালই শেষ হয়ে যায়, তবুও না।
শ্রমিক দিবসে দেয়া এক ট্রুথ সোশ্যাল পোস্টে ট্রাম্প বলেন, ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ জিতে গেলে ‘তেলের দাম নাটকীয়ভাবে কমে যাবে’। তিনি বলেন, সবকিছু দ্রুতই ঘটবে। এর নজির অবশ্য রয়েছে। জুনের মাঝামাঝি যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান একটি সমঝোতা স্মারকে সই করার পর হরমুজ প্রণালি সাময়িকভাবে খুলে দেয়া হয়। তখন গ্যাসোলিনের দাম গ্যালনপ্রতি ৪ ডলারের নিচে নেমে যায় এবং তেলের দাম যুদ্ধ শুরুর আগের পর্যায়েরও নিচে চলে যায়। মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদের স্পিকার মাইক জনসন বুধবার এক সংবাদ ব্রিফিংয়ে বলেন, অবশ্যই গ্যাসের দাম অনেক বেশি। হরমুজ প্রণালির বিষয়টি যখন আমরা সমাধান করতে পারব, তখন এর ওপর সরাসরি প্রভাব পড়বে। কিন্তু জুনের পর পরিস্থিতি অনেক বদলে গেছে।
জ্বালানি ও পরিবহন ব্যয় বেড়ে যাওয়ার প্রভাব এখন অর্থনীতির অন্যান্য খাতেও ছড়িয়ে পড়তে শুরু করেছে। খাদ্য ও জ্বালানির মতো অস্থিতিশীল পণ্যের দাম বাদ দিয়ে হিসাব করা মূল মূল্যস্ফীতি গত মাসে এপ্রিলের পর সর্বোচ্চ হারে বেড়েছে। এর প্রভাব পরিষেবার দামেও দেখা যাচ্ছে—যেসব খাতে একবার দাম বাড়লে সাধারণত তা আবার কমে না। মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ তীব্র হওয়া এবং ইউক্রেনের রুশ তেল শোধনাগারগুলোতে অব্যাহত হামলার কারণে মার্চের তুলনায় ডিজেলের দাম দ্বিগুণ হয়েছে। তবে পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধির পেছনে আবহাওয়াজনিত সমস্যাও বড় ভূমিকা রাখছে। এর মধ্যে রয়েছে পরপর আঘাত হানা টাইফুন, যার কারণে বিশ্বের সবচেয়ে বড় কনটেইনার বন্দর সাংহাই কার্যত দুই সপ্তাহ বন্ধ ছিল। এর প্রভাব এখনো রয়েছে এবং পণ্য পরিবহনে বড় ধরনের বিলম্ব হচ্ছে।
