আট দফা দাবিতে ঢাকা থেকে রংপুরের উদ্দেশ্যে ১১ দলের লংমার্চে এক দফার আন্দোলনের হুঁশিয়ারি দিয়েছেন জামায়াতে ইসলামীর আমীর ও বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান। তিনি বলেছেন, জাতির প্রয়োজনে যেকোনো সময় আট দফা এক দফায় রূপ নিতে পারে এবং সে পরিস্থিতির জন্য জনগণকে প্রস্তুত থাকতে হবে। লংমার্চের বিভিন্ন পথসভায় সরকারকে দাবি মেনে নেয়ার আহ্বান জানান ১১ দলের নেতারা। গণভোটের রায় বাস্তবায়ন, জুলাই গণহত্যার বিচার, দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ, বিদ্যুৎ-গ্যাস সংকট নিরসন, দুর্নীতি-চাঁদাবাজি বন্ধসহ আট দফা দাবিতে ঢাকা থেকে রংপুর পর্যন্ত এই কর্মসূচি পালন করা হয়।
পথসভার অংশ হিসেবে গাজীপুরের ভোগরা বাইপাস রোড, টাঙ্গাইলের নগর জালফৈ বাইপাস রোড, সিরাজগঞ্জের হাটিকুমরুল মোড়, বগুড়ার মাটিডালি বিমান মোড় এবং গাইবান্ধার পলাশবাড়ী চৌমাথায় পথসভা অনুষ্ঠিত হয়। রংপুরের জিলা স্কুল মাঠে সমাপনী সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। লংমার্চকে ঘিরে সংশ্লিষ্ট এলাকাগুলোতে দলীয় নেতাকর্মী ও সমর্থকদের অংশগ্রহণ ছিল চোখে পড়ার মতো। রাস্তার দু’দিকে দাঁড়িয়ে স্থানীয় নেতাকর্মী ও জনসাধারণ গাড়িবহরকে স্বাগত জানান। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা তৎপর ছিলেন কর্মসূচিকে ঘিরে।
লংমার্চে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকের ছেলে অপ্রতিমের নৃশংস হত্যার নিন্দা জানিয়ে দ্রুত এই হত্যার বিচারের দাবি জানানো হয়।
রাজধানীর মানিক মিয়া এভিনিউয়ে লংমার্চের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, আজকে আমাদের আট দফা দাবি। এটা ৯ দফা হতে পারে, ১০ দফাও হতে পারে। আবার জাতির প্রয়োজনে যেকোনো সময় এটা এক দফায় পরিণত হতে পারে। এক দফায় যখন পরিণত হবে তখন কিন্তু পরিস্থিতি খুবই ভয়াবহ হবে।
তিনি বলেন, সেই পরিস্থিতির মুখোমুখি হওয়ার আগে সম্প্রতি অতীত থেকে শিক্ষা নিন। শিক্ষা নিয়ে জনগণের দাবি মেনে নিন। যদি দাবি মানতে ব্যর্থ হন তাহলে পরিষ্কার বলে দিচ্ছি কোনো চক্রান্তে কোনো কাজ হবে না।
১১ দলের প্রথম লংমার্চ সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে উল্লেখ করে জামায়াত আমীর বলেন, এতে অনেকের মাথা গরম হয়ে গিয়েছে। মাথা গরমের কিছু লক্ষণ গত দুইদিন ধরে রাজধানীতে আমরা দেখতে পাচ্ছি। আমরা অনুরোধ করবো হতাশ হয়ে মাথা গরম করবেন না। জনতার দাবি মেনে নেয়ার চেষ্টা করুন। আমরা কোনো কিছুই পরোয়া করবো না। কারণ আমরা কোনো দলের দাবি নিয়ে মাঠে নামিনি। আমরা ১৮ কোটি মানুষের দাবি নিয়ে মাঠে নেমেছি। আজকে ১৮ কোটি মানুষ দলের সঙ্গে আছে সেই দাবি আদায় করি আমরা ঘরে ফিরবো।
জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম বলেন, তারেক রহমানকে তার যাওয়ার রাস্তা নিজেকেই বেছে নিতে হবে।
তিনি বলেন, এই সরকারের যেখানে দায়িত্ব ছিল মানবাধিকারের সুরক্ষা দেয়ার, তারা মানবাধিকার হরণ করার সকল ধরনের প্রেক্ষাপট তৈরি করছে। শেখ হাসিনার সরকার জনগণের অধিকার হরণ করেছে যে সকল আইন এবং প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে, বর্তমান সরকারও ঠিক একই আইন এবং প্রতিষ্ঠানগুলোকে ব্যবহার করা শুরু করছে।
নাহিদ আরও বলেন, তারেক রহমানকে নির্ধারণ করতে হবে— তিনি কীভাবে ক্ষমতা থেকে চলে যাবেন? তিনি কি হেলিকপ্টারে করে পালিয়ে দেশ থেকে যাবেন, নাকি সরাসরি ক্ষমতা থেকে পদত্যাগ করবেন? আমরা জানি এরশাদও অনেক সম্মানের সঙ্গে পদত্যাগ করেছিল, ফলে তারেক রহমানকে তার যাওয়ার রাস্তা নিজেকেই বাছাই করে নিতে হবে। আমরা জানি সকল দফা কোথায় এসে ঠেকবে— এক দফায় এসে ঠেকবে। সেটার জন্য প্রস্তুত হন।
গাজীপুর: সরকার গণভোটের রায় বাস্তবায়ন না করে জনগণকে অপমান করেছে বলে মন্তব্য করেছেন জামায়াতে ইসলামীর আমীর ডা. শফিকুর রহমান। তিনি বলেন, সেই অপমানের প্রতিশোধ নিতেই রাস্তায় নেমেছি। শনিবার গাজীপুরের ভোগড়া বাইপাসে আয়োজিত পথসভায় তিনি এ কথা বলেন।
সরকার জনগণের রায় বাস্তবায়ন করতে বাধ্য হবে বলে মন্তব্য করে তিনি বলেন, বিএনপি এই রায় বাস্তবায়ন করতে বাধ্য হবে। পানি খাবে কিন্তু ঘোলা করে খাবে।
তারেক রহমানের সরকার হাসিনার সরকার হয়েছে জানিয়ে লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) চেয়ারম্যান কর্নেল (অব.) অলি আহমেদ বলেন, যখন বেগম জিয়ার সময় ছিল তখন বেগম জিয়ার সরকার হয়েছিল। শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের সময় জিয়াউর রহমানের সরকার হয়েছিল। তারেক রহমানের সময় কিন্তু হাসিনার সরকার গঠন হইছে। সুতরাং হাসিনা সরকার দিয়ে বিএনপি’র কাজ চলবে না।
টাঙ্গাইলের নগর জালফৈ বাইপাসে পথসভা: জামায়াত আমীর ও বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, এই লড়াই ১৮ কোটি মানুষের জন্য। সেই লড়াইয়ের আওয়াজ নিয়ে আমরা রাস্তায় নেমেছি। আপনাদের দাবি আদায় করেই ঘরে ফিরবো, ইনশাআল্লাহ। এর মাঝখানে কোনো বিশ্রাম নেই, বিরতি নেই। অবিরাম এই কাফেলা চলতেই থাকবে।
তিনি বলেন, প্রথম দফার লংমার্চ ঢাকা শাপলা চত্বর থেকে শুরু হয়ে চট্টগ্রামের লালদীঘি পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। ওই কর্মসূচিতে রাস্তায় লাখো মানুষের ঢল নেমেছিল। নারী-পুরুষ নির্বিশেষে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ লংমার্চের সঙ্গে একাত্মতা ঘোষণা করেছিলেন।
সিরাজগঞ্জ হাটিকুমরুলে পথসভা: জনগণকে এক দফার জন্য প্রস্তুতি নেয়ার আহ্বান জানিয়েছেন বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর আমীর ডা. শফিকুর রহমান।
তিনি বলেন, এক দফার ডাক যখন আসবে, এখনকার লংমার্চ শুরু হয়েছে ঢাকা থেকে এদিকে, তখন আপনাদের লংমার্চ করতে হবে সিরাজগঞ্জ থেকে ঢাকা। যদি এর মধ্যে আমাদের আট দফা দাবি আদায় হয়ে যায় তাহলে আলহামদুলিল্লাহ। কিন্তু যদি আট দফা দাবি আদায় না হয় যেকোনো সময় আট দফা এক দফাতে পরিণত হবে।
বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমীর মাওলানা মামুনুল হক বলেন, দেশের মানুষের গণরায় উপেক্ষা করে বাংলার ক্ষমতার মসনদে টিকে থাকা যাবে না।
বগুড়া: জামায়াত আমীর ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ১১ দল শুধু জনগণের দাবি আদায়ে ডাক দিয়েছে। তবে এ দাবি জনগণকে সঙ্গে নিয়েই বাস্তবায়ন করা হবে। জুলাই শহীদের রক্তের ওপর দাঁড়িয়ে যে সরকার গঠন করা হয়েছে তারাই জুলাইয়ের সঙ্গে গাদ্দারি করেছে।
তিনি বলেন, গ্যাস বিদ্যুতের দাবিতে বিএনপি বিরোধী দলে থাকাকালীন যে দাবি করেছিল বর্তমান সেই দাবিই করছে বিরোধী দল। সরকার বিদ্যুৎ দিতে না পারলেও ডাবল বিদ্যুৎ বিল ধরিয়ে দিচ্ছে জনগণের হাতে।
এক দফার দাবির ডাক আসলে সবাইকে রাজপথে নামতে হবে জানিয়ে এনসিপি’র আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম বলেন, দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষা করতে না পারার দায়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর পদত্যাগ করা উচিত। বগুড়া থেকেই চাঁদাবাজের বিরুদ্ধে দুর্বার আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে।
গাইবান্ধা: পথসভায় জামায়াত আমীর বলেন, আমাদের এই লংমার্চ কোনো দল বা ব্যক্তির খায়েশ পূরণের জন্য নয়। এই লংমার্চ ১৮ কোটি মানুষের দাবি আদায়ের জন্য। সরকার যদি ৮ দফা দাবি বাস্তবায়ন করে তাহলে আমাদের লংমার্চ করতে হতো না। সরকার আমাদের এসব দাবি না মানলে সব দফা এক দফায় পরিণত হবে।
কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক নাহিদা নাহিদের ছেলে অপ্রতিম প্রসঙ্গে শফিকুর রহমান বলেন, মায়ের মোবাইল নিয়ে বের হয়ে ছেলে লাশ হয়ে এসেছে। এভাবে আর কতো? দেশের মানুষ আর এই জুলুম সহ্য করতে পারছে না।
উল্লেখ্য, গণভোটের রায় বাস্তবায়ন; জুলাই গণহত্যার বিচার; বিদ্যুৎ, তেল, গ্যাস, সার সংকট নিরসন; নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের মূল্যের ঊর্ধ্বগতি রোধ; দুর্নীতি, চাঁদাবাজি ও দখলদারি বন্ধ; আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন; সংকীর্ণ দলীয়করণ বন্ধ এবং তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের দাবিতে এই লংমার্চ অনুষ্ঠিত হচ্ছে। পূর্বঘোষিত ছয় দফা দাবির সঙ্গে দুর্নীতি, দখলবাজি ও চাঁদাবাজি বন্ধের দাবি এবং সর্বশেষ উত্তরাঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের দাবি যুক্ত হয়ে তা ৮ দফায় রূপ নিয়েছে।
