সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নতুন বেতন-ভাতা কাঠামো বা পে-স্কেলের প্রজ্ঞাপন জারি করেছে সরকার। শনিবার অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগ থেকে এ-সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন প্রকাশ করা হয়। নতুন প্রজ্ঞাপনটির নাম দেয়া হয়েছে ‘চাকরি (বেতন ও ভাতাদি) আদেশ, ২০২৬’। পে-স্কেল গত ১লা জুলাই থেকে কার্যকর হওয়ায় কর্মকর্তা-কর্মচারীরা বকেয়া বেতনও পাবেন।
প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, ১লা জুলাই ২০২৬ থেকে ১ম থেকে ৯ম গ্রেডের কর্মকর্তারা নতুন বেতন কাঠামোর মূল বেতনের ৪০ শতাংশ পাবেন। ১০ম থেকে ২০তম গ্রেডের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা বর্ধিত বেতনের ৫০ শতাংশ এই জুলাই থেকে কার্যকর হবে। আপাতত এই বছরের ডিসেম্বর পর্যন্ত তারা এই হারে বেতন পাবেন। গত ৩০শে জুন তারা সর্বশেষ যে বেতন পেয়েছিলেন, তার সঙ্গে নতুন এই বর্ধিত বেতন যুক্ত হবে। ১লা জানুয়ারি ২০২৭ থেকে জুন পর্যন্ত তারা বাড়তি মূল বেতনের ৭০ শতাংশ (১ম থেকে ৯ম গ্রেড) এবং ৭৫ শতাংশ (১০ম থেকে ২০তম গ্রেড) কার্যকর হবে।
প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, ২০২৭ সালের ১লা জুলাই থেকে বেতন বৃদ্ধির বাকি শতভাগ কার্যকর হবে। সেই সময় থেকে বার্ষিক বেতন বৃদ্ধিও কার্যকর হবে। নতুন বেতন কাঠামো এই বছরের জুলাই থেকে কার্যকর বলে ধরায় সরকারি চাকরিজীবীরা বাকি অংশ ১লা জুলাই ২০২৬ থেকে থেকে বকেয়া হিসাবে বুঝে পাবেন।
নতুন বেতন কাঠামোয় ১ম থেকে ১০ম গ্রেডের কর্মকর্তাদের মূল বেতন সর্বোচ্চ ১০০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। আর ১১তম থেকে ২০তম গ্রেডের সরকারি চাকরিজীবীদের মূল বেতন সর্বোচ্চ ১৪২ শতাংশ পর্যন্ত বাড়বে। আনুপাতিক হারে বিভিন্ন ধরনের ভাতাও বাড়ানো হবে। এর আগে গত ৩১শে আগস্ট প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভা বৈঠকে নতুন বেতন কাঠামো অনুমোদন দেয়া হয়। এর পর প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া শেষে শনিবার প্রজ্ঞাপন জারি করা হলো।
বেতন কাঠামোর সঙ্গে বাড়িভাড়া, চিকিৎসা ভাতা বা মোবাইল ভাতাসহ অন্যান্য আনুষঙ্গিক যেসব সুযোগ-সুবিধা বাড়ানো হয়েছে, সেগুলো ২০২৮ সালের ১লা জানুয়ারি থেকে পেতে শুরু করবেন সরকারি চাকরিজীবীরা।
যারা পেনশন গ্রহণ করছেন, তারাও ১লা জুলাই ২০২৬ থেকেই তাদের পেনশন সø্যাব অনুযায়ী নতুন বেতনকাঠামোর সুযোগ-সুবিধা পাবেন। এবারই প্রথমবারের মতো প্রতিবন্ধী সন্তান ভাতা চালু হতে যাচ্ছে। যার আওতায় মাসে তিন হাজার টাকা ভাতা দেয়া হবে। এই পে-স্কেল অনুযায়ী, সকল গ্রেডের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা মোবাইল ভাতা পাবেন।
সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য ১০০ শতাংশ থেকে শুরু সর্বোচ্চ ১৪২ শতাংশ পর্যন্ত বেতন বাড়িয়ে দুই অর্থবছরে তিন ধাপে এই পে-স্কেল বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার।
সর্বনিম্ন স্তর ২০তম গ্রেডের মূল বেতন ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২০ হাজার টাকা করা হয়েছে। অর্থাৎ এই গ্রেডে ১৪২ শতাংশ বেতন বাড়ানো হয়েছে।
সরকারি চাকরির সর্বোচ্চ স্তর প্রথম গ্রেডের বেতন ৭৮ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে এক লাখ ৫৬ হাজার টাকা (সর্বোচ্চ নির্ধারিত) হয়েছে। এ ছাড়া সিনিয়র সচিব পদে বর্তমানে ৮২ হাজার টাকা থেকে বেড়ে হবে ১ লাখ ৬৪ হাজার টাকা। তবে মন্ত্রিপরিষদ সচিব, প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব ও সমমর্যাদার পদে বেতন ৮৬ হাজার টাকা থেকে বেড়ে হবে ১ লাখ ৭২ হাজার টাকা (নির্ধারিত)।
বর্তমানে দেশে প্রায় ১৪ লাখ সরকারি চাকরিজীবী এবং প্রায় ৯ লাখ পেনশনভোগী রয়েছে। চলতি অর্থবছরের বাজেটে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন ও ভাতা বাবদ ৮৯ হাজার ৮৩৬ কোটি টাকা বরাদ্দ দেখানো হয়েছে। পেনশন ও গ্র্যাচুইটিসহ এই পে-স্কেল বাস্তবায়নে ব্যয় হবে ১ লাখ ৪১ হাজার কোটি টাকারও বেশি। এর মধ্যে ৪৪ হাজার কোটি টাকা চলতি অর্থবছরের বাজেটে বরাদ্দ রাখা হয়েছে।
কোন গ্রেডে কতো বাড়লো: গ্রেড-১-এ প্রারম্ভিক মূল বেতন ৭৮ হাজার থেকে বেড়ে ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা; গ্রেড-২-এ ৬৬ হাজার থেকে বেড়ে ১ লাখ ৩২ হাজার; গ্রেড-৩-এ ৫৬ হাজার ৫০০ টাকা থেকে বেড়ে ১ লাখ ১৩ হাজার টাকা এবং গ্রেড-৪-এ ৫০ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ১ লাখ টাকা করা হয়েছে। গ্রেড-৫-এ ৪৩ হাজার থেকে বেড়ে ৮৬ হাজার টাকা; গ্রেড-৬-এ ৩৫ হাজার ৫০০ টাকা থেকে বেড়ে ৭১ হাজার টাকা, গ্রেড-৭-এ ২৯ হাজার টাকা থেকে বেড়ে ৫৮ হাজার টাকা; গ্রেড-৮-এ ২৩ হাজার থেকে বেড়ে ৪৬ হাজার টাকা; গ্রেড-৯-এ ২২ হাজার টাকা থেকে বেড়ে ৪৪ হাজার টাকা এবং গ্রেড-১০-এ ১৬ হাজার থেকে বেড়ে ৩২ হাজার টাকা করা হয়েছে। গ্রেড-১১-এ প্রারম্ভিক মূল বেতন ১২ হাজার ৫০০ টাকা থেকে দ্বিগুণ হয়ে ২৫ হাজার টাকা করা হয়েছে। গ্রেড-১২-এ ১১ হাজার ৩০০ থেকে বেড়ে ২৪ হাজার ৩০০ টাকা; গ্রেড-১৩-এ ১১ হাজার টাকা থেকে বেড়ে ২৪ হাজার টাকা; গ্রেড-১৪-এ ১০ হাজার ২০০ টাকা থেকে বেড়ে ২৩ হাজার ৫০০ টাকা এবং গ্রেড-১৫-এ ৯ হাজার ৭০০ থেকে বেড়ে ২২ হাজার ৮০০ টাকা করা হয়েছে। এ ছাড়া গ্রেড-১৬-এ ৯ হাজার ৩০০ থেকে ২১ হাজার ৯০০ টাকা, গ্রেড-১৭-এ ৯ হাজার টাকা থেকে ২১ হাজার ৪০০ টাকা; গ্রেড-১৮-এ ৮ হাজার ৮০০ থেকে ২১ হাজার টাকা; গ্রেড-১৯-এ ৮ হাজার ৫০০ থেকে ২০ হাজার ৫০০ টাকা এবং গ্রেড-২০-এ ৮ হাজার ২৫০ থেকে ২০ হাজার টাকা করা হয়েছে।
যেসব ভাতার হার কমলো:
নতুন বেতন কাঠামোয় কয়েকটি ভাতার হার কমছে।
বাড়ি ভাড়া:
বর্তমানে ঢাকা সিটি করপোরেশন এলাকায় গ্রেডভেদে সরকারি চাকরিজীবীরা মূল বেতনের ৫০ থেকে ৬৫ শতাংশ পর্যন্ত বাড়িভাড়া পান। নতুন কাঠামোয় এ হার কমিয়ে ৪০ থেকে ৬০ শতাংশ করার প্রস্তাব করা হয়েছে। ঢাকা সিটি করপোরেশনের বাইরে অন্যান্য সিটি করপোরেশন ও সাভার উপজেলায় বর্তমানে মূল বেতনের ৪০ থেকে ৫৫ শতাংশ হারে বাড়িভাড়া দেয়া হয়। এ ছাড়া ঢাকাসহ সব সিটি করপোরেশন ও সাভারের বাইরে কর্মরতদের বাড়িভাড়া বর্তমানে মূল বেতনের ৩৫ থেকে ৫০ শতাংশ। নতুন কাঠামোয় এ হার ২৫ থেকে ৪৫ শতাংশ করা হচ্ছে।
বাংলা নববর্ষ ভাতা: বর্তমানে মূল বেতনের ২০ শতাংশ হারে এ ভাতা দেয়া হয়। নতুন কাঠামোয় তা কমিয়ে ১৫ শতাংশ করা হয়েছে। তবে দুর্গম পার্বত্য এলাকায় কর্মরতদের পাহাড়ি ভাতা মূল বেতনের ২০ শতাংশই বহাল থাকছে। পার্বত্য জেলা ও উপজেলা সদরের জন্য সর্বোচ্চ ৫ হাজার টাকা এবং সদরের বাইরের এলাকার জন্য সর্বোচ্চ ৫ হাজার ৫০০ টাকা নির্ধারণের প্রস্তাব রয়েছে। হাওড়, দ্বীপ ও চরভাতাও মূল বেতনের ২০ শতাংশ বহাল রেখে সর্বোচ্চ ৫ হাজার টাকা করার প্রস্তাব রয়েছে। অন্যদিকে শিক্ষাসহায়ক ভাতা, কার্যভার ভাতা, আপ্যায়ন ভাতা, কুক অ্যান্ড সিকিউরিটিজ অ্যালাউন্স, উৎসব ভাতা এবং শ্রান্তি, বিনোদন ছুটি ও ভাতার বিদ্যমান হার ও পরিমাণ বহাল রাখা হচ্ছে। ঝুঁকি ভাতাসহ বিভিন্ন বিশেষ ভাতার পরিমাণ বিদ্যমানের তুলনায় ২০ শতাংশ বাড়ানোর প্রস্তাব রয়েছে।
উচ্চ গ্রেডে কমছে ইনক্রিমেন্ট:
নতুন বেতন কাঠামোয় উচ্চ গ্রেডের চাকরিজীবীদের বার্ষিক ইনক্রিমেন্টের হার কমানো হয়েছে। বর্তমানে সব গ্রেডের সরকারি চাকরিজীবী মূল বেতনের ৫ শতাংশ হারে বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট পান। নতুন কাঠামোয় ২০তম থেকে ষষ্ঠ গ্রেড পর্যন্ত ৫ শতাংশ ইনক্রিমেন্ট বহাল থাকছে। তবে পঞ্চম গ্রেডে ৪ শতাংশ, চতুর্থ ও তৃতীয় গ্রেডে ৩.৫ শতাংশ এবং দ্বিতীয় গ্রেডে ২.৭৫ শতাংশ ইনক্রিমেন্ট দেয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে। সশস্ত্র বাহিনীতেও একই নীতি প্রযোজ্য হবে। ক্যাপ্টেন ও সমতুল্য এবং তার নিচের পদে ৫ শতাংশ, মেজর পদে ৪ শতাংশ, লেফটেন্যান্ট কর্নেল ও কর্নেল পদে ৩.৫ শতাংশ এবং ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ও সমপদে ২.৭৫ শতাংশ বার্ষিক ইনক্রিমেন্টের প্রস্তাব রয়েছে।
বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন সন্তানের জন্য ভাতা:
বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন সন্তান থাকলে সরকারি চাকরিজীবীরা মাসে তিন হাজার টাকা করে ভাতা পাবেন। একজন সরকারি চাকরিজীবী সর্বোচ্চ দুই সন্তানের জন্য এ সুবিধা পাবেন। এর বেশি থাকলে পাবেন না।
প্রাথমিকের শিক্ষকদের জন্য দুঃসংবাদ:
নতুন পে-স্কেলে বাতিল হয়ে গেছে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের ১৫ শতাংশ বিশেষ সুবিধা। নতুন বেতনস্কেল কার্যকর চলতি বছরের ১লা জুলাই। এই তারিখ থেকেই সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের ১৫ শতাংশ বিশেষ সুবিধা বিলুপ্ত হয়েছে বলে গণ্য হবে। এ সময় পর্যন্ত পাওয়া বিশেষ সুবিধা নতুন বেতনস্কেল অনুযায়ী প্রাপ্য বকেয়া অর্থের সঙ্গে সমন্বয় করা হবে। তবে, ১লা জুলাই ২০২৬ তারিখে অবসরোত্তর ছুটিতে থাকা কর্মচারীরা অবসরোত্তর ছুটি শেষ না হওয়া পর্যন্ত ৩০শে জুন ২০২৬ তারিখে যে হারে বিশেষ সুবিধা পেতেন, সেই হারে সুবিধা পাবেন বলে প্রজ্ঞাপনে উল্লেখ করা হয়েছে।
পেনশন বাড়বে যে হারে:
নতুন জাতীয় বেতনস্কেল, ২০২৬ অনুযায়ী অবসরভোগী ও আজীবন পারিবারিক পেনশনভোগীদের নিট পেনশন পুনর্নির্ধারণ করা হয়েছে। বিদ্যমান নিট পেনশনের ওপর ভিত্তি করে সর্বোচ্চ ১০০ শতাংশ পর্যন্ত পেনশন বাড়বে। একইসঙ্গে পেনশনের সর্বনিম্ন ও সর্বোচ্চ সীমাও নির্ধারণ করে দেয়া হয়েছে।
নতুন কাঠামো অনুযায়ী, ৩০শে জুন ২০২৬ তারিখে মূল পেনশনভোগীর নিট পেনশন ৯ হাজার টাকা বা তার কম হলে বৃদ্ধির হার হবে ১০০ শতাংশ। এ ক্ষেত্রে সর্বনিম্ন নিট পেনশন হবে ১০ হাজার টাকা এবং সর্বোচ্চ ১৮ হাজার টাকা।
যাদের নিট পেনশন ৯ হাজার ১ টাকা থেকে ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত, তাদের পেনশন বাড়বে ৭৫ শতাংশ। এ শ্রেণির সর্বনিম্ন নিট পেনশন নির্ধারণ করা হয়েছে ১৮ হাজার ১ টাকা এবং সর্বোচ্চ ৩৫ হাজার টাকা।
২০ হাজার ১ টাকা থেকে ৩০ হাজার টাকা পর্যন্ত নিট পেনশনপ্রাপ্তদের ক্ষেত্রে বৃদ্ধির হার ৬৫ শতাংশ। এ শ্রেণিতে সর্বনিম্ন নিট পেনশন হবে ৩৫ হাজার ১ টাকা এবং সর্বোচ্চ ৪৯ হাজার টাকা।
৩০ হাজার ১ টাকা থেকে ৪০ হাজার টাকা পর্যন্ত নিট পেনশনপ্রাপ্তদের জন্য বৃদ্ধির হার ৬০ শতাংশ। এ শ্রেণির সর্বনিম্ন নিট পেনশন ৪৯ হাজার ১ টাকা এবং সর্বোচ্চ ৬২ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।
এ ছাড়া ৪০ হাজার ১ টাকা ও তদূর্ধ্ব নিট পেনশনপ্রাপ্তদের ক্ষেত্রে বৃদ্ধির হার ৫৫ শতাংশ। এ শ্রেণিতে সর্বনিম্ন নিট পেনশন হবে ৬২ হাজার ১ টাকা এবং সর্বোচ্চ ৭০ হাজার ২০০ টাকা।
তবে যেসব অবসরভোগী ইতিমধ্যে ৭০ হাজার ২০০ টাকার বেশি নিট পেনশন উত্তোলন করছেন, তারা ১লা জুলাই ২০২৭ তারিখে পরবর্তী বার্ষিক বৃদ্ধি কার্যকর হওয়ার আগ পর্যন্ত বিদ্যমান নিট পেনশনই পাবেন। নতুন বেতনস্কেল কার্যকর হওয়ার তারিখ থেকে নিট পেনশনপ্রাপ্ত অবসরভোগী ও আজীবন পারিবারিক পেনশনভোগীদের জন্য প্রচলিত বিশেষ সুবিধা বিলুপ্ত হবে। এ ছাড়া ১লা জুলাই ২০২৬ তারিখ থেকে কর্মরত কোনো কর্মচারী মারা গেলে প্রচলিত পারিবারিক পেনশন বিধি অনুসরণ করে তার পরিবার পেনশন, আনুতোষিক ও অন্যান্য প্রাপ্য ভাতা পাবেন।
আদেশে বলা হয়, সংশ্লিষ্ট বিধান অনুযায়ী প্রথমে নিট পেনশন নির্ধারণ করা হবে। এরপর ১লা জুলাই ২০২৬ তারিখে একটি বার্ষিক বৃদ্ধি বা ইনক্রিমেন্ট দেয়া হবে।
অবসরোত্তর ছুটি ও নগদায়ন:
বিদ্যমান ছুটির বিধান অনুযায়ী, ছুটি পাওনা থাকা সাপেক্ষে কোনো কর্মচারী পূর্ণ গড় বেতনে ১২ মাসের অবসরোত্তর ছুটি ভোগ করতে পারবেন। একইসঙ্গে অবসর গ্রহণকারী কর্মচারীরা ১৮ মাসের ছুটি নগদায়নের সুবিধাও পাবেন। পেনশন, গ্র্যাচুইটি ও সাধারণ ভবিষ্যৎ তহবিলের বিষয়ে জাতীয় বেতনস্কেল, ২০২৬-এ সংশ্লিষ্ট বিদ্যমান বিধান ও আদেশ অনুসরণের কথা বলা হয়েছে।
বেতন পাবেন না যারা:
নতুন এই বেতন কাঠামোর আওতার বাইরে রাখা হয়েছে কয়েকটি শ্রেণির ব্যক্তি, কর্মচারী ও শ্রমিককে। ফলে তারা এই আদেশ অনুযায়ী বাড়তি বেতন-ভাতা পাবেন না।
বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিস: বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিসে নিয়োজিত ব্যক্তিরা এই আদেশের আওতায় থাকবেন না।
প্রতিরক্ষা সার্ভিস: প্রতিরক্ষা প্রাক্কলন থেকে বেতন পাওয়া বেসামরিক কর্মচারী ছাড়া প্রতিরক্ষা সার্ভিসে নিয়োজিত কর্মচারীরা নতুন বেতন কাঠামোর আওতাভুক্ত নন।
পুলিশ ও বিজিবি: পুলিশ বাহিনী এবং বর্ডার গার্ড বাংলাদেশে (বিজিবি) নিয়োজিত কর্মচারীরাও এই আদেশের বাইরে থাকবেন।
রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্প প্রতিষ্ঠানের শ্রমিক: পণ্য উৎপাদনশীল রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্প প্রতিষ্ঠান শ্রমিক (চাকরির শর্তাবলী) আইন, ২০১৮-এর ধারা ২-এর দফা (ঘ)-তে সংজ্ঞায়িত শ্রমিকরা এই বেতন কাঠামোর আওতায় থাকবেন না।
শিক্ষানবিশ ও প্রশিক্ষণার্থী: শিক্ষানবিশ (অ্যাপ্রেন্টিস) বা প্রশিক্ষণার্থী (ট্রেইনি) হিসেবে নিয়োজিত ব্যক্তিরা নতুন বেতন কাঠামোর সুবিধা পাবেন না।
আউটসোর্সিং কর্মী: আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে নিয়োজিত ব্যক্তিরাও এই আদেশের বাইরে থাকবেন।
দৈনিকভিত্তিক সাময়িক শ্রমিক: দৈনিকভিত্তিতে সাময়িক শ্রমিক নিয়োজিতকরণ নীতিমালা, ২০২৫-এর আওতায় নিয়োজিত শ্রমিকরা নতুন বেতন কাঠামোর সুবিধা পাবেন না।
চুক্তিভিত্তিক ও খণ্ডকালীন কর্মী: চুক্তি অথবা খণ্ডকালীন ভিত্তিতে নিয়োজিত ব্যক্তিরাও এই আদেশের আওতাভুক্ত নন।
এদিকে সাধারণ সরকারি চাকরিজীবীদের পাশাপাশি বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিস ও অন্যান্য সংশ্লিষ্ট শ্রেণির জন্য পৃথক প্রজ্ঞাপন জারি করা হবে বলে জানা গেছে।
প্রেষণে থাকা কর্মচারীদের বেতন:
প্রেষণে কর্মরত কোনো কর্মচারীর ক্ষেত্রে প্রেষণে না থাকলে তিনি তার মূল অফিস বা প্রতিষ্ঠানে যে বেতন পাওয়ার অধিকারী হতেন, সেই ভিত্তিতে নতুন বেতনস্কেলে তার বেতন নির্ধারণ করা হবে।
ছুটিতে থাকা কর্মচারীরা:
১লা জুলাই ২০২৬ তারিখে কোনো কর্মচারী ছুটিতে থাকলে জাতীয় বেতনস্কেল ২০২৬-এ তার বর্তমান বেতনের ভিত্তিতে বেতন নির্ধারণ করতে হবে। অথবা ওই তারিখে তিনি ছুটিতে না থাকলে যে বর্তমান বেতন পেতেন, সেই ভিত্তিতে নতুন বেতনস্কেলে তার বেতন নির্ধারণ করতে হবে। তবে নতুন বেতনস্কেলে বেতন নির্ধারণের ফলে যে আর্থিক সুবিধা তৈরি হবে, তা ছুটির সময়ের জন্য তিনি পাবেন না।
১লা জুলাই অবসর নিলে নতুন স্কেলের সুবিধা নেই:
গেজেটে স্পষ্ট করা হয়েছে, ৩০শে জুন ২০২৬ তারিখে কোনো কর্মচারীর অবসর-উত্তর ছুটি শেষ হলে অর্থাৎ তিনি ১লা জুলাই ২০২৬ তারিখে অবসরে গেলে, ১লা জুলাই থেকে কার্যকর জাতীয় বেতনস্কেল ২০২৬ অনুযায়ী বেতন নির্ধারণের সুবিধা তিনি পাবেন না। গেজেটে আরও বলা হয়েছে, ‘মূল পেনশনভোগী’ বলতে সেই কর্মচারীকে বোঝাবে, যার চাকরিকালের জন্য পেনশন অর্জিত হয়েছে।
সাময়িক বরখাস্তদের জন্য আলাদা নিয়ম:
১লা জুলাই ২০২৬ তারিখে কোনো কর্মচারী সাময়িকভাবে বরখাস্ত থাকলে তিনি পুনর্বহাল হয়ে বাস্তবে কাজে যোগদান না করা পর্যন্ত তার বেতন নতুন জাতীয় বেতনস্কেলে নির্ধারণ করা হবে না। পরে পুনর্বহাল হলে প্রথমে ৩০শে জুন ২০২৬ তারিখে তার বেতন বর্তমান বেতনস্কেলে নির্ধারণ করতে হবে। এরপর ওই নির্ধারিত বেতনের ভিত্তিতে জাতীয় বেতনস্কেল ২০২৬-এর সংশ্লিষ্ট অনুরূপ স্কেলে তার বেতন নির্ধারণ করতে হবে।
চিকিৎসা ভাতা সর্বোচ্চ ৬ হাজার টাকা:
নতুন বেতনস্কেলে চিকিৎসা ভাতাও বাড়ানো হয়েছে। ৫০ বছর বয়স পর্যন্ত কর্মচারীরা মাসে ৩ হাজার টাকা এবং ৫০ বছর ১ দিন বয়স থেকে অবসরোত্তর ছুটি (পিআরএল) শেষ হওয়া পর্যন্ত ৪ হাজার টাকা চিকিৎসা ভাতা পাবেন।
সন্তানপ্রতি শিক্ষা ভাতা ৫০০ টাকা:
সরকারি কর্মচারীদের সন্তানপ্রতি মাসে ৫০০ টাকা হারে শিক্ষা সহায়ক ভাতা দেয়া হবে। সর্বোচ্চ দুই সন্তানের জন্য মাসে ১ হাজার টাকা পাওয়া যাবে। স্বামী ও স্ত্রী দু’জনই সরকারি চাকরিতে থাকলে একজনের ক্ষেত্রেই সন্তান সংখ্যা গণনা করা হবে। বয়সের সনদ দাখিল সাপেক্ষে ২৩ বছর বয়স পর্যন্ত সন্তানের জন্য এ ভাতা পাওয়া যাবে।
টিফিন ভাতা ৫০০ টাকা:
জাতীয় বেতনস্কেল-২০২৬-এর ১১তম থেকে ২০তম গ্রেডের কর্মচারীদের মাসে ৫০০ টাকা টিফিন ভাতা দেয়া হবে। তবে কোনো কর্মচারী তার প্রতিষ্ঠান থেকে লাঞ্চ ভাতা বা বিনামূল্যে দুপুরের খাবার পেলে তিনি টিফিন ভাতা পাবেন না। এ ছাড়া চলতি বা অতিরিক্ত দায়িত্ব পালনের জন্য মাসে ১ হাজার ৫০০ টাকা কার্যভার ভাতা দেয়ার কথা বলা হয়েছে। ভ্রমণ ভাতার প্রচলিত বিধান আপাতত বহাল থাকবে। তবে বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনায় অর্থ বিভাগ পরবর্তী সময়ে ভ্রমণ ভাতার হার পুনর্নির্ধারণ করে পৃথক আদেশ জারি করবে।
চলতি অর্থবছরের বাজেটে নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের কথা বলা হলেও এসব বিবেচনায় সেই সুযোগ থাকছে কিনা, সেই প্রশ্ন উঠেছিল। শেষ পর্যন্ত সরকার গঠনের ছয় মাসের মাথায় সরকারি চাকুরেদের জন্য নবম এ বেতন কাঠামো আলোর মুখ দেখলো।
