জাপানি ঐতিহ্য প্রযুক্তির মেলবন্ধনে পর্দা উঠলো এশিয়ান গেমসের

জাপানি ঐতিহ্য প্রযুক্তির মেলবন্ধনে পর্দা উঠলো এশিয়ান গেমসের

ফন্ট সাইজ:

হৃদস্পন্দনে এক হলো এশিয়া। জাপানি ঐতিহ্যের ছোঁয়া, আধুনিক প্রযুক্তির চোখ ধাঁধানো প্রদর্শন, বর্ণিল সাংস্কৃতিক পরিবেশনা আর ৪৫ দেশ ও অঞ্চলের অ্যাথলেটদের মার্চপাস্ট- সবমিলিয়ে নাগোয়ায় জমকালো আয়োজনে পর্দা উঠলো ২০তম এশিয়ান গেমসের। গতকাল সন্ধ্যায় নাগোয়া সিটি মিজুহো পার্ক অ্যাথলেটিক স্টেডিয়ামে শুরু হয় মহাদেশের সবচেয়ে বড় ক্রীড়া আসরের আনুষ্ঠানিক যাত্রা। হারমনিক হার্ট বিট থিমে দুই ঘণ্টার উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে পুরনো জাপানের ঐতিহ্য আর ভবিষ্যতের জাপানের প্রযুক্তি যেন একই মঞ্চে এসে দাঁড়ায়। তবে উদ্বোধনের আমেজ নাগোয়াবাসী পেয়েছে সকালেই। গেমসের উদ্বোধন উপলক্ষে জাপানের এয়ার সেল্ফ-ডিফেন্স ফোর্সের ব্লু ইমপালস আকাশে প্রদর্শনী উড়ান দেয়। সকাল ৯টা ১০ থেকে ৯টা ৫৫ মিনিট পর্যন্ত আইচির আকাশে চলে এই বিশেষ প্রদর্শনী।

নাগোয়ার আকাশে ধোঁয়ার রেখায় হৃদয় ও অন্যান্য আকৃতি এঁকে দর্শকদের মাতিয়ে তোলে ছয়টি বিমান। নাগোয়ায় জন্ম নেওয়া চলচ্চিত্র পরিচালক ইউকিহিকো সুতসুমির পরিচালনায় উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের মূল থিম ছিল ‘ হারমনিক হার্ট বিট’। এশিয়ার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা ক্রীড়াবিদদের মধ্যে সংযোগ, সম্প্রীতি ও ঐক্যের প্রতীকী বার্তা তুলে ধরতেই হৃদস্পন্দনকে কেন্দ্র করে সাজানো হয় অনুষ্ঠান। বিশাল হৃদয় আকৃতিতে তৈরি করা হয় মূল মঞ্চ। জাপানি সংস্কৃতির ঐতিহ্যবাহী উপাদানের সঙ্গে শিল্প রোবট, আধুনিক প্রযুক্তি ও টয়োটার আক্সেসিবল পিপল মুভার এর মতো উদ্ভাবনও অনুষ্ঠানের অংশ হয়ে ওঠে। গেমস আয়োজনের ক্ষেত্রে জাপানের সুনাম বহুদিনের। এর আগে দু’বার এশিয়ান গেমস আয়োজন করেছে দেশটি- ১৯৫৮ সালে টোকিও এবং ১৯৯৪ সালে হিরোশিমায়।

এর বাইরে ২০২১ সালে করোনাভাইরাস মহামারির মধ্যে অলিম্পিকও (টোকিও) আয়োজন করে দেশটি। তারই ধারাবাহিকতায় পালোমা মিজুহো স্টেডিয়ামে স্থানীয় সময় সন্ধ্যা ৬টায় শুরু হওয়া অনুষ্ঠানে প্রথমে ছিল স্বাগতিক জাপানের জাতীয় পতাকা ও জাতীয় সংগীত। এরপর একে একে স্টেডিয়ামে প্রবেশ করেন বিভিন্ন দেশের ক্রীড়াবিদরা। ইংরেজি নামের বর্ণানুক্রম অনুসারে মার্চপাস্টে সবার আগে আসে আফগানিস্তান। তার পরেই স্টেডিয়ামে প্রবেশ করে বাংলাদেশ। গেমসের শুরু ও শেষের মার্চপাস্টে পতাকা বহন করা বাংলাদেশি ক্রীড়াবিদদের জন্য সবসময়ই গর্বের। এবার সেই সম্মান পেয়েছেন শুটার আবদুল্লাহ হেল বাকি ও কারাতেকা হুমায়রা আক্তার অন্তরা। বাংলাদেশ বহরের নেতৃত্ব দেয়া এই দুই ক্রীড়াবিদের কাছে অবশ্য পতাকা বহনের চেয়ে বড় কোনো পদকের প্রত্যাশা ছিল না। অন্যদের মতো তারাও এসেছেন এশিয়ার সবচেয়ে বড় ক্রীড়া আসরের অংশ হতে।

২২টি খেলায় ২৬০ সদস্যের বাংলাদেশ বহর জাপানে এলেও উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে অংশ নেয়ার জন্য অনুমোদন পেয়েছিলেন ৬৫ জন অ্যাথলেট ও কর্মকর্তা। যার মধ্যে খেলোয়াড়ের চেয়ে কর্মকর্তাদের আধিক্যই ছিল বেশি। মার্চপাস্টে বাংলাদেশের অনেকে আবার ছবি তুলে ভিডিও করেই সময় কাটিয়েছেন। মার্চপাস্টের পর আসে উদ্বোধনের আনুষ্ঠানিক মুহূর্ত। জাপানের সম্রাট নারুহিতো ২০তম এশিয়ান গেমস আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন ঘোষণা করেন। পাশে ছিলেন সম্রাজ্ঞী মাসাকো। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন অলিম্পিক কাউন্সিল অব এশিয়ার সভাপতি শেখ জোয়ান বিন হামাদ আল থানি, আন্তর্জাতিক অলিম্পিক কমিটির সভাপতি ক্রিস্টি কোভেন্ট্রি। এবারের মশালের আগুনে জড়িয়ে ছিল জাপানের এশিয়ান গেমসের ইতিহাসও। টোকিও ও হিরোশিমা-১৯৫৮ ও ১৯৯৪ সালে জাপানে অনুষ্ঠিত আগের দুই এশিয়ান গেমসের শহর-থেকে সংগৃহীত আগুনের সঙ্গে নাগোয়া ক্যাসেলে প্রজ্বলিত শিখা মিলিয়ে চূড়ান্ত মশাল রিলে সম্পন্ন করা হয়। শেষ পর্যায়ে মশাল বহন করেন জাপানের হ্যামার থ্রোয়ের কিংবদন্তি বাবা-ছেলে শিগেনোবু মুরোফুশি ও কোজি মুরোফুশি। তারা মিলে স্টেডিয়ামের কড়াইয়ে আগুন প্রজ্বলন করেন।

কড়াইটিও ছিল হৃদয়ের বাঁক ও নাগোয়া ক্যাসেলের প্রতীকী শাচিহোকোর আদলে তৈরি। উদ্বোধনের সঙ্গে সঙ্গে স্টেডিয়ামজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে আলোর ঝলকানি। বর্ণিল উদ্বোধনের মধ্যেও এবারের এশিয়ান গেমসের আয়োজনে শুরু থেকেই আলোচনায় ছিল আবাসন ও পরিবহন। ঐতিহ্যবাহী কেন্দ্রীয় ‘গেমস ভিলেজ’-এর পরিবর্তে বিভিন্ন হোটেল, কাঠের কনটেইনার এবং বন্দরে নোঙর করা ক্রুজশিপে ক্রীড়াবিদ ও কর্মকর্তাদের থাকার ব্যবস্থা করা হয়েছে। কয়েকটি দেশের পক্ষ থেকে কক্ষ সংকট, ডাবল বুকিং ও পরিবহন ব্যবস্থাপনা নিয়ে অভিযোগও এসেছে। তবে উদ্বোধনের আলোয় সেসব ছাপিয়ে সামনে এসেছে ক্রীড়ার মূল বার্তাই- প্রতিযোগিতা, বন্ধুত্ব ও এশিয়ার ঐক্য। হাজারো ক্রীড়াবিদের পদচারণায় শুরু হলো লড়াই। এখন অপেক্ষা মাঠের গল্পের। কে হাসবেন সোনার হাসি, কার হাতে উঠবে রুপা কিংবা ব্রোঞ্জ- তার উত্তর মিলবে আগামী ৪ঠা অক্টোবর পর্যন্ত।