উপনিবেশোত্তর সমাজ ও রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক রূপান্তর প্রসঙ্গে

ইতিহাস, ভাষা ও শিক্ষার ঔপনিবেশিক রাজনীতি- ৫

উপনিবেশোত্তর সমাজ ও রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক রূপান্তর প্রসঙ্গে

ফন্ট সাইজ:

সম্রাট আতাহুয়ালা সোটোর প্রার্থনা মঞ্জুর করলে, মধ্য নভেম্বরে, পিজারোর দলটি কাজামারকা নগরে প্রবেশ করে এবং পরদিনই নগরীর কেন্দ্রীয় উন্মুক্ত চত্বরে উভয় পক্ষের সৌজন্য সাক্ষাতের আয়োজন করা হয়। সম্রাট আতাহুয়ালা রাজকীয় পোশাকে, খোস মেজাজে, একটি স্বর্ণখচিত বহনযোগ্য সিংহাসনে চড়ে, উৎসবের ঝলমলে পোশাক পরিহিত পারিষদবর্গ ও স্থানীয় পোশাকি অস্ত্রে সজ্জিত প্রহরীর দল সমভিব্যাহারে যথাস্থানে হাজির হন। পিজারোর দলের সঙ্গে এই সৌজন্যমূলক সাক্ষাৎকে ইনকা সম্রাট একটি নিতান্তই ‘ধর্মীয় আচার’ হিসেবে বিবেচনা করেছিলেন, ফলে তার সেনাদলকে নগরের দূরবর্তী প্রান্ত অঞ্চলে অবস্থানের নির্দেশ দিয়ে রেখেছিলেন। অন্যদিকে, পিজারো ও তার দেড় শতাধিক সঙ্গীর দল সেখানে পুরোপুরি সশস্ত্র অবস্থায় হাজির হয় এবং সাক্ষাৎ হওয়ামাত্র পিজারোর একজন দলসঙ্গী, খ্রীষ্টধর্মের এক যাজক, নিজেদেরকে ‘আসল’ ঈশ্বরের প্রতিনিধি হিসেবে দাবি করে, সম্রাট আতাহুয়ালপার হাতে একটি বাইবেল তুলে দিয়ে, খ্রীষ্টধর্মে দীক্ষিত হওয়ার এবং একই সঙ্গে নিজেদের স্পেনের সম্রাটের রাজনৈতিক প্রতিনিধি হিসেবে দাবি করে আতাহুয়াল্লাকে স্পেনের বশ্যতা মেনে নেয়ার অলঙ্ঘনীয় প্রস্তাব প্রদান করেন। এই অনাকাঙ্ক্ষিত সব প্রস্তাবে ইনকা সম্রাট বিস্মিত, অপমানিত ও রাগান্বিত হয়ে প্রত্যাখ্যান করলে, সশস্ত্র যুদ্ধের জন্য ইতিপূর্বে প্রস্তুত পিজারোর দল প্রায় নিরস্ত্র ইনকা সম্রাট ও তার পরিষদবর্গের ওপর রক্তাক্ত হামলা পরিচালনা করে সম্রাটকে বন্দি করে ফেলতে সমর্থ হয়। এভাবেই, ওয়েলম্যানের ভাষায়, ‘ইনকা সম্রাটের আপ্যায়নের ঋণ রক্ত নিয়ে পরিশোধ করা হয়’।২১

তার পরের ঘটনাবলিও খুব মর্মন্তুদ। সম্রাটকে বন্দি অবস্থায় রেখে, পিজারো বাহিনী পুরো নগর জুড়ে হত্যাযজ্ঞ ও লুটতরাজের মাধ্যমে প্রভূত সম্পদ, বিশেষত সোনা ও রূপা আহরণ করে। ইনকা সম্রাটকে মুক্তিদানের প্রতারণামূলক অঙ্গীকারের ভিত্তিতে সম্রাটের কাছ থেকে ‘একটি ঘরভর্তি পরিমাণ স্বর্ণ ও কয়েকটি ঘরভর্তি পরিমাণ রৌপ্য’ আদায় করে, যা বর্তমান বাজার মূল্যে অর্ধ-বিলিয়ন ডলার মূল্যের সম্পদের সমান।২২ কিন্তু বিনিময়ে ইনকা সম্রাটকে পূর্ব-প্রতিশ্রুত মুক্তিদানের পরিবর্তে, দু’মাস পর, এক প্রহসনমূলক বিচারের মাধ্যমে, তাকে জীবন্ত পুড়িয়ে মারার রায় ঘোষণা করে। আগুনে পুড়ে মরার বিকল্প হিসেবে সম্রাট আতাহুয়াল্পাকে খ্রীষ্টধর্ম গ্রহণের বিনিময়ে শ্বাসরোধের মাধ্যমে মৃত্যুবরণের প্রস্তাব দিলে, তিনি সম্মত হন। এমতাবস্থায়, ইনকা সম্পর্কে খ্রীষ্টধর্মে দীক্ষিত করে, তার ওপর পিজারোর নাম আরোপ করে, ফ্রান্সিকো পিজারো নামে, ১৫৩৩ সালের আগস্টে, তাকে একটি যন্ত্রের সাহায্যে শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয়। এভাবেই, স্পেনীয়দের হাতে গোটা ইনকা সভ্যতা ও সাম্রাজ্যের উপনিবেশায়ন প্রক্রিয়ার চূড়ান্ত পর্ব শুরু হয় এবং ১৫৭২ সালের মধ্যে সেই সাম্রাজ্যের উপনিবেশায়ন প্রক্রিয়া সমাপ্ত হয়। এই গোটা প্রক্রিয়ায় যেসব স্পেনীয় ব্যক্তিবর্গ গণহত্যা, লুণ্ঠন, পুরনো সভ্যতার ধ্বংসসাধন সহ নানা ধরনের নির্মাণাধিক ব্যবস্থা গ্রহণ করেছিল, বিশেষত যারা নেতৃত্বদান করেছিল, স্পেনের তৎকালীন রাজশক্তি তাদের প্রত্যেককে সংশ্লিষ্ট অধিকৃত এলাকায় গভর্নর হিসেবে নিয়োগদানসহ অর্থনৈতিকভাবেও পুুরস্কৃত করেছিল।

পৃথিবীব্যাপী ইউরোপীয় উপনিবেশয়ান প্রক্রিয়ায় অপরাপর ঔপনিবেশিক শক্তিগুলোও স্পেনের ভাগ্যান্বেষী সশস্ত্র দলগুলোর মতোই আচরণ করেছে। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শক্তি উত্তর আমেরিকার বিভিন্ন অঞ্চল দখল করার প্রক্রিয়ায়, স্থানীয় অধিবাসীদের সঙ্গে কী ধরনের আচরণ করেছে, তার একটি ছোট্ট উদাহরণ দেয়া যাক।

ইংল্যান্ডের রাজা প্রথম জেমসের (১৫৬৬-১৬২৫) পৃষ্ঠপোষকতায় স্থাপিত ‘ভার্জিনিয়া কোম্পানির’ একটি দল প্রথমে, ১৬০৭ সালের মে মাসে, তিনটি জাহাজে ১০৪ জনের একটি সশস্ত্র অভিযাত্রী দল নিয়ে, উত্তর আমেরিকার জেমসটাউনে ‘বসতি’ গড়ার উদ্দেশ্যে হাজির হয়। ইতিপূর্বে, সেখানে পাওহাটান নামক একটি স্থানীয় জনগোষ্ঠী বসবাস করতো। ইংরেজরা যখন ঐ অঞ্চলে গিয়ে ‘বসতি’ স্থাপনের আয়োজন করে, স্থানীয় সম্প্রদায়টির ‘প্রধান’ মনোযোগের সাথে তা লক্ষ্য করেছেন, ‘কিন্তু ইংরেজদের ওপর কোনো আক্রমণ পরিচালনা করেননি’। পরবর্তীকালে, ১৬১০ সালের শীতে, ইংরেজরা ভীষণ ঠাণ্ডায় কাতর হয়ে নানা অসুখ-বিসুখের মুখে পতিত হয় এবং ‘চরম খাদ্যাভাবের’ শিকার হয়। এমতাবস্থায়, ইংরেজদের কয়েকজন শুধু বেঁচে থাকার তাগিদে স্থানীয় পাওহাটান সম্প্রদায়ের আশ্রয় গ্রহণ করে। তারপর শীত অতিক্রান্ত হয়ে গ্রীষ্ম দেখা দিলে সংশ্লিষ্ট ইংরেজদের ‘গভর্নর’ পাওহাটান জনগোষ্ঠীর ‘প্রধানের’ কাছে একজন ‘দূত’ পাঠিয়ে ‘দলছুট’ ইংরেজদের ফেরত চায়, কিন্তু পাওহাটান প্রধানের ‘উত্তর’ ইংরেজ সাহেবের অপছন্দ হলে, ‘প্রতিশোধ’ নেয়ার জন্য ‘কয়েকজন সশস্ত্র সৈন্য পাঠিয়ে দেয়’। এই সশস্ত্র ইংরেজ ‘সৈন্যরা স্থানীয়দের একটি গ্রামে গিয়ে ১৫/১৬ জন পাওহাটনকে হত্যা করে, তাদের বাড়িঘর পুড়িয়ে দেয়, গ্রামের চারপাশে চাষ করা শস্য ধ্বংস করে এবং ঐ সম্প্রদায়ের রানী ও তার সন্তানদের অপহরণ করে জাহাজে নিয়ে এসে, বাচ্চাগুলোকে নদীতে ফেলে দেয়, আর রানীকে ছুরিকাঘাতে হত্যা করে’।২৩

প্রতিটি ঔপনিবেশিক শক্তির এহেন অভিন্ন আচরণ সম্পর্কে পৃথিবীর নানা অঞ্চলে ইতিমধ্যে অসংখ্য বস্তুনিষ্ঠ গবেষণার ফল প্রকাশিত হয়েছে। সেই ইতিহাসের বিস্তারিত বর্ণনায় না গিয়ে, শুধু ফরাসি ঔপনিবেশিক শক্তির নির্মমতার প্রতীক হিসেবে, আলজেরিয়ায় উপনিবেশ প্রতিষ্ঠার জন্য প্রযুক্ত নৃশংস বলপ্রয়োগ ও গণহত্যার সঙ্গে জড়িত একজন ফরাসি সামরিক কর্মকর্তা কর্নেল মন্তানিয়াকের (১৮০৩-১৮৪৫) ব্যক্তিগত স্বীকারোক্তির কথা এখানে পেশ করা যেতে পারে। আলজেরিয়ায় অভিযানকালে নিজের তৎপরতা সম্পর্কে বর্ণনা দিতে গিয়ে মন্তানিয়াক বলেছিলেন, “আমার মাথায় ঢুকে পড়া অপ্রয়োজনীয় চিন্তা ঝেড়ে ফেলার জন্য আমি কয়েকটি মাথা কেটে ফেলি— আর্টিচোক গাছের নরম মাথা নয়, খোদ মানুষের মাথা কেটে ফেলি।”২৪ বলার অপেক্ষা রাখে না, মন্তানিয়াকের তরবারিতে বিচ্ছিন্ন সেই মাথাগুলো ছিল আলজেরিয়ার স্থানীয় মানুষদের।

এই ফরাসি কর্নেল, যিনি আলজেরিয়া দখলের জন্য সংঘটিত অনেকগুলো গণহত্যায় জড়িত ছিলেন, এক বন্ধুকে ১৮৪৬ সালে পাঠানো একটি চিঠিতে লিখেছিলেন, “যে সব জনগোষ্ঠী আমাদের কথা শোনে না, আমাদের আরোপিত শর্ত মানতে অনীহা প্রকাশ করে, তাদের সর্বস্ব লুট করে অবশ্যই তাদের সর্বস্বান্ত করতে হবে। তাদের সব কিছু দখল করতে হবে, ধ্বংস করতে হবে, বয়স ও লিঙ্গ নির্বিশেষে সবাইকে বিপর্যস্ত করে দিতে হবে; যেখানে ফরাসি সৈন্যবাহিনী একবার পদার্পণ করবে, সেখানে আর দুর্বাও গজাবে না। আমাদের তথাকথিত লোকহিতৈষী ব্যক্তিরা যা-ই বলুক না কেন, আমরা ভালো করেই জানি, যারা কোনো লক্ষ্য অর্জনে ইচ্ছুক, তারা লক্ষ্য অর্জনের পথ ও পন্থা সম্পর্কেও অবগত। আমি যে সৈন্যদের নেতৃত্ব দেই, তাদের আমি ব্যক্তিগতভাবে হুঁশিয়ারি দেই যে, তারা কখনো যদি কোনো জীবিত আরবকে আমার সামনে হাজির করে, তাহলে তারা আমার তরবারির ভোঁতা উল্টো পিঠের মার খাবে। প্রিয় বন্ধু, এভাবেই আরবদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে হবে; পনের বছরোর্ধ সকল যুবককে হত্যা করে, তাদের সকল নারী ও শিশুকে ধরে এনে আমাদের নৌযানগুলো বোঝাই করে মার্কেসাস দ্বীপ বা অন্য কোথাও পাঠিয়ে দাও। এক কথায়, যারা আমাদের পায়ের তলায় কুকুরের মতো হামাগুড়ি দেবে না, তাদের প্রত্যেককে নির্মূল করে ফেলো”।২৫

স্পষ্টতই, এশিয়া, আফ্রিকা, ক্যারিবিয়া এবং উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকায় ‘সভ্যতা বিস্তারের’ নামে ইউরোপীয় ঔপনিবেশিক শক্তিসমূহ মূলত নিজেদের রাজনৈতিক আধিপত্য বিস্তার ও অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি অর্জনের জন্য গণহত্যা, লুণ্ঠন, দাস ব্যবসা, পুরনো সভ্যতার ধ্বংসসাধনসহ বহুবিধ নিপীড়নমূলক ব্যবস্থা প্রয়োগ করেছে; আর এসব নির্মানবিক ব্যবস্থা অবলম্বনের মাধ্যমে তারা নিজেদের অন্তর্নিহিত ‘অসভ্যতারই’ শুধু বহিঃপ্রকাশ ঘটায়নি, আপন আপন জনগোষ্ঠীর একটি উল্লেখযোগ্য অংশের বিমানবিকরণও সম্পাদন করেছে— এখনো পর্যন্ত যার কুফল শুধু ইউরোপ কর্তৃক বিভিন্ন উপনিবেশিত জনগোষ্ঠীগুলোই ভোগ করছে না, খোদ ইউরোপীয় জনগোষ্ঠীর একটি বিরাট অংশও ভোগ করে চলেছে।

এক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য যে, পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে ইউরোপীয়দের উপনিবেশায়ন প্রক্রিয়ায় খ্রীষ্টধর্ম ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়েছে। পঞ্চদশ শতাব্দীর ইউরোপে প্রভাবশালী রোমীয় ক্যাথলিক গির্জার পোপ, ১৪৯৩ সালে, ‘দুটি আনুষ্ঠানিক ফতোয়ার মাধ্যমে স্পেনকে পশ্চিম গোলার্ধের নতুন নতুন অঞ্চলে ক্যাথলিক ধর্ম প্রচার ও পৌত্তলিকদের ধর্মান্তকরণের জন্য অনুসন্ধান ও উপনিবেশায়নের অধিকার প্রদান করেন’।২৬ এই সমসাময়িক কালে, পর্তুগিজ রাজশক্তিকেও পোপ অভিন্ন অধিকার মঞ্জুর করেছিলেন।

পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে ধর্মান্তকরণসহ জোর করে আদিবাসীদের জমি দখল করার জন্য পোপ-প্রদত্ত এই সব ধর্মীয় অনুমোদন ছাড়াও, ইউরোপীয় ঔপনিবেশিক শক্তিসমূহ খোদ বাইবেলের পুরাতন ও নতুন নিয়মে উল্লিখিত দু’টি বাণীও— গীতসংহিতা: ২:৮ ও রোমীয়: ১৩:২— অকাতরে ব্যবহার করেছে।২৭

যাই হোক, নানা ছলে-বলে ও কলা-কৌশলে কোনো একটি অঞ্চলে উপনিবেশ স্থাপনের পর সেই অঞ্চলের ঔপনিবেশিক শাসন-শোষণ ব্যবস্থা কায়েম করা ও তা অব্যাহত রাখার জন্য ইউরোপের বিভিন্ন ঔপনিবেশিক শক্তি যে তিনটি সাধারণ অপকৌশল অবলম্বন করেছে বলে ইতিপূর্বে উল্লেখ করেছি, এবার আমরা একে একে সেগুলো আলোচনা করবো।

তথ্যসূত্র:
২১. প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা: ৯৭
২২. প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা: ৯৮
২৩. Howard Zinn, A Peoples’ History of the United States, p. 10
২৪. কর্ণেল মন্তানিয়াকে উদ্ধৃতির জন্য দেখুন, Aimé Césaire, Discourse on Colonialism, p. 4
২৫. দেখুন, https://en.wikipedia.org/wiki/Lucien_de_Montagnac
২৬. প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা: ১৩
২৭. Howard Zinn, A peopels’ History of the United States, p. 14; উল্লেখ্য, গীতসংহিতা বা Psalms-এর ২:৮ নম্বর বাণীতে বলা হয়েছে, ‘Ask of me, and I shall give thee the heathen for thine inheritence, and the uttermost parts of the earth for thy possossion’. আর, রোমীয় বা Romans-এর ১৩:১-২ নম্বর বাণীতে বলা হয়েছে, ‘[T]he powers that be are ordained of God. Whosever therefore resisteth the power, resisteth the ordinance of God: and they that resist shall receive to themselves damnation’.