আফসানা পাশা। তিনি রাজধানীর বাড়িধারা ডিওএইচএস এলাকার মৃত কর্নেল আব্দুল আজিজ পাশার মেয়ে ।আজ থেকে তিন বছর আগে বাসচাপায় প্রাণ হারান আফসানা।তবে তার এই মৃত্যু ঘিরে এখনো রহস্য রয়ে গেছে। জারি রয়েছে নানা প্রশ্ন। মৃত্যুটি নিছক সড়ক দুর্ঘটনা নাকি হত্যাকাণ্ড! উত্তর মেলেনি আজও।২০২৩ সালের ৫ এপ্রিল। রাজধানীর খিলক্ষেতে বাসের ধাক্কায় সিএনজি অটোরিকশায় থাকা আফসানা পাশা নিহত হন। ওইদিন বুধবার বিকাল ৫টার দিকে ময়মনসিংহ-ঢাকা মহাসড়কের খিলক্ষেতের লা মেরিডিয়ান হোটেলের সামনে এ ঘটনা ঘটে।
সেসময় প্রত্যক্ষদর্শীরা দ্রুতগামী ‘শ্যামলী এনআর পরিবহনের’ একটি বাস অটোরিকশাকে ধাক্কা দেয় এমনটাই জানান। তখন আফসানা পাশার মৃত্যুর বিষয়ে খিলক্ষেত থানার ওসি কাজী সাহান হক গণমাধ্যমকে বলেন, ‘দুর্ঘটনায় সিএনজি চালক আহত হয়েছেন। বাসটি জব্দ করা হয়েছে। চালক পালিয়ে গেছেন।’
এদিকে পরিবারের দাবি এটি হত্যাকাণ্ড। আর তখন থেকেই এর বিচার চেয়ে আসছে পরিবার।
আফসানা পাশার মা লিজা আহমেদ এই মৃত্যু নিয়ে কিছু প্রশ্ন তুলে গতকাল (১৮ সেপ্টেম্বর) ফেসবুকে ধারাবাহিক পোস্ট দেন।
শুক্রবার এক পোস্টে লিজা আহমেদ লেখেন, ‘৫ এপ্রিল, ২০২৩ সাল। বিকাল ৪ টা বাজে, রোজা বলে অফিস একটু আগেই ছুটি হয়। আফসানা জানতো না তার ভাগ্যে আজ কী ভয়ংকর লেখা। অফিসের আশপাশেই ওত পেতে ছিলো আগে থেকেই পরিকল্পনা করা শ্যামলী পরিবহনের খালি প্যাসেঞ্জার বাস। অপেক্ষায় ছিলো আব্দুল কাদের জিলানী, একজন সরকারি লোক নিয়ে। বাইরে সিএনজি অপেক্ষমাণ যা একেবারেই ব্যতিক্রম। প্রতিদিন আফসানা মেইন রোড পর্যন্ত হেঁটে এসে একটি সিএনজি পায়। আজ সিএনজি অপেক্ষায়। সহজসরল আফসানার মনে সেদিন কী কোনও প্রশ্ন এসেছিলো? নাকি আফসানাকে অপেক্ষমাণ সিএনজিতে উঠতে বাধ্য করা হয়—আজ আর জানার উপায় নেই। আফসানা রওনা হওয়ার কয়েক মিনিট পরে সরকারি এজেন্ট নিয়ে আফসানার সিএনজি অনুসরণ করতে থাকে কাদের। লা মেরিডিয়ান হোটেলের অপজিটে এসে শ্যামলী পরিবহনের খালি বাসটি প্রচণ্ড জোরে আফসানার সিএনজিকে ধাক্কা দেয়। আফসানার চুলের ক্লিপটি সাড়ে তিন ইঞ্চি, তার মাথার মধ্যে ঢুকে যায় ধাক্কা থামে না। ধাক্কার পর ধাক্কা চলতেই থাকে যতক্ষণ সিএনজি বাসের নিচে পিষ্ট হয়ে চলে না যায়। আফসানাকে সাথে সাথে বের করা সম্ভব হয়নি। অনেক সময় লেগে যায়, সিএনজির মাথা ভেঙে ওপর দিয়ে আমার ৫ ফুট ৭ ইঞ্চি মেয়েকে বের করতে হয়। দূরে গাড়ি থামিয়ে তামাশা দেখেন কাদের। খুনি শ্যামলী ড্রাইভারকে উদ্ধার করতে ওখানে আগে থেকেই লোকজন উপস্থিত ছিলো।
একইদিন আরেক পোস্টে লিজা আহমেদ বেশ কিছু প্রশ্ন তোলেন। বলেন, ‘শ্যামলী পরিবহনের প্যাসেঞ্জার বাস, অথচ সেদিন বাসে কোনো প্যাসেঞ্জার ছিলো না। বাসটি আফসানার অফিসের আশপাশে ওত পেতে ছিলো। আফসানার বস আব্দুল কাদের জিলানী অধীর অপেক্ষায় ছিলো সরকারি এজেন্ট সাথে নিয়ে— কখন অফিস ছুটি হবে, আর আফসানা বাসার পথে রওনা দেবে। আফসানা সকালে তার মাকে বলে গিয়েছিলো ইফতারির পর বাসার কাছে মেলা হচ্ছে সেখানে যাবে। কেনাকাটা করতে নয়, ৬০ টাকা দিয়ে এক প্লেট ফুসকা খেতে। আফসানার চাওয়া ছিলো খুবই সীমিত। কোনো বন্ধু-বান্ধব ছিলো না ওর। আমরা মা-মেয়ে একা অনেক শান্তিতে ছিলাম। আফসানার লেখালেখি আর পড়াশোনা ছাড়া কিছুই চাওয়ার ছিলো না। এমন ভালো মানুষ আমি মা হয়ে বলছি— আমি আমার জীবনে দেখিনি।’
এর আগে গত ১৭ সেপ্টেম্বর ফেসবুকে লিজা আহমেদের পোস্টে অভিযোগ করা হয়, ওপরের নির্দেশে কর্নেল আজিজ পাশার একমাত্র মেয়ে আফসানা পাশাকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে। প্রত্যাশা করা হয় ন্যায় বিচারের।
পোস্টে বলা হয়, ‘শ্যামলী পরিবহনের বাস ড্রাইভার ওপরের নির্দেশে আফসানার সিএনজিকে শুধু একবার নয়, বারবার সজোরে ধাক্কা দিয়েছে তার মৃত্যু নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত। ধাক্কা দিতে দিতে যে পর্যন্ত না সিএনজি বাসের নিচে ভর্তা হয়েছে সেই পর্যন্ত ধাক্কা দিয়েছে। ধাক্কার প্রচণ্ডতায় রাস্তার ডিভাইডার ভেঙে গেছে— যা কঠিন লোহা ও সিমেন্টের তৈরি। আফসানার মৃত্যু হয়েছে নিশ্চিত হয়ে শ্যামলী পরিবহনের ড্রাইভার বাস থেকে নেমে পালিয়ে যায়, আগে থেকে সেখানে উপস্থিত একজন মুখে মাস্ক ও মাথায় হেলমেট পরা লোকের সহায়তায় যা ভিডিওতে পথচারীদের ক্যামেরায় উঠেছে। আমার উকিল বিজ্ঞ আদালতকে সেই দৃশ্য পেনড্রাইভের মাধ্যমে দাখিল করেছেন।’
আকুল আবেদন জানিয়ে তিনি আরও লিখেন, ‘একজন নিঃস্ব মা হিসেবে আমার আকুল আবেদন, শ্যামলী বাস ড্রাইভারকে রিমান্ডে নিয়ে কঠিনভাবে জিজ্ঞাসাবাদ করা হোক। প্রকৃত সত্য বেরিয়ে আসুক। প্রতিষ্ঠিত হোক ন্যায়বিচার!!!’
সর্বশেষ লিজা আহমেদ লেখেন, লেঃ কর্নেল আব্দুল আজিজ পাশার একমাত্র নিরীহ নিষ্পাপ মেয়েকে ফ্যাসিস্ট ডাইনি নির্মমভাবে হত্যা করেছে। সন্তানহারা মা বিচার চায়'।
নিজেকে একজন সন্তানহারা মা হিসেবে আদালতের নিকট ন্যায়বিচার প্রার্থনা করে তিনটি প্রশ্ন রাখেন তিনি ।বলেন, আমার মেয়ে আফসানার বস—UNICERT এর ম্যানেজিং ডিরেক্টর আব্দুল কাদের কেন সেদিন সরকারি মেহমান নিয়ে আফসানাকে অনুসরণ করছিলো দুর্ঘটনা না হওয়া পর্যন্ত ? কাদেরকে গ্রেপ্তার করে রিমান্ডে নিয়ে দয়া করে প্রকৃত সত্য উদ্ঘাটন করুন। সরকারি মেহমান কি সচক্ষে আফসানার নিশ্চিত মৃত্যু হয়েছে দেখতে এসেছিলো ? যে কারণে আফসানার বাসার কাছে আসা সত্ত্বেও তাকে কাদের তার গাড়িতে নেয়নি
সিএনজি ড্রাইভারকেও জিজ্ঞাসাবাদ করা হোক, কে তাকে সেদিন অফিস ছুটির সময় অফিসের সামনে অপেক্ষায় রেখেছিলো ? সিএনজি ড্রাইভারের কথাবার্তা সঠিক নয়। অপর প্রশ্নে লিজা আহমেদ বলেন, কেন সেই রাতেই অফিসের আফসানার কলিগ হাসপাতাল থেকে তার ডেথ সার্টিফিকেটের কপি চুরি করে ফটো তুলে আফসানার ব্যক্তিগত ফেসবুক আইডি রিমেম্বারিং করে দেয়, তাদের কী উদ্দ্যেশ্য ছিল ?
অফিসের সিসি ক্যামেরা নষ্ট করে রাখার কারণে সরকারি মেহমান কে ছিল আমরা দেখতে পারলাম না।
তিনি লেখেন, বিজ্ঞ আদালতের নিকট একজন সন্তানহারা মায়ের আকুল আবেদন, এইসব প্রশ্নের যথাযথ উত্তর খুঁজে বের করা হোক, একজন নিরীহ, নিষ্পাপ মেয়েকে সম্পূর্ণ বিনা অপরাধে নির্মমভাবে হত্যা করার প্রকৃত কারণ উন্মোচন হোক ন্যায় বিচারের স্বার্থে!!
এদিকে লিজা আহমেদের ফেসবুক পোস্টে উল্লেখিত আবদুল কাদেরের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। তিনি মানবজমিনকে বলেন, এটা আমাকে জড়িয়ে ইনটেনশনালি বলা হচ্ছে। অনেক কিছুই বলেছেন বিভিন্ন সময় তারা। আফসানার সঙ্গে আমাদের খুব ভালো সম্পর্ক ছিল। রোজার মাস ছিল। ঘটনার দিন আমি ইফতারির দাওয়াতের জন্য বের হয়েছিলাম। ফোনে তার মৃত্যুর সংবাদ পাই। আমিও অনেককে ফোন করে জানাই। আর আমার গাড়িতে কোনো সরকারি মেহমান ছিল না। আফসানাকে ফলোও করিনি। তাছাড়া অফিসের পাওনা যা ছিল আফসানার পরিবার এসে পরে সবই বুঝিয়ে নিয়ে গেছে।
