প্রথমেই বলে নেওয়া ভালো যে আমি অর্থনীতিবিদ নই। তাই অর্থনীতির জটিল সমীকরণ না বুঝলেও অন্তত এইটুকু বুঝতে পারি যে, যেকোনো দেশের অর্থনীতির সবচেয়ে মৌলিক প্রশ্নটি হলো-অর্জিত সম্পদের প্রবাহ দেশের সাধারণ মানুষের জীবনে কতটা স্বস্তি নিশ্চিত করছে এবং সেই স্বস্তির অংশীদার কারা? আমাদের রিজার্ভ বাড়ছে, জাতীয় আয় বাড়ছে, ব্যাংকে আমানত বাড়ছে, বড় বড় ব্যবসা ও অবকাঠামোর পরিসর সম্প্রসারিত হচ্ছে—এসব নিঃসন্দেহে অর্থনীতির সাময়িক ইতিবাচক সূচক। কিন্তু একই সময়ে যদি দেশের নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের মানুষকে বাজারের ব্যাগ সংকুচিত করতে বাধ্য হতে হয়, সন্তানের শিক্ষা ও স্বজনদের চিকিৎসা খরচ মেটাতে বছরের পর বছর জমে থাকা সঞ্চয় ভেঙে নিঃস্ব হতে হয়, কিংবা মাস শেষ হওয়ার আগেই বেতনের টাকা নিঃশেষ হয়ে যায়—তবে সেই তথাকথিত প্রবৃদ্ধির সামাজিক ও নৈতিক গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন উঠতেই পারে।
আজকের বাংলাদেশের বাস্তবতায় ঠিক এমনই এক বৈপরীত্য তীব্রভাবে দৃশ্যমান। এক মেরুতে দ্রব্যমূল্যের অনিয়ন্ত্রিত ঊর্ধ্বগতি ও জীবনযাত্রার ক্রমবর্ধমান ব্যয়ের নিষ্ঠুর চাপ, যা সাধারণ মানুষকে বেঁচে থাকার তাগিদে সঞ্চয় ভাঙতে বাধ্য করছে; অন্যদিকে ব্যাংকিং খাত যেন নতুন কোটিপতির ঢলে ভেসে যাচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ প্রকাশিত হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জুন শেষে ব্যাংক খাতজুড়ে এক কোটি টাকার বেশি আমানত থাকা হিসাবের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৪১ হাজার ৫৬২টিতে। অথচ এর মাত্র তিন মাস আগে, মার্চ শেষে এই সংখ্যা ছিল ১ লাখ ৩৬ হাজার ৪৮৫টি। সে হিসাবে মাত্র তিন মাসের ব্যবধানে দেশে কোটি টাকার বেশি জমা থাকা হিসাবের সংখ্যা বেড়েছে ৫ হাজার ৭৭টি।
জুন শেষে দেশের ব্যাংকগুলোতে মোট হিসাবের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৮ কোটি ৬৩ লাখ ৮৪ হাজার ৫৮৮টিতে, যেখানে মোট আমানতের পরিমাণ পৌঁছেছে ২২ লাখ ১০ হাজার ৪৪৪ কোটি টাকায়। মার্চ শেষে মোট আমানতের পরিমাণ ছিল ২১ লাখ ৫৮ হাজার ২ কোটি টাকা, অর্থাৎ তিন মাসের ব্যবধানে সামগ্রিক আমানতও ৫২ হাজার ৪১৯ কোটি টাকা বৃদ্ধি পেয়েছে।
এই সংখ্যাগুলো নিছক কোনো অর্থনৈতিক পরিসংখ্যান নয়; এটি আয় বৈষম্য ও সম্পদ কুক্ষীগত হওয়ার এক নির্মম দলিল। এটি প্রশ্ন তোলে—আমাদের অর্থনীতিতে যে বিশাল অর্থ সৃষ্টি হচ্ছে, তা কি সাধারণ মানুষের হাতে পৌঁছাচ্ছে, নাকি সীমিত কিছু প্রভাবশালী হাত ও চক্রের মধ্যে বন্দি হয়ে পড়ছে?
কোটিপতি হিসাবের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, স্বাধীনতার অব্যবহিত পর ১৯৭২ সালে দেশে কোটিপতি আমানতকারীর সংখ্যা ছিল মাত্র ৫ জন। ১৯৯০ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৯৪৩টিতে, ২০০৮ সালে ১৯ হাজার ১৬৩টিতে এবং ২০২০ সালের ডিসেম্বর শেষে ৯৩ হাজার ৮ ৯০টিতে। মহামারী ও বৈশ্বিক সংকট থাকা সত্ত্বেও এই ধারা থামেনি; ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে তা ১ লাখ ১৬ হাজার ৯০৮টিতে এবং ২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে ১ লাখ ৩৪ হাজার ৪৪টিতে পৌঁছায়। পরিশেষে ২০২৬ সালের জুনে তা ১ লাখ ৪১ হাজার ছাড়িয়ে যায়।
তবে অর্থনীতিতে যদি এই কোটিপতি হিসাবের প্রবৃদ্ধি সম্পূর্ণ বৈধ ব্যবসা, শিল্পায়ন, প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন ও উৎপাদনশীল বিনিয়োগ থেকে আসত, তবে কারো কোনো আপত্তি থাকত না। এটি হতো অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির প্রকৃত লক্ষণ। কিন্তু বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ইতিহাসের অপ্রিয় সত্য হলো—এখানে একটি গোষ্ঠী রাতারাতি কোটিপতি বনে যায় অবৈধ ক্ষমতার প্রভাব, রাজনৈতিক আশ্রয়-প্রশ্রয় এবং প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতির মাধ্যমে।
নিয়োগ বাণিজ্য, বদলি বাণিজ্য, টেন্ডারবাজি, চাঁদাবাজি, বেপরোয়া দখলবাজি ও মাদক সন্ত্রাসের মতো সামাজিক ব্যাধিই এ দেশের দুর্নীতিপরায়ণ সিন্ডিকেটের পকেট ভরানোর প্রধান হাতিয়ার। ক্ষমতা ও রাজনৈতিক আশ্রয় ব্যবহার করে রাতারাতি কোটিপতি বনে যাওয়ার এই দৃশ্য স্বাধীনতার পর থেকেই আমরা কম-বেশি দেখে আসছি। কিন্তু দুঃখজনক ও বেদনার বিষয় হলো, একটি বিশাল গণঅভ্যুত্থান ও পরিবর্তিত রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটেও আমরা নতুন বাংলাদেশে সেই পুরোনো রূপই দেখতে পাচ্ছি। চাঁদাবাজি, দখলদারিত্ব ও অবৈধ উপায়ে বিত্তশালী হওয়ার অভিযোগ, এই পুরোনো খেলা অব্যাহত থাকা দেশের সাধারণ মানুষের জন্য অত্যন্ত কষ্টকর।
সম্প্রতি জাতীয় সংসদের তৃতীয় অধিবেশনের সমাপনী বক্তৃতায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন। তিনি স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন, বাংলাদেশের সর্বত্র দুর্নীতির পাহাড় জমেছে এবং তিনি এ দেশের সমস্ত জঞ্জাল পরিষ্কার করতে চান। তারেক রহমান কেবল একজন রাষ্ট্রনায়ক নন, তিনি সাবেক রাষ্ট্রপতি, স্বাধীনতার ঘোষক শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান এবং গণতন্ত্রের আপসহীন নেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সুযোগ্য সন্তান। এ দেশের মানুষ দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করে যে, তার সুদৃঢ় রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও সদিচ্ছার মাধ্যমেই বাংলাদেশকে দুর্নীতিমুক্ত ও দাজ্জাল মুক্ত করা সম্ভব।
তবে কেবল সরকারের একার পক্ষে এই আমূল পরিবর্তন আনা সম্ভব নয়। এখন দেশের সচেতন নাগরিক হিসেবে আমাদের দায়িত্ব হলো দুর্নীতিবিরোধী এই যুদ্ধ ও জঞ্জাল পরিষ্কারের প্রক্রিয়ায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে সর্বাত্মক সহযোগিতা করা। একটি বিষয় দিবালোকের মতো স্পষ্ট—বাংলাদেশ যদি দুর্নীতি, অর্থ পাচার ও লুটপাট থেকে মুক্ত হতে পারে, তবে এ দেশের সিংহভাগ অর্থনৈতিক ও সামাজিক সমস্যা এমনিতেই সমাধান হয়ে যাবে। যদি আমরা দুর্নীতিকে স্থায়ীভাবে বিদায় জানাতে পারি, তবে আগামী এক দশকের মধ্যেই বাংলাদেশ বিশ্বের বুকে অন্যতম সুখী ও সমৃদ্ধশালী দেশ হিসেবে মাথা তুলে দাঁড়াবে।
তবে চাঁদাবাজ-সন্ত্রাসবাদ-মাদক-দখলবাজিমুক্ত বাংলাদেশ গড়ে তুলতে যা সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন, তা হলো—স্বার্থহীন ‘জাতীয় ঐক্য’। দৃঢ় রাজনৈতিক ও জাতীয় ঐক্য ছাড়া কায়েমী স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীকে উচ্ছেদ করা মোটেও সহজ কাজ নয়। সর্বাগ্রে দরকার সর্বস্তরের জাতীয় ঐক্য ও সামাজিক প্রতিরোধ।
একটি গণতান্ত্রিক ও সমতাভিত্তিক রাষ্ট্রের লক্ষ্য হওয়া উচিত ধনী হওয়ার ন্যায্য ও আইনি সুযোগ সৃষ্টি করা এবং একই সঙ্গে দরিদ্র ও মধ্যবিত্তকে পিছিয়ে পড়া থেকে রক্ষা করা। এক কোটি টাকার বেশি থাকা সব হিসাবই যে অবৈধ তা নয়; এতে ব্যবসা-প্রতিষ্ঠান, করপোরেট সংস্থা বা সরকারি খাতের বৈধ অর্থও থাকতে পারে। তবে যখন সেই প্রবৃদ্ধির সমান্তরালে সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষের ক্রয়ক্ষমতা শূন্যের কোঠায় নেমে আসে এবং অবৈধ পন্থায় অর্জিত কালো টাকার পাহাড় ব্যাংকে জমে ওঠে, তখন রাষ্ট্রীয় নীতি ও সামাজিক ন্যায়বিচার চরম চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে।
পরিশেষে বলতে চাই,বাংলাদেশ আজ অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিকভাবে এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। এখন সবচেয়ে বড় জরুরি প্রশ্ন এটি নয় যে ব্যাংকে কোটিপতির সংখ্যা কত বাড়লো—বরং আসল প্রশ্ন হলো, কত কোটি মানুষ পেট ভরে খেয়ে স্বস্তিতে বেঁচে থাকতে পারছেন। বাজারে সাধারণ মানুষের ব্যাগ যেন ভারী হয়, মধ্যবিত্তের জীবনযাত্রা যেন সুরক্ষিত থাকে এবং শ্রমিকের প্রকৃত মজুরি যেন বৃদ্ধি পায়—সেটিই হোক রাষ্ট্র সংস্কারের মূল লক্ষ্য। পরিসংখ্যানের কৃত্রিম সমৃদ্ধি নয়, সর্বস্তরের মানুষের ঘরে নিশ্চয়তা ফিরলেই অর্জিত হবে একটি প্রকৃত দুর্নীতিমুক্ত, বৈষম্যহীন ও সুখী-সমৃদ্ধ বাংলাদেশ। মহান আল্লাহ সুবহানাতায়ালা আমাদের সহায় হোন।
লেখক:সাংবাদিক, কলামিস্ট, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সম্পাদক,আমার দিন।
ই-মেইল:[email protected]
