জাপানের অন্যতম বাণিজ্যিক শহর নাগোয়া। এটাকে প্রযুক্তি ও বিশ্বের অন্যতম গাড়ি উৎপাদনের শহরও বলা যেতে পারে। বিশ্বের সর্ববৃহৎ গাড়ি উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান টয়োটার কারখানার পাশে টয়োটা সিটিতে হলেও মূল বিক্রয়কেন্দ্র কিন্তু এই নাগোয়াতে। এবার ২০তম এশিয়ান গেমসের মূল আয়োজনও এই শহরে। তবে জাপানের আইচি-নাগোয়া এশিয়ান গেমস যেন একটি শহরের গণ্ডি পেরিয়ে ছড়িয়ে পড়েছে পুরো অঞ্চলে। নাগোয়া মূল কেন্দ্র হলেও প্রতিযোগিতা হচ্ছে আইচি প্রিফেকচারের বিভিন্ন শহরের পাশাপাশি গিফু, শিজুওকা, টোকিও ও ওসাকাতেও। ফলে এবারের আসরকে বলা যায়- এক শহরের নয়, বহু শহরের এশিয়ান গেমস। গতানুগতিকের বাইরে গিয়ে পুরনো স্থাপনাতে গেমস আয়োজন করেছে জাপান। ভিলেজের বদলে দলগুলোকে রাখা হচ্ছে হোটেল ও ক্রুজে। পুরনোসহ স্টেডিয়ামেই খেলা হচ্ছে। যার উদ্বোধন হবে আজ নাগোয়া সিটি মিজুহো পার্ক অ্যাথলেটিক স্টেডিয়ামে।
জাপানের মাটিতে এশিয়ার সবচেয়ে বড় এই ক্রীড়া আসর বসছে ৩২ বছর পর। এর আগে ১৯৫৮ সালে টোকিও এবং ১৯৯৪ সালে হিরোশিমা এশিয়ান গেমস অনুষ্ঠিত হয়েছিল। এবার তৃতীয় বারের মতো জাপান এশিয়ার ক্রীড়া বিশ্বের মিলনমেলার আয়োজক। আইচি নাগোয়ার এই আসরে ৪৩ খেলায় ৭১টি ডিসিপ্লিনে ৪৬৯টি পদক ইভেন্ট। অংশ নিচ্ছেন প্রায় ১৭ হাজার অ্যাথলেট ও কর্মকর্তা, যা আয়োজকদের প্রাথমিক হিসাবের প্রায় ২ হাজার বেশি। খেলার তালিকাতেও এসেছে পরিবর্তনের ছাপ। মিক্সড মার্শাল আর্টস, প্যাডেল, সার্ফিং, ভার্চ্যুয়াল তায়কোয়ান্দো ও টেকবল এবার নতুন করে জায়গা পেয়েছে। একইসঙ্গে ই-স্পোর্টস ও ব্রেকিংও রয়েছে। অর্থাৎ ঐতিহ্যবাহী ক্রীড়ার পাশাপাশি তরুণ প্রজন্মের জনপ্রিয় খেলাগুলোকেও এশিয়ান গেমসের মঞ্চে আরও দৃশ্যমান করা হয়েছে। ২২টি খেলায় অংশ নিচ্ছে বাংলাদেশ। ২৬০ সদস্যের দলে আছেন ৯০ জন পুরুষ ও ৯৭ জন নারী ক্রীড়াবিদ।
বাকি ৭৩ জন কোচ ও কর্মকর্তা। আজ উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বাংলাদেশের পতাকা বহন করবেন শুটার আবদুল্লাহ হেল বাকি ও কারাতেকা হুমাইরা আক্তার অন্তরা। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে অংশ নেয়ার অনুমোদন পেয়েছেন ৬৫ জন। আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন আজ হলেও বাংলাদেশ মাঠের লড়াই শুরু করেছে চারদিন আগে, ওসাকাতে ফুটবলের মধ্যদিয়ে। উত্তর কোরিয়া ও দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে ম্যাচ খেলেছে বাংলাদেশ নারী ফুটবল দল। দু’টিতেই হেরেছে বাংলাদেশের মেয়েরা। গোল হজম করেছে দুই ম্যাচে ১৬টি। তবে এদিক দিয়ে ভাগ্যবান বাংলাদেশ নারী ক্রিকেট দল। কোনো ম্যাচ না খেলেই সেমিতে বসে রয়েছে তারা। পুরুষ হকি কাল দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে ৫ গোলে হার দিয়ে এশিয়ান গেমস শুরু করেছে। এদিকে, এবারের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের মূল ভাবনা হচ্ছে ‘ওয়ান ইমেজ ওয়ান এশিয়া’র মাধ্যমে এশিয়ার দেশগুলোর মানুষকে আরও কাছাকাছি নিয়ে আসা। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে তাই জাপানের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের পাশাপাশি এশিয়ার বৈচিত্র্য এবং ঐক্যের বার্তা তুলে ধরার ওপর গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের প্রায় দুই ঘণ্টা আগে, বিকাল ৪টায় শুরু হবে বিশেষ ওয়ার্ম-আপ স্টেজ। দর্শকদের বিনোদনের জন্য আয়োজিত এই পর্বে অংশ নেবে জাপানের জনপ্রিয় সংগীত দল। পাশাপাশি আইচির ঐতিহ্যবাহী লোকসংস্কৃতির প্রতিনিধিত্ব করবে সাইগো ড্রিস্টিক বো নোটি প্রিসারভেশন সোসাইটি। এই পর্ব পরিচালনায় থাকবেন কোবায়াশি তাকুআকিরো ও কাতো রিনা। আয়োজকদের ঘোষণা অনুযায়ী, ওয়ার্ম-আপ স্টেজ শুরু হওয়ার পরই প্রবেশে নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা হবে। এশিয়ান গেমসের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের অন্যতম প্রতীকী মুহূর্ত হবে গেমস ফ্লেম প্রজ্বালন। এবারের টর্চ রিলে আইচির ৪০টি পৌরসভায় অনুষ্ঠিত হয়েছে, যার মধ্যে নাগোয়া শহরের ১৬টি ওয়ার্ডও রয়েছে। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের দিন শুধু স্টেডিয়ামেই নয়, আকাশেও থাকবে বিশেষ আয়োজন। জাপান এয়ার সেল্ফ-ডিফেন্স ফোর্সেও বলু ইমাপন্স আজ সকাল ৯টা ১০ মিনিট থেকে ৯টা ৫৫ মিনিটের মধ্যে আইচি প্রিফেকচারের আকাশে প্রদর্শনী ফ্লাইট পরিচালনা করবে। কোমাকি বিমানঘাঁটি থেকে উড্ডয়নের পর বিমানগুলো হিসায়া-ওদোরি পার্ক, কারিয়া, ওকাজাকি, তাহারা, তোয়োহাশি ও এক্সপো ২০০৫ আইচি মেমোরিয়াল পার্কের ওপর দিয়ে উড়বে।
সবমিলিয়ে নাগোয়ার উদ্বোধনী অনুষ্ঠান শুধু আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকছে না। আকাশে ব্লু ইমপালসের প্রদর্শনী, মশালের যাত্রা, জাপানি সংস্কৃতির পরিবেশনা, জনপ্রিয় সংগীত, অ্যাথলেটদের মার্চপাস্ট এবং ‘ওয়ান এশিয়া’র বার্তা- সবমিলিয়ে আজ নাগোয়া পরিণত হবে এশিয়ার ক্রীড়া বিশ্বের মিলনমেলায়। আর সেই মিলনের প্রতীকী মঞ্চ হবে মিজুহো স্টেডিয়াম; যেখান থেকে শুরু হবে ২০তম এশিয়ান গেমসের ১৬ দিনের পদকের লড়াই।
