ধানের দেশ গানের দেশ বাংলাদেশ বাংলাদেশ। গোলা ভরা ধান আর গলায় গলায় গান। বাংলাদেশকে বলা হয় গানের দেশ পাখির দেশ। সবুজের দেশ বাংলাদেশ। এখানে ঘুম ভাঙার আগেই পাখিরা গান গায়। পাখির গানে আমাদের ঘুম ভাঙে।
ব-দ্বীপ পরিবেষ্টিত এই বঙ্গভূমি বছরের অধিকাংশ সময়ই বন্যার পানিতে নিমজ্জিত থাকতো। ডুবে থাকতো ফসলের মাঠ। বিশেষ করে হাওড় অঞ্চলে এই অবস্থাটা ছিল নিত্য নৈমিত্তিক ব্যাপার। কাজ না থাকায় এই বিশাল অবসরে এইসব এলাকার লোকজন গান বাজনা নিয়ে বেশি ব্যস্ত থাকতো। রচিত হয় নতুন নতুন গীত। বর্ষায় কোনো কাজ থাকে না। তাই রাতের বেলা পুঁথির আসর বসে। বিয়ে বাড়িতে ধামাইল পরিবেশিত হয়। এই অঞ্চলে জন্ম নিয়েছেন হাছন রাজা, বাউল শাহ আবদুল করিম, রাধা রমন দত্ত, দুর্বিন শাহ, উকিল মুন্সি, পাগল হাসানদের-এর মতো বাউলদের। কুষ্টিয়া অঞ্চলে জন্ম নিয়েছেন আরেক বাউল সাধন লালন সাঁই। আমাদের আছে ভাওয়াইয়া, ভাটিয়ালি, পল্লীগীতির মতো গানের ভান্ডার। আব্বাসউদ্দীন, আবদুল আলীম, নীনা হামিদ সহ অনেক লোকসঙ্গীত শিল্পী আমাদের অহংকার। তারা আমাদের লোকসঙ্গীতকে বিশ্বময় পরিচিত করে তুলেছেন তাদের কণ্ঠের জাদু দিয়ে।
বাঙালি জাতিকে কখনো যুদ্ধবাজ জাতি বলা হয়নি। কিন্তু বাঙালির পরতে পরতে জড়িয়ে আছে সংগ্রাম। এ সংগ্রাম বা যুদ্ধ অস্ত্র নিয়ে নয়। এ যুদ্ধ প্রকৃতির সাথে লড়াই করা। এই বঙ্গদেশে অতি খরা অতি বৃষ্টি, ঝড়, জলোচ্ছ্বাস, নদী ভাঙন লেগেই থাকতো। আর এখানকার মানুষ এসবের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেই টিকে রয়েছে যুগের পর যুগ। নদী ভাঙন কিন্তু এখনো রয়েছে। দেশের কয়েকটি জেলায় এতটাই ভাঙন হয় যেখানে মানুষের জীবন অতীব কষ্টে নিমজ্জিত। মানুষ প্রতিনিয়ত যুদ্ধ করছে এই প্রকৃতির বিরুদ্ধে। আমাদের সোনাফলা মাটি কখনো কখনো বিরুপ পরিবেশও তৈরি করে। এটা হচ্ছে নদী ভাঙন। মাইলের পর মাইল চর পড়ে যায়। আরেকদিকে ভাঙে বাড়িঘর। বিলীন হয় ফসলি জমি। অনেকেই নিঃস্ব হয়ে যায়। আবার জেগে ওঠে মানুষ। নতুন করে ঘর তোলে। বৃক্ষরোপন করে। নতুন করে বাঁচে। প্রতিটি দুর্যোগেই মানুষ ঘুরে দাঁড়ায়। নতুন করে স্বপ্ন দেখে। প্রাণভরে আবার নিঃশ্বাস নেয়। আবার গলাতে গানের সুর তোলে।
আমাদের গ্রামবাংলার দিকে তাকালে দেখতে পাই—যখন ধান কাটার মৌসুম শুরু হয় তখন দলবেঁধে মানুষ ধান কাটে আর গান গায়। তাদের গলায় উঠে আসে নতুন সুর। যারা নির্মাণ শ্রমিক তাদেরও একটা সুর আছে। তারা যখন একসাথে ইটের ঝাঁকা মাথায় নেয় তখন আলাদা একটা সুর তোলে। সুরের নেশায় ভুলে যায় কষ্টের কথা। সুর তাদের শ্রমের কথা ভুলিয়ে দেয়। আমরা দেখেছি নদীতে নৌকা বাইচের সময় নানারকম বাদ্য বাজিয়ে হেইও হেইও বলে যে সুর তৈরি হয় সেটার আবহ অন্যরকম। আমাদের দেশের বিয়ের আসরে গাওয়া হয় গীত। এই গীতগুলো একেক এলাকায় একেকরকম সুরে গাওয়া হয়। ছেলেমেয়েরা আনন্দ করে সুরে সুরে দলীয় সঙ্গীতের মাধ্যমে মাতিয়ে তোলে বিয়েবাড়ি।
আমরা দেখেছি আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে মুক্তিযোদ্ধাদের উদ্বুদ্ধ করতে জ্বালাময়ী দেশাত্ববোধক গান পরিবেশিত হতো।এগুলো শুধু বিনোদনের জন্য ছিল না। সেইসব গান অনুপ্রেরণা জুগিয়েছে। সাহস জুগিয়েছে। দেশের প্রতি মমত্ববোধ তৈরি করেছে। শুধু দেশের ভেতরই নয় বিদেশের মাটিতেও এইসব দেশের গান প্রবাসী বাঙালিকে উদ্বুদ্ধ করেছিল। তীর হারা এই ঢেউয়ের সাগর পাড়ি দেব রে.. কিংবা পূর্ব দিগন্তে সূর্য উঠেছে রক্ত লাল রক্ত লাল...। কিংবা জর্জ হ্যারিসনের সেই বিখ্যাত গান বাংলাদেশ বাংলাদেশ—এর কথা উল্লেখ করতেই পারি। এই গান বাংলাদেশের পক্ষে বিশ্ব জনমত গঠনে সাহায্য করেছিল। এসব গান শুনলেই শরীরে শিহরণ জেগে ওঠে। । অস্ত্রের পাশাপাশি সঙ্গীতও আরেক অস্ত্রের কাজ করে। মারণাস্ত্র তো মানুষ মারে আর সঙ্গীতাস্ত্র মানুষকে সাহস জোগায় শক্তি জোগায়। মুক্তিযোদ্ধারা এইসব গান শুনতেন আর নতুন করে যুদ্ধ করার প্রেরণা পেতেন। নতুন নতুন এলাকা মুক্ত করতেন তারা। এভাবেই একটা সময় আমাদের দেশ বিজয়ের স্বাদ গ্রহণ করে।
আমাদের ক্রীড়াঙ্গনের কথা যদি বলি—তাহলে দেখতে পাই যখন আমাদের ফুটবল কিংবা ক্রিকেট দল বিদেশের মাটিতে খেলতে যান তখন খেলা শুরুর পূর্বে জাতীয় সঙ্গীত বেজে ওঠে সাথে পতপত করে ওড়ে আমাদের জাতীয় পতাকা। যখন কোনো প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে খেলোয়াড়েরা জিতে যায় তখন নানারকম সঙ্গীত বেজে ওঠে। আনন্দে ভরে ওঠে মাঠে উপস্থিত দর্শকদের মন। গানের তালে তালে তারা নেচে ওঠেন। বিজয়ের আনন্দকে উপভোগ করেন। হাটে মাঠে ঘাটে সবখানেই গান মানুষকে শুধু বিনোদনই দেয় না শক্তিও জোগায়। এই শক্তি অনুভূতির। এই শক্তি দেশপ্রেমের।
আবার আমরা গানকে ব্যবহার করি শক্তির কথা বলতে গিয়েও। তাই গান আমাদের শান্তির উৎস। যুদ্ধের শক্তি। আর যে জাতি অস্ত্র দিয়ে নয়, হিংসা দিয়ে নয়, সুর আর স্বর দিয়ে বেঁচে থাকার প্রেরণা যোগায়, সে জাতি অবশ্যই সামনের দিকে এগিয়ে যাবেই।
গানের দেশ বাংলাদেশ
ফরিদুর রেজা সাগর
অনলাইন
২ ঘন্টা আগে
১৮ সেপ্টেম্বর (শুক্রবার), ২০২৬, ১২ঃ৩৩ (পূর্বাহ্ণ)
লিংক কপি হয়েছে!
ফন্ট সাইজ:
100%
