হঠাৎ মোহাম্মদ আলী জিন্নাহকে নিয়ে সাদিক কায়েমদের নেতৃত্বাধীন ডাকসু হঠকারী তৎপরতা শুরু করলো কেন? উল্টোদিকে ছাত্রদলই বা এর প্রতিবাদে জিন্নাহকে অস্বীকার বা অপ্রাসঙ্গিক করার অবিশ্বাস্য অপপ্রয়াসে মেতে উঠলো কেন? কায়েদে আজম মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ ছাড়া কি পাকিস্তান হতো? আর পাকিস্তান না হলে ভারত ভেঙে বাংলাদেশ হওয়ার কোনো সম্ভাবনাই ছিল না। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠায় জিন্নাহর অবদান কতটুকু? সেটা বোঝার জন্য প্রখ্যাত মার্কিন রাষ্ট্রবিজ্ঞানী এবং ক্যালিফোর্নিয়া ইউনিভার্সিটির এমিরেটাস অধ্যাপক Dr. Stanley Albert Wolpert-এর জিন্নাহর ওপর লেখা পুস্তকের এই উদ্ধৃতিটুকুই যথেষ্ট। তিনি লিখেছেন, ‘Few individuals significantly alter the course of history. Fewer still modify the map of the world. Hardly anyone can be credited with creating a nation-state. Mohammad Ali Jinnah did all three.’ না, Wolpart জিন্নাহ বা পাকিস্তানভক্ত ছিলেন না। তিনি মহাত্মাগান্ধী এবং জহরলাল নেহেরুর ওপরও গ্রন্থ লিখেছেন।
কিছু অর্বাচীন বলেন, জিন্নাহ বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার বিরোধী ছিলেন। এরা জানেন না বা জানলেও চেপে যান যে ভারত ভাগের আগে স্বাধীন সার্বভৌম বৃহত্তর বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার একটি উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল—যার নেতৃত্বে ছিলেন হুসেইন শহীদ সোহরাওয়ার্দী এবং শরত চন্দ্র বসু। জিন্নাহ তাদের প্রস্তাব মেনে নিয়েছিলেন। কিন্তু প্যাটেল এবং নেহেরুর কারণে তা ভেস্তে যায়।
জিন্নাহ পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হিসেবে যেটা বলেছিলেন—সেটা একটা মহল থেকে খণ্ডিতভাবে তুলে ধরা হয়। জিন্নাহ পাকিস্তানের ভিন্ন ভাষাভাষী প্রদেশগুলোর লিংগুয়া ফ্রাংকা হিসেবে উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করার কথা বলেন। যেমনটি ভারতে হিন্দিকে করা হয়েছে। উর্দু কিন্তু তৎকালীন পশ্চিম পাকিস্তানের কোনো প্রদেশের জনগণেরই মাতৃভাষা ছিল না এবং এখনো নেই।
পাঞ্জাবের অধিবাসীদের ভাষা পাঞ্জাবী, সিন্ধুবাসীদের ভাষা সিন্ধি, পাঠান অধ্যুষিত আগের উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশবাসীদের ভাষা পশতু, যেমন আমাদের ভাষা বাংলা। তিনি সকল প্রদেশের মানুষের সংযোগের ভাষা (লিংগুয়া ফ্রাংকা) হিসেবে উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করার কথা বলেছিলেন। হ্যাঁ, বাংলাদেশের বেশিরভাগ মানুষ উর্দু বলতে বা লিখতে পারেন না। ভারতেও তো অনেকগুলো প্রদেশের মানুষ হিন্দি ভালো জানেন না। কিন্তু হিন্দি তাদের লিংগুয়া ফ্রাংকা। জিন্নাহ পূর্ব পাকিস্তানের সরকারি ভাষা হিসেবে কখনো বাংলার বিরোধিতা করেননি।
ইতিহাস অজ্ঞ অনেকেই জানেন না যে, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ভারতের রাষ্ট্রভাষা হিন্দি করার পক্ষে মত দিয়েছিলেন। অথচ তখন সারা ভারতে সবচেয়ে বেশি মানুষের মাতৃভাষা ছিল বাংলা। ভারত যদি অখণ্ড থাকতো অর্থাৎ বাংলাদেশ ভারতের অংশ হতো তাহলে বাংলা নয়–হিন্দিই হতো আমাদের রাষ্ট্রভাষা। কই আমরা তো হিন্দিকে রাষ্ট্রভাষা করার পক্ষে মত দেয়ার জন্য রবীন্দ্রনাথের সমালোচনা করি না।
পৃথিবীতে বেলজিয়াম, কানাডার মতো ত্রিভাষী, দ্বিভাষী রাষ্ট্র আছে বটে। কিন্তু ঐসব দেশের মানুষের শিক্ষা, সংস্কৃতি, যোগাযোগ তথা সার্বিক অবস্থা আর এসব ক্ষেত্রে এই উপমহাদেশের মানুষের অবস্থা এক নয়।
অনেকে অখণ্ড ভারতকে দ্বিখণ্ডিত করার জন্য জিন্নাহকে দোষারোপ করেন। প্রথমেই বলে নেয়া উচিত ভারত কখনো দীর্ঘকাল ধরে একটি একক বা অখণ্ড রাষ্ট্র ছিল না। মোঘল আমলেও অনেক আঞ্চলিক শাসক সুযোগ পেলেই বিদ্রোহ করে স্বাধীনভাবে শাসনকাজ পরিচালনা করেছেন এবং কর দেয়াও বন্ধ করে দিয়েছেন। এমনকি দিল্লি প্রেরিত কোনো কোনো আঞ্চলিক শাসকও দিল্লির আদেশ অমান্য করে নিজেকে স্বাধীন নৃপতি ঘোষণা করেছেন। বৃটিশ আমলেই প্রথম ভারত মোটামুটি একটি একক কর্তৃত্বের অধীনে আসে।
দ্বিতীয়ত জিন্নাহ প্রথমে ভারত ভাগ করতে চাননি। স্বয়ং সরোজিনী নাইডু তাকে হিন্দু-মুসলিম ঐক্যের দূত হিসেবে আখ্যায়িত করেন। দীর্ঘদিন তিনি কংগ্রেসের রাজনীতি করেছেন। জিন্নাহর ১৪ দফা প্রস্তাব মেনে নিলে ভারত ভাগ হয় না। এমনকি কেবিনেট মিশন প্রস্তাব সামগ্রিকভাবে মেনে নিলেও একটা শ্লত ফেডারেশন হিসেবে ভারত টিকে যায়। জিন্নাহ তা মেনে নিয়েছিলেন। কিন্তু কংগ্রেস বিশেষ করে নেহেরু খণ্ডিতভাবে মানতে রাজী হন, সামগ্রিকভাবে নয়।
কেবিনেট মিশনের প্রস্তাবে ভারতের প্রদেশগুলোকে এ বি সি—এই তিন ভাগে ভাগ করে সর্বাধিক স্বায়ত্তশাসন প্রদান এবং এর আলোকে একটি ফেডারেল রাষ্ট্র গঠন করার কথা বলা হয়। মিশন পরিষ্কারভাবে বলে দেয় তাদের প্রস্তাবাবলীকে সামগ্রিকভাবে গ্রহণ করতে হবে। কিন্তু নেহেরু প্রদেশগুলোকে এ বি সি—এই তিনভাগে ভাগ করা এবং এগুলোর বর্ণীত স্বায়ত্তশাসনের ব্যাপারে আপত্তি জানিয়ে বলেন, এটা নির্ধারণ করবে প্রস্তাবিত সংবিধান প্রণয়ন সংক্রান্ত কমিটি যাতে হিন্দু সদস্যদের দুই তৃতীয়াংশেরও বেশি সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকবে। জিন্নাহ ও মুসলিম লীগ নিশ্চিত বুঝতে পারেন, কংগ্রেস এ বি সি বিভক্তি বাতিল বা মৌলিকভাবে সংশোধন করে ফেলবে।
ভারতের পশ্চিম এবং পূর্বাঞ্চলের মুসলিম প্রদেশগুলোর কাঙ্ক্ষিত স্বায়ত্তশাসন কার্যকর হবে না। কংগ্রেস কেবিনেট মিশনের প্রস্তাব কার্যত প্রত্যাখান করায় ভারত বিভক্তি অনিবার্য পরিণতির দিকে অগ্রসর হয়। জিন্নাহর ১৪ দফা দাবির নির্যাস ছিল আইনসভায় মুসলমানদের এক তৃতীয়াংশ আসন প্রদান। কেবিনেট মিশনের প্রস্তাবাবলীর একটি মৌলিক শর্ত ছিল —তিন ভাগে বিভক্ত প্রদেশগুলোর সর্বোচ্চ স্বায়ত্তশাসন নিশ্চিতকরণ। এই দাবিগুলো প্রত্যাখ্যান করে কংগ্রেস মুসলিম লীগ ও জিন্নাহকে পাকিস্তানের পক্ষে ঠেলে দিতে বাধ্য করেছে। আয়শা জালাল বলেছেন, জিন্নাহর দাবিগুলো ছিল দরকষাকষিমূলক। কংগ্রেস নমনীয় হলে অখণ্ড ভারত টিকে যেতো। ভারতের সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী যশোবন্ত সিংহ বলেছেন, ভারতবিভক্তির জন্য কংগ্রেস এবং জওহরলাল নেহেরু কম দায়ী নন। জিন্নাহ এবং মুসলিম লীগের অনমনীয় অবস্থানের কারণে ভারত বিভক্তি যখন সন্নিকটে তখন নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বসু জিন্নাহকে অখণ্ড ভারতের প্রধানমন্ত্রীর পদ গ্রহণ করার প্রস্তাব দিয়ে তা ঠেকানোর শেষ চেষ্টা করেন। আজীবন নীতিবান মানুষ জিন্নাহ ভারতের প্রধানমন্ত্রিত্বের বিনিময়ে পাকিস্তানের দাবি ত্যাগ করে আপস করতে রাজি হননি।
তিনি কীটদষ্ট (Moth eaten) তথা দাবির চেয়ে ছোট পাকিস্তান গ্রহণ করে হলেও মুসলমানদের জন্য একটা স্বতন্ত্র রাষ্ট্র আদায় করেছেন। যেখানে তারা অবদমিত না হয়ে নিরাপদে বসবাস করতে পারেন। জিন্নাহ প্রতিষ্ঠিত পাকিস্তানের ধারাবাহিকতা বা পটভূমিতেই যে বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, এই ইতিহাস কমবেশি সকলের জানা। কিন্তু হঠাৎ করে কি এমন ঘটলো যে ছাত্রশিবিরের নেতৃত্বাধীন ডাকসু যেন জিন্নাহকে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করার লক্ষ্য নিয়ে হঠকারী তৎপরতায় লিপ্ত হয়ে গেল? জিন্নাহকে অবমূল্যায়ন বা তার প্রতি অবিচার করা হয়ে থাকলে তা শোধরাবেন রাজনীতিবিদরা।
অনেকেই জানেন, শিবিরের মূল দল জামায়াতে ইসলামী এবং তাদের আদি রাজনৈতিক নেতা আবুল আ’লা মওদুদী। তিনি পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার ঘোর বিরোধিতা করে গেছেন। তবে কি সেই ভুল ভুলিয়ে দেয়ার জন্যই তারা এখন অতি জিন্নাহভক্ত ও পাকিস্তান সমর্থক বলে নিজেদের দেখাতে প্রয়াসী হয়েছেন? এর জবাবে ছাত্রদল যেটা করছে তাও তো কোনোমতেই সমর্থনযোগ্য নয়। জিন্নাহ ও পাকিস্তান বিরোধিতা করা তো ভারতীয় এবং অন্ধ ভারত-অনুগতদের রাজনীতি। তবে কি ছাত্রদল প্রকারান্তরে ছত্রলীগের রাজনীতি করছে? আরও আপত্তির বিষয় হচ্ছে মূল দল বিএনপির কোনো কোনো নেতাও জিন্নাহ বিরোধিতায় অবতীর্ণ হয়েছেন। এমনিতেই তো জামাতমনারা বিএনপিকে এখন ভারতপন্থী দল হিসেবে ট্যাগ দিচ্ছেন এবং জনমনেও এ ব্যাপারে কিছুটা পারসেপশান তৈরি হয়েছে। বিএনপির উচিত হবে তাদের কাজকর্মের মাধ্যমে এই পারসেপশানকে দূর করা, শক্ত করা নয়।
লেখক: বর্তমানে সুইডেন প্রবাসী একজন সিনিয়র বাংলাদেশি সাংবাদিক।
(মতামত লেখকের নিজস্ব)
আনিসুর রহমান।
জিন্নাহ-ডাকসু–ছাত্রদল
আনিসুর রহমান
মত-মতান্তর
২ ঘন্টা আগে
১৭ সেপ্টেম্বর (বৃহস্পতিবার), ২০২৬, ১২ঃ৪৪ (অপরাহ্ণ)
লিংক কপি হয়েছে!
ফন্ট সাইজ:
100%
