কানাডা-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কে টানাপড়েন সৃষ্টি হয়েছে প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় আসার পর থেকেই। তিনি প্রথমে কানাডাকে যুক্তরাষ্ট্রের ৫১তম রাজ্য বানানোর ঘোষণা দেন। তাতে দুই দেশের মধ্যে শুরু হয় চাপানউতোর। এর সঙ্গে যুক্ত হয় উচ্চ হারে শুল্ক আরোপ। ‘লেক অন্টারিও’র নাম পাল্টে বানিয়ে দেন ‘লেক আমেরিকা’। কানাডার নির্ধারিত কিছু পণ্যের ওপর ট্রাম্পের শতকরা ৫০ ভাগ শুল্ক আরোপ নিয়ে ওয়াশিংটনে বৈঠক করেন ট্রাম্প ও কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কারনি। কিন্তু সে বৈঠক ফলপ্রসূ হয়নি। ফলে যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার মধ্যে এক রকম দা-কুমড়ো অবস্থায় চলে এসেছে। এর ফলে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বাড়ানোর উদ্যোগ নেন মার্ক কারনি। এমন অবস্থায় কানাডাকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) প্রথম ‘সহযোগী সদস্য’ করার প্রস্তাব দিয়েছেন ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ভন ডার লিয়েন। এর পরপরই নতুন করে শুল্ক আরোপের হুমকি দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প। এ খবর দিয়েছে অনলাইন সিএনএন।
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ক্রমবর্ধমান বাণিজ্য উত্তেজনার মধ্যে নিজেদের অর্থনীতি শক্তিশালী করার লক্ষ্যে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও কানাডার ঘনিষ্ঠ হওয়ার প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে এ প্রস্তাব দেয়া হয়েছে কানাডাকে। তবে বুধবার ট্রাম্প বলেন, কানাডার সঙ্গে নতুন কোনো চুক্তিকে তিনি ‘শত্রুতামূলক পদক্ষেপ’ হিসেবে বিবেচনা করলে ইউরোপীয় ইউনিয়নের ওপর ‘ভারী শুল্ক’ আরোপ করতে পারে যুক্তরাষ্ট্র। ট্রাম্প বলেন, যদি এটি ভালো উদ্দেশ্যে করা হয়, তাহলে ঠিক আছে। যদি খারাপ উদ্দেশ্য থাকে, তাহলে আমরা ইউরোপের ওপর খুব ভারী শুল্ক আরোপ করব- এটি একটি সম্ভাবনা।
কানাডা বর্তমানে তার সবচেয়ে বড় বাণিজ্য অংশীদার যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যযুদ্ধে জড়িয়েছে। ফলে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ করার উদ্যোগে নতুন করে তাগিদ তৈরি হয়েছে। এদিকে ট্রাম্প বারবার কানাডাকে যুক্তরাষ্ট্রের ৫১তম অঙ্গরাজ্য হওয়ার আহ্বান জানিয়ে আসছেন। তবে কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কারনি এই ধারণা দৃঢ়ভাবে প্রত্যাখ্যান করেছেন। ফ্রান্সের স্ট্রাসবুর্গে উরসুলা ভন ডার লিয়েনের ‘স্টেট অব দ্য ইউনিয়ন’ ভাষণের অনুষ্ঠানে অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন কারনি। সেখানে ভন ডার লিয়েন বলেন, এই নতুন বিশ্বে আমাদের অংশীদারিত্বগুলোকে নতুন করে ভাবা এবং নিজেদের স্থিতিস্থাপকতা ও গণতন্ত্রের জন্য বৈশ্বিক জোট গড়ে তোলা জরুরি। তিনি বলেন, সংক্ষেপে বলতে গেলে, আমরা কানাডার সঙ্গে সম্পর্ককে যতটা সম্ভব সর্বোচ্চ পর্যায়ে নিয়ে যেতে চাই।
অন্যদিকে ইইউর সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তুলতে আগ্রহী কারনি। রোববার তিনি বলেন, কানাডা ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে একটি অনন্য জোট গড়ে তোলার পথে এগোচ্ছে। চলতি বছরের শুরুতে সুইজারল্যান্ডের দাভোসে দেয়া এক ভাষণে কারনি ‘মধ্যম শক্তির’ দেশগুলোকে একসঙ্গে কাজ করার প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেন। তার ভাষায়, বিশ্বব্যবস্থায় তখন একটি বড় ধরনের বিচ্ছিন্নতা তৈরি হচ্ছিল। এই পরিস্থিতির মধ্যেও বুধবার ভন ডার লিয়েন জোর দিয়ে বলেন, কানাডার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হওয়ার সিদ্ধান্ত অন্য কারও বিরুদ্ধে কোনো অংশীদারিত্ব নয়, বরং আমাদের সম্মিলিত শক্তির জন্য।
তবে গত এক বছরে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র দেশগুলোর ওপর ট্রাম্পের আরোপ করা শুল্কের প্রভাব ইউরোপীয় ইউনিয়নও মোকাবিলা করছে। কানাডা ইইউর ‘সহযোগী সদস্য’ হলে এর আওতায় ঠিক কী কী সুবিধা বা বাধ্যবাধকতা থাকবে, তা এখনও স্পষ্ট নয়। একইভাবে ইইউর ২৭টি সদস্যদেশের সবাই এ পরিকল্পনাকে সমর্থন করছে কি না, সেটিও পরিষ্কার নয়। বৃটিশ কমনওয়েলথের সদস্য কানাডার সঙ্গে ইউরোপের গভীর সাংস্কৃতিক ও ঐতিহাসিক সম্পর্ক রয়েছে। সংসদীয় গণতন্ত্র, সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা ও সামাজিক কল্যাণ ব্যবস্থাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে কানাডার কাঠামো ইউরোপীয় মডেলের সঙ্গে অনেকটাই সামঞ্জস্যপূর্ণ। এমনকি ইউরোপের সঙ্গে কানাডার একটি ছোট স্থলসীমান্তও রয়েছে। গ্রিনল্যান্ডের উত্তর-পশ্চিম উপকূলের কাছে অবস্থিত ছোট ভূখণ্ড হ্যান্স আইল্যান্ডের মাধ্যমে ডেনমার্কের সঙ্গে এই সীমান্ত। এ ছাড়া ফ্রান্সের অধীন সেন্ট পিয়ের ও মিকেলন দ্বীপপুঞ্জ নিউফাউন্ডল্যান্ডের উপকূল থেকে প্রায় ২০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত।
তবে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও আইনি মানদণ্ডের অধিকাংশ পূরণ করার সম্ভাবনা থাকলেও কানাডার ইইউর পূর্ণ সদস্য হওয়ার পথে একটি সুস্পষ্ট বাধা রয়েছে। তাহলো দেশটি ভৌগোলিকভাবে ইউরোপে অবস্থিত নয়। ইউরোপীয় ইউনিয়নে যোগ দিতে কোনো দেশকে ‘অ্যাকসেশন’ বা সদস্যপদ লাভের কঠোর বহুস্তরীয় প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হয়। আর প্রার্থিতাকে ইইউর ২৭টি সদস্যদেশের সর্বসম্মত অনুমোদন পেতে হয়। বর্তমানে ইউরোপীয় ইউনিয়নে যোগ দেয়ার অপেক্ষায় থাকা বেশ কয়েকটি দেশ রয়েছে। এর মধ্যে নয়টি দেশকে আনুষ্ঠানিকভাবে ইইউ সদস্যপদের প্রার্থী হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে।
