ফারাক্কা বাঁধ ভেঙে ফেলার দাবিতে বিহারে ফের জোরদার প্রচারাভিযান

ফন্ট সাইজ:

ভারতে ক্ষমতাসীন এনডিএ’র শরিক জনতা দল (ইউনাইটেড) ফারাক্কা চুক্তির বিরুদ্ধে তাদের বিরোধিতা জোরদার করেছে। এই লক্ষ্যে তারা গঙ্গা নদীর তীরে অবস্থিত বিহারের ১২টি জেলায় প্রচার অভিযান শুরু করেছে। গঙ্গা পানিবণ্টন চুক্তির নবায়নের বিরোধিতা করে জেডি-ইউ এখন দলের প্রধান তথা সাবেক মুখ্যমন্ত্রী নীতীশ কুমারের দীর্ঘদিনের অবস্থানের কথা উল্লেখ করে ফারাক্কা বাঁধ (ব্যারাজ) ভেঙে ফেলার দাবি জানাচ্ছে।
জেডি-ইউ-এর জাতীয় কার্যকরী সভাপতি ও রাজ্যসভার সাংসদ সঞ্জয় কুমার ঝা বলেছেন, “সাধারণ মানুষের সঙ্গে আরও নিবিড় সংযোগ স্থাপনের লক্ষ্যে আমরা এই কর্মসূচির নাম দিয়েছি ‘নীতীশ সংবাদ’। ফারাক্কা ব্যারাজের কারণে প্রচুর পলি জমে এবং বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়—তাই এই ব্যারাজ ভেঙে ফেলার দাবি নীতীশ কুমার বারবার কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে জানিয়েছেন।”
তিনি আরও বলেন, “ফারাক্কা নিয়ে নীতীশ কুমারের অবস্থান ব্যাখ্যা করা হয়েছে। বিহারের যে ১২টি জেলার মধ্য দিয়ে গঙ্গা প্রবাহিত হয়েছে, সেখানে মানুষের কাছে যাওয়ার সময় আমরা তার অডিও বার্তাও প্রচার করছি।” তিনি সরাসরি বলেছেন, “আমরা চুক্তি নবায়নের সম্পূর্ণ বিরোধী। কারণ এটি আমাদের (বিহারের) স্বার্থ রক্ষায় ব্যর্থ। বরং, বিহারে বিধ্বংসী বন্যার অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে এটি রয়ে গেছে।”
জেডি-ইউ দলটির নেতারা তাদের ‘নীতীশ সংবাদ’ প্রচার অভিযানের অংশ হিসেবে এ পর্যন্ত বক্সার, ভোজপুর, বেগুসরাই এবং খাগাড়িয়াসহ ছয়টি জেলায় প্রচারাভিযান চালিয়েছেন। সাবেক মুখ্যমন্ত্রী নীতীশ কুমার নিজে এই প্রচার অভিযানে সশরীরে অংশ নেবেন না বলে জানা গেছে।
এই প্রচার অভিযানের নেতৃত্বদানকারী সঞ্জয় ঝা জানিয়েছেন, ডিসেম্বরে গঙ্গা পানিবণ্টন চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার অনেক আগেই এই প্রচার অভিযান শেষ হবে। জেডি-ইউ-এর ‘নীতিশ সংবাদ’ (নীতিশ সংলাপ) কর্মসূচিটি এমন একটি পানি চুক্তির বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়ার প্রয়াস, যা বিহারের রাজনীতিবিদরা রাজ্যের স্বার্থের পরিপন্থী বলে মনে করেন।
১৯৯৬ সালের ১২ ডিসেম্বর ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে স্বাক্ষরিত দ্বিপাক্ষিক ‘গঙ্গা পানি বণ্টন চুক্তি’ মূলত শুখা মৌসুমে (১ জানুয়ারি থেকে ৩১ মে) ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের ফারাক্কা ব্যারেজ পয়েন্টে গঙ্গা নদীর পানি বণ্টনের বিষয়টি নিয়ন্ত্রণ করে। আগামী ডিসেম্বরে এই চুক্তির মেয়াদ শেষ হয়ে যাবে।
মুঙ্গেরে তিনি বলেন, “আমরা বর্তমানে কেবল চার মাস—জুলাই থেকে অক্টোবর—গঙ্গার পানি পাই, অথচ সারা বছরই আমাদের পানির প্রবাহ প্রয়োজন।”
১৯৭৫ সালে গঙ্গা থেকে হুগলি নদীতে পানি সরিয়ে নেওয়ার লক্ষ্যে এই বাঁধটি (ব্যারেজ) নির্মাণ করা হয়েছিল, যাতে পলি অপসারণ করা যায় এবং কলকাতা বন্দরকে নৌ-চলাচলের উপযোগী রাখা সম্ভব হয়। তবে এর ফলে ভাটির দিকে বাংলাদেশে পানির প্রবাহ কমে যায়, যা তীব্র পানির সংকট, মাটিতে লবণের পরিমাণ বৃদ্ধি এবং দক্ষিণ বাংলাদেশের বাস্তুতন্ত্রের ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলে।
১৯৯৬ সালের চুক্তিটি আগের স্বল্পমেয়াদী ও সাময়িক ব্যবস্থার পরিবর্তে ৩০ বছরের (১৯৯৬–২০২৬) একটি বাধ্যতামূলক কাঠামো তৈরি করে, যার লক্ষ্য ছিল পানির সুনির্দিষ্ট ও পূর্বাভাসযোগ্য বণ্টন নিশ্চিত করা।
১৯৭৭ সালের আগের অস্থায়ী চুক্তির বিপরীতে, ১৯৯৬ সালের চুক্তিতে “ন্যূনতম প্রবাহের নিশ্চয়তা সংক্রান্ত কোনো ধারা” নেই। যদি মোট পানির প্রবাহ ৫০,০০০ কিউসেকের অনেক নিচে নেমে যায়, তবে চুক্তিতে কেবল উভয় সরকারের মধ্যে জরুরি আলোচনার কথা বলা হয়েছে। পলি জমা, ভূগর্ভস্থ পানির প্রবাহ কমে যাওয়া, উজানে পানি প্রত্যাহার এবং বৃষ্টিপাতের অনিয়মিত ধরন—এসব কারণে ১৯৯৬ সালের ভিত্তিমূলের তুলনায় বিহারে নদীর প্রকৃত পানি প্রাপ্তির পরিমাণে পরিবর্তন এসেছে।
দুই দশক ধরে বিহার সরকার—প্রথমে নীতীশ কুমারের অধীনে এবং বর্তমানে সম্রাট চৌধুরীর অধীনে—কেন্দ্রের কাছে এই বাঁধ নিয়ে উদ্বেগ জানিয়ে আসছে।
বিহার সরকারের যুক্তি হলো, এই কাঠামোটি উজানে “বন্যা ও খরা”-র এক তীব্র পরিস্থিতি তৈরি করেছে। বাঁধের পেছনে বিপুল পরিমাণ পলি জমে গঙ্গার তলদেশ অনেক উঁচুতে উঠে গেছে, যা নদীর স্বাভাবিক পানি ধারণক্ষমতা নষ্ট করেছে এবং বর্ষাকালে ভাগলপুর ও মুঙ্গেরের মতো জেলাগুলোতে তীব্র মৌসুমী বন্যা ডেকে আনছে।
তবে বিহারের বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী সম্রাট চৌধুরী জোর দিয়ে বলেছেন যে, গঙ্গা চুক্তির ক্ষেত্রে বিহারের স্বার্থ রক্ষা করা প্রয়োজন। ইতিমধ্যেই এই দাবি জানিয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্করের সঙ্গে বৈঠকও করেছেন।