অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সিদ্ধান্তের কারণে গত ফেব্রুয়ারিতে ভারত ও শ্রীলঙ্কায় শেষ হওয়া আইসিসি টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ-২০২৬ খেলতে যায়নি বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট দল। এরপর বিএনপি সরকার গত মে মাসে বিশ্বকাপে খেলতে না যাওয়ার কারণ অনুসন্ধানে তদন্ত কমিটি গঠন করে। যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয় তিন সদস্যের সেই তদন্ত কমিটি গতকাল তাদের প্রতিবেদন প্রকাশ করে। সংবাদ সম্মেলনে তদন্ত কমিটি জানায়, তখনকার ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ নজরুলের সিদ্ধান্তে ভারতে বিশ্বকাপ খেলতে যায়নি বাংলাদেশ দল। তদন্ত কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার ফয়সাল দস্তগীর সংবাদমাধ্যমকে বলেন, ‘তদন্তে পাওয়া তথ্য, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে আমাদের আলোচনা, গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনসহ সার্বিক বিষয় পর্যালোচনা করে বলা যায়, বিশ্বকাপে না যাওয়ার পেছনে তৎকালীন যুব ও ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ নজরুলই দায়ী। সে সময়ের সরকার ও তিনি এর জন্য দায়ী।’ অতিরিক্ত সচিব ড. এ. কে. এম ওয়ালী উল্লাহ বলেন, ‘সিদ্ধান্ত একজনের মাধ্যমে তো আসবে। সে সিদ্ধান্ত তো একজনের বলা যায় না। সরকারি সিদ্ধান্ত। সরকারের সিদ্ধান্তের বাইরে আমরা কেউ নই। যখন যে সরকারের সিদ্ধান্ত থাকে, তাদের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত।’ তিনি বলেন, ‘সিদ্ধান্ত সঠিক না বেঠিক, সেটা কীভাবে বলবো? আপনারা চিন্তা করতে পারেন। সরাসরি বলবো না যে সরকার সিদ্ধান্ত ভুল করেছে। এটা আমরা ভারত বলতে পারবো না।’
২২ পৃষ্ঠার যে তদন্ত প্রতিবেদন সংবাদমাধ্যমকে দেয়া হয়, সেখানে ১২ জন ব্যক্তির সাক্ষাৎকার নেয়ার কথা উল্লেখ করে তদন্ত কমিটি এবং তাদের বক্তব্যের সারসংক্ষেপ তুলে ধরা হয়। সেখানে ক্রিকেটারদের মধ্যে আছেন বাংলাদেশের টি-টোয়েন্টি অধিনায়ক লিটন কুমার দাস ও টেস্ট অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্ত। ক্রিকেট আঙিনা থেকে সাক্ষাৎকার নেয়া হয় সাবেক অধিনায়ক ও বর্তমান বিসিবি সভাপতি তামিম ইকবাল খান, বোর্ডের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও এশিয়ান ক্রিকেট কাউন্সিলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল হক, বিসিবি’র প্রধান নির্বাহী নিজাম উদ্দিন চৌধুরী, বিসিবি’র কোচ ও ওই সময়ে জাতীয় দলের সিনিয়র সহকারী কোচ মোহাম্মদ সালাউদ্দিন এবং ওই সময়ের বিসিবি’র পরিচালক ও ক্রিকেট পরিচালনা বিভাগের প্রধান নাজমুল আবেদীনের।
যুব ও ক্রীড়া সচিব মো. মাহবুব-উল-আলমের সঙ্গেও কথা বলে কমিটি। সংবাদমাধ্যমের প্রতিনিধি হিসেবে এই কমিটি সাক্ষাৎকার নেয় বাংলাদেশ স্পোর্টস জার্নালিস্টস এসোসিয়েশনের সভাপতি আরিফুর রহমান বাবু, সাধারণ সম্পাদক এস এম সুমন এবং বাংলাদেশ স্পোর্টস প্রেস এসোসিয়েশনের সভাপতি রেদুয়ানুজ্জামান ও সাধারণ সম্পাদক সুদীপ্ত আহমেদের। তবে বিতর্কের কেন্দ্রে যে দু’জন, সাবেক ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ নজরুল ও সেই সময়ের বিসিবি প্রধান আমিনুল ইসলাম বুলবুল, তাদের সঙ্গে বারবার নানা মাধ্যমে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও সাড়া মেলেনি বলে জানায় তদন্ত কমিটি। ওই সময়ের বোর্ড পরিচালক ও ক্রিকেট পরিচালনা বিভাগের প্রধান নাজমুল আবেদীন তদন্ত কমিটির কাছে বলেন, ‘ক্রিকেটারদের বিশ্বকাপে যাওয়ার ইচ্ছা ছিল।
তবে সরকার যদি এরকম সিদ্ধান্ত নেয়, ক্রিকেট বোর্ড সেই সিদ্ধান্ত মানতে বাধ্য।’ সরকারি সিদ্ধান্ত বলেই যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের তদন্ত কমিটি কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তিকে দায়ী বা শাস্তির সুপারিশ করেনি তাদের প্রতিবেদনে। তাদের সুপারিশে যেসব বলা হয়েছে, তুলে দেয়া হলো এখানে- ২০২৬ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ থেকে বাংলাদেশের নাম প্রত্যাহার নিয়ে প্রকাশ্য বিতর্ক, টেলিভিশন সাক্ষাৎকার এবং বিভিন্ন গণমাধ্যমের প্রতিবেদনের ভিত্তিতে ভবিষ্যৎমুখী বেশ কিছু সুপারিশ করা হয়। চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের জন্য কে দায়ী- এ নিয়ে মতভেদ থাকলেও, ভবিষ্যতে বাংলাদেশ ক্রিকেটের একই ধরনের পরিস্থিতি এড়ানো উচিত, এ বিষয়ে ব্যাপকভাবে ঐকমত্য রয়েছে। ১. রাজনৈতিক বিরোধ থেকে ক্রিকেটকে আলাদা করা: অনেক বিশ্লেষক ও মন্তব্যকারী মনে করেন, সম্ভব হলে আন্তর্জাতিক ক্রীড়ায় অংশগ্রহণকে কূটনৈতিক উত্তেজনা থেকে দূরে রাখা উচিত। খেলোয়াড় ও সমর্থকদের স্বার্থ সুরক্ষিত রেখে ভূরাজনৈতিক বিরোধ মোকাবিলা করতে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) একটি আনুষ্ঠানিক নীতি প্রণয়ন করা উচিত।
২. বিসিবি’র স্বাধীনতা জোরদার করা: এই বিতর্কে সিদ্ধান্তটি সরকার, বিসিবি নাকি খেলোয়াড়দের পক্ষ থেকে এসেছে, তা নিয়ে বিভ্রান্তি তৈরি হয়। ভবিষ্যতে পরিচালনাগত সংস্কারের মাধ্যমে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা এবং যোগাযোগের দায়িত্ব কার, স্পষ্টভাবে নির্ধারণ করা উচিত। ৩. সংকটকালীন যোগাযোগব্যবস্থা উন্নত করা: কর্মকর্তাদের ও খেলোয়াড়দের পরস্পরবিরোধী বক্তব্য জনমনে অনিশ্চয়তা সৃষ্টি করেছে। ভবিষ্যতে এ ধরনের বিরোধের ক্ষেত্রে একজন নির্ধারিত মুখপাত্র এবং একটি স্বচ্ছ যোগাযোগ কৌশল গ্রহণ করলে জনসাধারণের আস্থা বজায় রাখতে সহায়তা করবে। ৪. খেলোয়াড়দের কল্যাণ ও নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দেয়া: যদি প্রকৃত নিরাপত্তাজনিত উদ্বেগ থাকে, তাহলে স্বাধীনভাবে নিরাপত্তা মূল্যায়ন করা উচিত এবং সিদ্ধান্তগুলো যাতে বাস্তব তথ্য ও প্রমাণের ভিত্তিতে নেয়া হয়, তা নিশ্চিত করতে সেই মূল্যায়নের ফল খেলোয়াড়, আইসিসি কর্মকর্তা এবং সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের সঙ্গে শেয়ার করা উচিত।
