বাকস্বাধীনতা চর্চা করলে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে মামলা দেয়া হচ্ছে: টিআইবি

ফন্ট সাইজ:

গণ-অভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে বাকস্বাধীনতা হরণ, মামলা নিয়ে হয়রানি, জেল ইত্যাদি কমে যাওয়ার কথা থাকলে বাস্তবে উল্টো চিত্র দেখেছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। গতকাল ঢাকার টিআইবি কার্যালয়ে আন্তর্জাতিক গণতন্ত্র দিবস উপলক্ষে আয়োজিত এক আলোচনা সভায় এই প্রতিক্রিয়া তুলে ধরে টিআইবি। টিআইবি’র নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ‘এখন মামলার সংখ্যা বিগত বছরের তুলনায় বেড়েছে। ৮৯ জনকে আটক করা হয়েছে, তার মধ্যে বেশির ভাগই হচ্ছে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে। বাকস্বাধীনতার চর্চার কারণে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে মামলা দেয়া হচ্ছে; আটক করা হয়- এটি ২৪ পরবর্তী বাংলাদেশের কাছে প্রত্যাশিত ছিল না।’ আলোচনায় টিআইবি’র নির্বাহী পরিচালকের কথার জবাবে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ড. মাহদী আমিন বলেন, ‘গত ৭ মাসে রাষ্ট্রের মদতে সরকারের প্রশাসনিক কারণে কোনো ধরনের মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটেছে বলে আমার মনে পড়ে না। ‘রাষ্ট্রের মদতে’ এই কারণে বলছি, এর আগে আমরা দেখেছি একটি নির্দিষ্ট অফিস থেকে রাষ্ট্রের শীর্ষ পর্যায়ের ব্যক্তিদের তালিকা করা হতো নিজ গৃহে, কিংবা সরাসরি হেফাজতে।’

আলোচনায় ড. ইফতেখারুজ্জামান আরও বলেন, নারী, কন্যাশিশু ও মানুষের জীবনের নিরাপত্তা ও নিরাপত্তাহীনতা, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি যৌক্তিক কারণেই হয়তো বা এখনও আগের মতো স্বাভাবিকতায় ফিরে আসেনি। পুলিশ পুরোপুরি তাদের জায়গায় সঠিকভাবে দাঁড়াতে পারেনি। তা সত্ত্বেও বেশ কিছু বিষয়ে আমাদেরকে উদ্বিগ্ন হতে হয়Ñনারী, কন্যাশিশুর প্রতি সহিংসতার ঘটনা অন্তত ১,৭৩০-এর বেশি ঘটেছে। যার মধ্যে ৫০৩টি ধর্ষণের ঘটনা, অন্তত ৫০ জনের মৃত্যু ঘটেছে।’
তিনি বলেন, ‘আটকে নির্যাতন- যেটা টর্চার ইন কাস্টডি; এটা একদম হওয়ার কথাই ছিল না, এখনও এই ঘটনা ঘটেছে এবং সরাসরি আইন প্রয়োগকারী সংস্থার হাতে ৭ জনের মৃত্যু ঘটেছে। অন্তত একটা ডিসঅ্যাপিয়ারেন্সের ঘটনা ঘটেছে, যেখানে একটা আইন প্রয়োগকারী সংস্থা জড়িত। এই বিষয়গুলো অবশ্যই আমাদেরকে সত্যিকার অর্থে উদ্বিগ্ন করে।’
তিনি আরও বলেন, অবস্থা আগের মতোই এবং যেটা বিশেষ করে ২৪ পরবর্তী বাংলাদেশে। বিশেষ করে মানবাধিকার, সুরক্ষা, ন্যায়বিচার এবং রাষ্ট্রকাঠামোকে জবাবদিহিমূলক জায়গায় নিয়ে যাওয়ার জন্য যে ধরনের আইন- সকল আইনের ক্ষেত্রেই এটা প্রযোজ্য।

আলোচনা সভায় মাহদী আমিন বলেন, অন্ততপক্ষে গত সাত মাসে সরকারের মানবাধিকার এবং বাকস্বাধীনতার ক্ষেত্রে আমরা যে ট্র্যাক রেকর্ড দেখছি, যেখানে রাষ্ট্রীয় মদতে কিংবা রাজনৈতিক কারণে কাউকে হয়রানি করা হচ্ছে নাÑ এই স্পিরিটটাকে আমরা ধরে রাখতে চাই। যদি বিচ্ছিন্নভাবে কোথাও কিছু হয়ে থাকে, অনেক বড় দেশ- স্বাভাবিকভাবেই বিচ্ছিন্নভাবে একদম তৃণমূলেও যদি কোথাও ভুলভ্রান্তি হয়ে থাকে; এই জায়গাটাতেইÑযখনই আমাদের কেন্দ্রীয় পর্যায়ে এই তথ্য আসছে, সঙ্গে সঙ্গে এর এগেইনস্টে রেকটিফিকেশন করা হচ্ছে, অ্যাকশন নেয়া হচ্ছে।
মাহদী আমিন বলেন, ‘আমরা যা দেখছি বর্তমানে বিশাল রাষ্ট্র পরিচালনায় কোথাও যদি বিচ্ছিন্নভাবে ভুলভ্রান্তি থেকে থাকে, অনাকাক্সিক্ষত কোনো ঘটনা ঘটে থাকে, সেটারও কিন্তু জবাবদিহিতা চলে এসেছে।

তিনি বলেন, অধ্যাদেশকে আইনে রূপান্তরের ক্ষেত্রে প্রায় ১০০টির মতো অধ্যাদেশকে পার্লামেন্টের ফার্স্ট সেশনে আইনে রূপান্তর করা হয়েছে। এত দ্রুততম সময়ে এতগুলো আইন বাস্তবায়ন করা আগে কখনও হয়নি। কিছু ক্ষেত্রে আমাদের সহকর্মীরা কথা বলেছেন। আমরা চেষ্টা করেছি যারা আইন প্রণয়নের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত তাদের কাছে সেই বার্তাটা পৌঁছে দেয়ার জন্য। প্রেসিডেন্টের অধ্যাদেশ ইতিমধ্যেই পাবলিশ করা হয়েছে। তবে এটি চলমান প্রক্রিয়া। যেকোনো আইন একবার প্রণয়ন করার পরে সংশোধনের সুযোগ থাকে। সেটাকে আরও কীভাবে গ্লোবাল স্ট্যান্ডার্ডে নিয়ে যাওয়া যায়, সে ব্যাপারে সিভিল সোসাইটির কনসালটেশন রয়েছে।

এসময় আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির সভাপতি পঞ্চগড়-১ আসনের সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার মুহাম্মদ নওশাদ জমির বলেন, আমরা বিশ্বাস করি, শুধু আমাদের সাংবিধানিক পরিবর্তনই শুধু আসল কথা নয়, আমাদের নিজেদের চলার এবং সংস্কৃতির পরিবর্তনও প্রয়োজন। আপনারা নিজেরা হয়তো নিজেরা দুর্নীতি করেননি, কিন্তু দুর্নীতির শিকার হননি এ রকম কতজন আছেন? এবং সেটার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছেন কতজন আছেন? আমরা সবাই যদি আলোচনা করি, ঘাত-প্রতিঘাত এবং আলোচনা-সমালোচনার মধ্য দিয়েই বাংলাদেশ সামনের দিকে এগিয়ে যাবে।

আলোচনা সভায় যোগ দিয়ে চিকিৎসক ও রাজনীতিক ডা. তাসনিম জারা বলেন, যে সমস্ত আইন পাস করানো হচ্ছে সেখানে জনগণের অংশগ্রহণ কতটুকু ছিল? এসব ক্ষেত্রেও যে আমরা খুব পরিবর্তন দেখছি না। বরং নাম, রং কিংবা কাভার পরিবর্তন হচ্ছে কিন্তু ভেতরে যা ছিল তা মূলত আছেই। আমাদের রাইটস আমাদেরই রক্ষা করতে হবে। আমরা যখন এটা রক্ষা করা বন্ধ করে দেবো, অধিকার হরণ করার জন্য অনেকেই বসে আছে।

বাসদের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য ডা. মনীষা চক্রবর্তী বলেন, আমাদের দেশেও যদি আমরা ঠিকই বলি যে ক্ষমতার উৎস জনগণÑ কিন্তু ক্ষমতার উদ্দেশ্য কি জনগণ? ক্ষমতার উদ্দেশ্য যদি জনগণ হতো, তাহলে তো সেগুলোর পলিসিতে, আমরা প্রতিফলন দেখতাম। তিনি বলেন, শুরুতেই সংসদে আমাদের বেশির ভাগ সংসদ সদস্য একটা মিথ্যা বলেন। নির্বাচনে তারা ব্যয়সীমার চেয়ে অনেক বেশি টাকা খরচ করেন এবং সেই ধরনের একটা ব্যবস্থার মধ্য থেকে সংসদে গিয়ে শুরুতেই সেটা অস্বীকার করতে দেখি। এবং তারপরে সংসদে যে আইনগুলো তাদেরকে পাস করতে দেখি, যে কথাগুলো আমরা বলতে দেখি, সেগুলোও এই ব্যবসায়ীদের পক্ষেই আমরা বলতে দেখি। ফলে ডেমোক্রেসি এখন অব দ্য বিজনেসম্যান, ফর দ্য বিজনেসম্যান, বাই দ্য বিজনেসম্যান-এ পরিণত হয়েছে। ডেমোক্রেটিক পিপলের জন্য আর ডেমোক্রেসি নাই।
আলোচনা সভায় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও ইয়থ এক্টিভিস্টরা যোগ দেন।