দেশ জুড়ে বিদ্যুতের টানাপড়েন। একদিকে বিদ্যুতের ঘাটতি, অন্যদিকে ঘন ঘন লোডশেডিং। এর মধ্যেই মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলে রাতভর চলছে ইজিবাইক, অটোরিকশা ও ব্যাটারিচালিত ভ্যানের ব্যাটারি চার্জ। উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় গড়ে ওঠা গ্যারেজ ও চার্জিং পয়েন্টে একসঙ্গে শত শত ব্যাটারি চার্জ দেয়ায় বিদ্যুতের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, এসব যানবাহনের ব্যাটারি চার্জ দিতে উপজেলার বিভিন্ন স্থানে গড়ে ওঠা চার্জিং পয়েন্ট ও গ্যারেজে অবৈধ সংযোগ ব্যবহার করা হচ্ছে। এতে বিদ্যুতের ওপর অতিরিক্ত চাপ পড়ার পাশাপাশি সরকার রাজস্ব থেকেও বঞ্চিত হচ্ছে। স্থানীয় বিদ্যুৎ বিভাগ ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, শ্রীমঙ্গল উপজেলায় কয়েক হাজার ব্যাটারিচালিত যানবাহন চলাচল করছে।
এসব যানবাহনের একটি বড় অংশ রাতের বেলায় বিভিন্ন গ্যারেজ ও চার্জিং পয়েন্টে রাখা হয়। এ উপজেলায় মোট ১১৫টি বৈধ চার্জিং স্টেশন রয়েছে। সেখানে কয়েক ঘণ্টা ধরে ব্যাটারি চার্জ দেয়া হয়। অভিযোগ রয়েছে, এসব স্টেশন ছাড়াও উল্লেখযোগ্য অনেক অংশে বৈধ মিটারের পরিবর্তে অবৈধ সংযোগ ব্যবহার করা হচ্ছে। মৌলভীবাজার পল্লী বিদ্যুৎ অফিসের তথ্য অনুযায়ী, উপজেলায় তাদের প্রায় ১ লাখ ১৩ হাজার ৮৬৬ জন গ্রাহক রয়েছেন। তাদের মাসিক গড় বিদ্যুৎ ব্যবহার প্রায় ১ কোটি ৮০ লাখ ইউনিট। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের দেয়া হিসাব অনুযায়ী, একটি ইজিবাইকে সাধারণত চার থেকে পাঁচটি ১২ ভোল্টের ব্যাটারি থাকে। ব্যাটারি পুরোপুরি চার্জ দিতে প্রায় ছয় থেকে সাত ঘণ্টা সময় লাগে এবং এতে প্রায় আট থেকে ১০ ইউনিট বিদ্যুৎ খরচ হয়। অটোরিকশা ও ব্যাটারিচালিত ভ্যানের ক্ষেত্রে ব্যাটারি চার্জে প্রায় তিন ইউনিট বিদ্যুৎ প্রয়োজন হয়। শ্রীমঙ্গল পৌরসভা ও শ্রমিক সংগঠনের তথ্য অনুযায়ী, উপজেলায় প্রায় ৭ হাজার অটোরিকশা, ইজিবাইক ও ব্যাটারিচালিত ভ্যান রয়েছে।
এই হিসাব ধরে প্রতিদিন এসব যানবাহনের ব্যাটারি চার্জে বিপুল পরিমাণ বিদ্যুৎ ব্যবহৃত হচ্ছে। সংশ্লিষ্টদের ধারণা, সব ধরনের ব্যাটারিচালিত যানবাহন মিলিয়ে মাসে প্রায় ২১ লাখ ইউনিট বিদ্যুৎ এ কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে। টাকার হিসেবে প্রায় ১ কোটি ৭০ লাখ টাকা। স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, যাত্রী পরিবহনে তুলনামূলক কম ভাড়ার কারণে ইজিবাইক ও ব্যাটারিচালিত রিকশা-ভ্যানের সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। শ্রীমঙ্গল পৌর শহর ও বাজার এলাকায় এসব যানবাহনের চলাচল বেশি। চালকদের অনেকে বিভিন্ন গ্যারেজে রাতের জন্য গাড়ি রেখে ব্যাটারি চার্জ করান। এর বিনিময়ে গাড়ি প্রতি প্রায় ১০০ থেকে ১৫০ টাকা পর্যন্ত গ্যারেজ মালিককে দিতে হয় বলে কয়েকজন চালক জানিয়েছেন। শ্রীমঙ্গল পৌরসভা সূত্রে জানা গেছে, শহরে প্রায় ২ হাজার ৫০০টি ইজিবাইক, অটোরিকশা ও ভ্যান চলাচল করছে। এর মধ্যে ৫৯৫টি যানবাহনের লাইসেন্সের জন্য আবেদন করা হয়েছে।
টমটম মালিক ও চালকদের পরিচয় শনাক্তের লক্ষ্যে তাদের তথ্য থানায় পাঠানো হয়েছে। স্থানীয়ভাবে অবশ্য এর বাইরেও অনেক ব্যাটারিচালিত যানবাহন চলাচল করছে বলে অভিযোগ রয়েছে। সরজমিন বিভিন্ন চার্জিং পয়েন্ট ও গ্যারেজে দেখা যায়, অনেক জায়গায় একসঙ্গে একাধিক গাড়ির ব্যাটারি চার্জ দেয়া হচ্ছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, কিছু গ্যারেজে মিটারের বাইরে সংযোগ নেয়া হয়েছে। কোথাও কোথাও মিটার কারসাজির মাধ্যমেও বিদ্যুৎ ব্যবহারের অভিযোগ রয়েছে। গ্যারেজ মালিকদের কয়েকজন জানান, ব্যাটারি চার্জ দিতে বৈধ সংযোগের মাধ্যমে বিদ্যুৎ ব্যবহার করলে বিদ্যুৎ বিল বেশি আসে। ফলে অনেকে খরচ কমাতে অবৈধ সংযোগের দিকে ঝুঁকছেন। তবে অবৈধ সংযোগ নেয়ার অভিযোগের সঙ্গে বিদ্যুৎ বিভাগের কিছু অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীর সম্পৃক্ততার অভিযোগও রয়েছে। এ অভিযোগের পক্ষে কোনো নির্দিষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায়নি। শ্রীমঙ্গল পৌর শহরের বাসিন্দা শাহজাহান আহমেদ বলেন, দিনে বিদ্যুৎ থাকলেও সন্ধ্যার পর থেকে বিভিন্ন সময়ে লোডশেডিং হয়।
অন্যদিকে রাতভর গ্যারেজগুলোতে একসঙ্গে অনেক ব্যাটারি চার্জ দেয়া হয়। এতে বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থায় বাড়তি চাপ তৈরি হচ্ছে কি না, তা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদন্তের বিষয় বলে তারা মনে করেন। মৌলভীবাজার পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির সিনিয়র জেনারেল ম্যানেজার সুজিত কুমার বিশ্বাস বলেন, ‘চার্জিং পয়েন্টের জন্য আমাদের ১১৫টি বৈধ সংযোগ রয়েছে। অবৈধ সংযোগের বিষয়ে আমাদের অভিযান চলমান রয়েছে। লোডশেডিং সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘চাহিদার তুলনায় আমরা কম বিদ্যুৎ পাচ্ছি। যে পরিমাণ বিদ্যুৎ পাওয়া যায়, চাহিদা অনুযায়ী সেটিই বিতরণ করা হয়। জ্বালানি ঘাটতির কারণেও লোডশেডিং হচ্ছে। তবে স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, শুধু অভিযান পরিচালনা নয়, অবৈধ চার্জিং পয়েন্টগুলো চিহ্নিত করে নিয়মিত নজরদারি ও বৈধ সংযোগ নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
