পদ্মা, যমুনা ও কালীগঙ্গার বুক চিরে অবৈধভাবে বালু ও মাটি উত্তোলনের মহোৎসব কোনোভাবেই থামছে না। মানিকগঞ্জের নদ-নদীগুলো এখন প্রভাবশালী ও ‘বালুখেকো’ চক্রের কবলে জিম্মি হয়ে পড়েছে। ক্ষমতার পালাবদল ঘটলেও অবৈধ এই বাণিজ্যের রুটিন ও চরিত্র বদলায়নি। বিগত সরকারের আমলের পথ অনুসরণ করেই বর্তমান রাজনৈতিক পরিচয়ের ছত্রচ্ছায়ায় পৃথক কয়েকটি চক্র এই ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। প্রশাসন মাঝেমধ্যে অভিযান চালালেও নদী ধ্বংসের এই প্রক্রিয়া স্থায়ীভাবে বন্ধ হচ্ছে না। সর্বশেষ সোমবার দুপুরে মানিকগঞ্জের ঘিওর উপজেলার সিংজুরী ইউনিয়নের কালীগঙ্গা নদীর পূর্ব কোশুন্ডা গ্রামের সড়কঘাটা (আশাপুর) এলাকায় অবৈধভাবে মাটি কাটার প্রতিবাদ করায় স্থানীয়দের ওপর হামলার ঘটনা ঘটে।
এতে নারী ও শিশুসহ অন্তত সাতজন আহত হয়েছেন। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ট্রলার ও ভলগেট নিয়ে নদীর তীর থেকে মাটি কাটতে আসে একটি প্রভাবশালী চক্র। এতে বাধা দিলে সাবেক যুবদল নেতা আল আমিন, সাবেক ছাত্রদল নেতা সম্রাট, লোকমান, স্থানীয় বিএনপি নেতা আখতার মেম্বার, হযরত, রানিং ইউপি সদস্য গুলজার ও মানিকসহ ২০-২৫ জনের একটি দল অতর্কিত হামলা চালায়। নদীর তীর ও ফসলি জমি রক্ষায় স্থানীয়রা প্রতিবাদ করলে উভয়পক্ষের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া ও সংঘর্ষের সৃষ্টি হয়। এ ঘটনায় আহত আব্দুল মান্নান (৫০), কাশেম (৪৪), নান্নু (৪২), আব্দুল্লাহ, জাহিদ (২২), পলাশ (১৮) ও রফিককে দ্রুত উদ্ধার করে মানিকগঞ্জ সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। এদিকে একইদিন সোমবার মানিকগঞ্জের তরা কালীগঙ্গা সেতুর নিচে অবৈধভাবে ডাম্পিং করে বালু মজুতের প্রস্তুতি নেয় আরেকটি চক্র। খবর পেয়ে জেলা প্রশাসনের সহকারী কমিশনার ও এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট উম্মে সুমাইয়া তাৎক্ষণিকভাবে ঘটনাস্থলে গিয়ে ড্রেজার মেশিনের পাইপ অপসারণ করেন এবং জড়িতদের কঠোরভাবে সতর্ক করেন। শুধু ঘিওরই নয়, মানিকগঞ্জ জেলার অন্যান্য নদীবেষ্টিত উপজেলাগুলোতেও অবৈধ বালু উত্তোলনের কারণে জনজীবন ও প্রাকৃতিক পরিবেশ চরম হুমকির মুখে পড়েছে।
হরিরামপুর উপজেলার পদ্মা, শিবালয় ও দৌলতপুর উপজেলার যমুনা নদীতেও চলছে একই রকম অবৈধ বালু উত্তোলনের মহোৎসব। ভুক্তভোগীরা প্রতিবাদ করলেও প্রভাবশালী চক্রের ভয়ে মুখ খুলতে সাহস পান না। নদীভাঙন কবলিত মানিকগঞ্জের সাধারণ মানুষ এই অবৈধ বালু উত্তোলন ও মাটি কাটার বিরুদ্ধে আরও কঠোর ও নিয়মিত অভিযানের দাবি জানিয়েছেন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক স্থানীয় বাসিন্দা জানান, রাজনৈতিক পরিচয়ের আড়ালে যারা সাধারণ মানুষের ভিটেমাটি ও ফসলি জমি হুমকির মুখে ফেলছে, তাদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক আইনি ব্যবস্থা না নিলে জেলার নদী তীরবর্তী জনপদগুলো আরও বেশি বিপর্যস্ত হয়ে পড়বে।
