রাঙ্গামাটির বাঘাইছড়ির সাজেকে শান্তিলাল চাকমাকে গলা কেটে করে হত্যা করে তার রক্ত পান করার ঘটনায় দায়েরকৃত হত্যা মামলায় দুই আসামিকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন আদালত। দণ্ডপ্রাপ্তরা হলো, আলোময় চাকমা (৩২) ও সোহেল চাকমা (২২)। সম্পর্কে আলোময় নিহত শান্তিলাল চাকমার ভাতিজা এবং সোহেল চাকমা তার (ভিকটিম) ছেলে। একই সঙ্গে প্রত্যেককে ৫০ হাজার টাকা করে অর্থদণ্ড দেয়া হয়েছে। পলাতক মূল হত্যাকারী আলোময় চাকমা পার্বত্য চুক্তি বিরোধী সশস্ত্র সংগঠন ইউপিডিএফ’র সক্রিয় একজন সন্ত্রাসী বলে আদালত সূত্র জানিয়েছে। মঙ্গলবার দুপুরে রাঙ্গামাটির জেলা ও দায়রা জজ মো. আহসান তারেক নিজ এজলাসে এ রায় ঘোষণা করেন।
আদালতসংশ্লিষ্টরা জানান, রাঙ্গামাটি জেলা ও দায়রা জজ আদালত প্রতিষ্ঠার পর ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের নির্দেশ দিয়ে এটিই প্রথম রায়। রায়ের সময় আসামি সোহেল চাকমা আদালতে উপস্থিত থাকলেও প্রধান আসামি ভিকটিমের ভাতিজা আলোময় চাকমা জামিনের পর হতেই পলাতক রয়েছে। রাঙ্গামাটির জেলা ও দায়রা জজ আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) সিনিয়র আইনজীবী এডভোকেট প্রতিম রায় পাম্পু রায়ের বিষয়টি প্রতিবেদক আলমগীর মানিককে নিশ্চিত করেছেন। এদিকে এই রায়ের বিরুদ্ধে দ্বিতীয় আসামি ভিকটিমের ছেলে সোহেল চাকমার আইনজীবী জানিয়েছেন, তারা আসামিদের পরিবারের সঙ্গে কথা বলে উচ্চ আদালতে এই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করবেন। মামলার নথি ও সাক্ষ্য অনুযায়ী, ২০১৭ সালের ৬ই আগস্ট রাত সাড়ে ১০টার দিকে আলোময় ও সোহেল চাকমা ভিকটিম শান্তিলাল চাকমাকে তার ঘর থেকে তুলে নিয়ে যান।
পরে প্রায় ২০০ গজ দূরে একটি রাস্তায় গলায় গামছা পেঁচিয়ে তাকে আটকে দা দিয়ে গলা কেটে হত্যা করা হয়। এ সময় হত্যাকারী আলোময় চাকমা ভিকটিমের রক্ত পান করে বলেও জবানবন্দিতে জানায়। এরপর লাশটি কাঠের সঙ্গে বেঁধে প্রায় এক কিলোমিটার দূরে গঙ্গারাম নদীতে ফেলে দেয়া হয়। ঘটনার প্রায় নয়দিন পর কাচালং নদীর লাইল্যাগোনা এলাকায় শান্তিলালের পচনধরা মরদেহ উদ্ধার করা হয়। পরে ময়নাতদন্তের জন্য মরদেহ খাগড়াছড়ি সদর হাসপাতালে পাঠানো হয়। এ ঘটনায় স্থানীয় বাসিন্দা বিনয় শঙ্কর চাকমা সাজেক থানায় মামলা করেন। ২০১৭ সালের ১৫ই অক্টোবর তদন্ত শেষে দুই আসামির বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র দেয়া হয়।
২০১৮ সালের ২৮শে মার্চ অভিযোগ গঠন করা হয়। দীর্ঘ বিচারপ্রক্রিয়ায় রাষ্ট্রপক্ষের সাক্ষ্য, নথিপত্র ও অন্যান্য প্রমাণ উপস্থাপন করা হয়। রায়ের পর্যবেক্ষণে আদালত বলেন, হত্যাকাণ্ডে দুই আসামিরই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। আলোময় চাকমা ভিকটিম শান্তিলালকে ঘর থেকে বের করে তার গলায় গামছা প্যাঁচান এবং ভিকটিমের ঔরসজাত ছোট ছেলে সোহেল চাকমা গামছার অপর প্রান্ত ধরে তাকে সহযোগিতা করেন। ফলে একজনকে অপরজনের তুলনায় লঘুদণ্ড দেয়ার সুযোগ নেই। আদালত আরও বলেন, মামলার এজাহার, অভিযোগপত্র, সুরতহাল ও ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনসহ সাক্ষ্য-প্রমাণ পর্যালোচনায় রাষ্ট্রপক্ষ আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করতে সক্ষম হয়েছে। হত্যাকাণ্ডটিকে আদালত অত্যন্ত নৃশংস ও নিষ্ঠুর হিসেবে উল্লেখ করেন। মামলার সাক্ষ্যপ্রমাণে হত্যার পর ভিকটিমের রক্ত পান করার অভিযোগও উঠে আসে।
জেলা ও দায়রা জজ আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) সিনিয়র আইনজীবী এডভোকেট প্রতিম রায় পাম্পু রায়ের বিষয়টি নিশ্চিত করে প্রতিবেদক আলমগীর মানিককে বলেন, ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা ও দৃষ্টান্ত স্থাপনের জন্য আদালত এ রায় দিয়েছেন। এমন নির্মম হত্যাকাণ্ডে এই রায় সমাজের জন্য দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।
দণ্ডপ্রাপ্ত আলোময় চাকমা বর্তমানে পলাতক। তার বিরুদ্ধে সাজা পরোয়ানা ও পুনরায় গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির নির্দেশ দিয়েছেন আদালত। অপর আসামি সোহেল চাকমা রায় ঘোষণার সময় আদালতে উপস্থিত ছিলেন এবং তাকে জেলহাজতে পাঠানোর নির্দেশ দেয়া হয়েছে। মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিরা আইন অনুযায়ী রায়ের বিরুদ্ধে সাতদিনের মধ্যে হাইকোর্ট বিভাগে আপিল করতে পারবেন। মামলার এজাহারকারী বিনয় শঙ্কর চাকমার অভিযোগের ভিত্তিতে সাজেক থানায় ২০১৭ সালের ৬ই আগস্ট মামলা হয়। তদন্ত শেষে এসআই সফিকুল ইসলাম দুই আসামির বিরুদ্ধে ২০১৭ সালের ১৫ই অক্টোবর আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করেন। ২০১৮ সালের ২৮ মার্চ আদালত আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করেন।
