নেতারা বললেন, ওয়েস্টমিনস্টারের সময় ফুরিয়ে আসছে

যুক্তরাজ্য থেকে সরে যেতে তিন দেশের চুক্তি

নেতারা বললেন, ওয়েস্টমিনস্টারের সময় ফুরিয়ে আসছে

ফন্ট সাইজ:

যুক্তরাজ্য থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার লক্ষ্যে একটি সমঝোতা চুক্তি স্বাক্ষর করেছে ওয়েলস, স্কটল্যান্ড এবং উত্তর আয়ারল্যান্ডের সরকার প্রধানরা। এমন চুক্তির পর ওয়েলস, স্কটল্যান্ড ও উত্তর আয়ারল্যান্ডের নেতারা ঘোষণা করেন, ‘ওয়েস্টমিনস্টারের সময় ফুরিয়ে আসছে’।

সোমবার একটি বৈঠকে বসেন ওয়েলসের সরকার প্রধান ও প্লেড সিমরু দলের নেতা রুন আপ ইয়োরওয়ার্থ, উত্তর আয়ারল্যান্ডের সরকার প্রধান ও সিন ফেইন দলের শীর্ষস্থানীয় নেতা মিশেল ও’নিল, স্কটল্যান্ডের সরকার প্রধান ও স্কটিশ ন্যাশনাল পার্টির নেতা জন সুয়েনি। এতে সিন ফেইন-এর প্রেসিডেন্ট মেরি লু ম্যাকডোনাল্ডও উপস্থিত ছিলেন।

বৈঠকে তিনটি প্রদেশ যুক্তরাজ্য থেকে বিচ্ছিন্ন হতে একমত পোষণ করে এবং একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এই চুক্তিটি, যা আইনত বাধ্যতামূলক নয়, তাতে বলা হয়েছে যে এটি ‘যুক্তরাজ্যের অর্থায়ন ব্যবস্থার পরিচালনা এবং আমাদের সাংবিধানিক ভবিষ্যতের উপর ক্ষমতার মতো ক্ষেত্রগুলিতে ওয়েলস এবং স্কটল্যান্ডের জন্য বৃহত্তর ন্যায্যতার দাবিতে জোর দেবে’।

চুক্তিতে আরও বলা হয়, ওয়েস্টমিনস্টারের কোনো সরকারেরই "গণতন্ত্রকে বাধা দেওয়ার" অধিকার নেই। প্রতিটি জাতি "নিজস্ব উপায়ে ও নিজস্ব সময়ে" তাদের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে। শিশু দারিদ্র্য মোকাবিলা এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের সাথে সম্পর্কের সুফল সর্বোচ্চ পর্যায়ে নিয়ে আসাসহ বিভিন্ন বিষয়ে দুই সরকার যৌথভাবে কাজ করবে।

তিন দেশের নেতারা বলেন ,এই দ্বীপপুঞ্জ এবং সারা বিশ্বের মানুষের জন্য এর চেয়ে স্পষ্ট কোনো ইঙ্গিত হতে পারে না যে, ওয়েস্টমিনস্টারের বা লন্ডন-কেন্দ্রিক কেন্দ্রীয় সরকারের সময় ফুরিয়ে আসছে। গণতন্ত্রকে বাধা দেওয়ার বা আমাদের জনগণই যে তাদের নিজেদের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে সেই নীতিকে ক্ষুণ্ণ করার কোনো অধিকার ওয়েস্টমিনস্টারের কোনো সরকারের নেই। আমরা স্বীকার করি যে, আমাদের দলগুলোর সাংবিধানিক অবস্থান ভিন্ন এবং প্রতিটি জাতি নিজস্ব উপায়ে ও নিজস্ব সময়ে নিজেদের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে।

বৈঠকের পর সংবাদ সম্মেলনে অংশ নেন তিন দেশের নেতারা। এতে আপ ইয়োরওয়ার্থ বলেন, ওয়েস্টমিনিস্টার ব্যবস্থা যে আর কার্যকর হচ্ছে না এই উপলব্ধি ক্রমশ বাড়ছে এবং ক্ষমতাকে সত্যিকার অর্থেই জনগণ ও সম্প্রদায়ের আরও কাছাকাছি নিয়ে আসা প্রয়োজন।

তিনি বলেন, মে মাসের 'সেনেড' (ওয়েলস পার্লামেন্ট) নির্বাচন তার সরকারকে পরিবর্তনের ম্যান্ডেট বা জনরায় দিয়েছে যার লক্ষ্য হলো ওয়েলসকে আরও আত্মবিশ্বাসী ও সমৃদ্ধ করে তোলা এবং তাদের ভবিষ্যতের ওপর নিজেদের নিয়ন্ত্রণ আরও সুদৃঢ় করা।

তিনি আরো বলেন, একটি জাতি হিসেবে আমাদের জনগণের প্রাপ্য ভবিষ্যৎ গড়ে তোলার জন্য প্রয়োজনীয় ক্ষমতা, সম্পদ এবং ন্যায্য আচরণ এসবই ওয়েলসের থাকা উচিত।

এসএনপি নেতা সুইনি বলেন, সোমবারের দিনটি ছিল যুক্তরাজ্যের সাংবিধানিক যাত্রাপথে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত।

তিনি উল্লেখ করেন যে, মে মাসে প্রতিটি জাতির নির্বাচনে এমন সব 'ফার্স্ট মিনিস্টার' বা সরকারপ্রধান নির্বাচিত হয়েছেন যারা বিশ্বাস করেন যে, তাদের দেশগুলোর নিজেদের ভবিষ্যৎ নিজেদের নির্ধারণ করা উচিত। " আত্মনিয়ন্ত্রণের সেই নীতিটি একটি অবিচ্ছেদ্য অধিকার।"

রুন আপ ইয়োরওয়ার্থ বলেন, ওয়েলসের জনগণই তাদের নিজেদের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে। এসময় তিনি অ্যান্ডি বার্নহামকে "যুক্তরাজ্যের শেষ প্রধানমন্ত্রী" হিসেবে অভিহিত করেন। কারণ হিসেবে উল্লেখ করে বলেন ,স্কটল্যান্ডের জনগণকে যদি গণভোটের মাধ্যমে স্বাধীনতার সুযোগ দেওয়া হয়, তবে তারা সেই পথই বেছে নেবে।" সিন ফেইনের ম্যাকডোনাল্ড সোমবারের বৈঠকটিকে "ঐতিহাসিক" হিসেবে অভিহিত করে বলেন, "গণভোটের অধিকার আমাদের রয়েছে। নিজেদের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের অধিকারও আমাদের আছে। কোনো প্রধানমন্ত্রী যদি আমাদের বলেন যে সেই অধিকার আর বিবেচনার বিষয় নয়, তবে আমরা তা মেনে নেব না বা সহ্য করব না।

উত্তর আয়ারল্যান্ডের সরকার প্রধান ও'নিল বলেন যে, তিনটি জাতিই "একে অপরের চেয়ে স্বতন্ত্র" এবং তাদের নিজস্ব অগ্রাধিকার রয়েছে।

তবে তিনি উল্লেখ করেন, এখানে সাধারণ বিষয়টি হলো, ওয়েস্টমিনস্টার বা যুক্তরাজ্যের কেন্দ্রীয় সরকার আমাদের জনগণের স্বার্থ ভালোভাবে দেখছে না এবং ভবিষ্যতেও দেখবে না।

ও'নিল উত্তর আয়ারল্যান্ডের ক্ষমতা-অংশীদারিত্বমূলক সরকার ব্যবস্থায় দায়িত্ব পালন করছেন; সেখানে ডেমোক্রেটিক ইউনিয়নিস্ট পার্টির (ডিইউপি) ডেপুটি ফার্স্ট মিনিস্টার এমা লিটল-পেঙ্গেলি সিন ফেইনের এই রাজনীতিবিদের বিরুদ্ধে "ফার্স্ট মিনিস্টারের পদটিকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের" চেষ্টার অভিযোগ তুলেছেন। উত্তর আয়ারল্যান্ডে ফার্স্ট মিনিস্টার এবং ডেপুটি ফার্স্ট মিনিস্টারের ক্ষমতা সমান।

এসময় বিবিসি ওয়েলসের পক্ষ থেকে জানতে চাওয়া হয়েছিল, এই সমঝোতা স্মারকটি ওয়েলসের জন্য কী অর্থ বহন করে এবং এর মাধ্যমে ওয়েস্টমিনস্টারকে (যুক্তরাজ্যের কেন্দ্রীয় সরকারকে) ওয়েলসের স্বাধীনতার গণভোট আটকে না দেওয়ার আহ্বান জানানো হচ্ছে কি না। জবাবে আপ ইয়োরওয়ার্থ বলেন, ওয়েলসের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের বিষয়টি সেখানকার জনগণের ওপরই নির্ভর করে। ওয়েলসের জনগণ যখন এ বিষয়ে সম্মত হবেন, তখনই এর সময়সীমা নির্ধারিত হবে। আর তাদের সেই সম্মতির পথে নিয়ে আসাই আমার কাজ। ওয়েলস সরকারের এই ধরনের গণভোট আয়োজনের ক্ষমতা নেই, কিন্তু অ্যাপ ইওরওয়ার্থ সংবাদ সম্মেলনে বলেন, তিনি এই ক্ষমতা হস্তান্তরিত হতে দেখতে চান।

তবে বৈঠকে স্কটল্যান্ডের জন সুইনি এবং উত্তর আয়ারল্যান্ডের মিশেল ও'নিল এক যৌথ সংবাদ সম্মেলনে গণভোটের আহ্বান জানালেও, ওয়েলসের রুন আপ ইয়োরওয়ার্থ তাঁর দেশে গণভোটের কোনো সময়সূচি দিতে অস্বীকৃতি জানান।

ক্ষমতা বিকেন্দ্রীকরণ বা 'ডেভোলিউশন' প্রক্রিয়া শুরুর পর এই প্রথম ওয়েলস, স্কটল্যান্ড এবং উত্তর আয়ারল্যান্ড তিনটি অঞ্চলেরই 'সরকারপ্রধানরা যুক্তরাজ্য থেকে বেরিয়ে আসার পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন।