জিন্নাহ’র ছবি টানানো নিয়ে তুলকালাম

ডাকসু’র সংগ্রহশালা

জিন্নাহ’র ছবি টানানো নিয়ে তুলকালাম

ফন্ট সাইজ:

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) সংগ্রহশালা সংস্কার শেষে চালু হয়েছে। তবে চালুর পরই দেখা দিয়েছে বিতর্ক। ১৯৪৮ সালে ‘কেবল উর্দুই হবে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা’ বক্তব্য দেয়া পাকিস্তানের গভর্নর জেনারেল মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ’র ছবি এ সংগ্রহশালায় অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। বিষয়টি সামনে আসার পর থেকেই তুলকালাম বাধে। এরইমধ্যে সংগ্রহশালায় সংযোজিত জিন্নাহ’র সেই ছবিটির ফ্রেম ভাঙেন এবং ছবিটি ছিঁড়ে ফেলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আবু তৈয়ব হাবিলদার। আবার ওই ছবির স্থানে ছাত্র ফেডারেশন জামায়াতে ইসলামীর সাবেক আমীর গোলাম আযমকে জুতা মারার ছবি সাঁটিয়েছে।

ছবি ভাঙচুর করা আবু তৈয়ব ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে অনুষ্ঠিত ডাকসু নির্বাচনের সবচেয়ে বয়োজ্যেষ্ঠ ভিপি (সহ-সভাপতি) প্রার্থী হিসেবে আলোচিত হয়েছিলেন। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০০১-০২ শিক্ষাবর্ষের উর্দু বিভাগের ছাত্র। ছবির ফ্রেম ভাঙার আগে আবু তৈয়ব হাবিলদার বলেন, বাংলাদেশের স্বাধীনতার সূত্রটা জিন্নাহ তৈরি করে দিয়েছে। কার্জন হলে ছাত্র-ছাত্রীদের সামনে বলে যে, পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা উর্দু হবে, বাংলা হবে না। আমাদের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক ছাত্র প্রতিবাদ করেছিলেন। তারা বলেছিলেন, জিন্নাহ সাহেব আপনার এই সিদ্ধান্ত আমরা মানি না। তিনি বলেন, ভাষা আন্দোলনের মূল নায়ক হিসেবে প্রিন্সিপ্যাল আবুল কাসেম ১১ই মার্চ ১৯৪৮ শুরু করেছিলেন এবং উনার নেতৃত্বে হরতাল পালন হয়েছিল। সেখানে অনেক ছাত্র গ্রেপ্তার হয়েছিলেন, দুই হাজারের উপরে। সেই জিন্নাহ ডাকসুতে স্থান পেতে পারে না।

জিন্নাহ’র ছবি ভাঙচুরের ঘটনায় যখন ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা চলছিল এরইমধ্যে গোলাম আযমকে জুতা দিয়ে মারার একটি ছবি সাঁটিয়েছে ছাত্র ফেডারেশন। বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সাংগঠনিক সম্পাদক অর্ক বড়ুয়ার নেতৃত্বে একদল শিক্ষার্থী এ ছবি লাগান। ১৯৮১ সালের ওই ছবিতে দেখা যায়, রাজধানীর বায়তুল মোকাররম এলাকায় গোলাম আযমকে জুতা দিয়ে মারছেন বিক্ষুব্ধ জনতা। যে স্থানে জিন্নাহ’র ছবি লাগানো হয়েছিল ঠিক সে স্থানের উপরেই এই ছবি সাঁটানো হয়। এ ঘটনার পর ডাকসু জিএস এসএম ফরহাদ সাংবাদিকদের বলেন, আমরা ছবির নিচে ক্যাপশনে লিখে দিয়েছি- ‘তিনি বলেছেন উর্দু এবং উর্দুই একমাত্র রাষ্ট্রভাষা’। আমরা এটা যদি না করতাম তাহলে আপনারা বলতে পারতেন যে, আমরা জিন্নাহকে গ্লোরিফাই করেছি। আমার মনে হয় জিন্নাহ’র দোষ যারা ঢাকতে চান তারাই এই ছবি সরাতে চান, ভাঙতে চান।

এর আগে ডাকসু ভবনের সংগ্রহশালায় জিন্নাহ ও মালেকের ছবি টানানোসহ তথাকথিত ডাকসু’র সমসাময়িক কিছু বহুল বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের প্রেক্ষিতে ভাইস চ্যান্সেলরের (ভিসি) সঙ্গে বৈঠক করে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। সাধারণ সম্পাদক নাহিদুজ্জামান শিপন জানান, ৫২’র ভাষা আন্দোলন ও মহান মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিটি অলি-গলি-ধূলিকণার সঙ্গে মিশে আছে। যে ডাকসু সেই দু’টি আন্দোলনে নেতৃত্বের ভূমিকা রেখেছে, সেই ডাকসু’র সংগ্রহশালায় জিন্নাহ ও মালেকের মতন বিতর্কিত ব্যক্তির ছবি টানানো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিটি শিক্ষার্থীর আবেগে আঘাত দিয়েছে। বিষয়টি নিয়ে ভিসি আমাদের সঙ্গে একমত হয়েছেন এবং দ্রুত আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়ার আশ্বাস দিয়েছেন।

এদিকে ডাকসু সংগ্রহশালায় পাকিস্তানের তৎকালীন গভর্নর জেনারেল মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ্ এবং তৎকালীন ছাত্রসংঘের নেতা আব্দুল মালেকের ছবি প্রদর্শনের বিষয়ে আপত্তি জানিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। বক্তব্যে বলা হয়, ভাষা আন্দোলন ও বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাসের সঙ্গে সাংঘর্ষিক এমন ব্যক্তিদের ছবি বিশ্ববিদ্যালয়ের সংগ্রহশালায় প্রদর্শন কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রচলিত বিধিবিধান অনুযায়ী সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কঠোর প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেয়া হবে। এ ছাড়া ডাকসু’র পক্ষ থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের মূল্যায়নের জন্য অনুমোদন ছাড়া একটি ওয়েবসাইট চালু করা হয়েছে বলেও অভিযোগ করেছেন বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। তাদের দাবি, এটি বিশ্ববিদ্যালয়ের নীতিমালা ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়ার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ বলছেন, শিক্ষক মূল্যায়ন একটি গুরুত্বপূর্ণ একাডেমিক ও প্রাতিষ্ঠানিক বিষয়। কোনো ব্যক্তি, সংগঠন বা ছাত্র সংসদ নিজেদের উদ্যোগে পৃথক শিক্ষক মূল্যায়ন ব্যবস্থা চালু করতে পারে না। একই সঙ্গে ওই ওয়েবসাইট চালু করে শিক্ষকদের ব্যক্তিগত তথ্য বাইরে আনা হয়েছে, যা আইন অনুযায়ী শাস্তিযোগ্য অপরাধ।

ওদিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু)-এর বিভিন্ন কর্মকাণ্ড নিয়ে আপত্তি জানিয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রচলিত আইন, বিধি, নীতিমালা ও প্রশাসনিক কাঠামোর সঙ্গে ডাকসু’র কয়েকটি কর্মকাণ্ড সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় বলে জানিয়েছে প্রশাসন। সোমবার জনসংযোগ দপ্তর থেকে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের এক বক্তব্যে এসব কথা জানানো হয়। এতে বলা হয়, বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত ডাকসু-সংক্রান্ত বেশ কয়েকটি সংবাদ বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের দৃষ্টিগোচর হয়েছে। এসব কর্মকাণ্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রচলিত আইন, বিধি, নীতিমালা ও প্রশাসনিক কাঠামোর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের অবস্থান সুস্পষ্ট ও দ্ব্যর্থহীন।