অটোমেশন প্রক্রিয়ায় আসছে ঢাকার ট্রাফিক

এআই ক্যামেরা, এক মাসে ৫৩ হাজার মামলা

অটোমেশন প্রক্রিয়ায় আসছে ঢাকার ট্রাফিক

ফন্ট সাইজ:

গত এক মাসে ঢাকার সড়কে ট্রাফিক আইন লঙ্ঘনের দায়ে ৫৩ হাজার মামলা দিয়েছে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি)। ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় ট্রাফিক আইন লঙ্ঘনকারীদের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান চালায় পুলিশ। অভিযানে প্রকাশিত প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করে গত এক মাসে অর্ধ লাখের বেশি মামলার তথ্য পাওয়া গেছে। ডিএমপি’র ট্রাফিক বিভাগ সূত্র জানিয়েছে, এইসব মামলায় প্রতি মাসে গড়ে প্রায় ১৫ কোটি টাকা জরিমানা করা হচ্ছে। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কসহ পুরো রাজধানীর বেশ কয়েকটি জায়গায় ট্রাফিক ব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণ করতে এআই ক্যামেরা বসানো হয়েছে। মহাসড়কের মতো ঢাকার ট্রাফিকব্যবস্থাও ‘অটোমেশন’ প্রক্রিয়ায় আসছে। পূর্বে পরীক্ষামূলকভাবে এআই মামলাব্যবস্থা চালু করলেও এবার আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে স্বয়ংক্রিয়ভাবেই এআই’র মাধ্যমেই মামলা হয়ে যাবে। ফলে ভিডিও ফুটেজ দেখে আর অভিযুক্ত যানবাহন চিহ্নিত করতে হবে না।

এক মাসে ডিএমপি’র ট্রাফিক মামলার হিসাব থেকে দেখা যায়, গত ১২ই আগস্ট ১ হাজার ৮১৮টি, ১৫ই আগস্ট ১ হাজার ৩২৯টি, ১৬ই আগস্ট ১ হাজার ৬৮৪টি, ১৭ই আগস্ট ১ হাজার ৭৩০টি, ১৮ই আগস্ট ১ হাজার ৮৪১টি এবং ১৯শে আগস্ট ১ হাজার ৭৩২টি মামলা হয়েছে। এরপর ২০ ও ২১শে আগস্ট দুই দিনে ২ হাজার ৫৫০টি, ২২ আগস্ট ১ হাজার ৪৯৩টি, ২৩ আগস্ট ২ হাজার ১৪৪টি, ২৪ আগস্ট ২ হাজার ৩৮৩টি, ২৫ ও ২৬ আগস্ট দুই দিনে ৪ হাজার ১১৮টি এবং ২৭ থেকে ২৯শে আগস্ট তিন দিনে ৪ হাজার ১৬টি মামলা হয়েছে। এ ছাড়া ৩০ আগস্ট ২ হাজার ১১৯টি, ৩১শে আগস্ট ২ হাজার ৩৭৭টি, ১লা সেপ্টেম্বর ২ হাজার ৯টি, ৩ ও ৪ঠা সেপ্টেম্বর দুই দিনে ৩ হাজার ২০৬টি, ৫ সেপ্টেম্বর ১ হাজার ৬৮৭টি, ৬ই সেপ্টেম্বর ২ হাজার ২১৪টি, ৭ই সেপ্টেম্বর ২ হাজার ৩০৬টি, ৮ই সেপ্টেম্বর ২ হাজার ২৬৮টি, ৯ই সেপ্টেম্বর ২ হাজার ২০৬টি, ১০ ও ১১ই সেপ্টেম্বর দুই দিনে ৩ হাজার ৯৫২টি এবং ১২ই সেপ্টেম্বর ২ হাজার ৪৭৮টি। অর্থাৎ, ১২ই আগস্ট থেকে ১২ই সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ডিএমপি’র ট্রাফিক বিভাগে ৫৩ হাজার ৬৬০টি মামলা করা হয়েছে ট্রাফিক আইন লঙ্ঘনের ফলে।

ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ করছে স্বয়ংক্রিয় ট্রাফিক সিগন্যাল ও এআই প্রযুক্তি: ঢাকার শাহবাগ, বাংলামোটর, কাওরান বাজার, বিজয় সরণি, জাহাঙ্গীর গেট ও বিমানবন্দর সড়কের মতো গুরুত্বপূর্ণ মোড়গুলোতে এআই ক্যামেরা বসানোর পর আরও বেশ কিছু সড়কে বসছে এআই-ভিত্তিক ট্রাফিকব্যবস্থা। এরও আগে গত বছর ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের ২২টি মোড়ে নতুন করে স্বয়ংক্রিয় ট্রাফিক সিগন্যাল বসানোর উদ্যোগ নেয়া হয়। দেশীয় প্রযুক্তিতে তৈরি এসব বাতি বসাতে ব্যয় ধরা হয় প্রায় ১৮ কোটি টাকা। হাইকোর্ট থেকে হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টাল ও বাংলামোটর এবং ঢাকা উত্তরের সোনারগাঁও, ফার্মগেট, বিজয় সরণি, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ও জাহাঙ্গীর গেট মোড়ে এসব সংকেত বাতি বসানো হয়েছিল। পরে এসব সিগন্যালে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসম্পন্ন (এআই) ক্যামেরা যুক্ত করে পুলিশের ট্রাফিক বিভাগ।

সরজমিন ঢাকার অন্তত ৫টি ট্রাফিক ইন্টারসেকশনে দেখা যায়, সিগন্যালগুলোতে যানবাহনের চালকরা আগের চেয়ে বেশি সচেতন। এআই ক্যামেরার কারসাজিতে এখন জরিমানার ভয়ে ট্রাফিক আইন মানার চেষ্টা করছেন চালকরা। বিভিন্ন সিগন্যালের ১০ জন চালকের সঙ্গে কথা বললে ৮ জনই এআই মামলার বিষয়ে জানেন বলে জানিয়েছেন। শুধু এআই ক্যামেরা নয়, ট্রাফিক ব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণে সহযোগী হিসেবে আছে স্বয়ংক্রিয় ট্রাফিক বাতি। নির্দিষ্ট ইন্টারসেকশনের বসানো এইসব স্বয়ংক্রিয় ট্রাফিক লাইটগুলোর ওপর এখন চালকরা লক্ষ্য রাখছেন সারাক্ষণ। প্রতিটি সিগন্যাল বাতি পাশেই এলইডি স্ক্রিনে টাইমার দেয়া। ১২০ সেকেন্ড থেকে শুরু করে ব্যস্ততম সিগন্যালে ৩০০ সেকেন্ড পর্যন্ত সময় বেঁধে দেয়া হচ্ছে। ইন্টারসেকশনের গিয়ে দেখা যায়, চালকদের দৃষ্টি থাকছে টাইমারের দিকে। সময় শেষ হলেই ট্রাফিক পুলিশের ইশারায় যানবাহনের গতি বাড়িয়ে দেন। তবে সংশ্লিষ্ট এলাকার ট্রাফিক সার্জেন্টদের নির্দেশে সিগন্যাল বাতি নিয়ন্ত্রণ করা হলেও এআই ক্যামেরার নিয়ন্ত্রণ করছে পুলিশ হেডকোয়ার্টার্স।
বাংলামোটর ইন্টারসেকশনের দায়িত্বরত ট্রাফিক সার্জেন্ট আতাউর রহমান মানবজমিনকে বলেন, এআই ক্যামেরা ও সিগন্যাল বাতির সমন্বয়ে এখন প্রায় ৯০ থেকে ৯৫ শতাংশ চালকই ট্রাফিক আইন মানছেন। না মানলে মামলা দেয়া হচ্ছে। কিছু মামলা আমরা ম্যানুয়ালি দিচ্ছি। একই কথা জানিয়েছেন বিজয় সরণি ইন্টারসেকশনের সার্জেন্ট আলমাসও। তিনি বলেন, এআই ক্যামেরা আর সিগন্যাল বাতি দুটোই ঠিকঠাকভাবে কাজ করছে। তবে আমরা এখান থেকে সিগন্যাল বাতি নিয়ন্ত্রণ করছি।

আরও ৫০ জায়গায় বসছে স্বয়ংক্রিয় ট্রাফিক সিগন্যাল: যানজট নিয়ন্ত্রণ ও সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে ১০০ কোটি টাকা ব্যয়ে রাজধানীর আরও ৫০টি ট্রাফিক সিগন্যাল স্বয়ংক্রিয় সংকেত বাতি বসানো হচ্ছে। প্রতিটি সিগন্যালে গড়ে ব্যয় হবে প্রায় ২ কোটি টাকা। উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) আওতায় ২৮টি স্থানে ট্রাফিক সংকেত বাতি বসাতে ব্যয় হবে প্রায় ৫৫ কোটি টাকা। আর ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) ২২টি স্থানে ব্যয় হবে প্রায় ৪৪ কোটি টাকা।

স্বয়ংক্রিয় ট্রাফিক সিগন্যাল কার্যক্রমের ফোকাল পয়েন্ট ও বুয়েটের পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. হাদিউজ্জামান বলেন, স্বয়ংক্রিয় ট্রাফিক সিগন্যাল স্থাপনের জন্য সিভিল সেকশনের কাজকর্ম সিটি করপোরেশন করবে। পোল, ক্যাবল বসানোর কাজ ইত্যাদি এই সেকশনের মধ্যে পড়ে। তিনি বলেন, নতুন করে মূলত মিরপুর, এয়ারপোর্ট ও গুলশান করিডোরে এই ৫০টি স্থানে ট্রাফিক বাতি বসানোর পরিকল্পনা হচ্ছে। মিরপুর করিডোর আজিমপুর থেকে গাবতলী পর্যন্ত সড়ক; এয়ারপোর্ট করিডোর উত্তরা পর্যন্ত। গুলশান করিডোরের মধ্যে রয়েছে- গুলশান থেকে মগবাজার হয়ে জিরো পয়েন্ট পর্যন্ত সড়কগুলোর সিগন্যাল। এর বাইরেও ইন্টারসেকশনগুলোর সংযোগস্থলের কয়েকটি জায়গায় সিগন্যাল বাতি বসানোর পরিকল্পনা করা হচ্ছে।

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মো. আব্দুস সালাম মানবজমিনকে বলেন, দক্ষিণ সিটির যে সমস্ত জায়গায় সিগন্যাল বাতি বসানোর কথা, কাজ মোটামুটি শেষ। সীমানা নির্ধারণ থেকে শুরু করে টেকনিক্যাল কাজকর্ম সম্পন্ন হয়ে গেছে। আশা করি দ্রুত সিগন্যালগুলোতে এই বাতিগুলোর কার্যক্রম শুরু করা যাবে।