ভূ-রাজনীতিতে ব্রিকসের মাধ্যমে ভারতের প্রভাব বিস্তারের প্রচেষ্টা সফল

ফন্ট সাইজ:

ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে দু’দিনের ১৮তম ব্রিকস সম্মেলন শেষ হয়েছে। পশ্চিম এশিয়া এবং ইউরোপে দু’টি যুদ্ধের আবহাওয়ার মধ্যে রীতিমতো চ্যালেঞ্জের পরিস্থিতিতে এই সম্মেলনকে সফল করতে ভারত গত এক বছর ধরেই সচেষ্ট ছিল। সম্মেলন শুরুর আগে এক পক্ষকাল ভারত ব্যস্ততম কূটনৈতিক দৌত্য পরিচালনা করেছে।

ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর ব্রিকসের সদস্য দেশগুলোতে সফর করেছেন। মতপার্থক্য নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। ভারতের নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভাল বিশেষভাবে সফর করেছেন চীনের সঙ্গে জটিল রাজনীতির সমীকরণের মধ্যে বেইজিংয়ে। গলওয়ানের রক্তাক্ত সীমান্ত সংঘাতের সাত বছর পরে সম্ভব হয়েছে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের ভারত সফর। ভারতের সেই সব কূটনৈতিক দৌত্যের ফলেই কোনো বড় ধরনের বিতর্ক ছাড়াই ঐকমত্যের ভিত্তিতে সম্মেলন শেষ হয়েছে। সম্মেলন থেকে আয়োজক দেশ হিসেবে ভারত নিজের ভূমিকাকে স্পষ্ট করেছে। ব্রিকসের মঞ্চ থেকে ‘অশান্ত’ বিশ্বে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পকেও বার্তা দিয়ে প্রধানমন্ত্রী মোদি বলেছেন, আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে কোনো একটি দেশের একচ্ছত্র ‘রাজত্ব’ করার দিন শেষ। কারণ, কূটনীতির পৃথিবীতে এখন তৈরি হচ্ছে শক্তির নয়া ভারসাম্য।

মোদি জানিয়েছেন, “গত দুই দশকে বিশ্বমঞ্চে ব্রিকস এক স্বতন্ত্র পরিচিতি গড়ে তুলেছে। আমরা একে অপরের দৃষ্টিভঙ্গিকে সম্মান করি এবং সর্বসম্মত সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে এগিয়ে যাই। কাউকে বিরোধিতা করে নয়, বরং সবাইকে সঙ্গে নিয়ে এগিয়ে যাওয়াই আমাদের লক্ষ্য। এখন সময় এসেছে ব্রিকসের মধ্যকার এই ঐক্য ও সর্বসম্মত অবস্থানকে বিশ্বমঞ্চে বাস্তব ও দৃশ্যমান ফলাফলে রূপ দেয়ার।”
রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভøাদিমির পুতিন, ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান এবং চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংসহ সদস্যদেশগুলোর অধিকাংশ রাষ্ট্র নেতারা সম্মেলনে যোগ দেয়ার ফলে বৈশ্বিক রাজনীতির পাশাপাশি আর্থিক সহযোগিতা নিয়ে সদর্থক আলোচনা হয়েছে। জাতিসংঘের মহাসচিবসহ ৩৬টি দেশের নেতা ও জোটের সাম্প্রতিক ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলনে যোগদান এই জোটের প্রতি বিশ্বব্যাপী আগ্রহেরই ইঙ্গিত দিয়েছে। শুরুতে দক্ষিণ বিশ্বের সম্মিলিত কণ্ঠস্বর বৃদ্ধি করা এবং অর্থনৈতিক ও আর্থিক সহযোগিতা সম্প্রসারণ করাই ছিল এই জোটের অন্যতম লক্ষ্য। পরে বৈশ্বিক শাসনব্যবস্থার সংস্কার, ডলারের ওপর নির্ভরতা হ্রাস এবং ‘গ্লোবাল সাউথ’ বা উন্নয়নশীল বিশ্বের জন্য বিকল্প আর্থিক ব্যবস্থা গড়ে তোলা নিয়ে জোটে আলোচনা চলছে। তবে উচ্চাকাঙ্ক্ষী লক্ষ্য থাকা সত্ত্বেও জোটের সদস্য দেশগুলোর বৈচিত্র্যময় অবস্থানের কারণে তাদের অগ্রাধিকারের বিষয়গুলোও ভিন্ন। স্বাভাবিক ভাবেই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে ঐকমত্যে পৌঁছানোর ক্ষেত্রে ব্রিকসকে উল্লেখযোগ্য চ্যালেঞ্জের মোকাবিলা করতে হচ্ছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই জোটটি ‘গ্লোবাল সাউথ’-এর জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ মঞ্চ। গ্লোবাল সাউথ বলতে ১০০টিরও বেশি উন্নয়নশীল দেশকে বোঝায়। তবে ব্রিকস জোটে গ্লোবাল সাউথের ১১টি গুরুত্বপূর্ণ দেশ রয়েছে। ব্রিকস-এর এই ১১টি দেশের জোট বিশ্বের জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেক অংশের এবং বৈশ্বিক জিডিপি’র ৪১ শতাংশের প্রতিনিধিত্ব করে।
পশ্চিমা শক্তি নিয়ন্ত্রিত প্রতিষ্ঠানগুলোতে উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলোর প্রভাব বাড়াতে ২০০১ সালে নিউ ইয়র্কে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশন চলাকালে ব্রিক-এর পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের প্রথম বৈঠকের মাধ্যমে এর সূচনা হয়েছিল। তবে ২০০৯ সালে রাশিয়ার ইয়েকাটেরিনবার্গে ব্রিক-এর প্রথম শীর্ষ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। দ্রুত বর্ধনশীল উদীয়মান বাজার ও উন্নয়নশীল দেশগুলোকে বোঝাতে গোল্ডম্যান স্যাকসের অর্থনীতিবিদ জিম ও’নিল মূলত ব্রাজিল, রাশিয়া, ইন্ডিয়া ও চীনের প্রথম অক্ষরের উল্লেখ করে ব্রিক শব্দটি প্রবর্তন করেছিলেন। পরে ২০১০ সালে নিউ ইয়র্কে অনুষ্ঠিত ব্রিক পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের বৈঠকে দক্ষিণ আফ্রিকাকে অন্তর্ভুক্ত করে ব্রিক-কে ‘ব্রিকস’-এ সম্প্রসারিত করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছিল।

ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত, চীন এবং দক্ষিণ আফ্রিকাকে নিয়ে গঠিত হলেও বর্তমানে এর সদস্য সংখ্যা ১১। ২০২৪ সালে মিশর, ইথিওপিয়া, ইরান, সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং সৌদি আরব এই জোটে যুক্ত হয়েছে এবং গত বছর ইন্দোনেশিয়া এতে যোগ দেয়। ২০২৫ সালে বেলারুশ, বলিভিয়া, কাজাখস্তান, কিউবা, মালয়েশিয়া, নাইজেরিয়া, থাইল্যান্ড, উগান্ডা, উজবেকিস্তান ও ভিয়েতনাম ‘অংশীদার দেশ’ বা পার্টনার কান্ট্রি হিসেবে ব্রিকস-এ যুক্ত হয়েছে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বিশ্বের অন্যান্য দেশের কাছে এই জোট অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এটি বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক ভূ-রাজনৈতিক গুরুত্বসম্পন্ন সমসাময়িক বিষয়াবলি এবং বৈশ্বিক রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক শাসনব্যবস্থা সংক্রান্ত বিষয়ে আলোচনা ও সহযোগিতার একটি কার্যকর মঞ্চ হিসেবে কাজ করে চলেছে।

বিশ্ব রাজনীতিতে ভারত ব্রিকস-এর মাধ্যমে তার বৃহত্তর উচ্চাকাঙ্ক্ষাকেই প্রতিফলিত করার সুযোগ পেয়েছে। অবশ্য সাংহাই সহযোগিতা সংস্থা, কোয়াড ও জি-২০ গোষ্ঠীর সদস্য হিসেবে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা চালিয়ে গিয়েছে। তবে ব্রিকসের সদস্য হিসেবে ভারতকে ‘গ্লোবাল সাউথ’ বা উন্নয়নশীল বিশ্বে চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাবের বিপরীতে ভারসাম্য বজায় রাখার পাশাপাশি অন্যান্য উদীয়মান অর্থনীতির সঙ্গে ঘনিষ্ঠ অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক সম্পর্ক গড়ে তোলার কাজটি ভারত সুন্দরভাবে করে চলেছে। জোটের বিভিন্ন পক্ষের পরস্পরবিরোধী স্বার্থের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখতে ভারত অনেকটাই ভূমিকা রেখেছে। ফলে বৈশ্বিক শাসনব্যবস্থায় একটি গুরুত্বপূর্ণ মধ্যস্থতাকারী হিসেবে নিজের অবস্থান সুদৃঢ় করে চলেছে ভারত। আর তাই ইউক্রেন যুদ্ধে মধ্যস্থতার ক্ষেত্রে সক্রিয়তা দেখিয়ে চলেছে ভারত। নয়াদিল্লিতে বৈরিতা সত্ত্বেও ইরান ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় বৈঠকও ভারতের প্রভাবেরই নজির। ব্রিকস সম্মেলন ভারতের সামনে চীন, রাশিয়া, ইরানসহ বিভিন্ন রাষ্ট্র প্রধানদের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠকের মাধ্যমে পারস্পরিক স্বার্থ রক্ষা এবং বৈশ্বিক রাজনীতিতে ভারতের প্রভাবকে তুলে ধরার সুযোগ করে দিয়েছে।