ব্যাংকিং খাতের মতো দেশের বীমা খাতেও বিশাল অব্যবস্থাপনা ও দুর্নীতি হয়েছে বলে জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তিনি বলেছেন, গ্রাহকদের পাওনা মেটাতে ব্যর্থ হলে প্রয়োজনে বীমা কোম্পানিগুলোর সম্পদ বিক্রি করে দাবি পরিশোধ করতে বাধ্য করা হবে। সোমবার বীমা খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থা আইডিআরের কর্মকর্তাদের সাথে মতবিনিময় শেষে অর্থমন্ত্রী এ কথা বলেন।
অর্থমন্ত্রী জানান, বর্তমানে ৫৭ শতাংশ ক্ষেত্রেই বীমা কোম্পানিগুলো গ্রাহকের পাওনা পরিশোধ করেনি। সাধারণ মানুষের কষ্টের টাকা ফেরাতে কোম্পানিগুলোকে বাধ্য করা হচ্ছে। এছাড়া, দুর্নীতি কমাতে প্রতিটি বীমা কোম্পানিকে সম্পূর্ণ অটোমেশন এবং অনলাইন লেনদেনের আওতায় আনা বাধ্যতামূলক করা হচ্ছে। একইসঙ্গে আগামী তিন থেকে পাঁচ বছরের মধ্যে প্রেষণে লোকবল কমিয়ে আইডিআরএতে নিজস্ব ও পেশাদার জনবল গড়ে তোলা হবে বলেও জানান তিনি।
আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, গ্রাহক নিজের কষ্টার্জিত অর্থ দিয়ে ভবিষ্যতের নিরাপত্তার জন্য বীমা করেন। অথচ অনেক বীমা কোম্পানি গ্রাহকের দাবি পরিশোধ করছে না। বর্তমানে প্রায় ৫৭ শতাংশ বীমা দাবি পরিশোধ করা হয়নি। অর্থাৎ, ১০০টি দাবির মধ্যে ৫৭টিই অনিষ্পন্ন রয়েছে। এটি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। তিনি বলেন, বীমা কোম্পানিগুলোকে দাবি পরিশোধের জন্য সময়সীমা দেয়া হচ্ছে। যারা দাবি পরিশোধ করছে, তারা ভালো করছে। যারা করছে না, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে। অনেক কোম্পানি গ্রাহকের পাওনা পরিশোধ না করে জমি ও অন্যান্য সম্পদ কিনেছে। তাদের যদি নগদ অর্থের সংকট থাকে, তাহলে সম্পদ বিক্রি করে হলেও গ্রাহকের দাবি পরিশোধ করতে হবে।
অর্থমন্ত্রী বলেন, যে মানুষটা নিরাপত্তার জন্য ইন্স্যুরেন্স করে, নিজের কষ্টের অর্জিত টাকা থেকে দেয়, তাকে আপনি কীভাবে সেই টাকা থেকে বঞ্চিত করবেন? তিনি জানান, এরই মধ্যে কিছু দাবি পরিশোধ করা হয়েছে। আইডিআরএর চেয়ারম্যান নিজেও একটি দাবি পরিশোধের উদ্যোগ নিয়েছেন, যা মূলত একটি দৃষ্টান্ত স্থাপনের জন্য। তবে বিমা দাবি পরিশোধ করা নিয়ন্ত্রক সংস্থার চেয়ারম্যানের দায়িত্ব নয়, সংশ্লিষ্ট বিমা কোম্পানিকেই তা পরিশোধ করতে হবে।
বীমা খাতে ব্যাংকিং খাতের মতোই অনিয়ম ও দুর্নীতি দেখা যাচ্ছে মন্তব্য করে অর্থমন্ত্রী বলেন, দায়িত্ব নেয়ার পর তারা বীমা খাতে ব্যাপক অব্যবস্থাপনা, দুর্নীতি ও অনিয়ন্ত্রণ দেখতে পেয়েছেন। এ কারণে নিয়ন্ত্রক সংস্থার ভূমিকা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
তিনি বলেন, বীমা খাতকে নিয়ন্ত্রণে আনতে বিমা আইনেও প্রয়োজনীয় পরিবর্তন আনা হবে। ব্যাংকিং খাতের মতো বীমা খাতেও প্রয়োজনীয় ‘রেজুলেশন’ কাঠামো গড়ে তোলা হবে। এসব পরিবর্তন আগামী দিনে সংসদে নেয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
বীমা খাতে ঝুঁকিভিত্তিক তদারকি ব্যবস্থা চালুর কথা জানিয়ে অর্থমন্ত্রী বলেন, আইডিআরএর পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় তদারকি ব্যবস্থা আগে না থাকায় বর্তমান পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। এখন প্রত্যেকটি বীমা কোম্পানিকে অটোমেশনের আওতায় আনা হবে এবং লেনদেন অনলাইনে করতে হবে।
কিছু বীমা কোম্পানির দুটি সার্ভার ব্যবহারের অভিযোগের বিষয়ে অর্থমন্ত্রী বলেন, একটি সার্ভার প্রকৃত তথ্যের জন্য এবং অন্যটি ভিন্ন লেনদেনের জন্য ব্যবহারের মতো ঘটনা পাওয়া গেছে। এখন থেকে কোনো কোম্পানিতে দুই সার্ভার রাখা যাবে না। নির্ধারিত সময়ের পর পরিদর্শন শুরু হবে জানিয়ে তিনি বলেন, কোনো কোম্পানিতে দুই সার্ভার পাওয়া গেলে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
বীমা খাতকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করার লক্ষ্য তুলে ধরে অর্থমন্ত্রী বলেন, বিশ্বজুড়ে অর্থনীতিতে বীমার ভূমিকা অনেক বড়। বিমা পেশার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরাও বিভিন্ন দেশে সম্মানজনক অবস্থানে রয়েছেন। বাংলাদেশেও বীমাক সেই পর্যায়ে নিয়ে যেতে হবে। তিনি বলেন, এখন থেকে বীমা কোম্পানিগুলোকে আইন মেনে, নিয়ন্ত্রিতভাবে, পেশাদারত্বের সঙ্গে এবং নতুন ডিজিটাল ব্যবস্থার আওতায় কাজ করতে হবে।
