খেলাপি ঋণে শীর্ষে বাংলাদেশ, দায় কার?

খেলাপি ঋণে শীর্ষে বাংলাদেশ, দায় কার?

ফন্ট সাইজ:

ধরা যাক, একটি বাড়ির দেয়ালে বছরের পর বছর ধরে ফাটল ধরেছে। বাইরে থেকে তা দেখা যায় না। কারণ, ফাটলের ওপর বারবার রং করা হয়েছে, কোথাও প্লাস্টার দিয়ে ঢেকে দেয়া হয়েছে। একদিন নতুন মালিক এসে পুরোনো রং তুলে দেয়াল পরীক্ষা করলেন। তখন একসঙ্গে বেরিয়ে এল অসংখ্য ফাটল। এখন প্রশ্ন হলো-এই ফাটলগুলো কি নতুন মালিক তৈরি করেছেন?

বাংলাদেশের ব্যাংক খাতের খেলাপি ঋণের বর্তমান চিত্র অনেকটা এমনই। ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ এখন ৬ লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে, ২০২৬ সালের জুন শেষে খেলাপি ঋণ দাঁড়িয়েছে ৬ লাখ ৬ হাজার ৫৫৫ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ৩২ দশমিক ৭৮ শতাংশ। মার্চ শেষে এই হার ছিল ৩২ দশমিক ২৬ শতাংশ।

সংখ্যাটি নিঃসন্দেহে ভয়াবহ। কিন্তু এই খেলাপি ঋণের পাহাড় বর্তমান বিএনপি সরকারের সময়ে তৈরি হয়েছে—এমন দাবি করার কোনো সুযোগ নেই। কারণ, খেলাপি ঋণ এক দিনে তৈরি হয় না। আজ যে ঋণটি খেলাপি হিসেবে হিসাবের খাতায় উঠেছে, সেটি হয়তো বহু বছর আগে বিতরণ করা হয়েছিল। বছরের পর বছর কিস্তি পরিশোধ হয়নি। এরপর নানা সুবিধায় ঋণ পুনঃতফসিল করা হয়েছে, পরিশোধের জন্য বাড়তি সময় দেয়া হয়েছে। শেষ পর্যন্ত ঋণ শ্রেণীকরণের নিয়ম কঠোর হলে সেই ঋণের প্রকৃত চেহারা হিসাবের খাতায় ধরা পড়েছে। এখানেই বর্তমান খেলাপি ঋণের হিসাব বোঝার মূল বিষয়টি।

পরিসংখ্যানের দিকে তাকালেই বিষয়টি পরিষ্কার হয়। ২০০৯ সালে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ ছিল প্রায় ২২ হাজার ৪৮১ কোটি টাকা। ২০২৩ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ১ লাখ ৪৫ হাজার ৬৩৩ কোটি টাকা। ২০২৪ সালের জুনে খেলাপি ঋণ হয় ২ লাখ ১১ হাজার ৩৯১ কোটি টাকা।

ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ওই বছরের সেপ্টেম্বরে খেলাপি ঋণ বেড়ে দাঁড়ায় ২ লাখ ৮৪ হাজার ৯৭৭ কোটি টাকায়। মাত্র তিন মাসে প্রায় ৭৪ হাজার কোটি টাকা বেড়ে যাওয়ার এই হিসাব দেখে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগে—তিন মাসে কি এত বিপুল অঙ্কের নতুন ঋণ খেলাপি হয়ে গেল?

বাস্তবতা তা বলে না। ২০২৪ সালে অন্তর্র্বতী সরকারের সময়ে ঋণ শ্রেণীকরণের নিয়মে বড় পরিবর্তন আসে। ২০১৯ সালে ঋণকে খেলাপি হিসেবে চিহ্নিত করার ক্ষেত্রে যে শিথিলতা আনা হয়েছিল, তা প্রত্যাহার করে বাংলাদেশ ব্যাংক কঠোর শ্রেণীকরণ ব্যবস্থা চালু করে। ফলে এত দিন যেসব ঋণ নানা কারণে খেলাপি হিসেবে হিসাবের বাইরে ছিল, সেগুলোর বড় অংশ নতুন করে শ্রেণীকৃত হয়।

আইএমএফও বলেছে, ২০২৪ সালের দ্বিতীয়ার্ধে খেলাপি ঋণ দ্রুত বেড়ে যাওয়ার একটি বড় কারণ ছিল দীর্ঘদিন আড়ালে থাকা খেলাপি ঋণ প্রকাশ্যে আসা। সংস্থাটির হিসাবে, ২০২৪ সালের জুন শেষে খেলাপি ঋণের অনুপাত ছিল ১২ দশমিক ৬ শতাংশ। ডিসেম্বর শেষে তা বেড়ে ২০ দশমিক ২ শতাংশে ওঠে। ২০২৫ সালের মার্চে তা প্রায় ২৪ শতাংশে পৌঁছায়।

অর্থাৎ, খেলাপি ঋণের এই বিপুল অঙ্ক হঠাৎ তৈরি হয়নি। বহুদিন ধরে জমে থাকা সমস্যার বড় অংশ তখন প্রকাশ্যে আসে। দীর্ঘদিন ধুলার নিচে পড়ে থাকা কার্পেট সরানোর কাজ শুরু হয়েছিল তখনই। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকারও পরবর্তী সময়ে সেই প্রকৃত চিত্র আড়াল না করে প্রকাশ্যে রাখার ধারাবাহিকতা বজায় রেখেছে।

এ প্রসঙ্গে গত বুধবার জাতীয় সংসদে স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানার একটি বক্তব্যও প্রশ্নের জন্ম দেয়। তিনি বলেন, ‘বিএনপি ক্ষমতায় আসবে আর বাংলাদেশ প্রথমবারের মতো ঋণখেলাপিতে সর্বোচ্চ স্থান অর্জন করবে না, সেটা হতে পারে না।’

কথাটি রাজনৈতিক বক্তৃতা হিসেবে চটকদার হতে পারে, কিন্তু অর্থনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে এর মিল খুঁজে পাওয়া কঠিন। কারণ খেলাপি ঋণ কোনো সরকারের ক্ষমতায় আসার সঙ্গে সঙ্গে তৈরি হয় না; এটি বছরের পর বছর ধরে জমে ওঠা ঋণ অনিয়ম, দুর্বল তদারকি, পুনঃতফসিল, ঋণ পুনর্গঠন এবং ঋণ আদায়ে ব্যর্থতার ফল। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—বর্তমান ৬ লাখ ৬ হাজার কোটি টাকার খেলাপি ঋণ বর্তমান সরকারের আমলে সৃষ্টি হয়নি; বরং আগের সরকারের সময়ে সৃষ্ট ও দীর্ঘদিন আড়ালে থাকা সমস্যার প্রকৃত চিত্র এখন প্রকাশ্যে এসেছে।

সুতরাং, ‘বিএনপি ক্ষমতায় আসবে বলেই বাংলাদেশ খেলাপি ঋণে শীর্ষে যাবে’-এ ধরনের মন্তব্য সমস্যার কারণ ও সময়কালকে একসঙ্গে গুলিয়ে ফেলে। বরং প্রশ্ন হওয়া উচিত, কোন সময়ে খেলাপি ঋণ এত দ্রুত বেড়েছিল, কোন নীতির মাধ্যমে প্রকৃত খেলাপি ঋণ আড়াল করা হয়েছিল এবং কারা বছরের পর বছর ব্যাংকঋণের সুবিধা নিয়ে তা পরিশোধ করেনি।

রুমিন ফারহানার বক্তব্যের সবচেয়ে দুর্বল জায়গাটিও এখানেই। তিনি যদি খেলাপি ঋণের দায় নিয়ে প্রশ্ন তুলতে চান, তাহলে সরকারের নাম ধরে রাজনৈতিক পূর্বাভাস দেয়ার বদলে ঋণের ইতিহাস, শ্রেণীকরণ পদ্ধতি এবং আগের দেড় দশকের ব্যাংকিং ব্যবস্থার সিদ্ধান্তগুলো নিয়ে প্রশ্ন তোলা বেশি যুক্তিসংগত হতো। কারণ খেলাপি ঋণের পাহাড় আজ দেখা যাচ্ছে মানেই পাহাড়টি আজ তৈরি হয়েছে-এমন সরল সমীকরণ অর্থনীতিতে চলে না।

বরং বাস্তবতা হলো, বহু বছরের জমে থাকা ক্ষত এখন প্রকাশ্যে এসেছে। কার্পেট সরানো হয়েছে বলেই ধুলো দেখা যাচ্ছে। তাই ধুলো দেখিয়ে কার্পেট সরানোর কাজটিকেই দোষারোপ না করে প্রশ্ন হওয়া উচিত—এত বছর ধুলো কারা কার্পেটের নিচে রেখে গিয়েছিল?

পতিত সরকারের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ঘনিষ্ঠ ব্যবসায়ী গোষ্ঠী ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে। নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পর তাঁরা বড় অঙ্কের ঋণ পেয়েছেন। এসব ঋণের বড় অংশ পরিশোধ হয়নি। অথচ খেলাপি হওয়ার পরও নানা সুবিধা দিয়ে অনেক ঋণকে দীর্ঘদিন হিসাবের খাতায় সচল রাখা হয়েছে।

ফলে ব্যাংকের হিসাবের খাতায় অনেক সময় বাস্তবতার চেয়ে ভালো একটি চিত্র দেখানো হয়েছে। একটি ঋণ কাগজে খেলাপি নয়-এর অর্থ এই নয় যে ঋণটি বাস্তবেও সুস্থ অবস্থায় রয়েছে। বহু ঋণ পুনঃতফসিল করা হয়েছে, পরিশোধের সময় বাড়ানো হয়েছে, নতুন সুবিধা দেওয়া হয়েছে; কিন্তু মূল ঋণ পরিশোধ হয়নি। এভাবেই প্রকৃত খেলাপি ঋণের একটি বড় অংশ দীর্ঘদিন হিসাবের আড়ালে রাখা হয়েছে।

২০২৪ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর অন্তর্র্বতী সরকার ব্যাংক খাতের চাপা পড়ে থাকা চিত্র সামনে আনার উদ্যোগ নেয়। ঋণ শ্রেণীকরণের নিয়ম কঠোর করা হয়, ব্যাংকগুলোর প্রকৃত আর্থিক অবস্থা যাচাইয়ের উদ্যোগ নেওয়া হয়, দুর্বল ব্যাংক চিহ্নিত করা হয় এবং অনিয়ম ও ঋণ জালিয়াতির অনুসন্ধান শুরু হয়।

এর ফলেই এত দিন আড়ালে থাকা খেলাপি ঋণের প্রকৃত চিত্র দ্রুত সামনে আসতে শুরু করে। বিএনপি সরকার দায়িত্ব নেয়ার পরও সেই চিত্র আড়াল না করে প্রকাশ্যে রাখার ধারাবাহিকতা বজায় রেখেছে।

অন্তর্বর্তী সরকারের গঠিত শ্বেতপত্রেও অর্থনীতি ও আর্থিক খাতের নানা অনিয়ম, দুর্বলতা, অর্থ পাচার এবং প্রভাবশালী মহলের প্রভাবের বিষয় উঠে এসেছে। এসব পর্যবেক্ষণও দেখায়, ব্যাংক খাতের সংকট কোনো সাম্প্রতিক ঘটনা নয়; এটি বহু বছরের জমে থাকা সমস্যা।

আইএমএফের বিভিন্ন প্রতিবেদনেও ব্যাংক খাতের দুর্বল সুশাসন, দুর্বল তদারকি, শিথিল নিয়ন্ত্রণ এবং বড় ঋণগ্রহীতাদের ঋণ পরিশোধের দুর্বল সংস্কৃতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। পুনঃতফসিল ও পুনর্গঠিত ঋণ বিবেচনায় নিলে প্রকৃত সমস্যার আকার ঘোষিত খেলাপি ঋণের চেয়েও বড় হতে পারে। তাহলে প্রশ্ন হলো-আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে ব্যাংক খাতে যে অনিয়ম ও ঋণ লুটপাট হয়েছে, তার দায় বর্তমান বিএনপি সরকারের ওপর আসবে কেন?

আরেকটি বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ। খেলাপি ঋণের অনেক ঋণগ্রহীতা দীর্ঘদিন ধরে ঋণ পরিশোধ করেননি। কেউ কেউ দেশ ছেড়ে পালিয়েছেন। বছরের পর বছর আসল অর্থ পরিশোধ না হওয়ায় এর সঙ্গে সুদ ও অন্যান্য দায় যুক্ত হয়েছে। ফলে পুরোনো ঋণের অঙ্কও সময়ের সঙ্গে বেড়েছে। এই বাস্তবতায় বর্তমান সময়ে খেলাপি ঋণের যে অঙ্ক বাড়ছে, সেটি বর্তমান সরকারের সময়ে বিতরণকৃত ঋণ থেকে সৃষ্টি হয়েছে-এমনটি বলারও সুযোগ নেই। তবে এখন বর্তমান সরকারের দায়িত্ব হলো- খেলাপি ঋণের প্রকৃত চিত্র প্রকাশ্যে আসার পর সবচেয়ে জরুরি কাজ হলো তা আদায় করা এবং ভবিষ্যতে একই ধরনের সংকট যাতে আর তৈরি না হয়, সেই ব্যবস্থা করা।

কারা ইচ্ছাকৃতভাবে ঋণখেলাপি হয়েছেন আর কারা প্রকৃত ব্যবসায়িক সমস্যার কারণে ঋণ পরিশোধ করতে পারেননি—তা আলাদা করতে হবে। ঋণ জালিয়াতি ও ব্যাংক লুটপাটের সঙ্গে যারা জড়িত, তাদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। একই সঙ্গে কোনো রাজনৈতিক বা প্রভাবশালী মহল যাতে ব্যাংককে নিজেদের অর্থের উৎস হিসেবে ব্যবহার করতে না পারে, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে।

কারণ শুধু খেলাপি ঋণের প্রকৃত অঙ্ক প্রকাশ্যে আনাই সংস্কার নয়। প্রকৃত সংস্কার তখনই হবে, যখন সেই অর্থ উদ্ধারে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং নতুন করে একই ধরনের অনিয়মের পথ বন্ধ করা যাবে।

বাংলাদেশের খেলাপি ঋণের গল্প তাই শুধু ৬ লাখ কোটি টাকার গল্প নয়। এটি গত দেড় দশকে ব্যাংকিং ব্যবস্থায় জমে ওঠা অনিয়ম, দুর্বল তদারকি, ব্যাংক লুটপাট এবং ঋণশৃঙ্খলার অবক্ষয়ের দীর্ঘ ইতিহাস।

২০০৯ সালের প্রায় ২২ হাজার কোটি টাকা থেকে ২০২৩ সালের ১ লাখ ৪৫ হাজার কোটি টাকা, এরপর ২০২৪ সালে দ্রুত উল্লম্ফন এবং শেষ পর্যন্ত ২০২৬ সালের জুনে ৬ লাখ ৬ হাজার কোটি টাকা-এই ধারাবাহিকতা দেখলেই বোঝা যায়, সমস্যাটি কত পুরোনো এবং কত গভীর।

দেয়ালের ফাটল আজ দেখা যাচ্ছে বলে ফাটল আজ তৈরি হয়েছে-এমন নয়। বহু বছরের পুরোনো ক্ষত এবার প্রকাশ্যে এসেছে। বাংলাদেশের ব্যাংক খাতের ক্ষেত্রেও সত্যটা একই।

এখন প্রয়োজন সেই পুরোনো ক্ষত আবার ঢেকে রাখা নয়; ক্ষত কোথায় এবং কতটা গভীর-তা স্বীকার করে স্থায়ীভাবে তার চিকিৎসা করা। কারণ, কার্পেট সরানো হয়েছে বলেই এখন ধুলো দেখা যাচ্ছে। সেই ধুলো আবার কার্পেটের নিচে লুকিয়ে রাখার সময় নয়; বরং ধুলো পরিষ্কার করে ব্যাংক খাতকে সুস্থ ও জবাবদিহিমূলক ব্যবস্থায় ফিরিয়ে আনার সময়।

লেখক: সাবেক সাধারণ সম্পাদক, ইকোনমিক রিপোর্টার্স ফোরাম (ইআরএফ)