মাদ্রাসায় যৌন নির্যাতন প্রতিরোধে সেল ও কমিটি গঠনের দাবিতে আইনি নোটিশ

মাদ্রাসায় যৌন নির্যাতন প্রতিরোধে সেল ও কমিটি গঠনের দাবিতে আইনি নোটিশ

ফন্ট সাইজ:

সারা দেশে মাদ্রাসায় শিশুদের ওপর যৌন নির্যাতন, ধর্ষণ, বলাৎকার ও নিষ্ঠুরতা প্রতিরোধে জাতীয় পর্যায়ে একটি সেল এবং প্রতিটি মাদ্রাসায় শিশু যৌন নির্যাতন প্রতিরোধ ও সুরক্ষা কমিটি গঠনের দাবিতে সরকারকে আইনি নোটিশ পাঠানো হয়েছে। সোমবার সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মুহাম্মদ নূরুল হুদা স্বরাষ্ট্র, শিক্ষা, আইন, সমাজকল্যাণ ও ধর্ম মন্ত্রণালয়ের সচিবদের এই নোটিশ পাঠিয়েছেন। নোটিশ পাওয়ার ৫ দিনের মধ্যে কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে রিট করা হবে বলে জানিয়েছেন আইনজীবী নূরুল হুদা।

নোটিশ পাঠানোর বিষয়ে আইনজীবী বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বিভিন্ন মাদ্রাসায় শিক্ষার্থীদের সঙ্গে ঘটে যাওয়া যৌন নির্যাতন, বলাৎকার ও ধর্ষণের মতো ঘটনার বিষয়ে যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণের জন্যই এই নোটিশ পাঠানো হয়েছে।

তিনি বলেন, নোটিশে দুটি বিষয়কে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এর একটি বাংলাদেশের প্রতিটি মাদ্রাসায় শিশু যৌন নির্যাতন প্রতিরোধ ও সুরক্ষা কমিটি গঠন এবং অন্যটি জাতীয় পর্যায়ে একটি শিশু যৌন নির্যাতন প্রতিরোধ ও সুরক্ষা সেল প্রতিষ্ঠা।

আইনজীবী আরও বলেন, সুপ্রিম কোর্টের হাই কোর্ট বিভাগের বাংলাদেশ ন্যাশনাল উইমেন লইয়ার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিএনডব্লিউএলএ) বনাম বাংলাদেশ ও অন্যান্য মামলায় যৌন হয়রানি প্রতিরোধে যে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল, তার আলোকে স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে যৌন নির্যাতন প্রতিরোধ কমিটি গঠনের ব্যবস্থা নেওয়া হলেও মাদ্রাসায় এ ধরনের কাঠামো গড়ে ওঠেনি।

নোটিশে বলা হয়েছে, ২০১০ সালের রিট মামলার রায় ২০১১ সালের ৪ জানুয়ারি দেওয়া হয়। মাদ্রাসায় শিশু যৌন নির্যাতন প্রতিরোধে ওই মামলার নির্দেশনার আদলে কমিটি গঠনের দাবি জানানো হয়েছে।

নোটিশে একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসায় প্রাতিষ্ঠানিক শিশু যৌন নির্যাতনের ৩৯টি প্রতিবেদিত ঘটনার মধ্যে ২৩টি বা ৫৯ শতাংশই ঘটেছে মাদ্রাসায়। অথচ মোট শিক্ষার্থীর মধ্যে মাদ্রাসা শিক্ষার্থীর অনুপাত প্রায় ১৬ শতাংশ। মাদ্রাসা শিক্ষার্থী আনুমানিক ২৭ লাখ ৬০ হাজার এবং স্কুল ও কলেজের শিক্ষার্থী প্রায় ১ কোটি ৪৪ লাখ বলে নোটিসে উল্লেখ করা হয়েছে।

এ ছাড়া ১৭ মার্চ থেকে ৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ পর্যন্ত ছয় মাসেরও কম সময়ে দেশের অন্তত ১৮টি জেলায় মাদ্রাসার শিক্ষক, অধ্যক্ষ ও তত্ত্বাবধায়কদের বিরুদ্ধে শিশুদের ধর্ষণ, বলাৎকার, যৌন নির্যাতন, যৌন হয়রানি ও গুরুতর শারীরিক নিষ্ঠুরতার অন্তত ৩০টি পৃথক ঘটনার তথ্য জাতীয় সংবাদমাধ্যম থেকে সংগ্রহ করার কথা নোটিশে বলা হয়েছে।

নোটিশে আরও বলা হয়েছে, এসব ঘটনায় পাঁচ, ছয় ও সাত বছর বয়সী শিশুরাও ভুক্তভোগী হয়েছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে ছয় মাস বা প্রায় এক বছর ধরে নির্যাতন চললেও তা প্রকাশ্যে আসেনি।

এ সময়ে প্রাতিষ্ঠানিক নির্যাতন ও নিষ্ঠুরতার অভিযোগের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ঘটনায় ঢাকার রায়েরবাগে ১৩ বছর বয়সী নাঈম শেখ এবং ঢাকার বনশ্রীতে যৌন নির্যাতনের অভিযোগের পর আত্মহত্যা করা ১০ বছর বয়সী এক শিক্ষার্থীর মৃত্যুর কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।

নেত্রকোণার মদনে ১১ বছর বয়সী এক শিশু মাদ্রাসা শিক্ষকের বিরুদ্ধে ধর্ষণের অভিযোগের পর গর্ভবতী হওয়ার এবং পরবর্তীতে ডিএনএ পরীক্ষায় অভিযুক্তের সম্পৃক্ততা নিশ্চিত হওয়ার কথাও নোটিশে রয়েছে।

দিনাজপুরের বিরামপুরে ৫ সেপ্টেম্বরের একটি মামলায় এক শিক্ষক ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে দেওয়া জবানবন্দিতে বিভিন্ন মাদ্রাসায় আনুমানিক ২০০ থেকে ২৫০ শিক্ষার্থীর সঙ্গে একই ধরনের আচরণ করার কথা স্বীকার করেছেন বলেও এতে উল্লেখ করা হয়েছে।

নোটিশে আরও বলা হয়, আলিয়া মাদ্রাসা ব্যবস্থা সরকারি শিক্ষা তত্ত্বাবধানের অধীনে থাকলেও হিফজ ও কওমি মাদ্রাসার বড় একটি অংশ সরাসরি রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণের বাইরে রয়েছে। একই সঙ্গে মাদ্রাসা শিক্ষকদের জন্য কেন্দ্রীয় ও আইনগতভাবে বাধ্যতামূলক নিবন্ধন বা কালো তালিকার ব্যবস্থা না থাকায় শিশু যৌন নির্যাতনের অভিযোগে অভিযুক্ত কেউ জামিনে মুক্ত হয়ে অন্য মাদ্রাসায় যোগ দিতে বা নতুন মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করতে পারার বিষয়টিও তুলে ধরা হয়েছে।

সেল ও কমিটি গঠনের পাশাপাশি নোটিশে শিশু আইন, ২০১৩-এর অধীনে গঠিত জাতীয়, জেলা ও উপজেলা শিশুকল্যাণ বোর্ডগুলোকে তাদের আওতাধীন প্রতিটি মাদ্রাসার শিশু সুরক্ষা ব্যবস্থা নিরীক্ষা করে ফলাফল প্রকাশের দাবি জানানো হয়েছে।

প্রতিটি মাদ্রাসায় লিখিত শিশু সুরক্ষা নীতি গ্রহণ ও বাস্তবায়ন, স্বাধীন ও গোপনীয় অভিযোগ ব্যবস্থা, শিশুদের জন্য জাতীয় শিশু-সুরক্ষা হটলাইন এবং জেলা শিশু-সুরক্ষা কর্তৃপক্ষের কাছে সরাসরি অভিযোগ জানানোর ব্যবস্থা করার দাবিও রয়েছে।

এ ছাড়া শিক্ষক, আবাসিক তত্ত্বাবধায়ক, হোস্টেল ওয়ার্ডেন ও কেয়ারটেকার নিয়োগের আগে এবং চাকরিকালে পুলিশ ভেরিফিকেশন, ফৌজদারি রেকর্ড যাচাই ও পরিচয় যাচাই বাধ্যতামূলক করা, আবাসিক মাদ্রাসায় নিয়মিত ও পূর্বঘোষণাবিহীন স্বাধীন সরকারি পরিদর্শনের ব্যবস্থা এবং ধর্ষণ, বলাৎকার বা যৌন নির্যাতনের অভিযোগ উঠলে অভিযুক্তকে শিশুদের কাছ থেকে তাৎক্ষণিকভাবে দূরে রাখার দাবিও করা হয়েছে।

নোটিশে প্রতিটি মাদ্রাসার প্রবেশপথ, করিডোর, শ্রেণিকক্ষ ও সাধারণ আবাসিক এলাকায় সিসিটিভি স্থাপনের কথা বলা হয়েছে। তবে বাথরুম, টয়লেট বা অন্য কোনো ব্যক্তিগত স্থানে ক্যামেরা স্থাপন নিষিদ্ধ রাখার দাবি জানানো হয়েছে।

নোটিশে সংবিধানে থাকা শিশুদের অধিকার এবং শিশু আইন, ২০১৩ ও নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০-এর সংশ্লিষ্ট বিধানের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।