নয়া দিল্লিতে সম্প্রতি শেষ হয়েছে ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলন। সম্মেলনে অর্থনৈতিক সম্পর্ক জোরদার ও সহযোগিতা বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করা হয়েছে। তবে সম্মেলনে একটি বড় সংকট এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে। ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইল সংঘাত ব্রিকসের অধিকাংশ সদস্য দেশকে প্রভাবিত করলেও যৌথ ঘোষণায় বিষয়টি সরাসরি আনা হয়নি। আগ্রাসী দেশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের নাম উল্লেখ বা কোনো নিন্দা পর্যন্ত জানানো হয়নি।
এই নমনীয় ভাষা সদস্যদের একই কূটনৈতিক বলয়ে রাখতে সাহায্য করেছে। তবে এতে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে যে পশ্চিমা ব্যবস্থার প্রতি অসন্তোষ থাকলেও ব্রিকস যৌথ ভূরাজনৈতিক পদক্ষেপে ব্যর্থ হচ্ছে। গত মে মাসে দিল্লিতে পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের বৈঠকেও ইরানের পরিস্থিতি নিয়ে অভিন্ন অবস্থান তৈরি করা যায়নি। ইরান চেয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের হামলার নিন্দা জানানো হোক। তবে সংযুক্ত আরব আমিরাত ইরানের হামলা ও নিজেদের নিরাপত্তা উদ্বেগ উপেক্ষা করা ভাষার বিরোধিতা করে। ব্রিকসের সম্প্রসারণ বৈশ্বিক পরিধি বাড়ালেও অভ্যন্তরীণ আঞ্চলিক বিরোধকে আরও প্রকট করেছে।
ব্রিকসের মূল সমস্যা তাদের অর্থনৈতিক বা কূটনৈতিক সক্ষমতার অভাব নয়। বরং এই শক্তিকে একটি অভিন্ন ভূরাজনৈতিক নীতিতে রূপান্তর করার অক্ষমতা। জোটের প্রতিটি দেশের স্বার্থ আলাদা। ভারত ব্রিকসকে কোনো যুক্তরাষ্ট্রবিরোধী জোট হিসেবে দেখে না। তারা বরং কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন চায়। নয়া দিল্লি ওয়াশিংটনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ও কোয়াড জোটে অংশ নিচ্ছে। একই সঙ্গে তারা রাশিয়া ও চীনের সঙ্গেও সম্পর্ক বজায় রাখছে। ব্রিকসকে সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রবিরোধী রূপ দিলে ভারতের নিজস্ব কূটনৈতিক ভারসাম্য নষ্ট হবে।
চীন ও রাশিয়ার ক্ষেত্রেও হিসাব ভিন্ন। রাশিয়া পশ্চিমা চাপ কমাতে ব্রিকসকে ব্যবহার করে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সরাসরি সংঘাতে জড়ানোর ঝুঁকি তারা এড়িয়ে চলে। চীনের জন্য ওয়াশিংটন এখনও একটি বড় রপ্তানি বাজার। তাই তারা সব ক্ষেত্রেই যুক্তরাষ্ট্রের বিরুপভবে মুখোমুখি হতে চায় না। ব্রাজিল ও ইন্দোনেশিয়াও ব্রিকসকে চীন বা রাশিয়ার প্রভাব বিস্তারের হাতিয়ার বানাতে চায় না।
সদস্যদের এই বহুমুখী অবস্থানের কারণে ব্রিকস সরাসরি ভূরাজনৈতিক পদক্ষেপ নিতে পারছে না। তবে জোটের গুরুত্ব কম নয়। ব্রিকস বিশ্বব্যবস্থা ভেঙে ফেলার চেয়ে ধীরে ধীরে দরকষাকষির পরিবেশ বদলে দিচ্ছে। তারা আন্তর্জাতিক আর্থিক ব্যবস্থার সংস্কার, নিজস্ব মুদ্রায় বাণিজ্য বাড়ানো এবং উন্নয়ন তহবিল গঠনে কাজ করছে। কঠোর সামরিক সংঘাত এড়িয়ে এমন ধীরস্থির অর্থনৈতিক পরিবর্তনই হয়তো দীর্ঘমেয়াদে ব্রিকসের জন্য ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে।
লেখক: ইন্দোনেশিয়া স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইকোনমিক অ্যাকশন ইনস্টিটিউশনের একজন সিনিয়র আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক।
