প্রথম আলো
‘গ্যাস সরবরাহ বাড়ছে, আদানির ইউনিট চালু, তবু লোডশেডিং’—এটি দৈনিক প্রথম আলোর প্রথম পাতার খবর। প্রতিবেদনে বলা হয়, গ্যাস সরবরাহ আজ সোমবার থেকে কিছুটা বাড়তে পারে। এদিকে কারিগরি ত্রুটির কারণে বন্ধ হওয়া আদানির বিদ্যুৎকেন্দ্রের একটি ইউনিট গতকাল চালু হয়েছে। তারপরও বিদ্যুতের লোডশেডিং সহনীয় হতে সময় লাগবে। কারণ, দেশের তিনটি বড় কয়লাবিদ্যুৎকেন্দ্রে সক্ষমতার অর্ধেক উৎপাদন হচ্ছে।
দেশে দেড় মাসের বেশি সময় ধরে গ্যাসের সংকট চলছে। এতে করে বিদ্যুৎ উৎপাদন কমায় লোডশেডিং বেড়েছে। গ্যাসের অভাবে শিল্পকারখানা পুরো সক্ষমতায় চালানো যাচ্ছে না। রান্না ও পরিবহনে বেড়েছে ভোগান্তি।
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত প্রথম আলোকে বলেন, পরিকল্পনা অনুসারে গ্যাস সরবরাহ বাড়ানো হচ্ছে। শিল্পসহ সব খাতের গ্রাহকের গ্যাস বাড়বে। কয়েকটি কয়লাচালিত কেন্দ্রে কারিগরি ত্রুটি না হলে বিদ্যুৎ পরিস্থিতির আরও উন্নতি হতো। তবে যত দিন যাবে, বিদ্যুৎ ও গ্যাস সরবরাহ পরিস্থিতির তত উন্নতি হতে থাকবে।
তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানি তদারক করে পেট্রোবাংলা। আমদানি করে পেট্রোবাংলার কোম্পানি রূপান্তরিত প্রাকৃতিক গ্যাস কোম্পানি লিমিটেড (আরপিজিসিএল)। এলএনজি সরবরাহের সঙ্গে যুক্ত তিনজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, এলএনজির কার্গো আমদানি কমায় সরবরাহ বাড়ানো যাচ্ছিল না। এখন কার্গো নিয়মিত আসতে শুরু করেছে। তাই সরবরাহ বাড়ানো হচ্ছে।
পেট্রোবাংলা সূত্র বলছে, দিনে গ্যাসের চাহিদা ৩৮০ কোটি ঘনফুট হলেও ২৬৫ থেকে ২৭০ কোটি ঘনফুট সরবরাহ করে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া হয়। গতকাল সরবরাহ করা হয়েছে ২৩৭ কোটি ঘনফুট, যার মধ্যে এলএনজি থেকে এসেছে ৭৫ কোটি ঘনফুট। আজ থেকে এলএনজি সরবরাহ বাড়িয়ে ৯৩ কোটি ঘনফুট করা হতে পারে। এটি হলে দিনের মোট গ্যাস সরবরাহ দাঁড়াবে ২৫৫ কোটি ঘনফুটে। ফলে শিল্পকারখানায় গ্যাস-সংকট কমতে পারে বলে আশা করছে পেট্রোবাংলা।
পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান মো. আবদুল মান্নান প্রথম আলোকে বলেন, বিশ্ববাজারে এলএনজি কার্গোর সরবরাহ কম। এর মধ্যেই চাহিদামতো এলএনজি আমদানি করা হচ্ছে। সোমবার থেকেই সরবরাহ বাড়ানো হচ্ছে। দ্রুতই গ্যাস সরবরাহ পরিস্থিতির উন্নতি হবে।
দেশে ৯ বছর ধরে দেশীয় গ্যাসের উৎপাদন কমছে। ঘাটতি পূরণে ২০১৮ সাল থেকে এলএনজি আমদানি শুরু হয়। কক্সবাজারের মহেশখালীতে আমদানি করা এলএনজি সরবরাহের দুটি ভাসমান টার্মিনাল রয়েছে। একটি মার্কিন কোম্পানি এক্সিলারেট এনার্জির, অন্যটি দেশি কোম্পানি সামিটের। গত ২১ জুলাই অগ্নিদুর্ঘটনার পর এক্সিলারেট এনার্জির টার্মিনাল বন্ধ হয়ে যায়। টানা ২৫ দিনের তীব্র গ্যাস-সংকটের পর গত ১৫ আগস্ট টার্মিনাল পুরোদমে সরবরাহের জন্য তৈরি হয়। তবে এলএনজির নতুন কার্গো কম আসায় সরবরাহ বাড়ানো যাচ্ছিল না।
সাধারণত প্রতি মাসে গড়ে ১০টি এলএনজি কার্গো আনা হয়। তবে এটি চাহিদা বুঝে কিছুটা কমে ও বাড়ে। গত বছর জুলাই–আগস্টে ২১টি কার্গো আনা হলেও এবার এসেছে ১৫টি। সরাসরি ক্রয়পদ্ধতিতে (ডিপিএম) কেনা চারটি কার্গো আগস্টে আসার কথা, একটিও আসেনি। এ মাসেও আসার তেমন সম্ভাবনা নেই। দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির অধীনে কাতার থেকেও আসছে না। বাধ্য হয়ে বেশি দামে খোলাবাজার থেকে কিনতে হচ্ছে।
আসছে আরও ৬ কার্গো এলএনজি
পেট্রোবাংলা ও আরপিজিসিএল সূত্র বলছে, সেপ্টেম্বরে ১০টি এলএনজি কার্গো আনার পরিকল্পনা নেওয়া হয়। একাধিকবার দরপত্র দিলেও সবগুলো পাওয়া যায়নি। দামও অনেক বেড়ে গেছে। এ মাসে সব মিলে ৯টি কার্গো নিশ্চিত হয়েছে। এর মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় গানভর যুক্তরাষ্ট্রের দুটি, স্বল্পমেয়াদি চুক্তির আওতায় আরামকোর দুটি এবং খোলাবাজার থেকে কেনা হয়েছে পাঁচটি।
আরপিজিসিএল সূত্র বলছে, এ মাসে আরামকোর দুটি ও ব্রিটিশ পেট্রোলিয়ামের একটি কার্গো ইতিমধ্যে এলএনজি সরবরাহ করেছে। কোরীয় কোম্পানি পস্কোর একটি কার্গো আসার কথা ছিল গতকাল। এটি আজ সোমবার সকালে পৌঁছার কথা রয়েছে। এরপর ১৬ সেপ্টেম্বর গানভর, ১৮ সেপ্টেম্বর আরামকো, ২৩ সেপ্টেম্বর টোটাল এনার্জি, ২৫ সেপ্টেম্বর আরামকো ও ২৮ সেপ্টেম্বর গানভরের একটি করে কার্গো আসার কথা। ফলে এলএনজি থেকে সরবরাহ বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হয়েছে।
জ্বালানি বিভাগ সূত্র বলছে, মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাত, কাতারের সরবরাহে অনিশ্চয়তা এবং শীত সামনে রেখে ইউরোপের বাড়তি চাহিদা এলএনজির দাম বাড়িয়েছে। ছয় মাসে আন্তর্জাতিক বাজারে এলএনজির দাম বেড়ে প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। গত জানুয়ারিতে এশিয়ার স্পট বাজারে প্রতি ইউনিট (এমএমবিটিইউ) এলএনজির দাম ছিল ১০ থেকে ১১ মার্কিন ডলার। গত এপ্রিলের শেষ দিকেও দাম ছিল ১৪ থেকে ১৫ মার্কিন ডলার। জুলাইয়ের শেষ সপ্তাহে তা বেড়ে প্রায় ২২ মার্কিন ডলারে পৌঁছেছে। সেপ্টেম্বরে এটি ২৮ ডলার ছাড়িয়েছে। এর মধ্যেই অক্টোবরের জন্য এলএনজি কার্গো কেনা শুরু হয়েছে। ইতিমধ্যে অক্টোবরের ৬টি কার্গো নিশ্চিত হয়েছে। আরও ৫টি কিনতে দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে।
লোডশেডিং এখনই থামছে না
কয়লাস্বল্পতায় এক মাস ধরে সীমিত বিদ্যুৎ উৎপাদন করছিল আদানির বিদ্যুৎকেন্দ্র। এর মধ্যে গত বুধবার রাত ১২টার দিকে কারিগরি ত্রুটির কারণে বিদ্যুৎকেন্দ্রের একটি ইউনিট বন্ধ হয়ে যায়। এতে উৎপাদন আরও কমায় দেশে লোডশেডিং বেড়ে যায়। গতকাল দুপুর ১২টায় আদানির দ্বিতীয় ইউনিট থেকে সরবরাহ শুরু হয়। সন্ধ্যা ৬টায় এ কেন্দ্র থেকে সরবরাহ বেড়ে ১ হাজার ৪৫০ মেগাওয়াট ছাড়িয়ে যায়।
এর আগে ঝড়ের কারণে কয়লা সরবরাহ ব্যাহত হওয়ায় গত ৭ আগস্ট থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন কমায় আদানির বিদ্যুৎকেন্দ্র। কয়লা সরবরাহ বাড়ার পর বুধবার রাতে ১ হাজার ৪০০ মেগাওয়াট ছাড়িয়ে যায় উৎপাদন। তবে ওই দিন একটি ইউনিট বন্ধের পর উৎপাদন কমে ৭৫০ মেগাওয়াটের নিচে নেমে যায়। ভারতের ঝাড়খন্ড রাজ্যে নির্মিত আদানির কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রটি ১ হাজার ৬০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার। চাহিদা বুঝে দেড় হাজার মেগাওয়াটের বেশি সরবরাহ করার রেকর্ড আছে এই কেন্দ্রের।
আদানির বিদ্যুৎকেন্দ্র চালুর আগে গতকাল বেলা সাড়ে ১১টায় কারিগরি কারণে বন্ধ হয়ে যায় বাগেরহাটের রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের একটি ইউনিট। এতে কেন্দ্রটি থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন কমে অর্ধেকে নেমেছে। ভারত ও বাংলাদেশের যৌথ উদ্যোগে নির্মিত রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রটি কয়লাচালিত। মাঝে কয়লাস্বল্পতায় উৎপাদন কমেছিল। এখন কয়লার মজুত আছে। গতকাল সকাল পর্যন্ত উৎপাদন হচ্ছিল ১ হাজার ১০০ মেগাওয়াটের বেশি। এক ইউনিট বন্ধের পর গতকাল ৬৫৭ মেগাওয়াট উৎপাদন করেছে কেন্দ্রটি। এটি আবার উৎপাদনে ফিরতে চার দিন লাগতে পারে বলে জানিয়েছেন বিদ্যুৎকেন্দ্রের মানবসম্পদ বিভাগের মহাব্যবস্থাপক (জনসংযোগ) আনোয়ারুল আজিম।
পটুয়াখালীতে চীন ও বাংলাদেশের যৌথ উদ্যোগে দুটি কয়লাচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্র আছে। প্রতিটি কেন্দ্র ১ হাজার ৩২০ মেগাওয়াট সক্ষমতায় নির্মিত হয়। এর মধ্যে পায়রা বিদ্যুৎকেন্দ্রের একটি ইউনিট কারিগরি কারণে বন্ধ আছে। এতে উৎপাদন হচ্ছে ৫৭০ মেগাওয়াট। এখানে কয়লা পর্যাপ্ত আছে। আর একই জেলার আরেকটি কেন্দ্রে কয়লার স্বল্পতা থাকায় উৎপাদন হচ্ছে ৪০০ থেকে ৮০০ মেগাওয়াট। তার মানে এ দুটি কেন্দ্র মিলে উৎপাদন কমেছে ১ হাজার মেগাওয়াটের বেশি।
বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) ও পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি সূত্র বলছে, সবচেয়ে বেশি বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যায় কয়লা থেকে। কিন্তু এক মাস ধরে কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে একের পর এক সমস্যা দেখা দিচ্ছে। ফলে বিদ্যুৎ চাহিদা পূরণ করা যাচ্ছে না। শনিবার রাত ১২টায় ৩ হাজার মেগাওয়াটের বেশি লোডশেডিং হয়েছে। গতকাল দিনের বেলাতেও আড়াই হাজার মেগাওয়াট ছাড়িয়েছে লোডশেডিং।
পিডিবির সদস্য (উৎপাদন) মো. জহুরুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, টানা চালু থাকায় কয়লার কেন্দ্রগুলোতে কারিগরি ত্রুটি দেখা দিচ্ছে, এগুলো রক্ষণাবেক্ষণ করা হচ্ছে। জ্বালানি তেলের আমদানি বাড়ানো হচ্ছে, আসতেও শুরু করেছে। তেল থেকে ৩ হাজার ৮০০ মেগাওয়াট পর্যন্ত বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হয়েছে। ২০ সেপ্টেম্বরের পর জ্বালানি তেলের সরবরাহ বাড়বে। ওই সময় বিদ্যুৎ উৎপাদন আরও বাড়ানো হবে।
যুগান্তর
দৈনিক যুগান্তরের প্রধান শিরোনাম ‘চাপে জনগণ, সরকারে অস্বস্তি’। খবরে বলা হয়, কোনো সুখবর নেই। গ্যাস-বিদ্যুতের সংকট দেশের সব পেশার মানুষকে ভোগাচ্ছে। দিনের বেশির ভাগ সময়ই বাসাবাড়িতে গ্যাস থাকে না। আর রাতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ঘুরছে না ফ্যান। শিল্পকারখানায় মেশিনের চাকা বন্ধ। সাধারণ মানুষের ওপর এর বহুমুখী প্রভাব পড়ছে। মানুষের আয় কমছে। এতে ক্ষুব্ধ সব শ্রেণির মানুষ। বিরোধী দলও সংসদের বাইরে রাজপথের আন্দোলনে নেমেছে। এ নিয়ে সব মহলের সমালোচনায় সরকার বিব্রত। সরকারের উচ্চপর্যায় থেকে প্রকাশ্যে এ বিষয়ে অস্বস্তির কথা স্বীকার করছে। তবে দাবি, এই সংকট তাদের সৃষ্টি নয়। তারা উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়েছে। সংকট সমাধানের সহজ কোনো পথ নেই।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নিত্যপণ্যের উচ্চমূল্য কিংবা আইনশৃঙ্খলা নিয়ে অসন্তোষ রয়েছে। তবে এটি সব সরকারের আমলেই কম-বেশি ছিল। কিন্তু গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকট এবার যেন সব সীমা ছাড়িয়ে গেছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় দীর্ঘমেয়াদি পদক্ষেপের পরামর্শ দিয়েছেন তারা।
জানতে চাইলে অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক আবু আহমেদ শনিবার যুগান্তরকে বলেন, গ্যাস-বিদ্যুৎ সমস্যা দেশের জন্য বড় দুর্যোগ। অর্থনীতিতে ইতোমধ্যে এর ব্যাপক প্রভাব পড়েছে। সাধারণ মানুষ কষ্টে আছে। তিনি বলেন, এই দুর্যোগ মোকাবিলার সহজ কোনো পথ নেই। এজন্য সময় লাগবে। সবাইকে এটা মেনে নিতে হবে। শুধু সরকারকে দায়ী করে লাভ নেই। একক কোনো সরকার সম্পূর্ণভাবে দায়ী নয়। যে কোনো সরকার থাকলে একই অবস্থা হতো। তিনি আরও বলেন, বর্তমানে গ্যাসের সরবরাহ কম। যুদ্ধের কারণে বিশ্ববাজারে তেলের দাম বেড়েছে। অনেক বিদ্যুৎকেন্দ্রের মেয়াদ শেষ হয়েছে। আবার ভারতের আদানি গ্রুপের কাছ থেকে কেনা বিদ্যুৎ চুক্তি অনুসারে পাওয়া যাচ্ছে না। তারা অর্ধেক বিদ্যুৎ দিচ্ছে। সবকিছু মিলে বড় সংকট তৈরি হয়েছে।
আবু আহমেদ বলেন, সরকার চেষ্টা করছে। কয়েকটি কুইক রেন্টাল পাওয়ার সচল করার চেষ্টা করা হচ্ছে। তেল আমদানির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে এসবের দীর্ঘমেয়াদি সমাধান হলো ব্যাপকভাবে সৌরবিদ্যুতের ব্যবস্থা করতে হবে। কিন্তু এজন্য এক বছরের বেশি সময় লাগবে।
গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকট দেশের সব মানুষকে চরম ভোগান্তিতে ফেলেছে। উচ্চবিত্তের ড্রয়িংরুম থেকে বস্তির ঝুপড়ি ঘর পর্যন্ত সবাই ভুক্তভোগী। গ্রাম থেকে শহর-কেউ এর বাইরে নেই। বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) তথ্যমতে, এই মৌসুমে দেশে দৈনিক বিদ্যুতের চাহিদা প্রায় ১৭ হাজার ৬০০ মেগাওয়াট। কিন্তু উৎপাদন হয় ১৫ হাজার ৩০০ মেগাওয়াট। ফলে কাগজে-কলমে ঘাটতি ২ হাজার থেকে আড়াই হাজার মেগাওয়াট। কিন্তু বাস্তব পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ। গ্রামে কোথাও কোথাও দিনে ৮ থেকে ১২ ঘণ্টাও বিদ্যুৎ থাকছে না। দেশের ১৪৩টি বিদ্যুৎকেন্দ্রের মধ্যে ৬২টিই জ্বালানি সংকটে ভুগছে। এর মধ্যে ২৬টি গ্যাসভিত্তিক, ৩৩টি তেলভিত্তিক ও দুটি কয়লাভিত্তিক। গ্যাসের চাপও কমে গেছে। অন্যদিকে বর্তমানে দেশে প্রতিদিন গ্যাসের চাহিদা ৩ হাজার ৮০০ থেকে ৪ হাজার মিলিয়ন ঘনফুট (এমএমসিএফডি)। বিপরীতে মিলছে ২ হাজার ২০০ থেকে ২ হাজার ৪০০ এমএমসিএফডি। অর্থাৎ প্রতিদিন ঘাটতি ১ হাজার ৪০০ থেকে ১ হাজার ৬০০ এমএমসিএফডি। দেশীয় গ্যাসক্ষেত্র থেকে দৈনিক সরবরাহ কমে ১ হাজার ৬০০ এমএমসিএফডিতে নেমেছে। আর এলএনজি আমদানি করে যোগ করা হচ্ছে ১ হাজার এমএমসিএফডির মতো। বিদ্যুৎকেন্দ্রে স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে গ্যাস সরবরাহ কমছে। ঘাটতি পূরণে সরকারকে এখন দামি তেল ও ডিজেলভিত্তিক কেন্দ্র চালাতে হচ্ছে স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে অনেক বেশি। সাধারণত লোকসানের কারণে অনেক সময় যা বন্ধ রাখা হয়।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক ড. ইজাজ হোসেন যুগান্তরকে বলেন, সমস্যা কঠিন আকার ধারণ করেছে। এর স্বল্পমেয়াদি সমাধান হলো আবাসিকের তুলনায় শিল্প খাতে গ্যাস বেশি দিতে হবে। আর বিদ্যুতের জন্য কয়লাভিত্তিক কেন্দ্র চালু করতে হবে। তিনি বলেন, পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রটি চালু হওয়ার আগ পর্যন্ত এভাবেই আমাদের চলতে হবে। আর দীর্ঘমেয়াদি সমাধান হলো এলএনজি আমদানি। কিন্তু খুব বেশি এলএনজি আমদানির সক্ষমতা আমাদের নেই, কারণ ডলার ঘাটতি আছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই সংকট রাতারাতি তৈরি হয়নি। এর পেছনে একাধিক কারণ রয়েছে। পতিত সরকার এবং তাদের সহযোগীরা পরিস্থিতির জন্য দায়ী। গ্যাস অনুসন্ধান না করে অতিরিক্ত বিদ্যুৎকেন্দ্র বানানো হয়েছে। গ্যাস নেই জেনেও দুর্নীতির মাধ্যমে বহু শিল্পপ্রতিষ্ঠানকে সংযোগ দেওয়া হয়েছে। দ্বিতীয়ত, দেশীয় গ্যাসক্ষেত্রের উৎপাদন প্রতিবছর কমছে। এই ঘাটতি পূরণ করতে হচ্ছে আমদানি করা তরলীকৃত গ্যাস (এলএনজি) দিয়ে। তৃতীয়ত, সম্প্রতি একটি এলএনজি টার্মিনালে দুর্ঘটনার পর পাইপলাইনে গ্যাস সরবরাহ একলাফে ১৭ শতাংশের বেশি কমে যায়। এতে সংকট আরও তীব্র করে। চতুর্থত, ডলার সংকট। এলএনজি আমদানি ব্যয়বহুল। আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়লে সরকার আমদানি কমিয়ে দেয়। যার প্রভাব সরাসরি সরবরাহে পড়ে। পঞ্চমত, নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার খুবই কম। দেশের মোট জ্বালানির মধ্যে নবায়নযোগ্য মাত্র ২ দশমিক ৩ শতাংশ। যেখানে বৈশ্বিক গড় প্রায় ৩৪ শতাংশ। ফলে মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের কারণে বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম বাড়লে বাংলাদেশে সরাসরি প্রভাব পড়েছে।
কনজ্যুমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) কেন্দ্রীয় কমিটির ভাইস প্রেসিডেন্ট এসএম নাজের হোসাইন শনিবার যুগান্তরকে বলেন, বিদ্যমান সমস্যার দ্রুত সমাধান করা কঠিন। এক্ষেত্রে সরকার যেভাবে উদ্যোগ নিয়েছে তার সবকিছু বাস্তবসম্মত নয়। উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের কথা বলা হচ্ছে। এজন্য রাত ৮টার মধ্যে দোকানপাট বন্ধ করতে বলা হয়েছে। কিন্তু বাস্তবে এই সময়ের মধ্যে দোকানপাট বন্ধ হয় না। আবার এগুলো নজরদারি করা হয় না। তিনি আরও বলেন, সংকট সমাধানের জন্য নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে জোর দিতে হবে। এক্ষেত্রে পাকিস্তানের অভিজ্ঞতা কাজে লাগানো যায়। পাকিস্তান নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে গুরুত্ব দিয়ে তাদের বিদ্যুৎ সমস্যার সমাধান করেছে। দ্বিতীয়ত, কিছু কুইক রেন্টাল পাওয়ার চালু করতে হবে। এছাড়াও সরকারকে আরও কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।
কালের কণ্ঠ
‘মিয়ানমারে যাচ্ছে সার, আসছে ইয়াবা’—এটি দৈনিক কালের কণ্ঠের প্রধান শিরোনাম। খবরে বলা হয়, কক্সবাজারের সীমান্তবর্তী টেকনাফের হোয়াইক্যং ইউনিয়নের উলুবনিয়া গ্রাম। ওই গ্রামের কৃষক হারুন প্রায় ১০ একর (২৪ কানি) জমিতে আমন ধানের চাষ করেছেন।
টেকনাফের স্থানীয় সার ডিলারদের কাছে ধরনা দিয়েও তিনি সার পাননি। শেষে পাশের উখিয়া উপজেলার পালংখালী ইউনিয়নের ডিলারের কাছ থেকে আট বস্তা সার কিনেছেন। প্রতি বস্তা সার এক হাজার ৭০০ টাকা করে নিয়েছেন ডিলার। কিন্তু সরকার নির্ধারিত মূল্য বস্তাপ্রতি এক হাজার ৩৫০ টাকা।
হারুনের পাশের গ্রাম কাটাখালী। ওই গ্রামের কৃষক আহমদ হোসেন আট কানি জমিতে এবার চাষ করেছেন। প্রতি কানিতে তাঁর সারের প্রয়োজন ২০ কেজি। তিনি পেয়েছেন ১০০ কেজি।
আরো ৬০ কেজি সারের জন্য হন্যে হয়ে ডিলারের কাছে ঘুরেও লাভ হয়নি। কৃষক হারুন ও আহমদ হোসেন গতকাল রবিবার কালের কণ্ঠকে এসব তথ্য জানিয়ে বলেন, ‘আমাদের সামনে দিয়েই মিয়ানমারের রাখাইনে বস্তা বস্তা সার পাচার হয়ে যাচ্ছে। অথচ সারের অভাবে আমাদের ক্ষেতের ধানের চারা লাল বর্ণ ধারণ করছে। সংঘবদ্ধ পাচারকারী চক্র সার পাচার করে দিচ্ছে। তাদের প্রতিরোধ করার শক্তি আমাদের নেই। আমরা অসহায়।’
কৃষক হারুন জানান, সার পাচারের অন্যতম প্রধান কারণ মিয়ানমারে সারের চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় দামও বেড়েছে চার-পাঁচ গুণ। বেশি মুনাফার লোভে এপারের চোরাকারবারিরা সার পাচারে হুমড়ি খেয়ে পড়েছে।
উখিয়ার পালংখালী এলাকার বাসিন্দা রুবেল জানান, বাংলাদেশ থেকে ইউরিয়া, টিএসপিসহ বিভিন্ন ধরনের সার অবৈধভাবে মিয়ানমারে পাচার হচ্ছে। আর এসব সারের বিনিময়ে মিয়ানমার থেকে দেশে ঢুকছে ইয়াবার চালান। সীমান্তরক্ষী বাহিনী ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনী সতর্ক থাকার পরও কিভাবে এ ধরনের চোরাচালান চলছে এ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন তিনি। স্থানীয় বিএনপি নেতা শাহ নেওয়াজ বলেন, ‘টেকনাফে বর্তমানে সারের সংকট চলছে। এই সুযোগে আমাদের দেশের একটি সংঘবদ্ধ চক্র দেশের কৃষকদের জন্য বরাদ্দ করা সার মিয়ানমারে পাচার করছে। ফলে স্থানীয় বাজারে সারের সংকট তৈরি হচ্ছে। সার পাচারের সঙ্গে জড়িত চক্রকে দ্রুত শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনা জরুরি।’
উখিয়া-টেকনাফে সার পাচারে ১৫ চক্র: কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফে রয়েছে সার পাচারে অন্তত ১৫টি চক্র। এসব চক্রের সঙ্গে জড়িত রয়েছে কয়েক শ রোহিঙ্গা শ্রমিক। মিয়ানমারে সারের দাম বেড়ে যাওয়ায় পাচারকারীদের মুনাফাও বেশি হচ্ছে। তাই পাচারকারীর সিন্ডিকেটও বাড়ছে। উখিয়ার পালংখালী ইউনিয়নের আঞ্জুমানপাড়া সীমান্ত থেকে টেকনাফের হোয়াইক্যং, হ্নীলা ও টেকনাফ সদর ইউনিয়নের কয়েকটি এলাকাজুড়ে অবস্থান এসব পাচারকারী চক্রের।
টেকনাফ-উখিয়ার ১২টি সার পাচারের পয়েন্ট: জানা গেছে, কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফ উপজেলার অন্তত ১৫টি পয়েন্ট দিয়ে মিয়ানমারে সার পাচার হচ্ছে। সার পাচারের সবচেয়ে বড় পয়েন্ট উখিয়ার পালংখালী ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের আঞ্জুমানপাড়া। অন্যদিকে টেকনাফের হোয়াইক্যং ইউনিয়নের উলুবনিয়া, হারাইঙ্গাঘোনা, ঝিমংখালী, কানজরপাড়া, তুলাতলি, কোনারপাড়া ও আমতলী এবং টেকনাফের হ্নীলা ইউনিয়নের লেদা দমদমিয়া খাল, হ্নীলা বাজার ও স্টেশন এবং রঙ্গিখালী পয়েন্ট দিয়ে সার পাচার হচ্ছে।
সাগরপথের তিনটি দ্বীপ থেকেও পাচার করা হয়: এ ছাড়া সাম্প্রতিক সময়ে সাগরপথে সারের বড় বড় চালান পাচার হয়ে যাচ্ছে মিয়ানমারে। বড় চালানের সার পাচার হচ্ছে সন্দ্বীপ, কুতুবদিয়া ও হাতিয়া থেকে। চট্টগ্রামের বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশন-বিসিআইসির রাঙ্গাদিয়া গুদাম থেকে দ্বীপ তিনটির জন্য বরাদ্দ করা সারের চালান মাছধরা নৌকায় বোঝাই করে দ্বীপে না গিয়ে সরাসরি মিয়ানমারে পাচার করা হয়।
সমকাল
দৈনিক সমকালের প্রধান শিরোনাম ‘ডিজিটাল নিরাপত্তার মতোই হচ্ছে সাইবার সুরক্ষা আইন’। প্রতিবেদনে বলা হয়, সাইবার সুরক্ষা আইন সংশোধনের জন্য খসড়া প্রস্তুত করেছে সরকার। এতে মানহানির অপরাধে সাজা যুক্ত করার প্রস্তাব রয়েছে। পাশাপাশি কাউকে হেয় প্রতিপন্ন করা, গুজব-অপতথ্য ছড়ালে ১০ বছর কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে খসড়ায়। এ রকম কিছু ধারা আওয়ামী লীগ আমলের বিতর্কিত ডিজিটাল নিরাপত্তা, সাইবার নিরাপত্তা আইনের মতো বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
বিরোধী দল ও নাগরিক সংগঠনগুলোও বলছে, খসড়ায় মানহানি, গুজব-অপতথ্যের যে ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে; এগুলোর অপব্যবহার হতে পারে।
আওয়ামী লীগ আমলের ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মানহানির জন্য ১০ বছর কারাদণ্ডের বিধান ছিল। সমালোচনার মুখে সেই আইন বিলোপ করে সাইবার নিরাপত্তা আইন করা হয়। এতে জরিমানার বিধান থাকলেও কারাদণ্ড ছিল না। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় মানহানির অংশ বাদ দিয়ে সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশ করা হয়। বিএনপি সরকার সেই অধ্যাদেশকে আইনে পরিণত করলেও ছয় মাসের মাথায় এসে তা সংশোধন করে পাঁচ বছর কারাদণ্ডের বিধান করতে চাইছে। এ ছাড়া গুজব, অপতথ্য প্রচার করলে ১০ বছর কারাদণ্ডের প্রস্তাব রয়েছে সংশোধনীর খসড়ায়।
ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগ ইতোমধ্যে আইন সংশোধনের খসড়া প্রকাশে করেছে। এতে উদ্বেগ জানিয়ে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশাল বাংলাদেশ (টিআইবি) বলেছে, খসড়াটি পাস হলে সাইবার জগৎ নিপীড়নের ভুবনে পরিণত হবে।
সাইবার সুরক্ষা আইনের এ সংশোধনী হলে তাতে মতপ্রকাশকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করার সুযোগ বৃদ্ধির আশঙ্কা রয়েছে বলে মনে করছে গবেষণা সংস্থা টেক গ্লোবাল ইনস্টিটিউট। সংস্থাটির মতে, সংশোধনীতে মানহানির সংজ্ঞা আগের চেয়ে আরও বিস্তৃত করা হয়েছে। পাশাপাশি ২৫ ও ২৬ ধারায় ‘অবমাননা’, ‘গুজব’ ও ‘অপতথ্য’-সংক্রান্ত নতুন অপরাধ যুক্ত করা হয়েছে। এসব শব্দের সংজ্ঞা যথেষ্ট স্পষ্ট নয়। ফলে কোনো বক্তব্য মানহানিকর, মিথ্যা, বিভ্রান্তিকর বা গুজব কিনা, তা নির্ধারণে ব্যক্তিগত ব্যাখ্যার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
খসড়ার বিষয়ে জানতে ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তিমন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম, প্রধানমন্ত্রীর তথ্যপ্রযুক্তিবিষয়ক উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করে সমকাল। ফোনকল এবং হোয়াটসঅ্যাপে বার্তা পাঠালেও তারা সাড়া দেননি। তথ্যপ্রযুক্তি সচিব মামুনুর রশীদ ভূঞার বক্তব্যও পায়নি সমকাল।
জানতে চাইলে প্রধানমন্ত্রীর তথ্যবিষয়ক উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান সমকালকে বলেন, আইনের সংশোধনীর খসড়ার কথা বলা হচ্ছে, তা আনুষ্ঠানিকভাবে এখনও প্রকাশ হয়নি। প্রকাশের পর এ বিষয়ে সরকার বক্তব্য জানাবে।
তবে সরকারের একটি সূত্র সমকালকে জানিয়েছে, সাইবার সুরক্ষা আইন সংশোধন করে আওয়ামী লীগ আমলের বিতর্কিত ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের মতো মানহানিকর বক্তব্যের কারণে কারাদণ্ডের বিধান রাখার প্রশ্নে সরকারের মধ্যে মতভিন্নতা রয়েছে। কয়েকজন প্রভাবশালী মন্ত্রী এ বিধানের পক্ষে। কিন্তু বিএনপির ৩১ দফা, নির্বাচনী ইশতেহার এবং দলের আগের অবস্থান বিপরীত হওয়ায় সরকারের অনেকে এমন সংশোধনীর বিপক্ষে। তাদের আশঙ্কা– মানহানি, হেয় প্রতিপন্ন, বুলিংয়ের মতো বিধান যুক্ত করলে এর অপব্যবহার হবে, যা সরকারের ভাবমূর্তি নষ্ট করবে। প্রমাণিত গুজব, অপতথ্য প্রচারকে শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে গণ্য করা যেতে পারে। তবে এ জন্য গুজব, অপতথ্য চিহ্নিত করার সুনির্দিষ্ট পদ্ধতি থাকতে হবে।
শেখ হাসিনার শাসনামলে কঠোর আইন
২০০৬ সালে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইন করা হয়। ২০১৩ সালে আইনটি সংশোধন করে কঠোর করে আওয়ামী লীগ। মানহানি, রাষ্ট্রের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করে বা আইনশৃঙ্খলার অবনতি ঘটায়, এমন কিছু অনলাইনে লেখা, বলাকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয় ৫৭ ধারায়। সরকারের সমালোচকদের মামলা ও কারাগারে পাঠানোর কারণে ধারাটি ‘কুখ্যাত’ হয়ে ওঠে।
দেশ-বিদেশে সমালোচনার মুখে আওয়ামী লীগ ২০১৮ সালে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন প্রণয়ন করে। এই আইনের ২১ ধরায় মুক্তিযুদ্ধ, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, জাতির পিতা, জাতীয় সংগীত বা জাতীয় পতাকার বিরুদ্ধে ‘প্রপাগান্ডা বা প্রচারণা’ চালালে ১০ বছর কারাদণ্ডের বিধান ছিল। ২০১৯ সালের ১৭ মার্চ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মবার্ষিকীতে বরিশালের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক শফিকুল ইসলাম শ্রদ্ধা জানানোর সময় বাম হাত দিয়ে ফুল ধরে ছবি তোলায় এক বছর কারাদণ্ড হয়।
মানহানির আসামি হয়েছিলেন তারেক রহমানও
ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের ২৫ এবং ২৯ ধারায় অনলাইনে যে কোনো বক্তব্য, সংবাদ, লেখাকে আক্রমণাত্মক, মিথ্যা, মানহানিকর আখ্যা দিয়ে মামলার সুযোগ ছিল। মানহানিকর বক্তব্য দিয়েছেন– এ অভিযোগে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বিরুদ্ধে ২০২১ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি মামলা করেছিলেন ছাত্রলীগ নেতারা। ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে এই মামলায় অভিযোগপত্রও গৃহীত হয়েছিল। তারেক রহমান অনলাইনে বক্তব্যের মাধ্যমে শেখ মুজিবুর রহমানের অবমাননা এবং মানহানি করেছেন বলে অভিযোগ করা হয়।
দেশে-বিদেশে সমালোচনার মুখে ২০২৩ সালে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন বিলুপ্ত করে সাইবার নিরাপত্তা আইন করে আওয়ামী লীগ সরকার। এই আইনেও জাতির পিতাকে অবমাননা, কোনো ব্যক্তির সম্পর্কে মানহানিকর বক্তব্য, আক্রমণাত্মক বক্তব্যকে শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয়। তবে ওই আইনে মানহানির জন্য ১০ বছর কারাদণ্ডের বদলে ২৫ লাখ টাকা জরিমানার বিধান করা হয়।
সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজের (সিজিএস) গবেষণা প্রতিবেদন অনুযায়ী, ডিজিটাল ও সাইবার নিরাপত্তা আইনে ২০১৮ থেকে ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ১ হাজার ৪৩৬টি মামলায় ৪ হাজার ৫২০ জনকে অভিযুক্ত করা হয়। এসব মামলার ৬০ শতাংশের বাদী ছিলেন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য বা আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা।
সিজিএস ৮৫৯টি মামলার বাদীর পরিচয় শনাক্ত করেছিল। ২৬৩টি মামলাই করেছিলেন তৎকালীন ক্ষমতাসীন দলের কর্মীরা। শেখ মুজিবুর রহমান, শেখ হাসিনা, সজীব ওয়াজেদ জয়, ওবায়দুল কাদেরসহ আওয়ামী লীগের মন্ত্রী, এমপি, নেতাদের নিয়ে কটূক্তির মাধ্যমে মানহানি করার অভিযোগে এসব মামলায় ৮৮৭ জনকে আসামি করা হয়েছিল। অধিকাংশ আসামি ছিলেন বিএনপির নেতাকর্মীরা। এর পরেই ছিলেন জামায়াতে ইসলামীর নেতাকর্মী এবং ফেসবুকের সাধারণ ব্যবহারকারীরা।
‘শেখ হাসিনার বিধবা ভাতা পাওয়া উচিত’– ফেসবুকে এমন মন্তব্যের কারণে ২০২০ সালের জুনে ১৫ বছর বয়সী স্কুল শিক্ষার্থী মো. ইমনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল আওয়ামী লীগ নেতাদের দায়ের করা ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের মামলায়।
শেখ হাসিনা ও ব্যবসায়ী নাফিজ শারাফাতকে বিদ্রুপ করে আঁকা কার্টুন ফেসবুকে পোস্ট করায় ২০২০ সালের মে মাসে লেখক মুশতাক আহমেদকে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে গ্রেপ্তার করেছিল র্যাব। সামাজিক মাধ্যম ব্যবহার করে রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রমূলক কথাবার্তা ও গুজব ছড়ানোর মামলায় তাঁর জামিন আবেদন ছয়বার নাকচ হয়। ২০২১ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি কারাগারে তাঁর মৃত্যু হয়।
ইত্তেফাক
‘সংস্কার প্রক্রিয়া নিয়ে দ্বিমত, আওয়ামী লীগ প্রশ্নে একমত’—এটি দৈনিক ইত্তেফাকের প্রথম পাতার খবর। প্রতিবেদনে বলা হয়, ত্রয়োদশ সংসদের শুরু থেকেই জুলাই জাতীয় সনদ অনুযায়ী সংস্কার বাস্তবায়ন ইস্যুতে টানাপড়েন চলছে ক্ষমতাসীন বিএনপিসহ সরকারে থাকা দলটির মিত্রদের সঙ্গে বিরোধী দল জামায়াতের নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্যের। এই ইস্যুতে উভয় পক্ষ পরস্পরকে চাপে রাখতে কৌশলী ভূমিকায় এগোচ্ছে। তবে, জুলাই গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত এবং কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকা আওয়ামী লীগকে রাজনীতিতে ফিরতে না দেওয়ার প্রশ্নে ঐকমত্য বজায় রেখে চলতে চায় সরকারি ও বিরোধী দল।
বিষয়টি আরো স্পষ্ট হয়েছে বৃহস্পতিবার শেষ হওয়া সংসদের তৃতীয় অধিবেশনে দেওয়া প্রধানমন্ত্রী ও সংসদ নেতা তারেক রহমানের সমাপনী বক্তব্যে। ঐ বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, ‘গণতন্ত্রের পক্ষের শক্তির মধ্যে বিভেদ-বিরোধ কিন্তু শেষ পর্যন্ত বিতাড়িত ফ্যাসিস্ট অপশক্তিকেই পুনরুজ্জীবিত করতে পারে, সেই পথকেই হয়তো সুগম করতে পারে। এটি যেন আমরা ভুলে না যাই। সে ব্যাপারে অবশ্যই আমাদের সতর্ক থাকতে হবে।’
জুলাইয়ের প্রতি দায়বদ্ধতার কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে তারেক রহমান এ-ও বলেছেন, ‘শহিদদের প্রতি কর্তব্যের অংশ হিসেবে অবশ্যই আমাদেরকে ঐক্যবদ্ধভাবে রাষ্ট্র মেরামতের কাজ চালিয়ে যেতে হবে। গণতন্ত্র ও গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থায় আমাদের মধ্যে ভিন্নমত থাকবে। কিন্তু, পতিত ফ্যাসিস্ট যেন আবার চেপে বসতে না পারে, সে বিষয়ে সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে।’
সংসদ অধিবেশনের সমাপনী বক্তব্যে বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমানও বলেছেন, “বিগত সময়ে অপরাধে জড়িত ব্যক্তিরা দেশ ছেড়ে পালিয়ে বিদেশে, বিশেষ করে প্রতিবেশী দেশে আশ্রয় নিয়ে অপপ্রচার চালাচ্ছেন এবং দেশকে অস্থির করার পাঁয়তারা করছেন। এসব ব্যক্তি ‘আসি আসি’ বলে ক্রমাগত ভয়ভীতি ও অপপ্রচার ছড়িয়ে সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিবেশ ঘোলাটে করছেন। এ ব্যাপারে আমাদের সবাইকে ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে।”
সর্বশেষ শুক্রবার রাজধানীর গুলশান-১ নম্বরে কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকা আওয়ামী লীগের ঝটিকা মিছিলের পর একধরনের ঐক্যের বার্তা মেলে সরকারি ও বিরোধী দলের ভূমিকায়। বিএনপি, জামায়াত ও জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) পৃথকভাবে প্রতিবাদ মিছিল করেছে ঢাকায়। জানা গেছে, ডিসেম্বর শেখ হাসিনার ‘দেশে ফেরা’র ঘোষণার সঙ্গে শুক্রবার গুলশানে আওয়ামী লীগের মিছিলের যোগসূত্র রয়েছে বলে মনে করছেন সরকারি ও বিরোধী দলের নেতারা। এ নিয়ে দুই পক্ষের দায়িত্বশীল নেতাদের মধ্যে কথাও হয়েছে। বিএনপি ও ১১ দলীয় ঐক্যের একাধিক নেতার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সংস্কার ইস্যুতে দূরত্ব থাকলেও আওয়ামী লীগ প্রশ্নে ঐক্য ধরে রাখার লক্ষ্যে ডিসেম্বর জুড়ে দেশব্যাপী রাজপথে পৃথকভাবে নানা কর্মসূচি রাখবে সরকারি ও বিরোধী দল।
এদিন ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকা আওয়ামী লীগ ও নিষিদ্ধ সংগঠন ছাত্রলীগ হুটহাট ঝটিকা মিছিল করলেও এবার খোদ প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নির্বাচনি আসনে (ঢাকা-১৭) মিছিল করায় নড়েচড়ে উঠেছে পুলিশ প্রশাসন। জুলাই অভ্যুত্থানের পক্ষের রাজনৈতিক শক্তিগুলোও বিষয়টিকে গুরুত্ব সহকারে নিয়েছে। যার কারণে, ইতিমধ্যে ৩২ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে গুলশান-বনানী-বারিধারায়। নজরদারি বাড়িয়েছে গোয়েন্দা সংস্থাগুলোও। ঐ এলাকায় সন্ধ্যা থেকে রাতভর বেশ কয়েকটি চৌকি বসিয়ে যানবাহনে তল্লাসি চালানো হচ্ছে।
বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেছেন, ‘নিষিদ্ধ রাজনৈতিক শক্তি আবারও মাথাচাড়া দিয়ে ওঠার চেষ্টা করছে। ফ্যাসিবাদের পুনরুত্থান ঠেকাতে সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে।’ প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক সহকারী রাশেদ খাঁনও বলেছেন, ‘দেশের রাজনীতিতে আওয়ামী লীগকে আর মেনে নেওয়া হবে না।’
এদিকে, জুলাই সনদ বাস্তবায়ন এবং সংবিধান সংশোধন বা সংস্কার ইস্যুতে একে অন্যের ওপর চাপ সৃষ্টির কৌশল নিয়েছে সরকারি ও বিরোধী দল। কৌশলের অংশ হিসেবে সংবিধান সংশোধনে গঠিত কমিটিতে নাম না দেওয়ায় বিরোধী দলকে মাত্র একটি ছাড়া আর সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতির পদ দেয়নি সরকারি দল।
জাতীয় সংসদে বিষয়ভিত্তিক স্থায়ী কমিটি রয়েছে ১১টি এবং বিভিন্ন মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটি ৩৯টি। চলতি ত্রয়োদশ সংসদের ৫০টি সংসদীয় স্থায়ী কমিটি গঠন সম্পন্ন হয়েছে। এর মধ্যে শুধু সরকারি হিসাব কমিটির সভাপতি পদ বিরোধী দলকে দেওয়া হয়েছে। বিরোধীদলীয় উপনেতা ডা. সৈয়দ আবদুল্লাহ মুহাম্মদ তাহের এই কমিটির সভাপতি।
সরকারি দল সূত্রে জানা গেছে, বিরোধী দল সংবিধান সংশোধন কমিটিতে নাম দিলে প্রয়োজনে সংসদীয় স্থায়ী কমিটি পুনর্গঠন করা যেতে পারে। সরকারি দল এখনো বিরোধী দল থেকে নাম পাবে বলে প্রত্যাশা করছে। প্রসঙ্গত, সংবিধান সংশোধনের লক্ষ্যে গত ১৩ জুলাই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদকে সভাপতি করে ১২ সদস্যের একটি বিশেষ কমিটি গঠন করে জাতীয় সংসদ। বিরোধী দলকে ঐ কমিটির জন্য পাঁচ জনের নাম দিতে বলা হয়েছিল; কিন্তু নাম দেয়নি। বিরোধী দল ঐ কমিটি প্রত্যাখ্যান করে বলেছে, সংশোধন নয়, তারা জুলাই সনদ অনুযায়ী সংবিধান সংস্কারের পক্ষে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এবং সংবিধান সংশোধন-সংক্রান্ত বিশেষ কমিটির সভাপতি সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, জুলাই সনদ বাস্তবায়ন করতে হলে আগে সংবিধান সংশোধন করতে হবে। সংবিধান সংশোধন করে তাতে জুলাই সনদ অন্তর্ভুক্ত করার পরই সনদ বাস্তবায়নের বিষয়টি সামনে আসবে। তিনি এটাও বলেছেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানসহ বিএনপির পক্ষ থেকে বারবারই বলা হচ্ছে—স্বাক্ষরিত জুলাই সনদে যেসব বিষয়ে ঐকমত্য হয়েছে, বিএনপি সরকার সেটি অক্ষরে অক্ষরে পালন করবে।
সংবিধান সংশোধন কমিটিতে বিরোধী দল থেকে এখনো নাম পাওয়ার প্রত্যাশা থেকেই এ নিয়ে তাড়াহুড়ো করছে না সরকারি দল। ১৩ জুলাই গঠনের পর বিশেষ কমিটির প্রথম বৈঠক হয় গত ৪ আগস্ট। এটিই এখন পর্যন্ত একমাত্র বৈঠক। শেষ পর্যন্ত বিরোধী দল থেকে নাম পাবে—এমন আশা থেকেই ধীরে এগোচ্ছে বিশেষ কমিটি।
নয়া দিগন্ত
দৈনিক নয়া দিগন্তের প্রধান শিরোনাম ‘ক্রান্তিকাল পার করছে অর্থনীতি’। প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ সূচক অনুসারে, দেশের অর্থনীতি এক ক্রান্তিকাল পার করছে। মূল্যস্ফীতি সামান্য কমে আসায় এবং রেমিট্যান্স প্রবাহ চাঙ্গা থাকায় সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় কিছু স্বস্তি মিললেও, ব্যাংকিং খাতের উচ্চ খেলাপি ঋণ এবং বিনিয়োগের স্থবিরতা দীর্ঘমেয়াদি টেকসই উন্নয়নের পথে বড় বাধা হয়ে আছে। অর্থনীতিকে পূর্ণ গতিশীল করতে হলে আর্থিক খাতের সুশাসন নিশ্চিত করা এবং খেলাপি ঋণ আদায়ে কঠোর ও কার্যকর নীতি বাস্তবায়ন এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
গতকাল রোববার বাংলাদেশ ব্যাংক প্রকাশিত ‘সাপ্তাহিক অর্থনৈতিক সূচক’ প্রতিবেদন অনুযায়ী দেশের সামষ্টিক অর্থনীতিতে মিশ্র ধারা বজায় রয়েছে। মূল্যস্ফীতি কিছুটা নিয়ন্ত্রণে আসার পাশাপাশি বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন এবং রেমিট্যান্স প্রবাহে গতি ফিরলেও, ব্যাংকিং খাতের মূল চ্যালেঞ্জ-বিশেষ করে খেলাপি ঋণ এবং অভ্যন্তরীণ ঋণের প্রবৃদ্ধি- অর্থনীতিবিদদের ভাবিয়ে তুলছে।
ব্যাংকিং খাত ও খেলাপি ঋণ, সবচেয়ে বড় উদ্বেগ : সামষ্টিক অর্থনীতির অন্যান্য সূচকে কিছু সুসংবাদ থাকলেও ব্যাংকিং খাতের স্বাস্থ্য নিয়ে গভীর উদ্বেগ রয়ে গেছে। প্রতিবেদনে দেখা যাচ্ছে, মোট বিতরণ করা ঋণের বিপরীতে খেলাপি ঋণের হার আশঙ্কাজনকভাবে ঊর্ধ্বমুখী। জুন ২০২৬ পর্যন্ত তথ্যানুযায়ী, মোট বকেয়ার অনুপাতে খেলাপি ঋণের হার দাঁড়িয়েছে ৩২.৭৮ শতাংশ (নিট খেলাপি ঋণ ১৫.২২ শতাংশ)। বিগত বছরগুলোতে এই হার অনেক কম থাকলেও সাম্প্রতিক সময়ে এটি পাহাড়সম রূপ নিয়েছে, যা আর্থিক খাতের স্থিতিশীলতার জন্য বড় হুমকি।
ঋণ প্রবৃদ্ধি : বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি সামান্য গতি পেলেও সরকারি খাতে নিট ঋণ গ্রহণের পরিমাণ বেশ ঊর্ধ্বমুখী (৩৪.৫১ শতাংশ বৃদ্ধি জুন ২৬ এর তুলনামূলক চিত্রে), যা সরকারের বাজেট ঘাটতি মেটানোর প্রচেষ্টাকে ফুটিয়ে তোলে।
প্রবৃদ্ধি ও বিনিয়োগ চিত্র : অর্থনৈতিক মন্দাভাব এবং উচ্চ মূল্যস্ফীতির প্রভাবে জিডিপি প্রবৃদ্ধির গতি শ্লথ হয়ে পড়েছে। সংশোধিত প্রাক্কলন অনুযায়ী, ২০২৫ অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৩.৪৯ শতাংশে নেমে আসার পর ২০২৬ অর্থবছরে তা সামান্য বেড়ে ৪.১৪ শতাংশে উন্নীত হওয়ার প্রাক্কলন করা হয়েছে। এ ছাড়া জাতীয় সঞ্চয়পত্র খাতে নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে; যেখানে নিট বিক্রি মাইনাস বা ঋণাত্মক ধারায় (-৬০৬৩.৩৩ কোটি টাকা) অবস্থান করছে, যা নির্দেশ করে সাধারণ মানুষ সঞ্চয়পত্র ভাঙাতে বাধ্য হচ্ছেন কিংবা বিকল্প বিনিয়োগের পথ বেছে নিচ্ছেন।
মূল্যস্ফীতিতে স্বস্তির সুবাতাস : দীর্ঘ দিন ধরে সাধারণ মানুষের মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়ানো মূল্যস্ফীতিতে এখন কিছুটা ইতিবাচক পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। ২০২৬ সালের আগস্ট মাসে পয়েন্ট-টু-পয়েন্ট ভিত্তিতে জাতীয় মূল্যস্ফীতি কমে দাঁড়িয়েছে ৮.২৬ শতাংশ, যা আগের বছরের একই সময়ে (আগস্ট ২০২৫) ছিল ৮.২৯ শতাংশ এবং তারও আগে মে ২০২৬-এ এটি ছিল ৯.১৬ শতাংশ। আর আগস্ট ২০২৬-এ ১২ মাসের গড়ভিত্তিক মূল্যস্ফীতি কিছুটা স্থিতিশীল হয়ে ৮.৬৬ শতাংশে অবস্থান করছে, যা আগের বছর একই সময়ে ৯.৫৮ শতাংশ ছিল। বাজার ব্যবস্থাপনায় কড়াকড়ি এবং সরবরাহ লাইন স্বাভাবিক হওয়ার ফলে মূল্যস্ফীতির চাপ কিছুটা কমছে বলে মনে করা হচ্ছে।
তবে মূল্যস্ফীতির হার নিচের দিকে মানে আগের বছরের তুলনায় জীবন যাত্রার ব্যয় কমেছে এমন নয়। বরং গত বছরের তুলনায় জীবন যাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির হার কিছুটা কমেছে।
বৈদেশিক খাত ও রেমিট্যান্স : ঘুরে দাঁড়ানোর ইঙ্গিত : দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ এবং প্রবাসী আয়ে ইতিবাচক প্রবণতা লক্ষ্য করা গেছে। জুলাই-আগস্ট (অর্থবছর ২৭) সময়ে প্রবাসী আয় বা রেমিট্যান্স এসেছে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে। শুধু জুলাই ২০২৬-এ রেমিট্যান্স বৃদ্ধির হার ছিল বেশ শক্তিশালী, আর সার্বিকভাবে এই খাতে বার্ষিক প্রবৃদ্ধি জোরালো অবস্থানে রয়েছে।
বণিক বার্তা
‘ব্যাংক এমডিদের নিয়োগ ও দক্ষতা মূল্যায়নে বাড়ছে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ক্ষমতা’—এটি দৈনিক বণিক বার্তার প্রধান শিরোনাম। খবরে বলা হয়, যদিও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের জারীকৃত নতুন কেপিআই ফ্রেমওয়ার্কের বিষয়ে ব্যাংক নির্বাহীদের অনেকে প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। তারা বলছেন, জারীকৃত প্রজ্ঞাপনটি ব্যাংক এমডিদের জন্য ‘অপমানজনক’।
দেশের ব্যাংকগুলোর ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তাদের (সিইও) কর্মদক্ষতা মূল্যায়নে অভিন্ন ‘কী পারফরম্যান্স ইন্ডিকেটরস’ বা কেপিআই ফ্রেমওয়ার্ক নির্ধারণ করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। নতুন এ কাঠামোয় ব্যাংকের আর্থিক সক্ষমতা, খেলাপি ঋণ, মুনাফা, সুশাসন, গ্রাহকসেবা ও আর্থিক অন্তর্ভুক্তিসহ মোট পাঁচটি ক্ষেত্রে এমডি-সিইওদের কর্মদক্ষতা পরিমাপে জোর দেয়া হয়েছে। মূল্যায়নের ফলাফল তাদের পারিশ্রমিক, প্রণোদনা, পুনর্নিয়োগ, মেয়াদ বৃদ্ধি ও উত্তরসূরি নির্বাচনের সিদ্ধান্তে প্রভাব রাখবে বলে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে জানানো হয়েছে। কেপিআই সূচকের কোনোটিতে ৫০ শতাংশের কম নম্বর পেলে তা ‘শূন্য’ বলে বিবেচিত হবে। আর সামগ্রিক স্কোর ১০০-তে কোনো এমডি ৬৫-এর নিচে পেলে তিনি ‘বিলো অ্যাভারেজ’ বা গড় মানের চেয়ে নিম্নমানের বলে বিবেচিত হবেন।
বাংলাদেশ ব্যাংকের ব্যাংকিং প্রবিধি ও নীতি বিভাগ-২ গতকাল এ-সংক্রান্ত নীতিমালার প্রজ্ঞাপন জারি করে। দেশের সবক’টি ব্যাংকের চেয়ারম্যানের কাছে প্রজ্ঞাপনের কপি পাঠানো হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, ব্যাংক খাতে শৃঙ্খলা, সুশাসন ও আর্থিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিতের পাশাপাশি আমানতকারী ও ব্যাংকের স্বার্থ সুরক্ষায় এ কাঠামো প্রণয়ন করা হয়েছে। এর আগে ২০২৪ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি এমডি/সিইও নিয়োগ ও পুনর্নিয়োগ বিষয়ে একটি প্রজ্ঞাপন জারি করেছিল কেন্দ্রীয় ব্যাংক। সেখানে খেলাপি ঋণ কমানো এবং অবলোপনকৃত ঋণ আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণের নির্দেশনা দেয়া হয়েছিল। নতুন কাঠামোর মাধ্যমে এসব বিষয়কে আরো সুনির্দিষ্ট ও পরিমাপযোগ্য করা হয়েছে।
প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, বিদ্যমান এমডি/সিইওদের ক্ষেত্রে এ কাঠামোয় প্রথম লক্ষ্যমাত্রার সময় হবে ১ অক্টোবর ২০২৬ থেকে ৩১ মার্চ ২০২৭। পরিচালনা পর্ষদকে ছয় মাস অন্তর রোলিং-ফরওয়ার্ড পদ্ধতিতে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করতে হবে। পুরো মেয়াদের জন্য নির্ধারিত কেপিআই কাঠামো বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদনের জন্য পাঠাতে হবে এবং প্রতিটি মূল্যায়ন শেষে ১৫ দিনের মধ্যে পর্যালোচনা প্রতিবেদন জমা দিতে হবে।
যদিও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের জারীকৃত নতুন কেপিআই ফ্রেমওয়ার্কের বিষয়ে ব্যাংক নির্বাহীদের অনেকে প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। তারা বলছেন, জারীকৃত প্রজ্ঞাপনটি ব্যাংক এমডিদের জন্য ‘অপমানজনক’। ঋণ অনুমোদন থেকে শুরু করে কর্মকর্তাদের নিয়োগ-পদোন্নতিতে অনেক ব্যাংকের এমডি স্বাধীন নন। এক্ষেত্রে পরিচালনা পর্ষদ ও কোনো কোনো ক্ষেত্রে চেয়ারম্যানই সর্বেসর্বা। এমন বাস্তবতায় শুধু এমডিদের কর্মদক্ষতা মূল্যায়ন করতে গেলে দুর্বল ব্যাংকগুলো এমডিই খুঁজে পাবে না।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতিমালার বিষয়ে মতামত জানতে বণিক বার্তার পক্ষ থেকে দেশের অন্তত ছয়টি বেসরকারি ব্যাংকের শীর্ষ নির্বাহীর সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। তাদের প্রায় প্রত্যেকেই এ বিষয়ে নিজেদের ক্ষোভের কথা জানিয়েছেন। তবে তারা নাম উদ্ধৃত করে বক্তব্য দিতে অপারগতা প্রকাশ করেন।
কেপিআই নীতিমালার বিষয়ে একটি ব্যাংকের শীর্ষ নির্বাহীর বক্তব্য এমন—বিশ্বের কোনো দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকই এভাবে এমডিদের কেপিআই মূল্যায়ন কিংবা নিয়োগ ও বেতন-ভাতা নির্ধারণের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকে না। কোনো এমডি অনিয়ম-দুর্নীতির সঙ্গে যুক্ত হলে কিংবা ব্যাংক পরিচালনায় ব্যর্থ হলে তার বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়ার অধিকার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের রয়েছে। কিন্তু এভাবে কেপিআই মূল্যায়ন করা হলে এমডি পদে নিয়োগ পেতে কিংবা টিকে থাকতেও অনৈতিক উপায়ের আশ্রয় নিতে হতে পারে। অনিয়ম-দুর্নীতির কারণে যে ব্যাংকগুলো এখন দুর্বল হিসেবে পরিচিতি পাচ্ছে, সেগুলোর ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের যথাযথ নজরদারি ছিল না। অনেক ক্ষেত্রে সেসব ব্যাংকের অর্থ লোপাটে তাদের অনেক কর্মকর্তার সহযোগিতাও ছিল। এমন পরিস্থিতিতে আগে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তাদের পেশাদার হওয়া দরকার।
আজকের পত্রিকা
দৈনিক আজকের পত্রিকার প্রধান শিরোনাম ‘২৪ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ২ হাজার কোটি টাকার অনিয়ম’। প্রতিবেদনে বলা হয়, শিক্ষা ছুটি শেষে যোগদান না করা শিক্ষকদের কাছ থেকে ছুটিকালীন বেতন-ভাতা ফেরত না নেওয়ায় দেশের ২৪টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের আর্থিক ক্ষতি প্রায় ২৬ কোটি টাকা। এ ছাড়া বিধিবহির্ভূতভাবে জনবলকাঠামোর বাইরে পদোন্নতি দিয়ে বেতন-ভাতা পরিশোধে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ক্ষতি ৪৭ কোটি টাকার বেশি।
এমন মোট ১৩২ ক্ষেত্রে অনিয়ম চিহ্নিত হয়েছে এই ২৪ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে করা নিরীক্ষায়। এসব অনিয়মে মোট আর্থিক ক্ষতি ২ হাজার ৩১ কোটি ৯২ লাখ ৫০ হাজার ৩০ টাকা। বাংলাদেশ মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রকের (সিএজি) অধীন শিক্ষা অডিট অধিদপ্তরের নিরীক্ষা প্রতিবেদনে এই চিত্র উঠে এসেছে। চলতি বছরের ২৯ মার্চ থেকে ১১ জুন পর্যন্ত এই নিরীক্ষা করা হয়। নিরীক্ষা প্রতিবেদনে ক্ষতি হওয়া টাকা আদায়ের পাশাপাশি দায়ীদের বিরুদ্ধে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে।
২৪ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের হিসাব- সম্পর্কিত ২০২৪-২৫ অর্থবছরের এই নিরীক্ষা পরিদর্শন প্রতিবেদন সম্প্রতি সংশ্লিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে পাঠানো হয়েছে। নিরীক্ষা প্রতিবেদনটি তৈরি করা হয়েছে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে। বেশির ভাগ বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ বলেছে, এসব অডিট আপত্তি আগের প্রশাসনের আমলের। বিশ্ববিদ্যালয়ের সংশ্লিষ্ট শাখা এ বিষয়ে পদক্ষেপ নেবে।
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট বিভাগ বলেছে, ওই বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ নিয়ম অনুযায়ী অডিট আপত্তির জবাব দেবে। এরপর বিধি অনুযায়ী পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
নিরীক্ষা প্রতিবেদনের বিষয়ে গতকাল রোববার জানতে চাইলে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো দেখভালের দায়িত্বে থাকা বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) সদস্য অধ্যাপক ড. আব্দুল্লাহ আল মামুন আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘ইউজিসি কোনো ধরনের অনিয়ম সহ্য করবে না। এ ক্ষেত্রে আমাদের অবস্থান অত্যন্ত কঠোর। যেসব অনিয়মের কথা বলা হচ্ছে, সেগুলো বর্তমান কমিশন দায়িত্ব গ্রহণের আগের। এখন আমরা প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়কে নিরীক্ষা আপত্তির বিষয়ে সতর্ক করছি।
তাদের বলা হচ্ছে, এ ধরনের নিরীক্ষা আপত্তি এলে ইউজিসি থেকে অর্থছাড়সহ অন্যান্য বিষয় পর্যালোচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।’
দেশে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে ৬০টি। এগুলোর মধ্যে কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ে এখনো শিক্ষা কার্যক্রম শুরু হয়নি। এ ছাড়া অনুমোদিত বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আছে ১১৬টি।
নিরীক্ষা করা ২৪টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় হলো—ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (ঢাবি), জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় (জাবি), চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় (চবি), রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় (রাবি), রাজশাহী প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (রুয়েট), ইসলামী আরবি বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম ভেটেরিনারি ও অ্যানিমেল সায়েন্সেস বিশ্ববিদ্যালয়, শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (কুয়েট), ময়মনসিংহের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট), মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ টেক্সটাইল বিশ্ববিদ্যালয় (বুটেক্স), কুষ্টিয়ার ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, খুলনা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ও জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় (জবি)।
এই ২৪ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের নিরীক্ষা প্রতিবেদনের বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, জনগণের করের টাকা যাঁরা নয়ছয় করেছেন, তাঁদের বিরুদ্ধে অবশ্যই আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে।
নিরীক্ষা প্রতিবেদনের তথ্য বলছে, এই ২৪ বিশ্ববিদ্যালয়ে বেশির ভাগ অনিয়ম হয়েছে বিভিন্ন খাতে বিধিবহির্ভূতভাবে শিক্ষক-কর্মকর্তাদের বেতন-ভাতা ও সম্মানী দেওয়া, ভবন নির্মাণ ও কেনাকাটায় সরকারি বিধি না মেনে অর্থ ব্যয়ে। এ ছাড়া ভর্তি পরীক্ষার ফি বিশ্ববিদ্যালয়ের তহবিলে জমা না দেওয়া, ভ্যাট সরকারি কোষাগারে জমা না দেওয়া, কোটি টাকার মোবাইল বিল দেওয়ার মতো অনিয়ম হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী সবচেয়ে বড় অঙ্কের অনিয়ম চিহ্নিত হয়েছে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে অধিকতর উন্নয়ন প্রকল্পের ভবন নির্মাণে। এতে অনিয়মিতভাবে খরচ হয়েছে ৯৭৯ কোটি ৬৫ লাখ ২ হাজার টাকা। ইউজিসি ও স্বাস্থ্য শিক্ষা বিভাগের জনবল পৃথকভাবে শনাক্ত না থাকায় বেতন-ভাতা বাবদ ব্যয়ের সঠিকতা নিরূপণ করা যায়নি। এতে ক্ষতি হয়েছে ১২০ কোটি ৫৯ লাখ ৭০ হাজার টাকা। এ ছাড়া ইউজিসির মাধ্যমে যথাযথ ব্যাংক হিসাব সংরক্ষণ না করায় অনিয়মিত ব্যয় হয়েছে ৪১৬ কোটি ৪৩ লাখ ২১ হাজার টাকা। নিরীক্ষা অনুযায়ী এই ক্ষেত্রে অনিয়মের পরিমাণ ১ হাজার ৪০০ কোটি টাকার বেশি।
দেশ রূপান্তর
‘শিক্ষায় বাড়ছে বিপদ’—এটি দৈনিক দেশ রূপান্তরের প্রধান শিরোনাম। খবরে বলা হয়, রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে অ্যাসাইনমেন্ট সারতে, প্রেজেন্টেশন স্ল্যাইড, ক্লাস টেস্ট ও গবেষণায় বাড়ছে এআই বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার। রেফারেন্স বই, রিসার্চ পেপার, জার্নাল ও ওয়েবসাইট ঘেঁটে বিশ্লেষণের পরিবর্তে শিক্ষার্থীরা বেছে নিচ্ছেন এক ক্লিকের সহজ সমাধান। এতে একদিকে পরিশ্রম কম হয় অন্যদিকে সময়ের সাশ্রয় হয়। অনেক সময় এআই বিকল্প শিক্ষকের কাজ করে। ফলে শিক্ষার্থীদের মধ্যে বাড়ছে এআই-নির্ভরতা। অতি মাত্রায় এআই-নির্ভরতায় বিপদ বাড়তে পারে বলে শিক্ষার্থীদের সতর্ক করছেন শিক্ষকরা। তারা বলছেন, এআই শিক্ষার্থীদের চিন্তাশক্তি দুর্বল করে দিচ্ছে, ক্রিটিক্যাল ভাবনায় পিছিয়ে দিচ্ছে।
আন্তর্জাতিক বিভিন্ন গবেষণাতেও এআইয়ের মাত্রাতিরিক্ত ব্যবহারে শিক্ষার্থীরা নানা ঝুঁকিতে পড়ছে।
গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে দীর্ঘদিন ধরে সামাজিক বিজ্ঞান বিভাগে পড়াচ্ছেন ড. মো. আনিসুর রহমান। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা আসার আগে শিক্ষাব্যবস্থা মূলত শিক্ষক, পাঠ্যবই, লাইব্রেরি ও প্রচলিত শিক্ষা-উপকরণের ওপর নির্ভরশীল ছিল। তথ্যসংগ্রহ, গবেষণা, অ্যাসাইনমেন্ট তৈরি কিংবা কোনো বিষয় বুঝতে শিক্ষার্থীদের বেশ পরিশ্রম করতে হতো; তবে এতে শিক্ষার্থীদের মেধার বিকাশ হতো। ঘঁাঁটাঘাঁটি করে তারা যে শিক্ষালাভ করত তা তাদের সমৃদ্ধ করত। এখন এআই এসব সমস্যার সমাধান এক ক্লিকে করে দিচ্ছে। সাবজেক্ট (বিষয়) লিখে সার্চ দিলেই মুহূর্তে সব তথ্য হাজির। এতে শিক্ষার্থীদের জানার আগ্রহ কমছে। এআইয়ে অতিরিক্ত নির্ভরতা সৃজনশীলতা, চিন্তাভাবনা ও অ্যাকাডেমিক সততা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।’
তবে এ শিক্ষক এ কথাও বলেন, ‘বর্তমানে এআই শিক্ষাক্ষেত্রে নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলেছে। দ্রুত তথ্যানুসন্ধান, কঠিন বিষয় সহজভাবে বোঝা, ভাষা শেখা, লেখালেখি ও গবেষণায় সহায়তা পায় শিক্ষার্থীরা। শিক্ষকরা পাঠ-পরিকল্পনা, শিক্ষাসামগ্রী তৈরি করা ও মূল্যায়ন করতে এবং শিক্ষার্থীর শেখার দুর্বলতা শনাক্ত করতে এআইকে ব্যবহার করতে পারেন। ফলে শিক্ষা আরও ব্যক্তিকেন্দ্রিক, সহজলভ্য ও কার্যকরী হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে।’
গত জুলাইয়ে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি বিভাগের ২০২০-২১ সেশনের শিক্ষার্থীদের স্নাতক সম্মান শ্রেণির ৮ম সেমিস্টারের ‘রিসার্চ মনোগ্রাফ’-এর গবেষণা প্রতিবেদন জমা দেওয়ার কথা ছিল। ওই সেশনের কমপক্ষে ১০ জন শিক্ষার্থীর সঙ্গে কথা বলেন দেশ রূপান্তরের এ প্রতিবেদক। তারা বলেন, ‘আমাদের ব্যাচের প্রায় সবাই রিসার্চ প্রতিবেদন তৈরিতে এআইয়ের সাহায্য নিই। আমরা টপিক লিখে প্রথমে এআইয়ে সার্চ দিই, এরপর এআইকে বলি আমাদের প্রতিবেদন তৈরি করে দিতে। আমরা যেসব ডেটা সংগ্রহ করেছিলাম মাঠ থেকে তা এআইকে দিয়ে বিশ্লেষণ করে প্রতিবেদন বানিয়ে দিতে বলি। প্রতিবেদন জমা দেওয়ার ২ দিন আগে বিভাগীয় প্রধান জানান, প্লেজিয়ারিজম হয়েছে কি না বা এআইয়ের কথা হুবহু তুলে দেওয়া হয়েছে কি না তা দেখা হবে। যাদের রিপোর্টে ‘নকল’-এর পরিমাণ ২০ ভাগের বেশি থাকবে তাদের অনুত্তীর্ণ বিবেচনা করা হবে। ফলে সবাই বাধ্য হয়ে নিজেদের মতো এআইয়ের করে দেওয়া রিসার্চকে রিঅ্যারেঞ্জ করে জমা দিই।’
বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, আগে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের অ্যাসাইনমেন্টের বিষয় নির্ধারণ করে দিতেন শিক্ষকরা। শিক্ষার্থীরা লাইব্রেরিতে যেতেন, বই ও গবেষণাপত্র খুঁজতেন, তথ্যের মধ্যে মিল-অমিল বের করতেন, নোট নিতেন। এরপর নিজের ভাষায় যুক্তি সাজিয়ে তৈরি করতেন অ্যাসাইনমেন্ট। এখন সে কাজের বড় একটি অংশ কয়েক মিনিটেই করে দিচ্ছে চ্যাটজিপিটি, জিমেনি, ক্লাউড-এর মতো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা। আগে একজন শিক্ষার্থী কোনো বিষয়ের ওপর ১০টি গবেষণাপত্র পড়ে, নোট নিয়ে, গবেষণাগুলোর মিল-অমিল খুঁজে নিজের সিদ্ধান্তে পৌঁছাতেন। এখন একজন শিক্ষার্থী এআইকে বলেন, ‘এ বিষয়ে ১০টি গবেষণাপত্রের মূল বক্তব্য বের করে একটি লিটারেচার রিভিউ তৈরি করে দাও’। এখন তথ্য পাওয়া যাচ্ছে ঠিকই, কিন্তু পড়া, তুলনা করা, যাচাই করা ও বিশ্লেষণের কাজ শিক্ষার্থী নিজে করছেন না। বুদ্ধিবৃত্তিক পরিশ্রম আগের মতো করছেন না। এআইয়ের ওপর মাত্রাতিরিক্ত নির্ভর করলে চিন্তাশীলতা দুর্বল হয়ে পড়ার শঙ্কা আছে।
তারা বলেন, একজন শিক্ষার্থী কোনো বিষয়ের ওপর গবেষণা করতে গিয়ে এআইকে ওই বিষয়ের ওপর ২০টি গবেষণাপত্রের তালিকা দিতে বললেন। এআই তাকে লেখক, জার্নাল, প্রকাশনা, প্রকাশনার বর্ষ, ডিওআইসহ তালিকা দিল। কিন্তু শিক্ষার্থী যদি একটি পেপারও না পড়েন, তাহলে তিনি আসলে গবেষণা করছেন না, শুধু এআইয়ের তৈরি তথ্যকে নিজের গবেষণা বলে উপস্থাপন করছেন। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কখনো কখনো এমন গবেষণাপত্র, লেখক বা রেফারেন্স দিতে পারে যার বাস্তব অস্তিত্ব নেই। তথ্য যাচাই না করে গবেষণায় ব্যবহার করলে একদিকে যেমন অ্যাকাডেমিক সততার প্রশ্ন উঠবে, অন্যদিকে ভুল তথ্য ছড়াবে।
শিক্ষকরা বলছেন, অ্যাসাইনমেন্ট ও প্রেজেন্টেশনে স্ল্যাইড ব্যবহারে শিক্ষার্থীরা এআই ব্যবহার করে থাকেন, কারণ এআইয়ের ব্যবহার নিয়ে নম্বর কাটা হয় না। খাতা মূল্যায়নের ক্ষেত্রে দেখা যায়, তারা এমন সব উত্তর এআইকে হুবহু কপি করে লিখছেন যা প্রশ্নের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয়। তারা থিসিস পেপার ও রিসার্চ মনোগ্রাফেও এআই ব্যবহার করেন; যেহেতু এসবে এআই চেক করা হয় তাই তারা একটু সতর্ক থাকেন। এআই মুক্তশিক্ষার অবাধ ভা-ার। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে লাইব্রেরির মান ভালো নয়, প্রয়োজনীয় বই পাওয়া যায় না, আবার অনলাইনে আলাদাভাবে রিসার্চ পেপার খুঁজে পাওয়া সময়সাধ্য, বিখ্যাত জার্নালে পাবলিক এক্সেস থাকে না। ফলে এআই শিক্ষার নতুন দিগন্ত খুলে দিতে পারে। কেবল প্রয়োজন ইতিবাচকভাবে কাজে লাগানো।
শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা তাদের পড়াশোনাকে সহজ করেছে। জটিল বিষয় বুঝতে, তথ্যের সারাংশ তৈরি করতে কিংবা লেখার কাঠামো ঠিক করতে এটা বেশ কার্যকরী। এআই তাদের শিক্ষার মান বাড়াতে সহযোগিতা করছে, এক ক্লিকে প্রাসঙ্গিক সব টপিক পেয়ে গেলে পড়াশোনায় বাড়তি সময় পাওয়া যায়। তারা এআইয়ে শতভাগ নির্ভর না করে মেধার বিকাশের চেষ্টা করছেন। যারা ফাঁকিবাজি করে নিজের কাজ এআইকে দিয়ে করানোর চেষ্টা করেন তাদের জন্য এটা ভয়াবহ সমস্যা।
২০২৫ সালে এমআইটি মিডিয়া ল্যাবের গবেষকরা চ্যাটজিপিটি দিয়ে প্রবন্ধ লেখার সময় বুদ্ধিবৃত্তিক বা চিন্তনমূলক সম্পৃক্ততা পরীক্ষা করেন। ৫৪ জন অংশগ্রহণকারীকে তিনটি গ্রুপে ভাগ করা হয় একটি চ্যাটজিপিটি ব্যবহার করে, একটি গুগল সার্চ ইঞ্জিন ব্যবহার করে এবং অন্যটি কোনো প্রযুক্তিগত সহায়তা ছাড়াই লেখে। লেখার সময় ৩ দলের মস্তিষ্কের কার্যকলাপ পর্যবেক্ষণ করা হয়। গবেষণায় চ্যাটজিপিটি ব্যবহারকারীদের ব্রেইনের সংযোগ তুলনামূলকভাবে কম পাওয়া যায়। তাদের লেখায় একই ধরনের ধারণা ও কাঠামোর পুনরাবৃত্তি বেশি ছিল। গবেষকরা জানান, বারবার নিজের চিন্তাশক্তির বদলে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহারে দীর্ঘ মেয়াদে চিন্তার অভ্যাস দুর্বল হওয়ার শঙ্কা বাড়ে।
বাংলাদেশ প্রতিদিন
দৈনিক বাংলাদেশ প্রতিদিনের প্রধান শিরোনাম ‘জ্বালানি আমদানিতে নতুন সংকট’। খবরে বলা হয়, মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে চলমান রাজনৈতিক অস্থিরতা আরও বৃদ্ধি পেয়েছে। এতে বাংলাদেশসহ বিশ্বের জ্বালানি আমদানিনির্ভর দেশগুলো জ্বালানি আমদানির ক্ষেত্রে নতুন করে সংকটে পড়েছে। সৌদি আরবের যে তেল আমদানি করতে বাংলাদেশের আগে ১৫-১৬ দিন সময় লাগত, বাব আল-মান্দেব প্রণালিতে জাহাজ চলাচলে শঙ্কা ও সৌদি আরবের ইস্ট ওয়েস্ট পাইললাইন সাময়িক বন্ধের কারণে এখন তা আনতে ৫০ দিন সময় লাগবে। এতে একদিকে যেমন দেশের জ্বালানি তেল আমদানির ব্যয় প্রায় দ্বিগুণ বৃদ্ধি পাবে, একই সঙ্গে বাড়বে পণ্য আমদানির সময়। দীর্ঘ সময় ধরে জ্বালানি আমদানির কারণে পণ্য প্রাপ্তিতে ঝুঁকি তৈরি হওয়ারও শঙ্কা আছে। এ পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির মূল্য লাগামহীনভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে।
এতে বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ বাড়ায় তা সরাসরি দেশের অর্থনীতিতে প্রভাব ফেলছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এ সংকট দ্রুত চলে যাবে এমন ভাবার কারণ নেই। এটি দীর্ঘস্থায়ী চ্যালেঞ্জ। এজন্য বিকল্প উৎস বিশেষ করে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলো থেকে জ্বালানির উৎস খুঁজে বের করতে হবে।
আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবর অনুযায়ী, মধ্যপ্রাচ্যে সংকটের কারণে হরমুজ প্রণালিতে পণ্যবাহী জাহাজ চলাছল বিঘ্নিত হওয়ার পর বৈশ্বিক জ্বালানি আমদানি-রপ্তানির গুরুত্বপূর্ণ আরেক প্রণালি বাব আল-মান্দেব দিয়েও জাহাজ চলাচলে শঙ্কা দেখা দিয়েছে। ইয়েমেনের লোহিত সাগর উপকূলে ইরান-সমর্থিত হুতিদের নিয়ন্ত্রণ বাড়ায় এ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলে বিঘ্ন ঘটায় বাংলাদেশসহ জ্বালানি আমদানিকারক দেশগুলোর কাছে এ বিকল্প নৌপথটির গুরুত্ব সাম্প্রতিক সময়ে বেড়ে যায়। কিন্তু এখন এ পথটি নিয়েও উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। হরমুজ এবং মান্দেব উভয় পথে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হলে বৈশ্বিক তেল ও গ্যাসের সরবরাহ শৃঙ্খল গভীর সংকটে পড়বে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন। আলজাজিরার বরাতে জানা যায়, ইরাক থেকে ড্রোন হামলার পর সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে সৌদি আরব ইস্ট ওয়েস্ট পাইপলাইনের কার্যক্রম সাময়িকভাবে স্থগিত করেছে। এতে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থা আরও সংকটে পড়েছে। এর মধ্যে গত শুক্রবার আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট ক্রুড ওয়েলের দাম বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ১০৪ দশমিক ৬১ ডলারে ঠেকেছে। অথচ এক মাস আগেও ছিল ৮৭ দশমিক ০৭ ডলার।
প্রসঙ্গত, হরমুজ ও বাব আল-মান্দেব হয়ে দেশে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি), জ্বালানি তেল, তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি) ও সারসহ বিভিন্ন পণ্য আমদানি করা হয়। তবে হরমুজ দিয়ে এখন দেশে কোনো জাহাজ আসছে না। আসছে মান্দেব প্রণালি দিয়ে। আর সেখানে পরিস্থিতি প্রতিকূলে গেলে বিমা ব্যয়, নিরাপত্তাঝুঁকি, জাহাজভাড়া ও সরবরাহ ব্যবস্থায় অনিশ্চয়তা তৈরি হবে।
বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)-এর বাণিজ্য ও অপারেশন বিভাগের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, নতুন করে সংকট তৈরির ফলে সৌদির আরামকো থেকে যে জ্বালানি আমদানি করতে ১৫-১৬ দিন লাগত এখন তা দক্ষিণ আফ্রিকা ঘুরে আসতে ৫০ দিনের মতো লাগবে। এখানে সময় একটি চ্যালেঞ্জ। এতে ফ্রেইট কিছুটা বেড়ে যায়। আবার এত দীর্ঘ সময়ে পণ্য প্রাপ্তিতে ঝুঁকিও থাকে। হরমুজ প্রণালি দিয়ে বিভিন্ন দেশে জ্বালানির ২০ শতাংশ পণ্য সরবরাহ করা হয়। এতে বিভিন্ন দেশের রিফাইনারিগুলোর মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক ক্রুড পেতে দেরি হবে। আবার যে পরিমাণ জ্বালানি প্রয়োজন তা হয়তো পূরণ হবে না। বিভিন্ন পথ ঘুরে আসায় পণ্য পেতে দেরি হবে। গুরুত্বপূর্ণ এই ফিডে সমস্যা মানেই বিশ্ববাজারে পরিশোধিত জ্বালানির সরবরাহ কিছুটা কমে যাওয়া। এর প্রভাবে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধি পাচ্ছে। এজন্য যারা বাংলাদেশের মতো জ্বালানি আমদানিনির্ভর দেশ তাদের ওপর বাড়তি আমদানি ব্যয় যুক্ত হবে। আবার সরবরাহকারী যারা পরিশোধিত পণ্য সরবরাহ করে তাদেরও জাহাজ প্রাপ্তিতে সমস্যা হবে এবং পরিবহন ব্যয় বাড়বে, ইন্স্যুরেন্স ঝুঁকিও বাড়বে। এ কারণে বিপিসির প্রিমিয়ামের ওপর চাপ পড়বে। পরিস্থিতি কোথায় যায় তা পর্যবেক্ষণ করতে আরও দু-এক দিন সময় লাগবে। এর ফলে জ্বালানি আমদানির খরচও বৃদ্ধি পাবে। ধারণা করা হচ্ছে, এ খরচ প্রায় দ্বিগুণ বৃদ্ধি পাবে। দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে সব জাহাজ রাজিও হয় না। আবার জাহাজ প্রাপ্তিরও বিষয় আছে। বর্তমানে বিপিসির অক্টোবর পর্যন্ত তেলের মজুত আছে। নভেম্বরে নতুন করে তেল আমদানির প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। জ্বালানি সংকট এড়াতে সব চেষ্টাই করা হচ্ছে।
রুট পরিবর্তনের কারণে জ্বালানি আমদানির ভাড়ায় কেমন প্রভাব পড়বে তা জানতে চাইলে বিপিসির অর্থ বিভাগের মহাব্যবস্থাপক মুহাম্মদ মোরশেদ হোসাইন আজাদ বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, স্বল্প দূরত্বের পথ ঘুরে আসায় আগের চেয়ে ভাড়া স্বাভাবিকভাবেই বৃদ্ধি পাবে। কারণ জ্বালানিবাহী জাহাজটিকে আগের চেয়ে বেশি পথ পাড়ি দিতে হবে। এতে জ্বালানি খরচও বাড়বে। ফ্রেইটও বাড়বে। জ্বালানি তেল আমদানিতে ব্যবহৃত ট্যাংকারের খাত সংশ্লিষ্টরা জানান, ঘুরপথে সাধারণত একটি ট্যাংকারে ৪০ লাখ ডলার পর্যন্ত বাড়তি ব্যয় হতে পারে। কিন্তু সরাসরি গেলে এ খরচ হয় না।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)-এর গবেষণা পরিচালক ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, মান্দেব প্রণালি ও সৌদির ইস্ট ওয়েস্ট পাইপলাইনের বিষয়টি অবশ্যই বাংলাদেশের জন্য দুর্ভাবনার বিষয়। বাংলাদেশসহ বিশ্বের অন্য জ্বালানি আমদানিকারক দেশগুলোও এ ঘটনায় উদ্বিগ্ন। এ ধরনের ক্ষেত্রে সাধারণত চুক্তির চাহিদামতো তেল পাওয়া যায় না। আবার মূল্যও বেশি থাকে। এ কারণে সরকারের শিল্পকারখানার বিদ্যুৎ উৎপাদন প্রক্রিয়ায় যে পরিমাণ জ্বালানি সরবরাহের কথা তা দেওয়া কষ্টকর হয়। এখন যেহেতু গ্যাসের সংকট এজন্য ডিজেলের ওপরও নির্ভরতা বেড়েছে। এ অবস্থায় ডিজেলের প্রাপ্তিও সমস্যার সম্মুখীন। আবার বিদ্যুতের সরবরাহ নিয়ে সমস্যা আছে। এ বিভিন্নমুখী চাপের মধ্যে জ্বালানি সরবরাহে বিঘ্ন হলে তা বাড়তি চাপের অনুষঙ্গ তৈরি করবে। এখন সরকারকে বিকল্প উৎস থেকে জ্বালানি খুঁজতে হবে। ডিজেলের জন্য বিকল্প উৎস হিসেবে রয়েছে ব্রুনাই, মালয়েশিয়া। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলো থেকে জ্বালানি আমদানি করতে হবে। আবার সবাই যখন এ দেশগুলো থেকে জ্বালানি আমদানির চেষ্টা করবে তখন এক ধরনের চাপ তৈরি হবে। তবে এ সংকট দ্রুত চলে যাবে এটা ভাবার কারণ নেই। এটি একটি দীর্ঘস্থায়ী চ্যালেঞ্জ। এ সমস্যাটি যেহেতু রাজনৈতিকভাবে সম্পর্কিত এজন্য দীর্ঘমেয়াদি সংকটের বাস্তবতা মেনেই এগিয়ে যেতে হবে এবং সেভাবেই কৌশল ঠিক করা দরকার। এরই মধ্যে বাব আল-মান্দেবের ঝুঁকি এড়াতে বিকল্প ঘুরপথে সৌদি আরবের ইয়ানবু বন্দর থেকে ১ লাখ টন ক্রুড অয়েল নিয়ে দেশে এসেছে এমটি নিনেমিয়া নামের একটি জাহাজ। আগে যেখানে ১২-১৩ দিন লাগত, সেখানে আফ্রিকা হয়ে আসতে এমটি নিনেমিয়ার লেগেছে ৫২ দিন। গত ২৩ জুলাই ইয়ানবু থেকে যাত্রা শুরু করা এ জাহাজ চট্টগ্রাম বন্দরে পৌঁছেছে গত শনিবার (১২ সেপ্টেম্বর)। বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশন (বিএসসি)-এর একটি সূত্র জানায়, ক্রুড অয়েলের আরও একটি চালান মধ্যপ্রাচ্য থেকে আনার প্রক্রিয়া চলছে। সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে আগামী ৬ অক্টোবর জাহাজটি ক্রুড লোড করে বাংলাদেশের উদ্দেশ্যে যাত্রা করতে পারে। এটি মান্দেব প্রণালি দিয়ে আনার চেষ্টা করা হবে। যদি এ পথে সম্ভব না হয়, তাহলে পরিস্থিতি বিবেচনায় এমটি নিনেমিয়ার মতো ঘুরপথে নিয়ে আসতে হবে। বাংলাদেশ মার্চেন্ট মেরিন অফিসার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিএমএমওএ) সভাপতি ক্যাপ্টেন আনাম চৌধুরী বলেন, হরমুজে সমস্যা হওয়ার পর সৌদি আরব ইয়ানবু বন্দরের মাধ্যমে তেল রপ্তানি করছিল। যা বাব আল-মান্দেব প্রণালি হয়ে বিকল্প পথে পরিবহন হতো। এখান সেখানেও সমস্যা তৈরি হয়েছে হুতি বিদ্রোহীদের হুমকির কারণে। আমাদের ক্রুড অয়েলের সর্বশেষ পার্সেলটি মান্দেব প্রণালি হয়ে আসতে পারেনি। সেক্ষেত্রে ১০-১২ দিন সময় লাগত। চালানটি সুয়েজ খাল পার হয়ে ভূমধ্যসাগর দিয়ে উত্তর আটলান্টিক-দক্ষিণ আটলান্টিক-আফ্রিকার কেপ অব গুড হোপ (অন্তমাশা অন্তরীপ) ও ভারত মহাসাগর হয়ে দেশে আসতে ৫২-৫৩ দিন লেগেছে। এতে সময় যেমন বেশি লাগছে, জাহাজ ভাড়াসহ আমদানি খরচও অনেক বেড়ে যাচ্ছে।
এ অবস্থায় জ্বালানির জন্য বিকল্প দেশ খোঁজার পরামর্শ দিয়ে তিনি বলেন, ব্রুনাই ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া ও সিঙ্গাপুরের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়ানো যেতে পারে। চট্টগ্রাম চেম্বার সভাপতি মো. আমিরুল হক বলেন, সমস্যাটি বৈশ্বিক এবং কম সময়ে সমাধান হবে বলে মনে হয় না। এক্ষেত্রে জ্বালানি চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় আমাদের নবায়নযোগ্য জ্বালানির ওপর জোর দিতে হবে। বাংলাদেশ শিপিং এজেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ক্যাপ্টেন মো. সালাহ উদ্দিন বলেন, বাব আল-মান্দেব দিয়ে বাংলাদেশ থেকে ইউরোপ, আমেরিকা ও কানাডায় পণ্য রপ্তানি হয়। তাই প্রণালিটি বন্ধ হয়ে গেলে রপ্তানিতেও সমস্যা দেখা দেবে। ইউরোপে একটি কনটেইনার পাঠাতে এখন লাগে ৪ হাজার মার্কিন ডলার। বিকল্প পথে আফ্রিকার কেপ অব গুড হোপ হয়ে রপ্তানি করতে হলে খরচ বেড়ে দাঁড়াবে ১০ হাজার ডলার। আমদানিতেও একই অবস্থা হবে। বাড়তি খরচ শেষ পর্যন্ত পড়বে ভোক্তার ঘাড়ে।
