বন্ধ ও অর্ধবন্ধ টেক্সটাইল ও সুতা কারখানাগুলো আবার উৎপাদনে ফিরলে প্রায় ১৫ লাখ মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত সুতা দিয়ে আমদানির একটি বড় অংশ প্রতিস্থাপন করা গেলে বছরে প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকার বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় সম্ভব বলে মনে করছেন খাতসংশ্লিষ্টরা। তাদের মতে, ১০ থেকে ৩০ কাউন্টের তুলার সুতা আমদানিতে সাম্প্রতিক নিয়ন্ত্রণের ফলে স্থানীয় স্পিনিং ও প্রাথমিক বস্ত্রশিল্পে দীর্ঘদিনের বাজারচাপ কমবে। এতে অলস পড়ে থাকা উৎপাদন সক্ষমতা কাজে লাগানোর পাশাপাশি তৈরি পোশাকশিল্পের স্থানীয় সরবরাহব্যবস্থাও শক্তিশালী হবে।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশনের (বিটিটিসি) কর্মকর্তারা বলছেন, বিদেশি সুতার দ্রুত বাড়তে থাকা আমদানি স্থানীয় ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ শিল্পের ওপর চাপ তৈরি করছিল। পাশাপাশি এর ফলে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রাও দেশের বাইরে চলে যাচ্ছিল।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, এইচএস কোড ৫২০৫, ৫২০৬ ও ৫২০৭-এর আওতায় সুতা আমদানি দুই বছরের ব্যবধানে প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। ২০২২-২৩ অর্থবছরে এসব পণ্যের আমদানি ছিল ৩৫ কোটি ৮০ লাখ কেজি। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তা বেড়ে ৬৯ কোটি ৭১ লাখ কেজিতে দাঁড়ায়। সর্বশেষ অর্থবছরে এসব সুতার আমদানি মূল্য ছিল ২৬ হাজার ৭০০ কোটি টাকা। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশে মোট সুতা আমদানিতে ব্যয় হয়েছে প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকা। এর প্রায় ৬৫ শতাংশই ছিল ১০ থেকে ৩০ কাউন্টের সুতা।
বস্ত্রকল মালিকেরা বলছেন, আমদানি করা এসব সুতার একটি বড় অংশ স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত সুতা দিয়ে প্রতিস্থাপন করা সম্ভব হলে বছরে প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকার আমদানি ব্যয় কমানো যাবে। এতে একই অর্থ দেশের অভ্যন্তরে বিনিয়োগ ও উৎপাদনে ব্যবহারের সুযোগ তৈরি হবে।
এই সম্ভাবনার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত হয়ে উঠেছে গত কয়েক বছরে বন্ধ হয়ে যাওয়া কারখানাগুলো। ২০১৯ সালের পর থেকে বিভিন্ন কারণে প্রায় ১১৪টি সুতা উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানসহ মোট ২৪৪টি টেক্সটাইল মিল বন্ধ হয়েছে।
সরকারি কর্মকর্তা ও বেসরকারি খাতের নেতারা আশা করছেন, আমদানি নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি বাংলাদেশ ব্যাংকের পুনঃঅর্থায়ন সুবিধা কাজে লাগিয়ে এসব কারখানার প্রায় ৮০ শতাংশ আগামী এক বছরের মধ্যে আবার উৎপাদনে ফিরতে পারে।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা বলেন, বিটিটিসির প্রতিবেদনের ভিত্তিতে স্থানীয় শিল্প ও কর্মসংস্থান বাড়ানোর লক্ষ্যে সুতা আমদানি কমাতে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে (এনবিআর) পরামর্শ দিয়েছে মন্ত্রণালয়।
জাতীয় নির্বাচনের পর নির্বাচিত সরকার তাদের মেয়াদে এক কোটি কর্মসংস্থান সৃষ্টির অঙ্গীকার করেছে। মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা মনে করছেন, স্থানীয় বস্ত্র ও স্পিনিং শিল্পের উৎপাদন বাড়ানো সেই লক্ষ্য অর্জনে ভূমিকা রাখতে পারে।
তবে শিল্পমালিকদের মতে, শুধু আমদানি নিয়ন্ত্রণ করলেই হবে না, বন্ধ কারখানা চালু করতে অর্থায়ন, জ্বালানি ও কাঁচামালের সরবরাহ এবং প্রতিযোগিতামূলক উৎপাদন ব্যয় নিশ্চিত করতে হবে।
বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস এসোসিয়েশনের (বিটিএমএ) সাবেক পরিচালক প্রকৌশলী রাজীব হায়দার বলেন, দেশের বন্ধ ও অর্ধবন্ধ বস্ত্রকারখানাগুলো কার্যকরভাবে চালু করা গেলে প্রায় ১৫ লাখ মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হতে পারে। তিনি বলেন, এই কর্মসংস্থান শুধু কারখানার ভেতরেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। তুলা পরিবহন ও ব্যবস্থাপনা, গুদামজাতকরণ, প্যাকেজিং, প্রকৌশল ও রক্ষণাবেক্ষণ, ইউটিলিটি, ব্যাংকিং ও বিমার পাশাপাশি নিটিং, উইভিং ও ডায়িংয়ের মতো পরবর্তী ধাপের শিল্পেও কর্মসংস্থান বাড়বে।
সম্প্রতি নেয়া সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ১০ থেকে ৩০ কাউন্টের নির্দিষ্ট সুতার ক্ষেত্রে প্রচলিত শুল্কমুক্ত বন্ড সুবিধা প্রত্যাহার করা হয়েছে। এর পরিবর্তে ব্যাংক গ্যারান্টি, রপ্তানির প্রমাণ যাচাই এবং কঠোর জবাবদিহির ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। বন্ড সুবিধার অপব্যবহার ঠেকানোর পাশাপাশি স্থানীয় শিল্প সুরক্ষাই এর অন্যতম লক্ষ্য।
বাদশা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের প্রতিষ্ঠাতা মো. বাদশা মিয়া বলেন, ট্যারিফ কমিশন আমদানির তথ্য পর্যালোচনা করে ১০ থেকে ৩০ কাউন্টের সুতা বন্ড সুবিধার বাইরে রাখার সুপারিশ করেছে। এর উদ্দেশ্য হলো অসম প্রতিযোগিতা থেকে দেশের স্পিনিং শিল্পকে সুরক্ষা দেয়া। তিনি বলেন, প্রয়োজনীয় কাঁচামাল আমদানি ও স্থানীয় উৎপাদনের সক্ষমতার মধ্যে ভারসাম্য নিশ্চিত করা জরুরি। স্থানীয় উৎপাদনের ধাপগুলো সুরক্ষিত করার ব্যবস্থা না থাকলে বস্ত্র খাতে বড় অঙ্কের বিনিয়োগ ঝুঁকির মুখে পড়বে।
সালমা গ্রুপের পরিচালক ও বিটিএমএর পরিচালক চৌধুরী মোহাম্মদ হানিফ বলেন, সস্তা বিদেশি সুতার প্রবাহের কারণে দীর্ঘদিন ধরে স্থানীয় মিলগুলো তাদের উৎপাদন সক্ষমতার বড় অংশ ব্যবহার করতে পারছে না। ‘অনিয়ন্ত্রিত আমদানির কারণে যখন স্থানীয় উৎপাদন লাইনগুলো অলস পড়ে থাকে, তখন পুরো ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ ব্যবস্থাই মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়,’ বলেন তিনি। তিনি আরও বলেন, আমদানি ব্যবস্থাপনায় কঠোর নজরদারি দেশের ৩২ বিলিয়ন ডলারের বেশি স্থানীয় বিনিয়োগ সুরক্ষিত করতে, যথাযথ রাজস্ব আদায় নিশ্চিত করতে এবং দেশে মূল্য সংযোজন বাড়াতে সহায়তা করবে। তার মতে, স্থানীয় বস্ত্র ও স্পিনিং শিল্পের সক্ষমতা বাড়ানো শুধু আমদানি কমানোর বিষয় নয়। স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে উত্তরণের পর বাংলাদেশের রপ্তানি খাত যে বাড়তি বাণিজ্যিক চাপের মুখে পড়বে, তা মোকাবিলায়ও শক্তিশালী স্থানীয় সরবরাহব্যবস্থা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
