ফারইস্ট ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি লিমিটেডের সাবেক চেয়ারম্যান মো. নজরুল ইসলাম এবং তার স্ত্রী তাসলিমা ইসলামের স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ ক্রোকের আদেশ দিয়েছেন আদালত। এসব সম্পদের মধ্যে রয়েছে বাড়ি, ফ্ল্যাট, আবাসিক ও বাণিজ্যিক প্লট এবং বিভিন্ন এলাকায় জমি।
রোববার ঢাকার মহানগর সিনিয়র স্পেশাল জজ আদালতের বিচারক মো. শাহজাহান কবির দুদকের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে এ আদেশ দেন। একই সঙ্গে ক্রোক করা সম্পদ বিক্রি, হস্তান্তর বা বিনিময় না করার বিষয়ে সংশ্লিষ্ট জেলা রেজিস্ট্রারদের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দেয়া হয়েছে।
এর আগে দুদক উপপরিচারক মশিউর রহমান মহানগর সিনিয়র স্পেশাল জজ আদালতে ফারইস্টের সাবেক চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম ও তার স্বার্থ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি এবং প্রতিষ্ঠানের স্থাবর সম্পত্তি ক্রোকের আবেদন করেন।
দুদক উপপরিচারক মশিউর রহমান তার আবেদনে উল্লেখ করেন যে, “ফারইস্টের সাবেক চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম গ্রাহকের সঞ্চয়ের অর্থ দ্বারা বিভিন্ন ব্যাংকে রক্ষিত এমটিডিআর (এফডিআর) এর অর্থ আত্মসাৎ এবং প্রতিষ্ঠানের নামে অতিরিক্ত দামে জমি ক্রয় করে অর্থ আত্মসাৎসহ নানাবিধ অনিয়ম ও দুর্নীতির সাথে জড়িত থাকার অভিযোগ অনুসন্ধানাধীন রয়েছে। দরখাস্তে বর্ণিত স্থাবর সম্পদ ক্রোক করা না হলে তা হস্তান্তর হওয়ার সমূহ সম্ভাবনা রয়েছে যা পরবর্তীতে রাষ্ট্রের অনুকূলে বাজেয়াপ্ত করা সম্ভব হবে না। ফলে সুষ্ঠু অনুসন্ধানের স্বার্থে দরখাস্তে বর্ণিত স্থাবর সম্পদ ক্রোক করণের আদেশ হওয়া আবশ্য।”
আদালত অনুসন্ধানকারী কর্মকর্তা কর্তৃক দাখিলকৃত দরখাস্ত ও অভিযোগের গুরুত্ব বিবেচনায় নিয়ে অনুসন্ধানকারী কর্মকর্তার দরখাস্তে বর্ণিত স্থাবর সম্পদ দুর্নীতি দমন কমিশন বিধিমালা, ২০০৭ (সংশোধিত বিধিমালা-২০১৯) এর বিধি ১৮ অনুয়ায়ী ক্রোক করার আদেশ দেন।
নজরুল ইসলামের ক্রোককৃত সম্পদের বিবরণ
রাজধানীর উত্তরা, ভালুকা (ময়মনসিংহ), কুয়াকাটা (পটুয়াখালী), যাত্রাবাড়ী, সূত্রাপুর, গুলশান, রূপগঞ্জ (নারায়ণগঞ্জ) এবং মুন্সীগঞ্জে ছড়িয়ে থাকা মোট ২০টি দলিলের সম্পদ। যার দাপ্তরিক ক্রয়মূল্য হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে ৩৮ কোটি ৩৯ লাখ ১৩ হাজার টাকা। উল্লেখযোগ্য সম্পদের মধ্যে রয়েছে: গুলশানস্থ ৮ কাঠা জমি ও বাড়ি- যার দলিলমূল্য ১০ কোটি টাকা; কুয়াকাটায় ৬.১৮ একর জমি— দলিলমূল্য ১০.৫৫ কোটি টাকা; এবং উত্তরায় ২১.২১ কাঠা জমি।
তাসলিমা ইসলামের ক্রোক করা সম্পত্তি
গুলশান, খিলক্ষেত, ক্যান্টনমেন্ট, বাড্ডা, সূত্রাপুর, টঙ্গীবাড়ী ও গাজীপুরে থাকা মোট ২২টি দলিলের স্থাবর সম্পদ। যার দাপ্তরিক ক্রয়মূল্য ১৯ কোটি ২২ লাখ ৫৪ হাজার টাকা। উল্লেখযোগ্য সম্পদের মধ্যে রয়েছে: গুলশান ও বাড্ডায় বিভিন্ন ফ্ল্যাট ও জমি এবং খিলক্ষেতে আবাসিক প্লট ও ভবন। নজরুল ইসলাম ও তার স্ত্রীর নামে রেজিস্ট্রিকৃত এই বিশাল স্থাবর সম্পত্তির মোট সরকারি ক্রয়মূল্য ৫৭ কোটি ৬১ লাখ টাকারও বেশি, যার বর্তমান বাজারমূল্য বহুগুণ।
দুদক জানিয়েছে, নজরুল ইসলামের বিরুদ্ধে সংস্থাটির সমন্বিত জেলা কার্যালয় (সজেকা), ঢাকা-১-এ একাধিক মামলা রয়েছে। এর মধ্যে ২০২৫ সালের ৩১ জুলাই দায়ের করা একটি মামলাও রয়েছে। দুদকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ২৩ অক্টোবর একটি মামলায় নজরুল ইসলামকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে তাকে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। জিজ্ঞাসাবাদের সময় তিনি বিভিন্ন স্থাবর সম্পদের তথ্য দিয়েছেন বলে দাবি করেছে দুদক।
এদিকে নজরুল ইসলাম ও তার স্ত্রীর বিদেশে থাকা সম্পদের বিষয়েও তথ্য সংগ্রহের উদ্যোগ নেয়াসহ যুক্তরাষ্ট্রে থাকা সম্পদের বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ ও আইনি ব্যবস্থা নিতে মিউচুয়াল লিগ্যাল অ্যাসিস্ট্যান্স রিকোয়েস্ট পাঠানোর প্রক্রিয়া চলছে বলে জানা গেছে।
নজরুল ইসলামের বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) ১০টি অভিযোগ রয়েছে। এর মধ্যে ৬টি অভিযোগের তদন্ত শেষে মামলা রুজু করা হয়েছে। ৪টি অভিযোগ এখনো তদন্তাধীন রয়েছে।
উল্লেখ্য, দুদকের দায়ের করা ৩৫(০৭)২৫ নং মামলায় নজরুল ইসলাম গ্রেপ্তার হয়ে বর্তমানে কারাগারে আছেন। এছাড়া ৪০ লাখ গ্রাহকের জমাকৃত অর্থ আত্মসাতের দায়ে ফারইস্ট কর্তৃক দায়ের করা মামলায় তদন্ত শেষে ডিবি পুলিশ ১হাজার ৯৪ কোটি টাকার অভিযোগ এনে আদালতে চার্জশিট দাখিল করেছে যা আদালতে গৃহীতও হয়েছে।
