আওয়ামী লীগের পক্ষে ভুয়া খবর ছড়ানোর নেটওয়ার্ক শনাক্ত, ২৯ অ্যাকাউন্ট বন্ধ

ফন্ট সাইজ:

বাংলাদেশের গ্রামীণ জনগোষ্ঠীকে লক্ষ্য করে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের পক্ষে ভুয়া বাংলা সংবাদ তৈরি ও প্রচারের একটি স্বয়ংক্রিয় নেটওয়ার্ক শনাক্ত করেছে এআই বিষয়ক প্রতিষ্ঠান অ্যানথ্রপিক। পরে তারা ওই নেটওয়ার্ক বন্ধ করে দিয়েছে। অ্যানথ্রপিক জানিয়েছে, ক্লাউড ব্যবহার করে পরিচালিত এই নেটওয়ার্কের মাধ্যমে আওয়ামী লীগের পক্ষে প্রচারণা এবং দলটির রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে মিথ্যা ও মানহানিকর তথ্য ছড়ানো হতো।

অ্যানথ্রপিকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আওয়ামী লীগ ২০২৪ সালের জুলাইয়ের গণ-অভ্যুত্থানের পর ক্ষমতার বাইরে থাকায় এই প্রচারণাটি ক্ষমতাসীন কোনো দলের পক্ষে পরিচালিত ছিল না। বরং বিরোধী অবস্থানে থাকা আওয়ামী লীগের স্বার্থে পরিচালিত একটি প্রচারণা ছিল এটি। ১০ই সেপ্টেম্বর ‘থ্রেট ইন্টেলিজেন্ট রিপোর্ট’ নামে ১৫৪ পৃষ্ঠার রিপোর্ট প্রকাশ করে অ্যানথ্রপিক।

এতে বলা হয়- তদন্তে দেখা গেছে, বাংলাদেশে গাইবান্ধা জেলায় অবস্থানকারী একজন ব্যক্তি একাই এই কার্যক্রম পরিচালনা করছিলেন। প্ল্যাটফরমের সীমা ও শনাক্তকরণ এড়াতে ওই ব্যক্তি প্রায় ১৬ মাস ধরে ২৯টি ক্লাউড অ্যাকাউন্ট ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে ব্যবহার করেন। ভুয়া সংবাদ তৈরির জন্য তিনি ‘ফেক নিউজ ৩ ডট পিওয়াই’ নামে একটি নিজস্ব সফটওয়্যার তৈরি করেন।

এটি সরাসরি ক্লাউডের সঙ্গে সংযুক্ত হয়ে প্রতিবার নির্দিষ্ট ব্যাচে ১৫টি শিরোনাম, তিনটি বিস্তারিত ভুয়া সংবাদ এবং ছবি তৈরির জন্য ১৫টি প্রম্পট তৈরি করতো। অ্যানথ্রপিক জানিয়েছে, এসব কনটেন্ট দিয়ে ফেসবুক লাইভ, ইউটিউব ও টিকটকে ধারাবাহিক লাইভ সম্প্রচারের একটি চক্র চালানোর পরিকল্পনা ছিল। লক্ষ্য ছিল বিশেষ করে গ্রামীণ এলাকার আওয়ামী লীগ সমর্থক এবং তুলনামূলক কম সাক্ষর জনগোষ্ঠী। তদন্ত অনুযায়ী, ওই নেটওয়ার্ক অন্তত ১ হাজার ৫০০টি শিরোনাম, ৩০০টি মিথ্যা বর্ণনা এবং ১ হাজার ৫০০টি ছবি তৈরির প্রম্পট তৈরি করেছে।

ক্লাউডে তখন নিজস্ব ছবি তৈরির সুবিধা না থাকায় এসব প্রম্পট অন্য এআই মডেল দিয়ে ছবি তৈরি করা হয়ে থাকতে পারে বলে মনে করছে অ্যানথ্রপিক। তদন্তে পাওয়া অভ্যন্তরীণ যোগাযোগে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি নিজেই এসব কনটেন্টকে ‘ফেক নিউজ’ বা ভুয়া খবর হিসেবে উল্লেখ করেছেন। কনটেন্টগুলোকে ‘হট অ্যান্ড অ্যাগ্রেসিভ’ বা উত্তেজনাপূর্ণ ও আক্রমণাত্মক করার পাশাপাশি এমনভাবে তৈরি করার নির্দেশনা ছিল, যাতে ‘গ্রামের মানুষও বুঝতে পারে’।

অর্থাৎ, লক্ষ্য করা শ্রোতারা এসবকে সত্যিকারের সংবাদ হিসেবে বিশ্বাস করবেন এই ধারণা থেকেই কনটেন্ট তৈরির কৌশল নির্ধারণ করা হয়। নেটওয়ার্কটির প্রচারণা ছিল প্রায় পুরোপুরি আওয়ামী লীগপন্থি। একই সঙ্গে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি), জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় নাগরিক কমিটি (এনসিপি), অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এবং ছাত্র আন্দোলনের নেতাদের লক্ষ্য করে ভুয়া প্রচারণা চালানো হয়। এসব প্রচারণায় রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে বিদেশি এজেন্ট হিসেবে চিহ্নিত করা এবং তারা ‘তালেবান-ধাঁচের’ শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা করছে- এমন মিথ্যা অভিযোগ ছড়ানো হয়েছে।

অ্যানথ্রপিকের তদন্তে নেটওয়ার্কটির প্রচারণায় কয়েকটি নির্দিষ্ট বয়ান বা ন্যারেটিভ উঠে এসেছে। এর মধ্যে আছে- রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে ধর্মীয় উগ্রবাদী হিসেবে উপস্থাপন। সহিংসতা ও ষড়যন্ত্রের মিথ্যা খবর। বিরোধী নেতাদের বিদেশি এজেন্ট হিসেবে প্রচার। হত্যা ষড়যন্ত্র ও ‘হিট স্কোয়াড’-এর কাল্পনিক গল্প। দুর্নীতি ও গোপন রাজনৈতিক জোটের মিথ্যা অভিযোগ। ছাত্রনেতাদের বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থার এজেন্ট হিসেবে চিত্রিত করা। বিরোধী দলগুলো তালেবান-ধাঁচের শরিয়া শাসন প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা করছে- এমন দাবি।

নেটওয়ার্কটি শুধু কনটেন্ট তৈরির মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। ইউটিউবের এপিআই ব্যবহার করে ভিডিও স্বয়ংক্রিয়ভাবে আপলোডের জন্য আলাদা একটি স্ক্রিপ্টও তৈরি করা হয়েছিল। ভিডিওগুলো এক মাস আগে থেকে নির্ধারিত সময় অনুযায়ী প্রকাশের ব্যবস্থা ছিল। তৃতীয় পক্ষের একটি ধারাবাহিক ইন্টিগ্রেশন সেবার মাধ্যমে ভিডিও আপলোডের সময়সূচি নিয়ন্ত্রণ করা হতো। তদন্তে আরও দেখা যায়, পুরো প্রক্রিয়াটি প্রায় স্বয়ংক্রিয়ভাবে চলত এবং এতে মানুষের সরাসরি তদারকি খুবই কম ছিল। ক্লাউড এপিআইয়ের মাধ্যমে ভুয়া শিরোনাম, বিস্তারিত বর্ণনা ও ছবি তৈরির প্রম্পট তৈরি করা হতো। এরপর সেগুলো ক্লাউড স্টোরেজের নির্দিষ্ট ফোল্ডারে পাঠানো, অডিও ও ভিডিওতে রূপান্তর এবং পরে ইউটিউবে প্রকাশের জন্য স্বয়ংক্রিয়ভাবে সারিবদ্ধ করা হতো।

তবে অ্যানথ্রপিক স্পষ্টভাবে জানিয়েছে, কনটেন্টের ধরন আওয়ামী লীগপন্থি হলেও আওয়ামী লীগ দল হিসেবে এই নেটওয়ার্ক পরিচালনা বা অর্থায়ন করেছে- এমন কোনো প্রমাণ তদন্তে পাওয়া যায়নি। নেটওয়ার্কটির তৈরি ভিডিও বাংলাদেশের বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম প্ল্যাটফরমে দেখা গেছে। এ ছাড়া এসব কনটেন্ট সংশ্লিষ্ট অ্যাকাউন্টগুলোর বাইরে বৃহত্তর দর্শকের কাছে পৌঁছেছিল, এমন প্রমাণও পাওয়া যায়নি। অ্যানথ্রপিকের ‘ব্রেকআউট স্কেল’ অনুযায়ী, এই অভিযানকে ক্যাটাগরি থ্রি হিসেবে মূল্যায়ন করা হয়েছে। অর্থাৎ একাধিক প্ল্যাটফরমে এর কনটেন্ট ছড়িয়েছে এবং বাংলাদেশকেন্দ্রিক একাধিক চ্যানেল ও অ্যাকাউন্টে ওই নেটওয়ার্কের তৈরি ভিডিও পাওয়া গেছে। কিছু প্রচারণার বয়ান ভারতের স্বার্থের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হলেও এ কার্যক্রমের পেছনে কোনো রাষ্ট্রীয় নির্দেশনা বা অর্থায়নের প্রমাণও তদন্তে পাওয়া যায়নি।

অ্যানথ্রপিক জানিয়েছে, অভ্যন্তরীণ তদন্তের মাধ্যমে এই কার্যক্রম শনাক্ত করার পর এর সঙ্গে যুক্ত অ্যাকাউন্টগুলো নিষিদ্ধ করা হয়েছে। ভবিষ্যতে সংশ্লিষ্টরা নতুন অ্যাকাউন্ট খুলে একই কার্যক্রম চালানোর চেষ্টা করতে পারে- এমন আশঙ্কায় তাদের আচরণগত বৈশিষ্ট্য শনাক্ত করার ব্যবস্থাও তৈরি করা হয়েছে। এ ছাড়া সংশ্লিষ্ট বিতরণ প্ল্যাটফরম ও অন্যান্য অংশীদারের সঙ্গে এই নেটওয়ার্কের শনাক্তকারী তথ্যও ভাগ করে নেয়া হয়েছে।