দুদকের জালে যেসব বড় অনুসন্ধান দেশে-বিদেশে সম্পদের খোঁজ

দুদকের জালে যেসব বড় অনুসন্ধান দেশে-বিদেশে সম্পদের খোঁজ

ফন্ট সাইজ:

দেশে দুর্নীতি ও অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ অনুসন্ধানের পাশাপাশি এবার বিদেশে থাকা সম্পদের তথ্য সংগ্রহেও জোরালো তৎপরতা শুরু করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। যুক্তরাষ্ট্র ও সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ বিভিন্ন দেশে থাকা ব্যাংক হিসাব, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও স্থাবর সম্পদের তথ্য সংগ্রহের উদ্যোগ নিয়েছে সংস্থাটি। একই সময়ে সাবেক মন্ত্রী, সাবেক শীর্ষ আমলা ও সরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ক্রয় অনিয়মের অভিযোগেও নতুন করে অনুসন্ধান ও তদন্তের সিদ্ধান্ত এসেছে। দুদক সূত্র জানায়, সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাবেদ ও তার স্ত্রীর যুক্তরাষ্ট্রে থাকা সম্পদের বিষয়ে এফবিআইয়ের পাঠানো তথ্য, সাবেক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী ইয়াফেস ওসমানের বিরুদ্ধে অনুসন্ধান টিম পুনর্গঠন ও সাবেক মুখ্য সচিব আহমদ কায়কাউসের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ চলমান অনুসন্ধানের সঙ্গে যুক্ত করার সিদ্ধান্ত বিশেষভাবে আলোচনায় এসেছে। এ বিষয়ে দুদকের মুখপাত্র ও উপপরিচালক মো. আকতারুল ইসলাম মানবজমিনকে বলেন, বড় বড় অভিযোগের অনুসন্ধান ও মামলার তদন্ত শেষ করতে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কাছে চিঠিপত্র প্রেরণ করতে হয়।

প্রাপ্ত নথি পর্যালোচনা ও পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে যাচাই-বাছাই করতে হয়। দেশের বাইরে থাকা ব্যাংক হিসাব, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও স্থাবর সম্পদের তথ্য সংগ্রহে একটু সময় লেগে যায়।
জাবেদের মার্কিন সম্পদের নথি পেলো দুদক: সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাবেদ ও তার স্ত্রী রুকমিলা জামানের যুক্তরাষ্ট্রে থাকা সম্পদের বিষয়ে তদন্ত প্রতিবেদন ও নথি পেয়েছে দুদক। যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (এফবিআই) বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষের অনুরোধের পর এসব তথ্য পাঠিয়েছে। দুদক জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রে থাকা তাদের ব্যাংক হিসাব, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও স্থাবর সম্পদের তথ্য সংগ্রহের জন্য বাংলাদেশ থেকে পারস্পরিক আইনি সহায়তা চুক্তির আওতায় আবেদন করা হয়েছে। একই সঙ্গে অপরাধলব্ধ সম্পদ হিসেবে চিহ্নিত কোনো সম্পদ থাকলে তা জব্দ ও বাজেয়াপ্ত করার ক্ষেত্রেও সহযোগিতা চাওয়া হয়। দুদকের অর্থপাচার সংক্রান্ত শাখা সূত্রে জানা গেছে, যুক্তরাষ্ট্রের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বাংলাদেশ সরকারের অনুরোধ গ্রহণের পর বিষয়টি তদন্ত করে। এরপর এফবিআই সংশ্লিষ্ট তথ্য ও নথি দুদকের কাছে পাঠিয়েছে। এখন এসব তথ্য চলমান অনুসন্ধানের সঙ্গে মিলিয়ে যাচাই করা হবে। দুদকের ভাষ্য অনুযায়ী, বিদেশে থাকা সম্পদের প্রকৃতি, অর্থের উৎস এবং বাংলাদেশ থেকে অর্থ পাচারের কোনো যোগসূত্র রয়েছে কিনা, তা যাচাই করা হবে।

দুবাইয়ে ৭৩ বাংলাদেশির সম্পদ নিয়ে তৎপরতা: অন্যদিকে দুবাইয়ে সম্পদ থাকার অভিযোগে ৭৩ বাংলাদেশির বিষয়ে অনুসন্ধানে তথ্য সংগ্রহের উদ্যোগ নিয়েছে দুদক। এ তালিকায় সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী, ব্যাংকিং খাতের কয়েকজন পরিচিত ব্যক্তিসহ বিভিন্ন বাংলাদেশির নাম রয়েছে বলে আন্তর্জাতিক অনুসন্ধানে উঠে এসেছে। দুদক সংযুক্ত আরব আমিরাত সরকারের কাছ থেকে এসব সম্পদের তথ্য চাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। অভিযোগ রয়েছে, সংশ্লিষ্টদের কেউ কেউ অর্থপাচারের মাধ্যমে দুবাইয়ে বাড়ি, অ্যাপার্টমেন্ট ও অন্যান্য সম্পদ অর্জন করেছেন। বিদেশে বাংলাদেশিদের অবৈধ সম্পদের অনুসন্ধানে এটি দুদকের একটি বড় উদ্যোগ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। কারণ দেশের বাইরে সম্পদ শনাক্ত করতে সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রের আইন প্রয়োগকারী সংস্থা ও আর্থিক গোয়েন্দা প্রতিষ্ঠানের সহযোগিতা প্রয়োজন হয়।

ইয়াফেস ওসমানের বিরুদ্ধে নতুন অনুসন্ধান টিম: সাবেক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী ইয়াফেস ওসমানের বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার, স্বজনপ্রীতি এবং সরকারি অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ অনুসন্ধানে নতুন করে তদন্ত টিম পুনর্গঠন করেছে দুদক। দুদকের তথ্য অনুযায়ী, তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলো অনুসন্ধানের জন্য কমিশন নতুন করে কর্মকর্তাদের দায়িত্ব দিয়েছে। অনুসন্ধানে অভিযোগের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন প্রকল্প, প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত এবং সরকারি অর্থ ব্যয়ের বিষয়গুলো যাচাই করা হবে।

অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা ও তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে পরবর্তী সময়ে কমিশন আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। তবে দুদকের অনুসন্ধান শুরু হওয়া মানেই অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে-এমন নয়। অনুসন্ধান শেষে কমিশন এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে।

কায়কাউসের অভিযোগ যুক্ত হচ্ছে আদানি বিদ্যুৎ চুক্তির অনুসন্ধানে

সাবেক মুখ্য সচিব ও বিদ্যুৎ বিভাগের সাবেক সচিব আহমদ কায়কাউসের বিরুদ্ধে ওঠা দুর্নীতি, অনিয়ম, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগকে আদানি পাওয়ারের সঙ্গে বাংলাদেশের বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তি সংক্রান্ত চলমান অনুসন্ধানের সঙ্গে যুক্ত করার সুপারিশ করেছে দুদক। দুদকের মতে, কায়কাউস দায়িত্ব পালনকালে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের গুরুত্বপূর্ণ পদে ছিলেন। ফলে তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ এবং বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তিতে সম্ভাব্য অনিয়মের বিষয়গুলো একই অনুসন্ধানের আওতায় যাচাইয়ের প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে। এখন আদানি পাওয়ারের সঙ্গে বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তির শর্ত, সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভূমিকা নিয়ে চলমান অনুসন্ধানে কায়কাউসের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগও পর্যালোচনা করা হতে পারে।

ডিএনসিসি’র ওয়াকিটকি ক্রয়েও দুর্নীতির অনুসন্ধান

ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) ওয়াকিটকি কেনায় অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগে পূর্ণাঙ্গ তদন্তের সিদ্ধান্ত নিয়েছে দুদক। অভিযোগ রয়েছে, প্রয়োজনীয় অভিজ্ঞতা না থাকা সত্ত্বেও একটি স্থানীয় প্রতিষ্ঠানকে ওয়াকিটকি সরবরাহের কাজ দেয়া হয়। দরপত্র প্রক্রিয়ায় অনিয়ম এবং পণ্যের মূল্য অস্বাভাবিকভাবে বেশি দেখিয়ে সরকারি অর্থের অপচয় ও আত্মসাতের অভিযোগও রয়েছে। এর আগে এ অভিযোগের ভিত্তিতে দুদক এনফোর্সমেন্ট অভিযান পরিচালনা করে তথ্য সংগ্রহ করেছিল। সেই অভিযানে পাওয়া তথ্য এবং পরবর্তী অভিযোগ যাচাইয়ের পর এবার আনুষ্ঠানিক তদন্তের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। তদন্তে ওয়াকিটকি কেনার দরপত্র প্রক্রিয়া, সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের যোগ্যতা, পণ্যের বাজারমূল্য এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা খতিয়ে দেখা হবে। তদন্ত পরিচালনার জন্য একজন উপপরিচালককে অনুসন্ধান কর্মকর্তা এবং একজন পরিচালককে তদারকি কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে।