বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডি বছর যায়, নীতিমালা হয় না

ফন্ট সাইজ:

দেশে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের যাত্রা শুরু হয় ১৯৯২ সালে। এরপর পেরিয়ে গেছে প্রায় ৩৪ বছর। এই সময়ে বেড়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা, শিক্ষক-শিক্ষার্থীর সংখ্যা এবং গবেষণার পরিধি। কিন্তু এখনো বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডি প্রোগ্রাম চালুর অনুমোদন মেলেনি। দীর্ঘদিন ধরে এ নিয়ে আলোচনা হলেও বাস্তবে অগ্রগতি হয়েছে খুব সামান্য। আলোচনাটা শুরু হয় আওয়ামী আমলে। কয়েক বছরের কথা চালাচালির পর ২০২৪ সালের ৪ঠা জুন পিএইচডি প্রোগ্রাম চালুর নীতিমালা প্রণয়নে কমিটি গঠন করে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি)।

এরপর নীতিমালার খসড়াও তৈরি করা হয়। গত বছরের জুলাই ও অক্টোবরে সেটি অনুমোদনের সম্ভাবনার কথা জানিয়েছিল ইউজিসি। তবে শেষ পর্যন্ত অনুমোদন হয়নি। এখন নতুন সরকারের মতামতের অপেক্ষায় রয়েছে খসড়াটি। এর মধ্যেই বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডি চালুর বিষয়টি আবারো সামনে এসেছে। শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন বলেছেন, পিএইচডি শুধু সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে দেয়া হবে, এমনটা হতে পারে না। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়েও গবেষণার সুযোগ বাড়াতে হবে। এজন্য ইউজিসিকে একটি নীতিমালা তৈরির কথাও বলেছেন তিনি। এর আগে গত ১৭ই আগস্টও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিগগির পিএইচডি চালুর উদ্যোগ নেয়ার কথা জানিয়েছিলেন শিক্ষামন্ত্রী। ঢাকায় ‘কিউএস বাংলাদেশ ফোরাম ২০২৬’-এ তিনি বলেন, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়েও গবেষণা দরকার।

ক্রস-বর্ডার শিক্ষা ও গবেষণার জন্য এ সুযোগ তৈরি করা প্রয়োজন। ইউজিসি বলছে, নীতিমালার খসড়া প্রস্তুত রয়েছে। এই খসড়ার উপর বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলরদের মতামতও নেয়া হয়েছে। তবে নতুন সরকারের মতামতের জন্য অপেক্ষা করছে কমিশন। সরকারের শিক্ষা নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রাখতে খসড়ায় পরিবর্তন আসতে পারে। সংযোজন-বিয়োজনও হতে পারে। সরকারের সম্মতি পাওয়ার পর খসড়াটি অনুমোদনের জন্য মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে। অন্যদিকে পিএইচডি চালুর জন্য প্রস্তুত রয়েছে আগ্রহী কয়েকটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়। বিশ্ববিদ্যালয়গুলো দীর্ঘদিন ধরেই সরকারের কাছে আবেদন জানিয়ে আসছেন। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর তরফে ইউজিসিকে জানানো হয়, আমাদের বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষকরা আন্তর্জাতিক মানের জার্নালে গবেষণাপত্র প্রকাশ করছেন। অন্যান্য অনেক বিশ্ববিদ্যালয়েও মানসম্মত শিক্ষকসহ পরিবেশ রয়েছে। আমরা দীর্ঘদিন ধরেই পিএইচডি চালুর আবেদন জানিয়েছি। এটি দ্রুত চালু হওয়া প্রয়োজন। তবে সব বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়কে পিএইচডি চালুর অনুমতি দেয়ার পরিকল্পনা নেই ইউজিসি’র। কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে ১১৬টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে। এর মধ্যে নিজস্ব ক্যাম্পাসের সনদপ্রাপ্ত বিশ্ববিদ্যালয় ২০ শতাংশেরও কম। পিএইচডি’র অনুমোদনে স্থায়ী ক্যাম্পাসকে গুরুত্ব দেয়া হবে।

পাশাপাশি দক্ষ সুপারভাইজার ও গবেষণার সক্ষমতাও বিবেচনায় থাকবে। ইউজিসি বলছে, ভালো র?্যাংকিং থাকা বিশ্ববিদ্যালয়গুলো অগ্রাধিকার পেতে পারে। গুরুত্ব পাবে ফ্যাকাল্টি স্ট্রেংথও। বিশেষ করে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে গবেষণায় যুক্ত শিক্ষকরা বিবেচনায় আসবেন। শিক্ষকদের প্রকাশনা, পিএইচডি ও গবেষণার অভিজ্ঞতাকেও গুরুত্ব দেয়া হবে। তবে পিএইচডি চালুর সঙ্গে বড় একটি ঝুঁকির সম্ভাবনাও রয়েছে, ভুয়া ডিগ্রি ও পিএইচডি বাণিজ্যের।

এদিকে সম্প্রতি যোগ্য বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডি চালুর বিষয়টি সক্রিয়ভাবে বিবেচনার কথা জানিয়েছেন ইউজিসি চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মামুন আহমেদ। তিনি বলেছেন, সব বিশ্ববিদ্যালয়কে ঢালাওভাবে এই সুযোগ দেয়া হবে না। গবেষণার মানদণ্ড, স্বচ্ছতা ও একাডেমিক সততা নিশ্চিত করেই অনুমোদন দেয়া হবে। একদিকে গবেষণার পরিধি বাড়াতে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডির প্রয়োজনীয়তার কথা বলা হচ্ছে।

অন্যদিকে মানহীন ডিগ্রি ও বাণিজ্যের আশঙ্কাও রয়েছে। তাই যোগ্য প্রতিষ্ঠান বাছাই এবং কঠোর মানদণ্ড নির্ধারণই এখন ইউজিসির সামনে বড় চ্যালেঞ্জ। দীর্ঘ ৩৩ বছরের অপেক্ষার পর এবার বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডির দরজা খুলবে কি না, সেটিই দেখার বিষয়। নাকি আগের মতোই নীতিমালা তৈরির আলোচনা চলবে, আর পিএইচডির সুযোগ থেকে যাবে অপেক্ষাতেই।

নীতিমালার অগ্রগতি সম্পর্কে জানতে চাইলে ইউজিসি চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মামুন আহমেদ বলেন, নীতিমালার বিষয়ে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। খসড়া নিয়ে কাজ চলছে। আমরা চাই দ্রুতই নীতিমালা যাতে চূড়ান্ত করতে পারি।