১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬। সিলেট থেকে চট্টগ্রামগামী পাহাড়িকা এক্সপ্রেসের নির্ধারিত ছাড়ার সময় ছিল সকাল ১০টা ৩০ মিনিট। সেই সময়কে সামনে রেখেই যাত্রীরা দিনের পরিকল্পনা করেছিলেন। কেউ দূরবর্তী উপজেলা থেকে ভোরে স্টেশনের দিকে রওয়ানা দিয়েছেন, কেউ চট্টগ্রামে পৌঁছে পরবর্তী কর্মসূচি ঠিক করেছেন। সকাল সাড়ে ৮টার দিকে জানানো হলো, ট্রেনটি দুপুর ১২টা ২০ মিনিটে ছাড়বে। আগে থেকে পরিবর্তিত সময় জানানোর উদ্যোগ ইতিবাচক হলেও সেই সময়ও রক্ষা হয়নি। শেষ পর্যন্ত ট্রেনটি সিলেট স্টেশন ছেড়েছে দুপুর ১টা ২০ মিনিটে। নির্ধারিত সময়ের তুলনায় বিলম্ব প্রায় ২ ঘণ্টা ৫০ মিনিট।
রেলওয়ের বিশাল কর্মযজ্ঞের তুলনায় ঘটনাটি হয়তো পরিসংখ্যানে ছোট। একজন যাত্রীর কাছে তা মোটেই ছোট নয়। সময় এমন সম্পদ, হারিয়ে গেলে যা ফেরত পাওয়া যায় না। রেলের টিকিট কেনার সঙ্গে যাত্রী শুধু আসন নিশ্চিত করেন না, নির্ধারিত সময়ে যাত্রা শুরু এবং যথাসম্ভব নির্ধারিত সময়ে গন্তব্যে পৌঁছানোর প্রত্যাশাও করেন। ফলে সময়সূচি নিছক ট্রেন চলাচলের তালিকা নয়; যাত্রী ও সেবাদাতার মধ্যে আস্থার এক অঘোষিত চুক্তি।
পাহাড়িকা এক্সপ্রেসের ঘটনায় তাই সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় শুধু প্রায় তিন ঘণ্টার বিলম্ব নয়, অনিশ্চয়তা। প্রথমে সকাল ১০টা ৩০ মিনিটের বদলে দুপুর ১২টা ২০ মিনিটের সময় জানানো হলো। সেই সময়ও পেরিয়ে গেল। এরপর আরও এক ঘণ্টা অপেক্ষা। একজন যাত্রী তখন জানেন না, কখন ট্রেন ছাড়বে। যান্ত্রিক ত্রুটি, সিগন্যাল সমস্যা কিংবা লাইন রক্ষণাবেক্ষণের কারণে বিলম্ব ঘটতেই পারে। কিন্তু সমস্যা দেখা দেওয়ার পর দ্রুত কারণ শনাক্ত করা, বিকল্প ব্যবস্থা নেওয়া এবং নির্ভুল তথ্য দেওয়া আধুনিক রেল ব্যবস্থাপনার মৌলিক দায়িত্ব।
সিলেটের মানুষের জন্য বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ। সড়ক যোগাযোগের দীর্ঘদিনের দুরবস্থায় যাতায়াত ক্রমেই কঠিন হয়েছে। ঢাকা–সিলেট, সিলেট–কুমিল্লা এবং সিলেট–চট্টগ্রাম মহাসড়কের বিভিন্ন অংশে যানজট, সড়ক বর্ধিতকরণ ও সংস্কারকাজ, ধীরগতি ও অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা মানুষের ভোগান্তি বাড়িয়েছে। ফলে রেলকে মানুষ তুলনামূলক নিরাপদ, আরামদায়ক ও নির্ভরযোগ্য বিকল্প হিসেবে দেখতে চান। সড়কে দীর্ঘ অপেক্ষার সঙ্গে রেলের অনিশ্চয়তা যুক্ত হলে সিলেটের যোগাযোগ সংকট আরও গভীর হয়।
সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান বলছে, বাংলাদেশ রেলওয়ের সময়ানুবর্তিতা পুরোপুরি হতাশাজনক নয়। সংবাদ প্রতিবেদনে রেলওয়ের তথ্য উদ্ধৃত করে বলা হয়েছে, ২০২৩–২৪ অর্থবছরে পূর্বাঞ্চলের আন্তনগর ট্রেনের প্রায় ৯১ শতাংশ সময়মতো চলেছিল। পরবর্তী অর্থবছরে হারটি প্রায় ৮৯ শতাংশে নেমে আসে। পশ্চিমাঞ্চলে একই সময়ে সময়ানুবর্তিতা প্রায় ৮৮ শতাংশ থেকে বেড়ে ৯০ শতাংশ হয়েছে। কিন্তু জাতীয় গড় একজন যাত্রীর বাস্তব অভিজ্ঞতা প্রকাশ করে না। তিনি যে ট্রেনে উঠেছেন, সেটি কখন ছাড়ল এবং কখন পৌঁছাল, তার কাছে সেটিই গুরুত্বপূর্ণ।
ঈদযাত্রায় রেলওয়ের সক্ষমতার ইতিবাচক দৃষ্টান্তও পাওয়া যায়। ২০২৫ সালের ঈদুল ফিতরে প্রায় ৯৪ শতাংশ ট্রেন নির্ধারিত সময়ে ছাড়ার কথা জানিয়েছিলেন সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা। পরিবহন, প্রকৌশল, যান্ত্রিক, সিগন্যাল, বিদ্যুৎ, নিরাপত্তা ও বাণিজ্যিক বিভাগের সমন্বিত কাজকে এর পেছনে গুরুত্বপূর্ণ কারণ বলা হয়েছিল। ফলে সময়ানুবর্তিতা কোনো একক বিভাগের দায়িত্ব নয়। ইঞ্জিন, রেক, লাইন, সিগন্যাল, স্টেশন ব্যবস্থাপনা ও নিয়ন্ত্রণব্যবস্থার সমন্বিত দক্ষতার ওপর তা নির্ভর করে।
পাহাড়িকা এক্সপ্রেসের সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো তাই আলাদা গুরুত্ব দাবি করে। ২০২৬ সালের মে মাসে ইঞ্জিন সমস্যায় ট্রেনটি প্রায় ৫৫ মিনিট বিলম্বে সিলেট ছাড়ার খবর প্রকাশিত হয়েছিল। ফেব্রুয়ারিতে ইঞ্জিন বিকল হয়ে সিলেটের সঙ্গে রেল যোগাযোগ প্রায় পাঁচ ঘণ্টা বন্ধ থাকার ঘটনাও সামনে আসে। একই ধরনের সমস্যা বারবার হলে শুধু তৎক্ষণাৎ মেরামত যথেষ্ট নয়। ইঞ্জিনের সক্ষমতা, রেকের অবস্থা, যন্ত্রাংশের মান, রক্ষণাবেক্ষণ পদ্ধতি এবং পরিচালন ব্যবস্থাপনা নিয়ে সমন্বিত পর্যালোচনা দরকার।
এখানেই দেশের ব্যবস্থাপনা কাঠামোর দুর্বলতা এবং দুর্নীতি ও অনিয়মের প্রশ্ন সামনে আসে। সিলেটের নতুন রেলওয়ে স্টেশন তার দৃশ্যমান উদাহরণ। দেড় যুগ আগে নির্মিত স্টেশনটি এখন দেখলে অনেকের কাছেই মনে হয়, যেন বহু দশক পুরোনো কোনো জীর্ণ স্থাপনা। নির্মাণকাজের মান, তদারকি এবং রক্ষণাবেক্ষণ নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। নির্মাণ খাতে অনিয়মের ক্ষতি শুধু অর্থের অপচয় নয়; নিম্নমানের অবকাঠামো দ্রুত নষ্ট হয়, রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় বাড়ায় এবং জনগণের অর্থে নির্মিত সম্পদের কার্যকারিতা কমিয়ে দেয়। দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নের জন্য দুর্নীতিমুক্ত পরিবেশ কতটা জরুরি, এমন দৃশ্য তারই বাস্তব শিক্ষা।
সিলেটের রেল যোগাযোগ উন্নয়নে আখাউড়া–সিলেট ডাবল লাইন নির্মাণকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া দরকার। একক রেললাইনে বিপরীতমুখী ট্রেনের ক্রসিং ও অপেক্ষার কারণে সময়সূচি জটিল হয়। কোথাও সামান্য বিলম্ব ঘটলে তার প্রভাব পরবর্তী ট্রেনেও পড়ে। ডাবল লাইন চালু হলে দুই দিকের ট্রেন চলাচল আরও নির্বিঘ্ন হবে, যাত্রী ও মালবাহী ট্রেনের সংখ্যা বাড়ানো সম্ভব হবে এবং সময়ানুবর্তিতা উন্নত হওয়ার সুযোগ তৈরি হবে। এর সঙ্গে সিলেটের পর্যটন, ব্যবসা-বাণিজ্য ও আঞ্চলিক অর্থনীতিও লাভবান হতে পারে।
তবে নতুন লাইন নির্মাণই শেষ কথা নয়। পরিকল্পনা, নকশা, নির্মাণ, তদারকি এবং রক্ষণাবেক্ষণের প্রতিটি পর্যায়ে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও কঠোর মাননিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করতে হবে। বিপুল অর্থ ব্যয়ে নির্মিত অবকাঠামো কয়েক বছরের মধ্যে দুর্বল হয়ে পড়লে উন্নয়ন প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্যই ব্যর্থ হয়। তাই প্রশ্ন শুধু কত কিলোমিটার রেললাইন নির্মিত হলো নয়; সেই লাইন কতটা মানসম্মত, টেকসই এবং সঠিকভাবে পরিচালিত হচ্ছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।
বিশ্বের উন্নত রেল ব্যবস্থার অভিজ্ঞতা দেখায়, সময়ানুবর্তিতা ভাগ্যের বিষয় নয়। যুক্তরাজ্য, ভারত এবং জাপানের রেল ব্যবস্থায় প্রযুক্তি, রক্ষণাবেক্ষণ, প্রশিক্ষিত জনবল, তথ্য বিশ্লেষণ ও কঠোর অপারেশনাল শৃঙ্খলার মাধ্যমে বিলম্ব কমানোর চেষ্টা চলছে। বাংলাদেশকে তাদের সঙ্গে সরাসরি তুলনা করার প্রয়োজন নেই; প্রয়োজন কার্যকর শিক্ষা নেওয়া।
বাংলাদেশ রেলওয়ের উচিত প্রতিটি আন্তনগর ট্রেনের মাসিক সময়ানুবর্তিতা প্রতিবেদন প্রকাশ করা। নির্ধারিত ও প্রকৃত ছাড়ার সময়, গন্তব্যে পৌঁছানোর সময় এবং বিলম্বের কারণ প্রকাশ হলে জবাবদিহি বাড়বে। কোনো ট্রেনের সময় পরিবর্তিত হলে স্টেশন ঘোষণা, ডিজিটাল ডিসপ্লে, ওয়েবসাইট, মোবাইল অ্যাপ এবং সম্ভব হলে সরাসরি বার্তার মাধ্যমে যাত্রীকে দ্রুত জানাতে হবে।
১১ সেপ্টেম্বরের পাহাড়িকা এক্সপ্রেসের ২ ঘণ্টা ৫০ মিনিটের বিলম্ব তাই শুধু কয়েক ঘণ্টার অপেক্ষা নয়। প্রশ্ন হলো, সড়কপথের দীর্ঘ ভোগান্তির মধ্যে সিলেটবাসী যদি রেলকেও নির্ভরযোগ্য বিকল্প হিসেবে না পান, তাহলে তাদের সামনে কার্যকর যোগাযোগের পথ থাকে কোথায়? রেল উন্নয়নের সাফল্য নতুন প্রকল্পের সংখ্যা দিয়ে নয়, সময়নিষ্ঠ ট্রেন, মানসম্মত অবকাঠামো, দক্ষ ব্যবস্থাপনা এবং দুর্নীতিমুক্ত বাস্তবায়নের মাধ্যমে মাপতে হবে। নাগরিকের সময়ের প্রতি সম্মান এবং রাষ্ট্রীয় অর্থের প্রতি দায়বদ্ধতাই রেলওয়ের প্রতি মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনার সবচেয়ে শক্ত ভিত্তি।
লেখক: প্রফেসর ড. খালিদুর রহমান
পরিসংখ্যান বিভাগ
শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, সিলেট।
