চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং আজ শনিবার ভারতে আসছেন। প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর এটি তার তৃতীয় ভারত সফর এবং সাত বছর পর প্রথম। ব্রিকস নেতাদের সম্মেলনে অংশ নেয়াই তার সফরের আনুষ্ঠানিক কারণ। তবে ২০২০ সালের সীমান্ত অচলাবস্থার পর দুই দেশের সম্পর্ক যে তলানিতে ঠেকেছিল, সেই বাস্তবতায় শির সফর দ্বিপক্ষীয় দিক থেকেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বৈশ্বিক অস্থিরতার পাশাপাশি ভারত-চীন সম্পর্কের এই ফাটলও সম্মেলনের গতিপথে বড় প্রভাব ফেলবে।
২০০১ সালে গোল্ডম্যান স্যাকসের বিশ্লেষকরা ভারত, চীন, ব্রাজিল ও রাশিয়াকে বিশ্বের ‘উদীয়মান অর্থনীতি’ হিসেবে চিহ্নিত করেছিলেন। ৯/১১ হামলার পরপরই গড়ে ওঠে ‘ব্রিক’ জোট। ২৫ বছর পর এই চার দেশের অগ্রযাত্রা হয়েছে ভিন্ন ভিন্ন পথে। যুক্তরাষ্ট্রের পর বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতিতে পরিণত হয়েছে চীন। ভারতও অর্থনৈতিকভাবে এগিয়েছে, তবে চীনের তুলনায় অনেক পিছিয়ে রয়েছে। নিজেদের সৃষ্ট যুদ্ধের কারণে রাশিয়া নানা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। আর ঘন ঘন সরকার পরিবর্তন ও নানা কেলেঙ্কারিতে ব্রাজিলও প্রত্যাশা অনুযায়ী এগোতে পারেনি। পরে এই জোটে যোগ দেয়া দক্ষিণ আফ্রিকাও প্রত্যাশা পূরণ করতে পারেনি।
২০০৯ সালে বৈশ্বিক আর্থিক সংকটের ছায়ায় প্রথম ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এরপর পশ্চিমা অনেক দেশের তুলনায় আর্থিক সংকট ভালোভাবে সামলে চীন আরও শক্তিশালী অর্থনৈতিক অবস্থানে উঠে এসেছে। অর্থনৈতিক উত্থানের পাশাপাশি চীনের সামরিক শক্তিও বেড়েছে। যুক্তরাষ্ট্রকে পেছনে ফেলে বৈশ্বিক পরাশক্তি হওয়ার উচ্চাকাক্সক্ষা এখন দেশটির কর্মকাণ্ডে স্পষ্ট। প্রতিবেশী অঞ্চলে চীনের ক্রমবর্ধমান আগ্রাসী ও শক্ত অবস্থান, দক্ষিণ চীন সাগর, ইন্দো-প্যাসিফিক এবং ভারতের সঙ্গে দেশটির সীমান্তে এর প্রতিফলন দেখা যায়।
সীমান্ত অচলাবস্থার কারণে ভারতকে বারবার চীনের শক্ত অবস্থানের মুখোমুখি হতে হয়েছে। তবে শি জিনপিংয়ের নেতৃত্বে সাম্প্রতিক সময়ে চীনা রাষ্ট্রের এই দৃঢ় ও আক্রমণাত্মক মনোভাব সাম্প্রতিক অতীতের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি বলে মনে হয়েছে। ১৯৬২ সালের যুদ্ধ এবং ১৯৬৭ সালে সিকিমে সীমান্ত সংঘর্ষের পর ভারত-চীন সীমান্তে বড় ধরনের অচলাবস্থার ঘটনা ঘটেছে ২০১৩ সালে লাদাখের দেপসাং, ২০১৪ সালে চুমার, ২০১৭ সালে ডোকলাম এবং ২০২০ সাল থেকে পূর্ব লাদাখে। পূর্ব লাদাখে এখনও প্রায় ৫০ হাজার ভারতীয় সেনা প্রকৃত নিয়ন্ত্রণরেখা বরাবর মোতায়েন রয়েছে। ২০২০ সালের জুনের সংঘর্ষে কর্নেল পদমর্যাদার এক কর্মকর্তাসহ ২০ জন ভারতীয় সেনা নিহত হন। চীনেরও অন্তত চারজন সেনা নিহত হয়েছিল।
বছরের পর বছর কূটনৈতিক ও সামরিক পর্যায়ের আলোচনার পর ২০২৪ সালে দুই দেশের সেনাদের মধ্যে কিছুটা বিচ্ছিন্নকরণ বা ডি-এনগেজমেন্ট হয়। এরপর সম্পর্ক স্থিতিশীল করার জন্য ধীরে ধীরে আরও কিছু পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। এর মধ্যে সরাসরি বিমান চলাচল পুনরায় চালু, ভিসা বিধিনিষেধ কিছুটা শিথিল, কৈলাস মানসসরোবর যাত্রা পুনরায় শুরু এবং চীনা বিনিয়োগের ওপর কিছু বিধিনিষেধ শিথিল করার বিষয় রয়েছে। তবে বড় ধরনের কাঠামোগত মতপার্থক্য এখনও রয়ে গেছে। এর মধ্যে অন্যতম হলো বিশাল বাণিজ্য ঘাটতি। ভারতীয় ব্যবসাগুলোর জন্য চীনের বাজারে পর্যাপ্ত প্রবেশাধিকার না থাকাও দীর্ঘদিন ধরে ভারতের অভিযোগের বিষয়। অন্যদিকে কর ফাঁকির অভিযোগে ভারতও চীনা কোম্পানিগুলোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিচ্ছে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো সীমান্ত অচলাবস্থার কারণে দুই দেশের মধ্যে কৌশলগত ও রাজনৈতিক আস্থা ব্যাপকভাবে কমে গেছে। এরই মধ্যে ‘অপারেশন সিঁদুর’-এর সময় ভারত-পাকিস্তান সামরিক সংঘাতে চীন ও পাকিস্তানের ঘনিষ্ঠতা সেই আস্থার সংকট আরও গভীর করেছে। এই বাস্তবতার মধ্যেই অনুষ্ঠিত হচ্ছে ব্রিকস সম্মেলন। ৩০টিরও বেশি দেশ ও বিভিন্ন জোটের নেতারা এতে অংশ নিচ্ছেন। পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে গত দেড় বছরে প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের নেতৃত্বাধীন মার্কিন সরকারের কর্মকাণ্ড। তার বিভিন্ন শুল্কনীতির কারণে চীন ও ভারতসহ বিশ্বের অনেক দেশ চাপে পড়েছে। ফলে এর প্রভাব মোকাবিলায় চীন ও ভারত এখন কিছু ক্ষেত্রে একই অবস্থানে রয়েছে। দীর্ঘ সময়ের উচ্চ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পর চীনও ভবিষ্যৎ নিয়ে তার প্রত্যাশা কিছুটা সংশোধন করেছে। এ ছাড়া ইরানের বিরুদ্ধে ট্রাম্পের যুদ্ধ শক্তিশালী দেশগুলো অন্য দেশের ভৌগোলিক অখণ্ডতা ও সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘন করতে পারে কি না, সেই প্রশ্নও সামনে এনেছে। তবে একই অভিযোগ চীন ও রাশিয়ার বিরুদ্ধেও রয়েছে- নিজ নিজ প্রতিবেশী অঞ্চলে তারাও এমন কর্মকাণ্ডে জড়িয়েছে।
এর পাশাপাশি পশ্চিম এশিয়ার যুদ্ধ সব দেশের ওপরই অর্থনৈতিক চাপ তৈরি করেছে। জ্বালানি ও মূল্যস্ফীতি বেড়েছে। গ্লোবাল সাউথের অংশ হিসেবে ব্রিকসের দেশগুলোও স্বাভাবিকভাবেই এর বড় ধাক্কা সামলাচ্ছে। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, অভিন্ন স্বার্থ ও উদ্বেগের এই মুহূর্ত ভারত ও চীনের সম্পর্ক উন্নয়নের সুযোগ তৈরি করতে পারে কি না। একই সঙ্গে অন্যান্য উন্নয়নশীল দেশকে অভিন্ন ইস্যুতে একই অবস্থানে আনা সম্ভব কি না, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। শির ভারত সফরকে ইতিবাচক সংকেত হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে সেই ইতিবাচকতারও সীমা রয়েছে। সহযোগিতার বিভিন্ন ক্ষেত্রে ব্রিকসের বড় সম্ভাবনা রয়েছে। কিন্তু এখন পর্যন্ত বেইজিং জোটটির ক্ষেত্রে নিজেকে অনেকটা ‘সমানদের মধ্যে প্রথম’ হিসেবে দেখে এসেছে। মূল পাঁচ সদস্যের বাইরে ব্রিকসের সম্প্রসারণেও চীন দীর্ঘদিন ধরে সমর্থন দিয়ে এসেছে। ২০২৩ সালের সম্প্রসারণের ফলে জোটের বর্তমান ১১ সদস্যের কাঠামো তৈরি হয়।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, চীন ও রাশিয়া ব্রিকসকে ‘পশ্চিমবিরোধী’ জোট হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করেছে। ভারত আবার এটিকে ‘অ-পশ্চিমা’ জোট হিসেবে দেখে। এই দুই দৃষ্টিভঙ্গির পার্থক্য পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। বিশেষ করে ব্রিকসের সদস্য ব্রাজিলের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক আরোপ এবং দক্ষিণ আফ্রিকার সঙ্গে ওয়াশিংটনের রাজনৈতিক মতবিরোধ দিল্লির জন্য পরিস্থিতি সহজ করেনি।
গত ২৫ বছরে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে শক্তিশালী সম্পর্ক গড়ে তুলেছে ভারত। পাশাপাশি ইউরোপ, অস্ট্রেলিয়া, কানাডা ও অন্যান্য পশ্চিমা দেশের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ অংশীদারত্ব গড়তে চাইছে দিল্লি। তাই ভারত কোনোভাবেই ‘পশ্চিমবিরোধী’ নয়। পুঁজির প্রবাহ, প্রযুক্তি এবং ভারতীয়দের জন্য কর্মসংস্থান ও সুযোগের ক্ষেত্রে চীন বা রাশিয়ার চেয়ে পশ্চিমা বিশ্বের ওপর নির্ভর করার প্রয়োজনীয়তা ভারত উপলব্ধি করে। এই ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় চীনের ব্রিকস ভাবনার তুলনায় ভিন্ন অবস্থান থেকে ভারত এবারের সম্মেলনের আয়োজন করছে। একই সঙ্গে ওয়াশিংটনকে এটিও দেখাতে চাইছে যে প্রযুক্তি থেকে জ্বালানি নিরাপত্তা—বিভিন্ন ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের বাইরেও ভারতের অংশীদার রয়েছে। সংযুক্ত আরব আমিরাত ও সৌদি আরব ভারতে বিনিয়োগ করছে। হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর রাশিয়া ভারতের জন্য জ্বালানি সরবরাহকারী হিসেবে এগিয়ে এসেছে। আর গুরুত্বপূর্ণ খনিজের ক্ষেত্রে ব্রাজিল ভারতের সঙ্গে অংশীদারত্বে আগ্রহী।
তবে ইরানের যুদ্ধ আবার ব্রিকস সদস্যদের মধ্যে বিভাজন তৈরি করেছে। ইরান পশ্চিম এশিয়ায় মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে হামলা চালাচ্ছে। অন্যদিকে সংযুক্ত আরব আমিরাতে রয়েছে একাধিক মার্কিন সামরিক ঘাঁটি ও সেনাসদস্য। এখানেই ভারতের চীনের শক্তির প্রয়োজন। দুই পক্ষকে সহযোগিতার দিকে এগিয়ে নিতে এবং ব্রিকসের একটি আরও ঐক্যবদ্ধ অবস্থান তুলে ধরতে চীনের প্রভাব কাজে লাগাতে হবে দিল্লিকে। তারা এসব বিষয়ে ঐকমত্যে পৌঁছাতে পারে কি না এবং এখন পর্যন্ত অর্জিত অগ্রগতিকে আরও এগিয়ে নিতে পারে কি না তার ওপর শুধু ভারত-চীন সম্পর্ক নয়, ব্রিকস জোট হিসেবে কতটা কার্যকর থাকবে, সেটিও নির্ভর করবে।
