যশোর দাপিয়ে বেড়াচ্ছে ৫৫ কিশোর গ্যাং

যশোর দাপিয়ে বেড়াচ্ছে ৫৫ কিশোর গ্যাং

ফন্ট সাইজ:

যশোরে সাম্প্রতিক সময়ে কিশোর গ্যাং এবং সীমান্তকেন্দ্রিক মাদক সিন্ডিকেটের তৎপরতায় জনজীবনে চরম উদ্বেগজনক অবস্থা সৃষ্টি করেছে। স্থানীয় পুলিশ ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে বারবার আগ্নেয়াস্ত্র ও বিপুল পরিমাণ মাদকসহ এই চক্রের সদস্যরা গ্রেপ্তার হলেও নেটওয়ার্কগুলো পুরোপুরি নির্মূল করা চ্যালেঞ্জিং হয়ে দাঁড়াচ্ছে। শহর ও শহরতলীর বিভিন্ন পয়েন্ট ও পাড়া-মহল্লায় সক্রিয় কিশোর অপরাধী চক্রের সদস্যরা স্থানীয় মাদক সিন্ডিকেট ও সন্ত্রাসী গ্রুপগুলোর জন্য ‘ক্যারিয়ার’ ও ভাড়াটে হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। সীমান্ত এলাকা কাছাকাছি হওয়ায় ভারত থেকে আসা পিস্তল, রিভলবার, ওয়ান শুটারগান এবং স্থানীয়ভাবে তৈরি নানা রকমের দেশীয় অস্ত্রের সরবরাহ নিশ্চিত করে এসব গ্যাং এলাকাভিত্তিক মহড়া ও খুনখারাবি এবং চাঁদাবাজি করছে। ফেনসিডিল, ইয়াবা, গাঁজাসহ বিভিন্ন ধরনের মাদকের বড় বড় চালান হস্তান্তরে কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যদের ব্যবহার করা হচ্ছে।

সম্প্রতি খুলনা রেঞ্জের ডিআইজি যশোরে কিশোর গ্যাং ও মাদক কারবারিদের বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি ঘোষণা করে গডফাদারদের আয়ের উৎস অনুসন্ধানসহ বিশেষ অভিযানের নির্দেশ দিয়েছেন। তারই আলোকে যশোরের পুলিশ সুপার সৈয়দ রফিকুল ইসলামের নেতৃত্বে যশোর পুলিশ বিশেষ অভিযান পরিচালনা করছে। বিশেষ করে অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার এবং মাদকদ্রব্যের ব্যবহারে জিরো টলারেন্স নীতি নিয়ে পুলিশকে কাজ করার নির্দেশ দিয়েছেন পুলিশ সুপারসহ জেলার আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রতিটি সদস্য। একইসঙ্গে পুলিশ বাহিনীর কোনো সদস্যের বিরুদ্ধে এই অবৈধ অস্ত্র বা মাদক কারবার বা সেবনের সঙ্গে সম্পৃক্ততার কোনো অভিযোগ পেলে আইন কাঠামোর মধ্যে সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করা হবে বলে জেলার পুলিশের মাসিক কল্যাণ সভায় কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেন পুলিশ সুপার সৈয়দ রফিকুল ইসলাম।

যশোর কোতোয়ালি থানার তথ্যানুযায়ী, গত ৬ মাসে শতাধিক কিশোরকে আটক করা হয়েছে। সর্বশেষ গত ৩০শে আগস্ট রাতে যশোর শহর ও শহরতলীতে মোবাইল টিমের অভিযানে ১১ জন অপরাধী কিশোরকে আটক করা হয়েছে তাদের কাছ থেকে উদ্ধার করা হয়েছে বিভিন্ন প্রকারের মাদক ও একাধিক দেশীয় তৈরি অস্ত্র।
র‌্যাব ও পুলিশ জানায়, বিভিন্ন অপরাধে জড়িত কিশোররা দেশি অস্ত্র নিয়ে মহড়া দিয়ে এলাকায় আতঙ্ক সৃষ্টি করছে। চাঁদাবাজি, মাদক ব্যবসা এমনকি অপহরণ, বোমাবাজি ও হত্যাকাণ্ডের মতো গুরুতর অপরাধেও জড়িয়ে পড়ছে তারা। বিভিন্ন সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যরা চাকু, ছুরি, রামদার মতো দেশি অস্ত্র ছাড়াও বোমা ও পিস্তল, রিভলবার, ওয়ান শুটার গান ইত্যাদি আগ্নেয়াস্ত্রও ব্যবহার করছে।

কোতোয়ালি থানা সূত্রে জানা যায়, যশোর শহরের শংকরপুর, বকচর, খোলাডাঙ্গা, চাঁচড়া, রেলগেট, তুলোতলা, রায়পাড়া, ভাতুড়িয়া, শংকরপুর বাস টার্মিনাল, রেল রোড, মুজিব সড়ক, মণিহার, উপশহর, পালবাড়ি, ধর্মতলা, খড়কি, রেলস্টেশন, বিরামপুর, নীলগঞ্জ, সিটি কলেজপাড়া, বারান্দিপাড়া, খড়কি কলাবাগান, ধর্মতলা, পুলেরহাট, বিরামপুর, হামিদপুর, তেঁতুলতলা ও শেখহাটিতে গ্রুপ ভিত্তিক কিশোর অপরাধী বেশি।

পুলিশ বলছে, যশোরে গত ৩০ মাসে ২৭টি হত্যাকাণ্ডসহ প্রায় শতাধিক অপরাধে কিশোর গ্যাংয়ের সক্রিয় সদস্যরা জড়িত ছিল। গত ২ বছর ও চলতি বছরের জুলাই মাস পর্যন্ত সময়ে যশোরের সুজলপুরের ইরিয়ান, শংকরপুরের আফজাল হোসেন, কলেজছাত্র সুলতানপুরের আব্দুল্লাহ, শংকরপুরের টুনি শাওন, উপশহরের এহসানুল হক ইমু, শংকরপুরে বিএনপি নেতা বদিউজ্জামান ধনি, খালধার রোডের পণ্ডিত পুকুরপাড়ের হাবিবুর রহমান হবির ছেলে অনুরাগ ইসলাম অপু, শংকরপুরে আশ্রম রোডের ধনাঢ্য রোশনি বেগম, শংকরপুরের বিএনপি নেতা আলমগীর হোসেন হত্যাকাণ্ড এবং চাঁচড়া বর্মণপাড়া শ্মশান ঘেঁষা খালে ফেলে রনি হত্যাকাণ্ডের মতো চাঞ্চল্যকর এসব ঘটনার সঙ্গে কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যদের জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে। বেজপাড়া সাদেক দারোগার মোড়ে স্বেচ্ছাসেবক লীগ নেতা আসাদ, খড়কি ধোপাপাড়ার ইরফান ফরাজী, বারান্দিপাড়ার কিশোর নাহিদ ও ঘুরুলিয়ার ইউনুছ হত্যাকাণ্ডেও কিশোরদের সংশ্লিষ্টতার তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। এমনকি যশোরে শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রের ভেতরেই ৩ বন্দি কিশোরকে হত্যা করা হয়। এ হত্যাকাণ্ডে জড়িতরাও ছিল শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রের বন্দিরা। কারণ সেখানেও বন্দি ৮ কিশোরের একটি গ্রুপ গড়ে ওঠে।

এ ব্যাপারে যশোরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মিরাজুল ইসলাম জানান, এলাকায় কার ক্ষমতা কতো বেশি, কে কার সিনিয়র, কে জুনিয়র এ নিয়ে কিশোরদের মধ্যে হরহামেশাই হচ্ছে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া। এমনকি হাতাহাতি ও খুনের ঘটনাও ঘটছে। কিশোরদের অপরাধে জড়িয়ে পড়ার পেছনে দারিদ্র্যতা, সামাজিক ও পারিবারিক সমস্যা, বিভিন্ন উন্নত প্রযুক্তি পণ্যের অপব্যবহার, বিদেশি সংস্কৃতির প্রতি আকৃষ্টতা ও তার অনুকরণ, অবাধ মাদক দ্রব্যের বিকিকিনি দায়ী। তার মতে, নিম্নবিত্ত পরিবারগুলোতে কিশোর অপরাধে জড়িত হওয়াদের সংখ্যা বেশি।