‘আমার ছেলে এনামুল যদি দোষী হয়ে থাকে, আমরা তার বিচার চেয়েছিলাম। কিন্তু সাড়ে ১৩ বছরেও তার অপরাধের কোনো প্রমাণ পাওয়া গেল না। শুধু সন্দেহের কারণে আমার ছেলে ও আমাদের পরিবারটাকে শেষ করে দেয়া হয়েছে। এখন তাকে মুক্তি দেয়া হোক। সাগর-রুনি হত্যার অপবাদ থেকে মুক্তি দেয়া হোক। আমাদের পরিবারকে একটু শান্তি দেয়া হোক।’ কান্নাজড়িত কণ্ঠে ছেলের মুক্তির দাবি জানিয়েছেন সাগর-রুনি হত্যা মামলায় সাড়ে ১৩ বছর ধরে কারাগারে থাকা প্রহরী এনামুল আহমেদ ওরফে হুমায়ুন কবীরের মা ফাতেমা বেগম।
সাগর-রুনি হত্যা মামলায় সন্দেহভাজন হিসেবে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল এনামুল আহমেদকে। দীর্ঘদিন কারাবন্দি থাকার কারণে বর্তমানে তিনি মানসিক ভারসাম্যহীনতায় ভুগছেন বলে পিবিআইয়ের ঢাকা মেট্রো উত্তর বিভাগের সাম্প্রতিক তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সাগর-রুনি হত্যাকাণ্ডে এনামুল আহমেদের সম্পৃক্ততার কোনো সাক্ষ্য-প্রমাণ এখন পর্যন্ত পাওয়া যায়নি। এনামুল হক ওরফে হুমায়ুন কবীর মৌলভীবাজার জেলার বড়লেখা উপজেলার দক্ষিণভাগ দক্ষিণ ইউনিয়নের পূর্ব-দক্ষিণভাগ গ্রামের মৃত মকবুল আলী ওরফে কালা মিয়ার ছেলে। এনামুল সাগর-রুনি হত্যাকাণ্ডের সময় রাজধানীর পশ্চিম রাজাবাজারের ৫৮/এ/২ নম্বর ভবনে নিরাপত্তাপ্রহরী হিসেবে কাজ করতেন। ২০১২ সালের ১১ই ফেব্রুয়ারি রাতে ওই বাসা থেকে সাংবাদিক সাগর সরওয়ার ও মেহেরুন রুনির মরদেহ উদ্ধার করা হয়। হত্যাকাণ্ডের পর সন্দেহভাজন হিসেবে এনামুলকে গ্রেপ্তার করে র্যাব। ফাতেমা বেগম বলেন, ‘আমরা টিভিতে খবর দেখে জানতে পেরেছি, পিবিআইয়ের তদন্ত প্রতিবেদনে এনামুলের বিরুদ্ধে অপরাধের প্রমাণ না পাওয়ার কথা উল্লেখ করেছে। এখন তাকে মুক্তি দেয়া হোক।
আমার ছেলের জীবন নষ্ট করার ক্ষতিপূরণ দেয়া হোক।’ অতীতের সেই সময়ের কথা বলতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন ফাতেমা বেগম। তিনি জানান, এনামুলকে গ্রেপ্তারের আগে তার স্বামী কালা মিয়াকেও র্যাব পরিচয়ে তুলে নেয়া হয়। আনুমানিক ২০১২ সালের ২৭শে সেপ্টেম্বর দোকানে যাওয়ার পথে তিনি নিখোঁজ হন। ফাতেমার দাবি, কালা মিয়াকে চোখ বেঁধে অজ্ঞাত স্থানে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। স্বামীর খোঁজে তারা থানা-পুলিশসহ বিভিন্ন জায়গায় যোগাযোগ করেন। নিজেদের সামর্থ্য অনুযায়ী অর্থও ব্যয় করেন। পরে একদিন কালা মিয়ার মুঠোফোন থেকে পরিবারের কাছে ফোন আসে। সেখানে তিনি এনামুলের বিষয়ে জানতে চেয়েছিলেন। বিভিন্ন গণমাধ্যমে তার নিখোঁজ হওয়ার খবর প্রকাশিত হওয়ার প্রায় ২১ দিন পর তাকে ভৈরবের কাছে ফেলে রেখে যাওয়া হয়। ফাতেমার ভাষ্য, বাড়িতে ফিরে কালা মিয়া জানিয়েছিলেন, সেখানে তাকে নির্যাতন ও বৈদ্যুতিক শক দেয়া হয়েছে। এ বিষয়ে কারও সঙ্গে কথা বললে তাকে আবারো তুলে নেয়ার হুমকি দেয়া হয়েছিল বলেও পরিবারের কাছে জানিয়েছিলেন তিনি। ফাতেমা বলেন, ওই ঘটনার পর তার স্বামী আর স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারেননি।
শারীরিক ও মানসিক নানা সমস্যায় তাকে চিকিৎসা নিতে হয়েছে। চিকিৎসার পেছনে পরিবারের বিপুল অর্থ ব্যয় হয়। প্রায় ছয়-সাত মাস আগে কালা মিয়া মারা যান। এনামুলের বড় ভাই শাহিন আহমদ বলেন, ভাই গ্রেপ্তারের পর তাদের পরিবার আর্থিক সংকটে পড়ে। একইসঙ্গে নিরাপত্তা নিয়ে আশঙ্কা থাকায় তারা নিয়মিতভাবে মামলা পরিচালনা করতে পারেননি। বিপদে পড়ার আশঙ্কায় মামলা চালানোর ক্ষেত্রেও তারা অনেকটা পিছিয়ে ছিলেন। দীর্ঘদিন কারাগারে থাকার কারণে এনামুলের মানসিক অবস্থার অবনতি হয়েছে। তার বিরুদ্ধে কোনো প্রমাণ না থাকলে তাকে মুক্তি দেয়ার দাবি জানান তিনি। পিবিআইয়ের প্রতিবেদনে বলা হয়, আদালতের আদেশের পর গত ২২শে এপ্রিল কাশিমপুর কেন্দ্রীয় কারাগারে এনামুল আহমেদকে পুনরায় জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়।
এ সময় তিনি কোনো প্রশ্নের সুনির্দিষ্ট উত্তর দিতে পারেননি। অনেক বিষয় মনে করতে পারছিলেন না এবং এলোমেলো উত্তর দিচ্ছিলেন। এসব কারণে তদন্ত কর্মকর্তার কাছে তাকে মানসিকভাবে ভারসাম্যহীন বলে মনে হয়েছে। কারা কর্তৃপক্ষের বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দীর্ঘদিন বন্দি থাকার কারণে এনামুল বর্তমানে মানসিক ভারসাম্যহীনতায় ভুগছেন। তাকে সাধারণ বন্দিদের থেকে আলাদা একটি ওয়ার্ডে রেখে প্রাথমিক চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে। তার দ্রুত সুচিকিৎসা প্রয়োজন বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
