কক্সবাজারের উখিয়া-টেকনাফ সীমান্তে ফের বেড়েছে ইয়াবা পাচার। সীমান্তে বিজিবি, কোস্ট গার্ডসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতা বাড়লেও থামছে না মাদকের বড় বড় চালান। প্রায় প্রতিদিনই কোথাও না কোথাও ইয়াবা উদ্ধারের খবর আসছে। কখনো লাখ লাখ পিস ইয়াবাসহ বাহক ধরা পড়ছে, আবার কখনো চালান পড়ে থাকছে মালিকবিহীন। তবে এসব চালানের নেপথ্যে থাকা মূলহোতাদের অধিকাংশই থেকে যাচ্ছে ধরাছোঁয়ার বাইরে। ফলে একজন বাহক আটক হওয়ার পর তার জায়গায় আরেকজন যুক্ত হচ্ছে, কিন্তু বন্ধ হচ্ছে না ইয়াবার বাণিজ্য। অনুসন্ধানে জানা গেছে, মিয়ানমার থেকে সীমান্ত পেরিয়ে আসা ইয়াবার একটি অংশ উখিয়া-টেকনাফের রোহিঙ্গা ক্যাম্প ও ক্যাম্পসংলগ্ন এলাকায় মজুত করা হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
পরে সংঘবদ্ধ নেটওয়ার্কের মাধ্যমে এসব ইয়াবা দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পাঠানো হয়। সীমান্ত থেকে ক্যাম্প, ক্যাম্প থেকে স্থানীয় পরিবহন ব্যবস্থা এবং সেখান থেকে দেশের বিভিন্ন জেলায়, একাধিক ধাপে পরিচালিত হচ্ছে এই নেটওয়ার্ক। এতে রোহিঙ্গা ও স্থানীয় কিছু মাদক কারবারি যুক্ত থাকলেও আড়ালে থেকে পুরো কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করছে প্রভাবশালী গডফাদাররা, এমন অভিযোগ স্থানীয়দের। সাম্প্রতিক কয়েকটি অভিযানে ইয়াবা পাচারের ভয়াবহ চিত্রও সামনে এসেছে। ৬ই সেপ্টেম্বর উখিয়ার মরিচ্যা চেকপোস্টে ৫৪ হাজার পিস ইয়াবাসহ এপিবিএনে কর্মরত এক কনস্টেবল আটক হন। পরদিন কক্সবাজার শহরের হাজীপাড়ায় অভিযান চালিয়ে ৯০ হাজার পিস ইয়াবা ও নগদ টাকা উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় তিনজনকে আটক করা হয়। এর পরদিন ৯ই সেপ্টেম্বর টেকনাফের হ্নীলা সীমান্ত এলাকায় ১৪ লাখ পিস ইয়াবাসহ দুই কারবারিকে আটক করে বিজিবি। এর আগে হোয়াইক্যং সীমান্ত এলাকায় পৃথক অভিযানে ৩ লাখ পিস ইয়াবা উদ্ধার করা হয়। শুধু সাম্প্রতিক এসব চালান নয়, চলতি বছর উখিয়া-টেকনাফ সীমান্তে বিপুল পরিমাণ ইয়াবা উদ্ধার করেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। ৬৪ বিজিবি’র তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ১লা জানুয়ারি থেকে ৯ই সেপ্টেম্বর পর্যন্ত তাদের আওতাধীন বিভিন্ন সীমান্ত এলাকায় অভিযান চালিয়ে ১ কোটি ৪৩ লাখ পিস ইয়াবা উদ্ধার করা হয়েছে। এসব ঘটনায় আটক করা হয়েছে ২৪৩ জনকে। একদিকে বিপুল পরিমাণ ইয়াবা উদ্ধার ও শত শত মানুষের আটকের তথ্য, অন্যদিকে সীমান্ত দিয়ে ইয়াবা প্রবেশ অব্যাহত থাকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে, তাহলে এই বিশাল মাদক বাণিজ্যের মূল নিয়ন্ত্রক কারা। স্থানীয়দের অভিযোগ, ইয়াবা ব্যবসায় এখন সরাসরি মাঠে না থেকে নিজেদের আড়ালে রাখছে বড় কারবারিরা। সীমান্ত থেকে চালান গ্রহণ, পরিবহন ও সরবরাহের জন্য ব্যবহার করা হচ্ছে ভাড়াটে বাহক ও ছোট কারবারিদের। ফলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে ধরা পড়ছে চুনোপুটিরা। এ ছাড়া উখিয়া-টেকনাফের রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোকে ঘিরেও মাদক কারবারের বিস্তৃত নেটওয়ার্ক গড়ে উঠার অভিযোগ রয়েছে। ক্যাম্পের ভেতরে থাকা কিছু চক্রের সঙ্গে সীমান্তের স্থানীয় মাদক কারবারিদের যোগসাজশে ইয়াবা মজুত ও সরবরাহ করা হয় বলে স্থানীয় সূত্রগুলো জানিয়েছে। সচেতন মহলের দাবি, ইয়াবা উদ্ধারের পাশাপাশি এর অর্থের উৎস খুঁজে বের করতে হবে। কয়েক বছরের ব্যবধানে সীমান্ত এলাকার কিছু ব্যক্তির অস্বাভাবিক সম্পদ বৃদ্ধির অভিযোগ রয়েছে। সাধারণ অবস্থা থেকে হঠাৎ করে গাড়ি-বাড়ি, জমি ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের মালিক হওয়া ব্যক্তিদের সম্পদের উৎস অনুসন্ধানের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা। ৬৪ বিজিবি’র অধিনায়ক লে. কর্নেল জহিরুল ইসলাম বলেন, বিজিবি’র মাদকবিরোধী অভিযান অব্যাহত রয়েছে। প্রযুক্তিগত সক্ষমতা ও জনবল বৃদ্ধির মাধ্যমে সীমান্ত এলাকায় নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও বিজিবি সর্বোচ্চ পেশাদারিত্বের সঙ্গে কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। চোরাচালান শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনার চেষ্টা চলছে। মাদক চোরাচালানের সঙ্গে সম্পৃক্ত সবাইকে আইনের আওতায় আনা হবে।
