সরকারি কর্মচারীদের নতুন পে-স্কেল ১ জুলাই ২০২৬ থেকে কার্যকর হয়েছে। দীর্ঘদিনের অপেক্ষার পর নতুন বেতন কাঠামো সরকারি কর্মচারীদের জন্য স্বস্তির খবর। বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের কর্মচারীদের জন্য বেতন বৃদ্ধির হার উল্লেখযোগ্য। নতুন কাঠামোয় ২০টি গ্রেড বহাল রেখে সর্বনিম্ন মূল বেতন ৮,২৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২০,০০০ টাকা করা হয়েছে—প্রায় ১৪২ শতাংশ বৃদ্ধি। সর্বোচ্চ মূল বেতন ৭৮,০০০ টাকা থেকে বেড়ে হয়েছে ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা—১০০ শতাংশ বৃদ্ধি।
কিন্তু একটি বড় প্রশ্ন থেকেই যায়, এই বেতন বৃদ্ধি শুধু সরকারি কর্মচারীদের আয় বাড়াবে, নাকি সামগ্রিক অর্থনীতিতেও বড় ধরনের পরিবর্তন আনবে? উত্তরটি সরল নয়। কারণ পে-স্কেল একদিকে সরকারি কর্মচারীদের ক্রয়ক্ষমতা বাড়াবে, অন্যদিকে সরকারের নিয়মিত ব্যয় বাড়াবে। সেই ব্যয় কীভাবে অর্থায়ন করা হবে, তার ওপর নির্ভর করবে মূল্যস্ফীতি, সরকারি ঋণ, বেসরকারি বিনিয়োগ, ব্যাংকিং খাতের ঋণপ্রবাহ এবং শেষ পর্যন্ত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ওপর এর প্রভাব।
নতুন পে-স্কেলের অতিরিক্ত বার্ষিক ব্যয় প্রায় ১ লাখ ৬ হাজার কোটি টাকা হতে পারে। বাংলাদেশের মতো সীমিত রাজস্ব সক্ষমতার অর্থনীতিতে এটি ছোট কোনো অঙ্ক নয়। বরং এই অতিরিক্ত ব্যয় এমন এক সময়ে যুক্ত হচ্ছে, যখন সরকারের রাজস্ব আহরণ লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় পিছিয়ে আছে এবং ঋণনির্ভরতা বাড়ছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে সরকারের প্রকৃত রাজস্ব আদায় হয়েছে প্রায় ৪ লাখ ১০ হাজার ৩৯০ কোটি টাকা, যেখানে সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রা ছিল প্রায় ৫ লাখ ৩ হাজার কোটি টাকা। অর্থাৎ ঘাটতি প্রায় ৯২ হাজার ৬১০ কোটি টাকা। আয়কর, ভ্যাট ও শুল্ক—রাজস্বের প্রধান তিন উৎসই লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে পারেনি। ফলে সরকারের সামনে এখন দ্বৈত চ্যালেঞ্জ—একদিকে নতুন পে-স্কেলের বাড়তি ব্যয়, অন্যদিকে দুর্বল রাজস্ব প্রবাহ।
এই পরিস্থিতিতে সরকার যদি বাড়তি ব্যয় মেটাতে ব্যাংকঋণের ওপর অতিরিক্ত নির্ভর করে, তাহলে অর্থনীতিতে বড় ধরনের ‘crowding-out’ ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জুলাই-মার্চ সময়ে সরকারের নিট ব্যাংকঋণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ১ লাখ ২৬ হাজার ১০২ কোটি টাকা, যেখানে পুরো অর্থবছরের বাজেট লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা। আগের বছরের একই সময়ে সরকারের নিট ব্যাংকঋণ ছিল মাত্র ২৭ হাজার ৪০৩ কোটি টাকা।
সরকারি ঋণের এই দ্রুত বৃদ্ধি ব্যাংকিং খাতের ঋণপ্রবাহের চিত্রেও প্রতিফলিত হয়েছে। মে ২০২৬-এ সরকারি খাতে ব্যাংকঋণের প্রবৃদ্ধি ছিল ২০ দশমিক ৭৮ শতাংশ, যেখানে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবৃদ্ধি মাত্র ৪ দশমিক ৯৮ শতাংশ। ২০২৫ সালের জুলাই থেকে ২০২৬ সালের মে পর্যন্ত সরকারি খাতে ব্যাংকঋণ বেড়েছে প্রায় ৯২ হাজার ৮৮০ কোটি টাকা, আর বেসরকারি খাতে বেড়েছে প্রায় ৭৭ হাজার ৭৩৩ কোটি টাকা।
এখানে অর্থনীতির জন্য উদ্বেগের জায়গাটি স্পষ্ট। সরকার যদি ব্যাংক থেকে বেশি ঋণ নেয়, ব্যাংকগুলো তুলনামূলক নিরাপদ সরকারি সিকিউরিটিজে বেশি অর্থ বিনিয়োগ করতে পারে। ফলে শিল্প, ব্যবসা ও উদ্যোক্তাদের জন্য ঋণের প্রাপ্যতা কমে যেতে পারে। বাংলাদেশ ব্যাংকও বেসরকারি ঋণপ্রবাহ দুর্বল হওয়ার পেছনে ব্যাংকগুলোর সরকারি সিকিউরিটিজে বিনিয়োগ বৃদ্ধিকে একটি কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে।
এর অর্থ হলো, পে-স্কেলের অর্থায়ন যদি ভুলভাবে করা হয়, তাহলে সরকারি কর্মচারীদের বেতন বাড়লেও দেশের উদ্যোক্তা, শিল্পপতি ও ব্যবসায়ীরা বিনিয়োগের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ পেতে সমস্যায় পড়তে পারেন। নতুন কারখানা স্থাপন, প্রযুক্তি আমদানি, উৎপাদন সম্প্রসারণ ও কর্মসংস্থান সৃষ্টি বাধাগ্রস্ত হতে পারে। দীর্ঘমেয়াদে এর প্রভাব প্রবৃদ্ধির ওপর পড়বে।
তবে পে-স্কেলের গল্পের অন্য দিকও রয়েছে। সরকারি কর্মচারীদের আয় বাড়লে তাদের ভোগক্ষমতা বাড়বে। খাদ্য, পোশাক, বাসস্থান, পরিবহন, শিক্ষা, চিকিৎসা, বিনোদন ও বিভিন্ন সেবায় অতিরিক্ত চাহিদা তৈরি হবে। ব্যবসার বিক্রি বাড়তে পারে, উৎপাদন বাড়তে পারে এবং নতুন কর্মসংস্থানও সৃষ্টি হতে পারে। অর্থাৎ সরকারি বেতন বৃদ্ধি অর্থনীতিতে একটি demand stimulus বা চাহিদা-উদ্দীপক হিসেবে কাজ করতে পারে।
সমস্যা হলো, বাড়তি চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ কতটা বাড়ছে। উৎপাদন একই হারে না বাড়লে অতিরিক্ত অর্থের একটি অংশ পণ্যের দাম বাড়িয়ে দিতে পারে। ফলে বেতন নামমাত্র হিসাবে যতটা বাড়বে, প্রকৃত আয় ততটা নাও বাড়তে পারে। বাংলাদেশে এই ঝুঁকি এখনও গুরুত্বপূর্ণ। জুলাইয়ে খাদ্য মূল্যস্ফীতি ছিল ৭ দশমিক ১৬ শতাংশ এবং খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি ৯ দশমিক ২৮ শতাংশ। একই সময়ে জাতীয় মজুরি বৃদ্ধির হার ছিল ৮ দশমিক ২২ শতাংশ। অর্থাৎ মজুরি বৃদ্ধি ও মূল্যস্ফীতির ব্যবধান খুবই কম। তাই নতুন বেতন কাঠামোয় বড় ধরনের বেতন বৃদ্ধি যদি উৎপাদন বৃদ্ধির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ না হয়, তাহলে বেতন বৃদ্ধির একটি অংশ মূল্যস্ফীতির কারণে প্রকৃত আয় বৃদ্ধিতে রূপ নাও নিতে পারে।
তাই পে-স্কেল বাস্তবায়নের সঙ্গে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণকে একই নীতির অংশ হিসেবে দেখতে হবে। খাদ্য সরবরাহ বাড়ানো, কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি, আমদানি ব্যবস্থাপনা, জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা, পরিবহন ব্যয় কমানো এবং বাজারে প্রতিযোগিতা বাড়ানোর মতো পদক্ষেপ ছাড়া শুধু মুদ্রানীতি দিয়ে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন।
আরেকটি বড় প্রশ্ন হলো সরকারি ঋণের চাপ। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি নাগাদ বাংলাদেশের সরকারি বৈদেশিক ঋণ প্রায় ৭৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে পৌঁছেছে। ২০২৫–২৬ অর্থবছরে বৈদেশিক ঋণের মূলধন ও সুদ পরিশোধে প্রায় সাড়ে ৪ বিলিয়ন ডলার ব্যয় হয়েছে; এর মধ্যে মূলধন প্রায় ৩ বিলিয়ন এবং সুদ দেড় বিলিয়ন ডলার। দেশীয় ঋণের সুদ ব্যয়ও দ্রুত বাড়ছে। ২০২৬–২৭ অর্থবছরের বাজেটে ঋণের সুদ পরিশোধের জন্য প্রায় ১ লাখ ২৭ হাজার ৫০০ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে, যা মোট বাজেটের প্রায় ১৩ দশমিক ৫৯ শতাংশ। এর মধ্যে দেশীয় ঋণের সুদ ১ লাখ ৫ হাজার কোটি এবং বৈদেশিক ঋণের সুদ ২২ হাজার ৫০০ কোটি টাকা।
এই বাস্তবতায় নতুন পে-স্কেলের অর্থায়ন যদি অতিরিক্ত ঋণনির্ভর হয়, তাহলে ভবিষ্যৎ বাজেটের ওপর চাপ আরও বাড়বে। আজকের বেতন বৃদ্ধির জন্য নেওয়া ঋণের সুদ ভবিষ্যৎ সরকার ও প্রজন্মকে পরিশোধ করতে হবে। তাই বর্তমান প্রজন্মের আয় বৃদ্ধির পাশাপাশি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের আর্থিক দায়ের বিষয়টিও বিবেচনায় রাখা জরুরি। তবে পে-স্কেলের একটি গুরুত্বপূর্ণ ইতিবাচক দিক হলো শ্রমবাজারে এর প্রভাব। সরকারি কর্মচারীদের বেতন ও সুযোগ-সুবিধা বাড়লে দক্ষ জনবলকে সরকারি খাতে ধরে রাখা সহজ হবে এবং দীর্ঘমেয়াদে প্রশাসনিক দক্ষতা বাড়তে পারে।
তবে এর ফলে বেসরকারি খাতেও চাপ তৈরি হতে পারে। সরকারি চাকরির বেতন, নিরাপত্তা, পেনশন ও সামাজিক মর্যাদা বাড়লে দক্ষ তরুণদের একটি অংশ উদ্যোক্তা হওয়ার পরিবর্তে সরকারি চাকরির দিকে ঝুঁকতে পারে। একই সঙ্গে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো দক্ষ কর্মী ধরে রাখতে বেতন বাড়াতে বাধ্য হতে পারে, যা ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগের জন্য তুলনামূলক কঠিন। তবে বেতন বৃদ্ধির সঙ্গে উৎপাদনশীলতা বাড়লে উচ্চতর মজুরি অর্থনীতির জন্য ইতিবাচক শক্তিতে পরিণত হতে পারে।এ কারণে নতুন পে-স্কেলের মূল সংস্কার হওয়া উচিত ‘বেতন ও উৎপাদনশীলতার মধ্যে সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করা’। বেতন বাড়ার সঙ্গে সরকারি সেবার মান, দ্রুততা, ডিজিটাল প্রশাসন, জবাবদিহি, দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ এবং কর্মদক্ষতারও উন্নতি নিশ্চিত করতে হবে। অর্থাৎ বেতন বৃদ্ধি শুধু প্রশাসনিক ব্যয় নয়, মানবসম্পদে বিনিয়োগে পরিণত হওয়া প্রয়োজন।
আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা থেকেও শিক্ষা নেওয়া যায়। ভারত নিয়মিত পে কমিশনের মাধ্যমে বেতন কাঠামো পর্যালোচনা করে; সিঙ্গাপুর শ্রমবাজারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সরকারি বেতন সমন্বয় করে; মালয়েশিয়ায় ধাপে ধাপে বেতন বৃদ্ধি করা হয়েছে। এসব দেশের অভিজ্ঞতা দেখায়, নিয়মিত ও বাস্তবভিত্তিক সমন্বয় এককালীন বড় বেতন বৃদ্ধির চেয়ে বেশি টেকসই হতে পারে।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও দীর্ঘ ১০–১১ বছর অপেক্ষা করে একবারে বড় পে-স্কেল দেওয়ার পরিবর্তে প্রতি এক বা দুই বছর অন্তর সীমিত সমন্বয় এবং নির্দিষ্ট সময় পরপর পূর্ণাঙ্গ কাঠামোগত পর্যালোচনার ব্যবস্থা করা যেতে পারে। এতে সরকারের ওপর হঠাৎ বড় আর্থিক চাপ কমবে। ভবিষ্যতের বেতন সমন্বয়ে মূল্যস্ফীতি, জাতীয় মজুরি বৃদ্ধি, মাথাপিছু আয়, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, জীবনযাত্রার ব্যয়, বেসরকারি খাতের মজুরি এবং সরকারের রাজস্ব সক্ষমতা বিবেচনা করা যেতে পারে। নিম্ন আয়ের কর্মচারীদের তুলনামূলক বেশি সুরক্ষা এবং উচ্চ গ্রেডে সংযত সমন্বয় করা হলে বেতন কাঠামোর ন্যায্যতা ও আয়বৈষম্য কমাতেও ইতিবাচক ভূমিকা রাখা সম্ভব।
তবে পে-স্কেলের সঙ্গে রাজস্ব সংস্কারকে অবশ্যই যুক্ত করতে হবে। বাংলাদেশের কর-জিডিপি অনুপাত এখনও খুবই কম। করজাল সম্প্রসারণ, কর ফাঁকি রোধ, ডিজিটাল কর প্রশাসন, কর অব্যাহতি পুনর্মূল্যায়ন এবং প্রকৃত আয় ও সম্পদের ওপর কার্যকর কর আহরণ ছাড়া দীর্ঘমেয়াদে বড় সরকারি বেতন কাঠামো টেকসই করা কঠিন।একই সঙ্গে সরকারি ব্যয়ের দক্ষতাও বাড়াতে হবে। কম অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত প্রকল্প, অপচয় ও অপ্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ব্যয় কমিয়ে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সামাজিক সুরক্ষা, অবকাঠামো ও উৎপাদনশীল বিনিয়োগে অর্থ বরাদ্দ বাড়াতে হবে। পে-স্কেলের অর্থায়নের কারণে উন্নয়ন ব্যয় সংকুচিত হলে দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতির উৎপাদনক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো বেসরকারি বিনিয়োগকে সুরক্ষা দেওয়া। বাংলাদেশের কর্মসংস্থান ও উৎপাদনের বড় অংশ বেসরকারি খাতের ওপর নির্ভরশীল। তাই সরকারের অতিরিক্ত ঋণ যেন বেসরকারি ঋণপ্রবাহকে সংকুচিত না করে, তা নিশ্চিত করতে হবে। শিল্প, SME, রপ্তানি খাত ও উদ্যোক্তাদের জন্য পর্যাপ্ত অর্থায়ন, জ্বালানি, কাঁচামাল ও অবকাঠামো নিশ্চিত করা না গেলে পে-স্কেলের বাড়তি ভোগচাহিদার সুফলও সীমিত হয়ে যাবে।
অর্থনীতির একটি মৌলিক সত্য হলো—চাহিদা বাড়লে সরবরাহও বাড়াতে হয়। সরকারি কর্মচারীদের হাতে বাড়তি অর্থ দেওয়া হলো চাহিদা বৃদ্ধির একটি উৎস। এখন সেই চাহিদা পূরণের জন্য দেশীয় উৎপাদন, শিল্প ও সেবা খাতকে সক্ষম করে তুলতে হবে। তা না হলে বাড়তি অর্থের বড় অংশ মূল্যস্ফীতি অথবা আমদানির পেছনে চলে যেতে পারে।সুতরাং নতুন পে-স্কেলকে শুধু সরকারি কর্মচারীদের বেতন বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখা ঠিক হবে না। এটি আসলে বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য একটি বড় ‘policy package’-এর সূচনা হতে পারে—যার সঙ্গে রাজস্ব সংস্কার, ঋণ ব্যবস্থাপনা, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, বেসরকারি বিনিয়োগ, উৎপাদনশীলতা, শ্রমবাজার এবং প্রশাসনিক সংস্কারকে একসঙ্গে যুক্ত করতে হবে।
সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হবে অর্থায়নের ক্ষেত্রে। অতিরিক্ত ব্যয়কে স্থায়ী রাজস্ব বৃদ্ধির মাধ্যমে যতটা সম্ভব সামলাতে হবে। ঋণ নিতে হলে তা হতে হবে সতর্ক ও টেকসই। একই সঙ্গে ব্যাংকিং খাতের অর্থ যেন অতিরিক্ত সরকারি ঋণে আটকে না যায়, তা নিশ্চিত করতে হবে। কারণ রাষ্ট্রের আর্থিক স্থিতিশীলতার মতোই গুরুত্বপূর্ণ হলো বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ সক্ষমতা।
শেষ পর্যন্ত একটি পে-স্কেলের প্রকৃত সাফল্য নির্ধারিত হবে সরকারি কর্মচারীর বেতন কত শতাংশ বেড়েছে দিয়ে নয়; বরং সেই বেতন বৃদ্ধির ফলে তার প্রকৃত জীবনমান কতটা উন্নত হয়েছে, রাষ্ট্রীয় সেবার মান কতটা বেড়েছে, মূল্যস্ফীতি কতটা নিয়ন্ত্রিত থেকেছে, বেসরকারি বিনিয়োগ কতটা সুরক্ষিত হয়েছে এবং উৎপাদনশীলতা কতটা বেড়েছে—এসব সূচকের মাধ্যমে।
বাংলাদেশের সামনে এখন তাই একটি ভারসাম্যের অর্থনীতি গড়ে তোলার সুযোগ। বেতন বাড়াতে হবে, কিন্তু মূল্যস্ফীতি বাড়িয়ে নয়; সরকারি ব্যয় বাড়াতে হবে, কিন্তু উন্নয়ন ব্যয় সংকুচিত করে নয়; ঋণ নিতে হবে, কিন্তু বেসরকারি বিনিয়োগ বন্ধক রেখে নয়; সরকারি কর্মচারীর আয় বাড়াতে হবে, কিন্তু উৎপাদনশীলতা ও জবাবদিহি ছাড়া নয়। একটি সফল পে-স্কেল হবে সেটিই, যা সরকারি কর্মচারীর প্রকৃত আয় বাড়াবে কিন্তু মূল্যস্ফীতি বাড়াবে না; রাষ্ট্রীয় সেবার মান উন্নত করবে কিন্তু বেসরকারি বিনিয়োগ সংকুচিত করবে না; কর্মীদের প্রণোদনা দেবে কিন্তু উৎপাদনশীলতাকে উপেক্ষা করবে না; এবং বর্তমান প্রজন্মকে সুবিধা দেবে কিন্তু ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ওপর অযৌক্তিক ঋণের বোঝা চাপাবে না।
অতএব, নতুন পে-স্কেলকে ব্যয় হিসেবে দেখলে এর একটি অংশই দেখা হবে; এটিকে যদি মানবসম্পদে বিনিয়োগ হিসেবে বাস্তবায়ন করা যায়, তবে এটি বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য দীর্ঘমেয়াদি ইতিবাচক সম্পদে পরিণত হতে পারে। আর সেই বিনিয়োগের সাফল্যের চাবিকাঠি একটাই—বেতন বৃদ্ধির সঙ্গে রাজস্ব সক্ষমতা, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, বিনিয়োগ সুরক্ষা ও উৎপাদনশীলতার সমন্বয়।
লেখক: অর্থনীতিবিদ, গবেষক ও কলামিস্ট
[email protected]
