সায়মার পদত্যাগ: বাংলাদেশের জন্য সতর্কবার্তা ও সুযোগ

সায়মার পদত্যাগ: বাংলাদেশের জন্য সতর্কবার্তা ও সুযোগ

ফন্ট সাইজ:

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলের পরিচালকের পদ থেকে সায়মা ওয়াজেদের পদত্যাগ বাংলাদেশের জন্য শুধু একটি আন্তর্জাতিক পদ হারানোর ঘটনা নয়। এর মধ্য দিয়ে সামনে এসেছে আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব, প্রার্থী বাছাই এবং কূটনৈতিক প্রস্তুতির গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।

৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ সায়মা ওয়াজেদ ডব্লিউএইচওর মহাপরিচালক তেদরোস আধানোম গেব্রেয়াসুসের কাছে পদত্যাগপত্র দেন। তার বিরুদ্ধে চীন সফরের ব্যয়, শিক্ষাগত যোগ্যতা এবং বাংলাদেশে জমি অধিগ্রহণ নিয়ে তদন্ত চলছিল। সায়মা এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।

২০২৩ সালের নভেম্বরে সদস্যদেশগুলোর ভোটে নির্বাচিত হয়ে তিনি ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে দায়িত্ব নেন। কয়েক মাস পর ৫ আগস্ট ২০২৪ আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ঘটে। শেখ হাসিনার মেয়ে হিসেবে বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রভাব তার অবস্থানের ওপরও পড়ে। তবে দেশের অভ্যন্তরীণ তদন্ত এবং ডব্লিউএইচওর তদন্তকে এক করে দেখা ঠিক হবে না। অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণের দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট তদন্ত প্রক্রিয়ার।

২০২৫ সালের জুলাইয়ে সায়মাকে বেতনবিহীন ছুটিতে পাঠানো হয়। ৩ জুলাই ২০২৬ তার আইনজীবীরা ডব্লিউএইচওকে দেয়া চিঠিতে অভিযোগগুলোর জবাব দেন। চীন সফরের প্রায় ৯০১ ডলারের ব্যয়কে প্রশাসনিক ভুল, সম্মানসূচক ডক্টরেটকে শিক্ষাগত যোগ্যতা হিসেবে উপস্থাপনের অভিযোগকে বিভ্রান্তিকর এবং জমি অধিগ্রহণকে দায়িত্ব গ্রহণের আগের ঘটনা বলে ব্যাখ্যা করেন তিনি।

পদত্যাগপত্রে সায়মা অভিযোগ করেছেন, তাকে দায়িত্ব পালনে বাধা দেওয়া হয়েছে এবং দীর্ঘদিন বেতন ছাড়া থাকায় পরিস্থিতি তার জন্য অসহনীয় হয়ে উঠেছিল। ডব্লিউএইচও তদন্তের বিষয়ে বিস্তারিত প্রকাশ করেনি।

এই ঘটনায় দুটি নীতি গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমত, অভিযোগ উঠলে তদন্ত অবশ্যই হতে হবে। দ্বিতীয়ত, তদন্তাধীন ব্যক্তির আত্মপক্ষ সমর্থনের অধিকারও নিশ্চিত করতে হবে। অভিযোগ প্রমাণের আগে কাউকে দোষী সাব্যস্ত করা যেমন ঠিক নয়, তেমনি রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে অভিযোগকে উপেক্ষা করাও সমীচীন নয়।

তবে বাংলাদেশের জন্য এখন অতীতের চেয়ে ভবিষ্যতের প্রশ্নটি বেশি গুরুত্বপূর্ণ। সায়মার পর ডব্লিউএইচওর দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলের পরিচালক কে হবেন?

তথ্য অনুযায়ী, ১২ অক্টোবর ২০২৬ প্রার্থীদের মনোনয়ন ঘোষণার পরিকল্পনা রয়েছে এবং ২৪ জানুয়ারি ২০২৭ নতুন পরিচালক নির্বাচনের সম্ভাব্য তারিখ। অর্থাৎ বাংলাদেশের হাতে প্রস্তুতির সময় সীমিত।

দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলে ভারতসহ একাধিক প্রভাবশালী সদস্যরাষ্ট্র রয়েছে। তাই এবার শুধু একজন প্রার্থী দাঁড় করানো যথেষ্ট হবে না। প্রার্থীর পেশাগত যোগ্যতা, আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা এবং বিভিন্ন দেশের সঙ্গে কাজ করার সক্ষমতার পাশাপাশি প্রয়োজন আগাম কূটনৈতিক সমর্থন।

সায়মার ঘটনাটি বাংলাদেশের জন্য আরেকটি শিক্ষা দিয়েছে আন্তর্জাতিক গুরুত্বপূর্ণ পদে ব্যক্তিগত বা রাজনৈতিক পরিচয়ের চেয়ে প্রার্থীর নিজস্ব যোগ্যতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা বেশি গুরুত্বপূর্ণ। ভবিষ্যৎ প্রার্থী বাছাইয়ে এই মানদণ্ডকে অগ্রাধিকার দেয়া জরুরি।

একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক পদকে বিচ্ছিন্ন অর্জন হিসেবে দেখার পুরোনো কৌশল থেকেও বেরিয়ে আসতে হবে। কোন পদ বাংলাদেশের জন্য কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ, কোন প্রার্থী সেখানে সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য এবং কোন দেশগুলোর সমর্থন প্রয়োজন এসব নিয়ে নির্বাচন ঘোষণার অনেক আগেই কাজ শুরু করা দরকার।

সায়মা ওয়াজেদের পদত্যাগ তাই বাংলাদেশের জন্য একই সঙ্গে সতর্কবার্তা ও সুযোগ। সতর্কবার্তা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বিশ্বাসযোগ্যতার বিকল্প নেই। সুযোগ আসন্ন নির্বাচনকে সামনে রেখে বাংলাদেশ নতুন প্রার্থী ও নতুন কূটনৈতিক কৌশল নিয়ে এগোতে পারে।

আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে কোনো শূন্যস্থান দীর্ঘদিন খালি থাকে না। ২৪ জানুয়ারি ২০২৭-এর নির্বাচন দেখাবে, বাংলাদেশ সেই শূন্যস্থান পূরণের জন্য কতটা প্রস্তুত নাকি অন্য কোনো দেশ এসে জায়গাটি নিয়ে নেবে।

লেখক: সুইজারল্যান্ডভিত্তিক বেসরকারি ব্যাংকিং আর্থিক অপরাধ বিশেষজ্ঞ, কলামিস্ট ও কবি।

ই-মেইল: [email protected]